Loading..

ব্লগ

রিসেট

১১ আগস্ট, ২০২৬ ১১:৪০ পূর্বাহ্ণ

এআই ভয়েস ক্লোনিং: শিক্ষা ও সামাজিক ব্যবস্থায় নতুন সংকট

একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে যদি আপনি দেখেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপনার একটি ভিডিয়ো ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে আপনি এমন কিছু কথা বলছেন, যা আপনি কোনো দিনই বলেননি। অথবা আপনার কণ্ঠে এমন একটি অডিয়ো ভাইরাল হয়েছে, যা আপনি কখনো রেকর্ড করেননি। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ভিডিয়োটি এতটাই বাস্তব যে আপনার পরিবারের সদস্য, বন্ধু কিংবা সহকর্মীরাও সেটিকে সত্য বলে বিশ্বাস করছেন। কয়েক বছর আগেও এমন একটি ঘটনা কল্পবিজ্ঞানের গল্প বলে মনে হতো; কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রগতির ফলে আজ এটি বাস্তব। আমরা এমন এক সময়ে প্রবেশ করেছি, যেখানে শুধু মিথ্যা কথাই নয়, মিথ্যা প্রমাণও তৈরি করা সম্ভব। আর এখানেই ডিপফেক প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় বিপদ।

Presidency University admission (300x250)

মানবসভ্যতার ইতিহাসে প্রতিটি প্রযুক্তি বিপ্লব মানুষের জীবনকে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেই ধারাবাহিকতার সর্বশেষ এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী উদ্ভাবন। চিকিৎসা, কৃষি, শিক্ষা, গবেষণা, শিল্প, ব্যবসা ও প্রশাসন সব ক্ষেত্রেই এআই ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে। ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষা, ভাষা অনুবাদ, গবেষণা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সহায়তা, তথ্য বিশ্লেষণ এবং সৃজনশীল কাজে এআই ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। কিন্তু প্রতিটি শক্তিশালী প্রযুক্তির মতো এআইও একটি দ্বিমুখী অস্ত্র। নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের অভাবে এর অপব্যবহার ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র এবং শিক্ষাব্যবস্থার জন্য গভীর সংকট সৃষ্টি করতে পারে। বর্তমানে সেই অপব্যবহারের সবচেয়ে আলোচিত দুটি রূপ হলো ডিপফেক এবং এআই ভয়েস ক্লোনিং।

ডিপফেক হলো এমন একটি প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে একজন ব্যক্তির মুখমণ্ডল অন্য একজনের শরীর বা ভিডিয়োর সঙ্গে এমনভাবে সংযুক্ত করা হয় যে তা বাস্তব ভিডিয়ো বলে মনে হয়। একইভাবে এআই ভয়েস ক্লোনিং প্রযুক্তির মাধ্যমে মাত্র কয়েক সেকেন্ড বা কয়েক মিনিটের অডিয়ো নমুনা ব্যবহার করে কোনো ব্যক্তির কণ্ঠস্বর অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নকল করা যায়। ফলে এমন বক্তব্য, সাক্ষাৎকার বা ভিডিয়ো তৈরি করা সম্ভব, যা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কখনো বলেননি বা করেননি। প্রযুক্তির এই সক্ষমতা চলচ্চিত্র, ডাবিং, ভাষা শিক্ষা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সহায়তা এবং সৃজনশীল শিল্পে ইতিবাচকভাবে ব্যবহৃত হলেও, অনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের কারণে বিশ্বজুড়ে সামাজিক, রাজনৈতিক ও শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক নেতা, রাষ্ট্রপ্রধান, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, বিচারপতি, সাংবাদিক, শিক্ষক, শিল্পী এবং জনপ্রিয় ব্যক্তিদের নিয়ে অসংখ্য ডিপফেক ভিডিয়ো ও ভুয়া অডিয়ো তৈরি হয়েছে। নির্বাচনকে প্রভাবিত করা, রাজনৈতিক বিভ্রান্তি সৃষ্টি, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ানো, ব্যক্তিগত চরিত্রহনন বা আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভুয়া ভিডিয়ো কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। পরবর্তীতে সেটি মিথ্যা প্রমাণিত হলেও সামাজিক ক্ষতি, রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং মানুষের বিশ্বাসের সংকট অনেক ক্ষেত্রেই আর পুরোপুরি দূর করা যায় না।

সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে নিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি ভুয়া ছবি ও ভিডিয়ো সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগে মেটা ইন্ডিয়ার প্রধান অরুণ শ্রীনিবাসের বিরুদ্ধে মামলা করেছে হায়দরাবাদ পুলিশের সাইবার ক্রাইম বিভাগ।

পুলিশ জানিয়েছে, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে সাম্প্রতিক সময়ে প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে একাধিক ভুয়া ভিডিয়ো, ছবি ও বিভ্রান্তিকর পোস্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব কনটেন্টের বড় অংশই এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি হওয়ায় সাধারণ ব্যবহারকারীদের পক্ষে সেগুলোর সত্যতা যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এরকম ঘটনা বাংলাদেশ সহ বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও ঘটছে।

ডিপফেক ও ভয়েস ক্লোনিংয়ের কারণে সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট। একসময় ছবি ও ভিডিয়োকে শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু এখন একটি ভিডিয়ো সত্য না কৃত্রিম, তা সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে মানুষ সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য নির্ধারণে বিভ্রান্ত হচ্ছে। গণতান্ত্রিক সমাজে সঠিক তথ্যের ওপর জনমত গড়ে ওঠে; অথচ ডিপফেক সেই ভিত্তিকেই দুর্বল করে দিচ্ছে। এ কারণে একে অনেক গবেষক তথ্য বিশৃঙ্খলার নতুন রূপ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই প্রযুক্তির অপব্যবহারের বড় শিকার হয়ে উঠছে শিক্ষার্থীরা। বর্তমান প্রজন্মের অধিকাংশ শিক্ষার্থী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়।তারা যেমন সহজেই ডিপফেক প্রযুক্তির শিকার হতে পারে, তেমনি কেউ কেউ না বুঝেই এ ধরনের কনটেন্ট তৈরিতে জড়িয়ে পড়তে


মন্তব্য করুন