সহকারী শিক্ষক
১১ আগস্ট, ২০২৬ ১১:৪২ পূর্বাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
হিরোশিমা-নাগাসাকির ৮০ বছরের ক্ষত। হিরোশিমার আনরাকুজি মন্দিরের পুরোনো ফটকটার ছাদে একটি ছিদ্র আছে। স্থপতিরা ইচ্ছে করেই রেখেছেন সেটা। কারণ ফটকের ঠিক নিচে দাঁড়িয়ে আছে পাখা আকৃতির পাতাওয়ালা প্রাচীন প্রজাতির একটা জিঙ্কগো গাছ, যাকে কোনোভাবেই কাটা যাবে না, ছাঁটা যাবে না। তার স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার পথ বাধাগ্রস্ত করা যাবে না। গাছটি প্রতিবছর ছাদ ফুঁড়ে আকাশের দিকে হাত বাড়ায়। আর মানুষ নিচ থেকে চরম বিস্ময় নিয়ে তা দেখে। এই গাছের বয়স ৮০ পেরিয়েছে। ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে বিস্ফোরণকেন্দ্র থেকে মাত্র দুই কিলোমিটারের মধ্যে দাঁড়িয়ে থেকেও সে বেঁচে গিয়েছিল। তবে সে সময় মানুষ, ঘরবাড়ি, ইতিহাসসহ চারপাশের প্রায় সবকিছু মুহূর্তে ভস্মীভূত হয়ে গিয়েছিল।
৬ আগস্টের সকাল। সেদিন হিরোশিমার আকাশে যেন আগুনের গোলায় ছেয়ে গেল। প্রথম তিন সেকেন্ডে বিস্ফোরণকেন্দ্র থেকে তিন কিলোমিটার দূরেও তাপমাত্রা ছিল সূর্যপৃষ্ঠের তাপমাত্রার প্রায় কয়েকগুণ। এই একটিমাত্র বোমা সেদিন প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল প্রায় দেড় লাখ মানুষের। কেউ মারা গিয়েছিলেন মুহূর্তে। কেউ আবার পরের কয়েক মাসে বিকিরণের প্রভাবে ধুঁকে ধুঁকে পরপাড়ে পাড়ি জমিয়েছিল। ঠিক তিন দিন পর ৯ আগস্ট। একই ভাগ্য নেমে আসে নাগাসাকির ওপর। দুটি শহর, দুটি সকাল; কিন্তু সেই একই রকম নিঃস্তব্ধতা। সেদিন নাগাসাকি শহরের বুকেও একই রকম প্রলয় চলেছিল। তবে মাটির নিচে, শিকড়ের অন্ধকারে কিছু জীবন সেই আগুনকে ফাঁকি দিয়েছিল। হিরোশিমার ছয়টি জিঙ্কগো গাছ বিস্ফোরণস্থল থেকে মাত্র এক থেকে দুই কিলোমিটারের মধ্যে থেকেও ভাগ্যগুণে বেঁচে গিয়েছিল। এখনো গাছগুলো বসন্তে নতুন কুঁড়ি ছাড়ে। জাপানিরা এই গাছগুলোকে নাম দিয়েছে ‘বোমাবিদ্ধ গাছ’। তথ্য মতে, আজ হিরোশিমা আর নাগাসাকি মিলিয়ে প্রায় দুই শতাধিক এমন গাছ টিকে আছে। যাদের অনেক ডাল এখনো হেলে আছে বিস্ফোরণকেন্দ্রের দিকেই। যেন সেই মুহূর্তটাকে তারা আজও ভুলতে পারেনি!
মানুষ ভোলেনি, ভুলতে পারেওনি। যে মানুষগুলো সেদিন বেঁচে গিয়েছিলেন, জাপানি ভাষায় তাদের বলা হয় ‘হিবাকুশা’। অর্থাৎ ‘বিস্ফোরণে আক্রান্ত মানুষ’। আর যে গাছগুলো বেঁচে গিয়েছিল তারা ‘হিবাকু জুমোকু’। দুটো শব্দের মধ্যে একটা আশ্চর্য মিল। প্রকৃতি আর মানুষ সেদিন একই ধ্বংসের ভেতর দিয়ে হেঁটে এসেছিল। সেই ক্ষতচিহ্ন বহন করে চলেছে আজও। বিভীষিকাময় ঘটনার আশি বছর পার হয়ে গেছে। প্রশ্নটা এখনো একই জায়গায় দাঁড়িয়ে- বিশ্বের নীতিনির্ধারকরা কি সত্যিই শিক্ষা নিয়েছে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ইতিহাসের পাতা নয়, তাকাতে হবে সোজা আজকের পৃথিবীর দিকে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক হিসাব বলছে, ২০২৬ সালের শুরুতে পৃথিবীতে মোট পারমাণবিক ওয়ারহেডের (ক্ষেপণাস্ত্র, রকেট বা বোমার সম্মুখভাগ। যাতে বিস্ফোরক ও বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ মজুত থাকে) সংখ্যা প্রায় ১২ হাজার ১৮৭, যার প্রায় সাড়ে ৯ হাজার এখনো সামরিক মজুতে সক্রিয় ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় রাখা আছে। আবার এর মধ্যে প্রায় চার হাজার বারোটি ওয়ারহেড ইতোমধ্যেই ক্ষেপণাস্ত্র আর বিমানে সংযুক্ত করে প্রস্তুত রাখা হয়েছে মোতায়েনের জন্য। আর সবচেয়ে ভয়ংকর খবর হলো- প্রায় দুই হাজারের বেশি ওয়ারহেড রাখা আছে উচ্চ সতর্ক অবস্থায়। অর্থাৎ মিনিটের মধ্যেই এগুলো নিক্ষেপ করা সম্ভব। উন্নত নয়টি দেশ যথা- যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ব্রিটেন, ফ্রান্স, চীন, ভারত, পাকিস্তান, উত্তর কোরিয়া আর ইসরায়েল এই অস্ত্রভাণ্ডারের মালিক। আর সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় প্রতিটি দেশই নিজেদের অস্ত্রভাণ্ডার আধুনিকায়ন করেছে এবং করছে। অনেকে যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নতুন নতুন অস্ত্র মোতায়েনও করেছে।
হিরোশিমায় যে একটিমাত্র বোমা একটা শহরকে মুছে দিয়েছিল। ধারণা করা যায়, আজকের আধুনিক ওয়ারহেডগুলোর ধ্বংসক্ষমতা তার তুলনায় বহু গুণ বেশি। এমন রাসায়নিক ও ক্ষেপণাস্ত্র অস্ত্র বিভিন্ন দেশে মজুত আছে হাজার হাজার। দক্ষিণ এশিয়ায় পারমাণবিক যুদ্ধের ঝলকানির ক্ষীণ সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এর প্রয়োগ হবে না- একথা বলার সময় এখনো আসেনি। সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, ভারতে ওয়ারহেডের সংখ্যা আগের থেকে বেড়েছে বলে জানা যাচ্ছে। পাকিস্তানও নিজের অস্ত্রভাণ্ডার বাড়িয়ে চলেছে সমান্তরালে। যদিও এই প্রতিযোগিতার কোনো নির্দিষ্ট শেষবিন্দু নেই। একটা দেশ বাড়ালে আরেকটা দেশও বাড়ায়। এই দুষ্টচক্র চলছে দশকের পর দশক ধরে।
বর্তমানে রাশিয়া-ইউক্রেন, ইসরায়েল-ফিলিস্তিনি ও আমেরিকা-ইরানের সঙ্গে থেমে থেমে যে যুদ্ধ চলমান রয়েছে সেখানে যুদ্ধ থামানোই একমাত্র সমাধান। পারমাণবিক সরঞ্জাম মজুত শুধু ধ্বংসই ডেকে আনে। বিশ্বব্যাপী পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বব্যাপী সামরিক ব্যয় এখন রেকর্ড উচ্চতায়। যা বছরে প্রায় ২.৯ ট্রিলিয়ন ডলার। এই একই অর্থের সামান্য একটা অংশ যদি জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় তথা খরা, বন্যা ও উপকূল ভাঙনে বিপর্যস্ত মানুষের পুনর্বাসনে কিংবা বাংলাদেশের মতো দেশের নদী রক্ষায় ব্যয় হতো তাহলে পৃথিবীর চেহারাটা হয়তো আজ অন্যরকম হতো। যুদ্ধ আর জলবায়ু সংকট দুটোকে আলাদা সমস্যা মনে হলেও বাস্তবে তারা একই মুদ্রার দুই পিঠ। অস্ত্র প্রতিযোগিতায় ব্যয় হওয়া প্রতিটি টাকা আসলে পৃথিবীকে বাঁচানোর একটা হারানো সুযোগ।
মানুষের স্মৃতিও কমে আসছে ক্রমেই। জাপানের সরকারি হিসেব বলছে, জীবিত ‘হিবাকুশা’দের (যারা যুদ্ধে বেঁচে গিয়েছিল) গড় বয়স এখন পঁচাশির ওপরে। আর তাদের সংখ্যা প্রতি বছর দ্রুত কমছে। যারা সরাসরি সেই আগুনের সাক্ষী তারা একে একে চলে যাচ্ছেন। আর কয়েক দশক পরে হয়তো আর কেউ থাকবেন না। যিনি নিজের চোখে দেখা পারমাণবিক ক্ষতির কথা বলতে পারবেন। তখন স্মৃতি বহনের দায়িত্ব বর্তাবে শুধু জাদুঘর, বই, আর সেই গাছগুলোর ওপর। যারা এখনো প্রতি বসন্তে পাতা ছাড়ে, নিঃশব্দে সাক্ষ্য দিয়ে যায়।
তেজস্ক্রিয়তা আর ধ্বংসস্তূপের বাইরেও পারমাণবিক যুদ্ধের একটা আরও দীর্ঘস্থায়ী, আরও নীরব বিপদ আছে। বিজ্ঞানীরা যাকে বলেন ‘নিউক্লিয়ার উইন্টার’ বা পারমাণবিক শীত। বড় পরিসরের পারমাণবিক সংঘাত হলে ব্যাপক বিস্ফোরণ আর অগ্নিকাণ্ড থেকে বিপুল পরিমাণ কালি ও ধোঁয়া বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে গিয়ে জমা হয়। যা বছরের পর বছর সূর্যের আলো পৃথিবীর পৃষ্ঠে পৌঁছাতে বাধা দেয়। পেনসিলভানিয়া স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, একটা বৈশ্বিক পারমাণবিক যুদ্ধ হলে বিশ্বের ভুট্টা উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমিয়ে দেয়। আর এই ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে লাগতে পারে বছরের পর বছর। এমনকি ভারত-পাকিস্তানের মতো আঞ্চলিক পারমাণবিক সংঘাতও কালি ছড়িয়ে দেবে বিশ্বজুড়ে। এমনকি দূরবর্তী দেশের ফসল উৎপাদনও কমিয়ে দেবে উল্লেখযোগ্য হারে। অর্থাৎ পারমাণবিক অস্ত্র যাকে আঘাত করে ক্ষতি তার একার সীমানায় থেমে থাকে না। সমুদ্র পেরিয়ে, মহাদেশ পেরিয়ে সেই ক্ষত ছড়িয়ে পড়ে গোটা কৃষি-ব্যবস্থায় ও খাদ্যশৃঙ্খলে। শেষমেশ মানুষ-প্রকৃতি নির্বিশেষে সবার বেঁচে থাকার সংগ্রামে।
যুদ্ধ শুধু মানুষ মারে না। একটা ভূখণ্ডের মাটি, জল, বাতাস, প্রতিটা জীবিত কোষকে বছরের পর বছর বিষাক্ত করে রাখে। হিরোশিমার মাটিতে আজও বিজ্ঞানীরা তেজস্ক্রিয়তার সূক্ষ্ম চিহ্ন খুঁজে পান। যদিও শহরটা এখন সবুজ, ঝলমলে ও পুনর্জীবিত! এই পুনর্জীবনটাই আসল গল্প। মানুষ যতটা দ্রুত ধ্বংস করতে পারে, প্রকৃতি ততটা দ্রুত সারিয়ে তুলতে পারে না। জিঙ্কগো গাছের একটা বীজ থেকে পূর্ণাঙ্গ গাছ হতে লাগে কয়েক দশক। বিপরীতে আর একটা বোমা ফাটতে লাগে এক সেকেন্ডেরও কম
১৩
১৮ মন্তব্য