প্রধান শিক্ষক
১১ আগস্ট, ২০২৬ ০১:৪৬ অপরাহ্ণ
পরীক্ষার ফলাফল মেধার পরিপূর্ণ মূল্যায়ন নয়
এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর কারও ঘরে আনন্দের ঢেউ, কারও মুখে হাসি, আবার কারও চোখে অশ্রু। কেউ গোল্ডেন এ প্লাস পেয়েছে, কেউ ভালো ফল করেছে; আবার কেউ হয়তো প্রত্যাশিত ফল করতে পারেনি, কেউ এক বা একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছে।
আজকের দিনটি তাদের জন্য নিঃসন্দেহে কষ্টের। এতদিনের পরিশ্রম, প্রত্যাশা, পরিবারের স্বপ্ন—সবকিছু যেন মুহূর্তেই ভারী হয়ে এসেছে।
প্রিয় শিক্ষার্থী, একটি পরীক্ষায় তুমি ব্যর্থ হয়েছ—জীবনে নয়। একটি ফলাফল তোমার মেধার পূর্ণ মূল্যায়ন নয়, তোমার ভবিষ্যতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তও নয়।
আজ যে ফলাফল তোমাকে কাঁদাচ্ছে, সঠিকভাবে শিক্ষা নিতে পারলে আগামী দিনের সাফল্যের জন্য সেটিই হতে পারে তোমার সবচেয়ে বড় প্রেরণা। তাই আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। কেননা আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি রয়েছে। নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি রয়েছে।
’ (সুরা আলাম নাশরাহ, আয়াত : ৫–৬)
আয়াতে আল্লাহ বলেননি—কষ্টের পরে স্বস্তি আসবে; বরং বলেছেন, কষ্টের সঙ্গেই স্বস্তি রয়েছে। অর্থাৎ কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও আল্লাহ ভবিষ্যতের সম্ভাবনা এবং বান্দার জন্য কল্যাণের দরজা খুলে দেন। তাই আজকের ব্যর্থতাকে জীবনের শেষ অধ্যায় মনে কোরো না। বরং এটিকে একটি নতুন অধ্যায়ের প্রথম পৃষ্ঠা মনে করো।
প্রিয় শিক্ষার্থী, তুমি পরীক্ষায় ফেল করেছ—এটা একটি ফলাফল।
কিন্তু তুমি একজন মানুষ, একজন সম্ভাবনাময় তরুণ বা তরুণী, একজন সন্তানের পরিচয়, একটি পরিবারের স্বপ্ন এবং সর্বোপরি আল্লাহর সৃষ্টি। তোমার মূল্য শুধু একটি মার্কশিটে লেখা কয়েকটি সংখ্যায় নির্ধারিত হয় না। সমাজ কখনো কখনো ফলাফল দিয়ে মানুষকে বিচার করে। কিন্তু আল্লাহ মানুষের চেহারা, সম্পদ কিংবা বাহ্যিক অবস্থার দিকে তাকান না; তিনি মানুষের অন্তর ও আমল দেখেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের চেহারা ও সম্পদের দিকে তাকান না; বরং তিনি তোমাদের অন্তর ও আমলের দিকে তাকান।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৬৪)
জীবনের ইতিহাস খুলে দেখলে দেখা যায়, অনেক সফল মানুষের পথও মসৃণ ছিল না। কেউ প্রথম চেষ্টায় সফল হয়েছেন, কেউ বারবার ব্যর্থ হয়ে শেষ পর্যন্ত নিজের কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে পৌঁছেছেন। তোমারও হয়তো কিছু ভুল হয়েছে। পড়াশোনায় নিয়মিত ছিলে না, সময়ের সঠিক ব্যবহার করোনি, পড়ার পদ্ধতিতে সমস্যা ছিল, অথবা কোনো বাস্তব পরিস্থিতি তোমার প্রস্তুতিতে বাধা দিয়েছে। এখন আবেগে নিজেকে দোষারোপ না করে ভুলগুলো খুঁজে বের করো। কেননা ব্যর্থতার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—কেন ব্যর্থ হয়েছি, সেটা খুঁজে বের করা।
ফল খারাপ হয়েছে বলে কষ্ট পাওয়া স্বাভাবিক। চোখে পানি আসতে পারে। বাবা-মায়ের সামনে দাঁড়াতে লজ্জা লাগতে পারে। বন্ধুদের ভালো ফল দেখে নিজের প্রতি খারাপ লাগতে পারে। আর রাসুলুল্লাহ (সা.) মুমিনের জীবন সম্পর্কে অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক একটি কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘মুমিনের ব্যাপারটি আশ্চর্যজনক! তার প্রতিটি অবস্থাই তার জন্য কল্যাণকর। সে সুখ লাভ করলে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে—এটি তার জন্য কল্যাণকর। আর বিপদে পড়লে ধৈর্য ধারণ করে—এটিও তার জন্য কল্যাণকর।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৯৯৯)
অভিভাবকের করণীয়
প্রিয় অভিভাবক, আপনার সন্তান ফলাফলে ব্যর্থ হয়েছে বলে তাকে ব্যর্থ মানুষ বানিয়ে দেবেন না। এই মুহূর্তে হয়তো আপনারও কষ্ট হচ্ছে। আপনি সন্তানের জন্য স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু মনে রাখবেন, আপনার সন্তানের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এখন আপনার ভালোবাসা, ধৈর্য ও সঠিক দিকনির্দেশনা। তাকে অন্যের সন্তানের সঙ্গে তুলনা করবেন না। ‘ও গোল্ডেন এ প্লাস পেল, তুমি পারলে না কেন?’ —এই কথাটি হয়তো তার ভেতরের কষ্টকে আরও গভীর করে দেবে। বরং বলুন— ‘ফলাফল খারাপ হয়েছে, সমস্যা নেই। আমরা আবার শুরু করব। কোথায় ভুল হয়েছে, সেটা খুঁজে বের করব। তুমি চেষ্টা করো, আমরা তোমার পাশে আছি।’ একটি কোমল বাক্য হয়তো একজন ভেঙে পড়া সন্তানের জীবনকে আবার দাঁড় করিয়ে দিতে পারে।
প্রিয় শিক্ষার্থী, তোমার জন্য করণীয় হলো-
১. আল্লাহর ওপর ভরসা করো।
২. নিজের ভুল স্বীকার করো।
৩. নতুন পরিকল্পনা তৈরি করো।
৪. মোবাইল ও অপ্রয়োজনীয় ব্যস্ততা নিয়ন্ত্রণ করো।
৫. দুর্বল বিষয়গুলোতে বেশি সময় দাও।
৬. প্রয়োজন হলে শিক্ষক ও অভিভাবকের সহযোগিতা নাও।
৭. নিয়মিত পড়াশোনা, নামাজ, দোয়া ও আত্মশুদ্ধির অভ্যাস গড়ে তোলো।
আল্লাহ চেষ্টা দেখেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মানুষ তাই পায়, যার জন্য সে চেষ্টা করে।’ (সুরা : নাজম, আয়াত : ৩৯)
তাই এবার তোমার লক্ষ্য হোক শুধু ‘পাস করা’ নয়; বরং নিজেকে এমনভাবে প্রস্তুত করা, যেন আগামীবার তুমি নিজের সামর্থ্যের সর্বোচ্চটুকু দিতে পারো। আজকের ব্যর্থতা যদি তোমাকে আরও পরিশ্রমী, শৃঙ্খলাবদ্ধ, বিনয়ী ও আল্লাহমুখী করে তোলে, তবে এই ব্যর্থতাই একদিন তোমার জীবনের একটি মূল্যবান শিক্ষা হয়ে দাঁড়াবে। তাই হতাশ হয়ো না। আবার শুরু করো। তোমার সামনে এখনো অনেক পথ বাকি।
১৩
১৮ মন্তব্য