সহকারী অধ্যাপক
১২ আগস্ট, ২০২৬ ০৩:২২ পূর্বাহ্ণ
সহকারী অধ্যাপক
আমার শিক্ষকতা জীবনের অন্যতম সেরা শিক্ষক হচ্ছেন পরম শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব, ইসলামিক স্কলার, বহু ভাষা ও গণের অধিকারী, আলিয়া মাদ্রাসা জগতের অন্যতম নক্ষত্র
ড. মো. নুরুল্লাহ আল- মাদানী, উপাধ্যক্ষ, বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (বিএমটিটিআই) গাজীপুর স্যারের সাথে।
করোনা মহামারী আমাদের অনেক কিছু নিয়ে গেছে আবার অনেক কিছু শিখিয়ে গেছে। আজকে অনলাইন জগতে বিচরণ হচ্ছে করোনা-এর শিক্ষা। এক সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয় কোরনা মহামারী আকার ধারণ করলে। দিন কাটছিল না ভালো ভাবে শিক্ষা ব্যবস্থার বেহাল দশা দেখে। সরকারি নির্দেশে তখন অনলাইন ক্লাস শুরু হয়েছিল। অনেকেই সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ও শিক্ষার্থীদের কথা চিন্তা করে অনলাইনে ক্লাস নিচ্ছিলেন তখন।
তো মাদ্রাসার শিক্ষকদের নিয়ে প্রেরণামূলক একটি জেনারেল জুম মিটিং হয়েছিল সেটাতে আমিও যুক্ত হয়েছিলাম। অন্যান্য বক্তাদের মধ্যে বক্তা হিসেবে ড. মো. নুরুল্লাহ আল- মাদানী স্যার বক্তব্য রাখছিলেন। আমি তখন বিএমটিটিআই সম্পর্কে তেমন কিছুই জানতাম না। আমার যতদূর মনে হয় এ অনুষ্ঠানে প্রফেসর মাহমুদুল হক স্যার অধ্যক্ষ বিএমটিটিআই গাজীপুরও যুক্ত ছিলেন। যুক্ত ছিলেন জনাব মোহাম্মদ কবির হোসেন স্যার। কবির স্যার বলেছিলেন স্কুল ও কলেজের শিক্ষকরা যদি ডিজিটাল কন্টেন্ট তৈরি, শিক্ষক বাতায়ন এ আপলোড ও অনলাইন ক্লাস নিতে পারেন তাহলে আপনারা মাদ্রাসার শিক্ষকরা বসে থাকবেন কেন? এ কথার যৌক্তিকতা তুলে ধরে ড. মো. নুরুল্লাহ আল- মাদানী স্যার উপস্থিত শিক্ষকদের মধ্যে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত আরবি বিষয়গুলো ভাগ করে দিলেন। নির্দেশনা দিলেন যে, যে শিক্ষকের জন যে বিষয়টি নির্ধারণ করে দিলেন সেই বিষয়ে তিনি ডিজিটাল কন্টেন্ট তৈরি করবেন, শিক্ষক বাতায়ন এ আপলোড করবেন এবং অনলাইন ক্লাস নিবেন।
আমার উপর দায়িত্ব পড়েছিল নবম/দশন শ্রেণির আরবি সাহিত্যের কন্টেন্ট তৈরির। একদিকে স্যারদের কঠোর নির্দেশনা অন্যদিকে আমার অপারগতা ও সিমাবদ্ধতা। আমি ২০০৩ সাথে এক বছরের কম্পিউটার ডিপ্লোমা করেছিলাম। কিন্তু কন্টেন্ট তৈরির কাজ জানতাম না। যতো দিন যাচ্ছে ততই চাপ ও তাগাদা অনুভব করছিলাম,,। শেষ পর্যন্ত শুধু করে দিলাম কন্টেন্ট তৈরির লক্ষ্যে গবেষণা,,।
শিক্ষক বাতায়ন এর সদস্য হলাম। আমি অবাক হলাম যে, লক্ষ্য লক্ষ্য শিক্ষক এখানে তাঁদের সৃজনশীল মেধা ও মননশীলতা দিয়ে রাতদিন পরিশ্রম করছেন। নতুন নতুন ডিজিটাল কন্টেন্ট তৈরি ও আপলোড করছেন। আমি মনে খুঁজতে লাগলাম আরবি কোন কন্টেন্ট বাতায়ন এ আছে কি না যাকে মডেল হিসেবে গ্রহণ করব।
ততদিনে উপকারী বন্ধু হিসেবে পরিচিত কিশোরগঞ্জের
মাওলানা নাজমুল হক স্যারের সাথে পরিচয় হয়ে গেছে। যাকেই বলি আমাকে একটি আরবি কন্টেন্ট দেন যা সামনে রেখে আমি আমার মেধা ও মননশীলতা দিয়ে নতুন কন্টেন্ট তৈরি করব। সবাই তখন মাওলানা নাজমুল হক স্যারের সাথে যোগাযোগ করতে বললেন। আমি যোগাযোগ করলাম তার সাথে। তিনি বললেন, আপনি যেটা তৈরি করবেন সেটাই হবে মডেল কন্টেন্ট। আপনাকে দেয়ার মতো আরবি কন্টেন্ট নেই।
শুরু হলো কন্টেন্ট তৈরির যুদ্ধ। ২০২১ সালের রমযান মাস ছিল তখন। নামাজ, গোসল, সাহরী ও ইফতার ছাড়া প্রায় বাকি সময় ল্যাপটপে বসে পার করেছিলাম কন্টেন্ট তৈরির কাজে। আমার আরবি ভাষা জানা থাকলেও প্যাডাগোজি জানা ছিল না। বিভিন্ন স্যার ও ম্যামদের সাথে তখন কথা হতো এ বিষয়ে। তাঁরা হৃদয় খুলে সহযোগিতা ও পরামর্শ দিয়ে আমাকে সমৃদ্ধ করেছিলেন,,।
আলহামদুলিল্লাহ ১০/১২ দিনের তপস্যায় দাখিল নবম/দশম শ্রেণির ১ম অধ্যায়ের ১ম পাঠ عبادة الله بالإخلاص শিরোনাম একটি কন্টেন্ট তৈরি করলাম। শিক্ষক বাতায়ন এ আপলোড করলাম। অনুপ্রেরণামূক অনেক দোয়া, পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা দিয়ে কমেন্টস করলেন অনেক স্যার ও ম্যাম। আমি অনুপ্রাণিত হয়ে আরো বেশি সময় ও মেধা ব্যয় করতে লাগলাম কন্টেন্ট তৈরির লক্ষ্যে।
আলহামদুলিল্লাহ একটা সময় এসে প্রতিদিন একটি করে কন্টেন্ট তৈরি করতে পেরেছি, সেটি শিক্ষক বাতায়ন এ আপলোড করেছি এবং তা দিয়ে লাইভ ক্লাস গ্রহণ করেছি জনপ্রিয় ফেসবুক পেইজ "বাংলাদেশ অনলাইন মাদ্রাসা" নামক পেইজে। একটা সময়ে এসে পাতাড়ী ফাযিল অনলাইন মাদ্রাসা ও Sapahar Online School & Madrasha নামক দুটি পেইজ ওপেন করি এবং সেখানে লাইভ ক্লাস গ্রহণ করি। এভাবে রাজশাহী অনলাইন স্কুল এ্যান্ড কলেজ, খুলনা অনলাইন স্কুল, দেবিদ্বার অনলাইন মাদ্রাসা সহ অনেক পেইজে লাইভ ক্লাস গ্রহণ করেছিলাম। আমার লাইভ ক্লাস ছিল অনেক তারমধ্যে ১৭২ শিক্ষক বাতায়ন এ আপলোড করেছিলাম।
এভাবে চলতে থাকে দিন। আমি ধীরে ধীরে অনেক গুলো ডিজিটাল কন্টেন্ট তৈরি করে ফেলেছি ইতোমধ্যে। দেশের মেধাবী, স্মার্ট ও সৃজনশীল মনা স্যার ও ম্যামদের সাথে পরিচিত হতে থাকি এবং তারই ধারাবাহিকতায় প্রিয় বন্ধু বেঙ্গুরা সিনিয়র মাদ্রাসা, চট্টগ্রাম এর কৃতি সন্তান জনাব মোজাম্মেল হক মারুফ এর সাথে পরিচয় হয়। সে সময় তিনি ও আমি অনলাইনে প্রায় প্রতিদিন লাইভ ক্লাস নিতাম।
ত্যাগ ও তপস্যার ফলে দেখতে দেখতে আমি দাখিল নবম/দশম শ্রেণির আরবি সাহিত্যের ধারাবাহিক ৬৫টি আরবি টু আরবি কন্টেন্ট তৈরি করে ফেলেছি। এগুলোর ভিডিও ফর্মেট ও ডিজিটাল কন্টেন্ট গুলো শিক্ষক বাতায়ন এ আপলোড করেছি এবং লাইভ ক্লাস গ্রহণ করেছি আলহামদুলিল্লাহ।
জাতির ক্রান্তিকালে খুব সামান্য অবদান রাখতে পারাই শিক্ষক বাতায়ন a2i কর্তৃপক্ষ প্রথমে আমাকে "ICT4E জেলা অ্যাম্বাসেডর" হিসেবে নির্বাচিত করে সম্মানিত করে এবং তার কিছুদিন পরই "সেরা অনলাইন পারফর্ম" স্বীকৃতি প্রদান করে। আমার প্রিয় প্রতিষ্ঠান এ অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করে সম্মানিত করে। এ ছাড়াও বিভিন্ন সংগঠন কর্তৃক সংবর্ধনা ও সম্মাননা পুরস্কার গ্রহণ করাথ গৌরব অর্জন করি আলহামদুলিল্লাহ।
এ জুম মিটিং এর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমি ধারাবাহিক ৬৫টি ডিজিটাল কন্টেন্ট তৈরির গৌরব অর্জন করেছিলাম আলহামদুলিল্লাহ। অন্যান্য বিষয় গুলোর দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকগণ নির্দেশনা অনুযায়ী কন্টেন্ট তৈরি করেছিলেন কি না আমার জানা নেই।
দাখিলের আরবি সাহিত্য বইটির সবগুলো কন্টেন্ট তৈরির নিয়ত করেছিলাম এবং সে অনুযায়ী কাজও করছিলাম। এর ফাঁকে পরম শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব জনাব মুহাম্মাদ মাকসুদুর রহমান স্যার, অধ্যাপক মাহমুদুল হক স্যার এবং ড. মো. নুরুল্লাহ আল-মাদানী স্যার এর মাধ্যমে ২০২১ সালের ১লা এপ্রিল অনলাইন আরবি ভাষা প্রশিক্ষণ কোর্স এর কার্যক্রম শুরু হয়। প্রথম ধাপে একটি ব্যাচ ও ২য় ধাপে ২য় ও ৩য় ব্যাচ শুরু হয়। আমি ও বন্ধু মারূফ ৩য় ব্যাচের প্রশিক্ষণার্থী ছিলাম। এরপর ৯ম ব্যাচে প্রশিক্ষক নির্বাচিত হওয়ার গৌরব অর্জন করি। এরপর ১২তম ব্যাচ থেকে এ পর্যন্ত ২২১তম ব্যাচ গুলোর সহকারী সমন্বয়ক ও প্রশিক্ষক অর্থাৎ কোর্স পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছি আলহামদুলিল্লাহ। এইবার অর্থাৎ ২১২-২২১তম ব্যাচ শুরুর আগে পরিচালক স্যার সহকারী বাদ দিয়ে শুধু "সমন্বয়ক ও প্রশিক্ষক" লেখার নির্দেশ প্রদান করেন আলহামদুলিল্লাহ।
আমি স্যারদের জন্য দোয়া করি আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে হায়াতে তাইয়্যেবা ও সিহ্হাতে কামেলা দান করুন। দেশ ও জাতির জন্য তাঁদের অবদান সমূহকে কবুল করুন। আমিও সবার নিকট দোয়া প্রার্থী। আল্লাহ তা'আলা আমাকে আমার উপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করার তাওফীক দান করুন। স্বাস্থ্য, মেধা ও মননশীলতায় বারাকাহ দান করুন। সবার জন্য দোয়া ও শুভকামনা রইল। আমিন সুম্মা আমিন।
১৩
১৮ মন্তব্য