সহকারী অধ্যাপক
১২ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:৫২ পূর্বাহ্ণ
চোগলখোর জান্নাতে প্রবেশ করবে না (হাদিস: «لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ نَمَّامٌ»—এর আলোকে) মোঃ মুজিবুর রহমান
চোগলখোর জান্নাতে প্রবেশ করবে না
(হাদিস: «لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ نَمَّامٌ»—এর আলোকে)
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর
বিসমিল্লাহ বলে শুরু করি, রবের নামে গান,
তাঁরই দানে জেগে থাকে মানুষের পরাণ।
জিহ্বা দিলেন কথা বলার, দিলেন বিবেক-জ্ঞান,
কথার মাঝে গড়ে স্বর্গ, কথায় জ্বলে প্রাণ।
মধুর কথা ফুলের মতো, সুবাস ছড়ায় চারি,
কটু কথা কাঁটার মতো, হৃদয় দেয় যে ভারী।
একটি কথা গড়তে পারে ভ্রাতৃত্বেরই সেতু,
একটি কথা ভাঙতে পারে আপনজনের নীড়টুকু।
তাই তো মুমিন ভেবে বলে, মেপে বলে কথা,
জিহ্বা যেন না হয় তার অন্যায়েরই ব্যথা।
সত্য কথা, সুন্দর কথা—মুমিনের পরিচয়,
অন্যের মনে আগুন জ্বালায়—এমন কথা নয়।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন সতর্ক করে তাই—
«لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ نَمَّامٌ»—ভয় করি, হায়!
অর্থ—“চোগলখোর জান্নাতে প্রবেশ করবে না”—
কথাটি শুনে মুমিন হৃদয় কাঁপে নিরন্তর।
চোগলখোর সে ব্যক্তি, যে কথা নিয়ে যায়,
একজনের বলা কথা অন্যজনকে শোনায়।
উদ্দেশ্য যদি হয় তাতে বিবাদ বাধানো,
সম্পর্ক ভেঙে অশান্তির আগুন জ্বালানো।
এক ঘরের কথা নিয়ে যায় অন্য ঘরের দ্বারে,
দুইটি হৃদয় ভাঙতে চায় কথারই আঘাতে।
বন্ধুত্বে দেয় বিষের ছোঁয়া, মনে জাগায় ক্ষত,
একটি মিথ্যা কিংবা কথা—বাড়ায় কত শত!
চোগলখোরি ছোট পাপ—এ কথা মনে নয়,
এর আঘাতে সমাজজুড়ে অশান্তি সৃষ্টি হয়।
ভাইয়ের সাথে ভাইয়ের লাগে হিংসার দ্বন্দ্ব,
বন্ধুত্ব ভেঙে দূরে সরে প্রিয় মানুষের বন্ধ।
স্বামী-স্ত্রীর শান্ত সংসার অশান্ত হয়ে যায়,
আপনজনের ভালোবাসাও সন্দেহে হারায়।
পাড়া-মহল্লা, পরিবার আর সমাজের মাঝে,
চোগলখোরি আগুন ধরায় অতি গোপন কাজে।
যে কথা বলা দরকার নেই, বলো না সে কথা,
অন্যের দোষ ছড়িয়ে বেড়ানো পাপেরই ব্যথা।
যে কথা শুনে ফিতনা বাড়ে, থামাও সেই বাণী,
মুমিন হবে শান্তির দূত—হবে না অশান্তির কারিগর কোনোদিনই।
গিবত হলো পেছনে কারও এমন কথা বলা,
যা শুনলে সে কষ্ট পাবে, মনে দেবে জ্বালা।
সত্য হলেও পেছনে বলা গিবত—ভুল নয়,
মিথ্যা হলে অপবাদ—আরও ভয়ংকর ক্ষয়।
নামীমাহ হলো মানুষের কথা নিয়ে যাওয়া,
একজনের কথা অন্যজনের কাছে লাগানো।
উদ্দেশ্য যদি সম্পর্ক ভাঙা, বিবাদ সৃষ্টি করা,
তবে সে পথে শয়তানেরই থাকে প্ররোচনা।
জিহ্বা যদি লাগামহীন, বিপদ আসে ঘরে,
মানুষ তখন নিজেই নিজের ক্ষতি করে।
তাই মুমিন আগে ভাবে—“কথাটি কি সত্য?”
“কথাটি কি প্রয়োজনীয়? এতে হবে কি মঙ্গল?”
কথা বলার আগে একটু থামো, ভাবো ভাই,
কথাটি কি সত্যিই বলা প্রয়োজন তাই?
কথাটি কি কারও মনে দুঃখ দেবে আজ?
কথাটি কি বাড়াবে শুধু শত্রুতা আর লাজ?
কথাটি কি গোপন কথা—রাখা উচিত গোপন?
কথাটি কি ছড়ালে হবে কারও ক্ষতি অপার?
কথাটি কি সংশোধনের, নাকি শুধু নিন্দা?
বিবেক দিয়ে যাচাই করে তারপর দিও ইঙ্গিত।
যে কথাতে মঙ্গল নেই, সে কথা না বলাই ভালো,
নীরবতার অনেক সময় জ্বলে পবিত্র আলো।
সব কথা বলা বুদ্ধিমানের পরিচয় কখনো নয়,
কখনো নীরব থাকাই শ্রেষ্ঠ—তাতেই মঙ্গল হয়।
জিহ্বা ছোট অঙ্গ, কিন্তু শক্তি তার বড়,
ভুল কথাতে মুহূর্তে যে সম্পর্ক যায় ঝরো।
একটি কথা ফিরিয়ে আনা যায় না আর,
তাই কথার আগে মুমিন করে নিজের বিচার।
মিথ্যা কথা, কটু কথা, অপমানের বাণী,
অন্যের দোষ প্রকাশ করা—সবই ক্ষতির খনি।
অকারণে তর্ক করা, বিদ্রূপ করা, হাসি,
এসব থেকেও দূরে থাকা মুমিনেরই খুশি।
যে জিহ্বায় কুরআন পড়ে, সে জিহ্বা পবিত্র রাখো,
দরুদ পড়ে, জিকির করে—সেই অভ্যাস রাখো।
সত্য, ন্যায়, কল্যাণেরই কথা বলো ভাই,
অন্যের মনে শান্তি দেবে—এমন কথা চাই।
একটি কথা আগুন হয়ে জ্বালাতে পারে ঘর,
একটি কথা ভালোবেসে মুছে দিতে পারে ক্ষত।
একটি কথা ভাঙতে পারে বছরের সম্পর্ক,
একটি কথা গড়তে পারে নতুন বিশ্বাসের পথ।
একটি কথা মায়ের চোখে আনতে পারে জল,
একটি কথা বাবার মনে করতে পারে ছল।
একটি কথা বন্ধুর বুকে দিতে পারে ব্যথা,
একটি কথা ফিরিয়ে আনে হারিয়ে যাওয়া কথা।
তাই বলো মিষ্টি কথা, বলো সত্য কথা,
ভালোবাসার ভাষায় ভরাও মানুষের ব্যথা।
জিহ্বা হোক রহমতের, হোক কল্যাণের দ্বার,
কথার মাধ্যমে গড়ে উঠুক সুন্দর সমাজ আর।
কেউ এসে যদি বলে—“শুনেছ তুমি ভাই?
অমুক তোমার নামে নাকি বলেছে এই!”
তখন বলো—“ভাই, থাক, আর বলো না তার কথা,
ফিতনার পথে যাব না আমি, চাই না কারও ব্যথা।”
যে তোমার কাছে অন্যের কথা এনে দেয়,
সুযোগ পেলে তোমার কথাও অন্যের কাছে যায়।
তাই তাকে আর উৎসাহ দিও না কথায়,
ফিতনার বীজ শুকিয়ে দাও প্রথমেই সেই ঠাঁই।
কেউ যদি ভুল করে থাকে, সংশোধনের পথ,
কল্যাণময়ভাবে বোঝাও—সেটিই উত্তম রথ।
অপমান নয়, প্রতিশোধ নয়, নিন্দা নয় তার কাজ,
সুন্দর ভাষায় সত্য বলা—মুমিনেরই সাজ।
শোনা কথায় বিশ্বাস করে কাউকে দোষ দিও না,
যাচাই ছাড়া কোনো খবর কখনো ছড়িও না।
গুজব হলো বিষের মতো, ছড়ায় ক্ষণে ক্ষণে,
সত্য-মিথ্যা যাচাই না করলে বিপদ আসে মনে।
কারও নামে অপবাদ দিলে ফিরে আসে তা,
আজ যে কথা অন্যের নামে, কাল তোমারই কথা।
তাই গুজবের পথ বন্ধ করো সত্য দিয়ে ভাই,
ন্যায়-নীতির পথে চলো—এটাই কাম্য তাই।
শুধু যে বলে তারই দোষ—এ কথা পুরো নয়,
যে শোনে আর উৎসাহ দেয়, তারও দায়িত্ব হয়।
চোগলখোরকে বলো—“ভাই, থামাও এই কথা,
কারও দোষ ছড়িয়ে দিয়ে বাড়িও না ব্যথা।”
যদি কথাটি ফিতনার হয়, সরে যাও সেথা,
অন্যের গোপন কথা শুনতে নেই কোনো প্রথা।
শুনে যদি মনে হয় যে বিপদ হবে বড়,
তবে থামাও সে কথাটি—সত্যের পথে চলো।
একটি পরিবার টিকে থাকে ভালোবাসার টানে,
বিশ্বাস থাকে স্বচ্ছ মনে, মায়া থাকে প্রাণে।
সেখানে যদি ঢুকে পড়ে পরনিন্দার বিষ,
শান্তির ঘর হয়ে যায় তখন অশান্তির নিঃশ্বাস।
একজনের কথা আরেকজনের কাছে লাগানো,
পুরোনো ক্ষত নতুন করে আবার জাগানো।
এভাবে কি ঘর টেকে? টেকে কি সংসার?
চোগলখোরির আগুনে পুড়ে ভালোবাসার দ্বার।
তাই পরিবারে বলো সবাই—“সত্য কথা বলি,
ভুল হলে ক্ষমা করি, ভালোবাসায় চলি।”
গোপন কথা রক্ষা করি, রাখি সবার মান,
এভাবেই গড়ে উঠুক শান্তির পরিবার।
বন্ধু যদি বিপদে পড়ে, তাকে দাও সহায়,
তার গোপন কথা রক্ষা করো বিশ্বস্ততার দায়।
বন্ধুর দোষ বন্ধুর কাছে বলো স্নেহভরে,
অন্যের কাছে ছড়িয়ে দিয়ে নয় যে ঘুরে ঘুরে।
বন্ধুত্ব মানে বিশ্বাস রাখা, পাশে থাকা ভাই,
বন্ধুর দুর্বলতা নিয়ে হাসাহাসি করা নয়।
যে বন্ধু তোমার গোপন কথা রাখে নিজের প্রাণে,
সেই বন্ধুত্ব ফুলের মতো সুবাস ছড়ায় মনে।
যদি কখনো ভুল করে থাকো কথারই কারণে,
হতাশ হয়ো না, ফিরে এসো আল্লাহরই শরণে।
ভুল বুঝে অনুতপ্ত হও, তওবা করো প্রাণে,
অন্যের ক্ষতি করে থাকলে সংশোধন আনো জীবনে।
ক্ষমা চাও মহান রবের কাছে অশ্রুসিক্ত চোখে,
ভুলের পথে আর না ফিরো দৃঢ় প্রতিজ্ঞা বুকে।
মানুষের হক নষ্ট হলে সম্ভব হলে তা শোধ,
সত্যিকার তওবার পথে মুছে যেতে পারে দোষ।
মুমিন সে নয় শুধু যে অনেক কথা জানে,
মুমিন সে, যে চরিত্র গড়ে আল্লাহর বিধানে।
জ্ঞান যদি চরিত্রে না হয়, কী তার মূল্য বলো?
কথায় যদি বিষ থাকে, হৃদয় কেমন ভালো?
মুমিনের মুখে সত্য কথা, হৃদয়ে থাকে দয়া,
অন্যের দোষ ঢেকে রাখা তার উত্তম মায়া।
ক্ষমা করে, ভালোবাসে, করে নেক কাজ,
মানুষের কল্যাণে তার জীবন হয় সাজ।
সব জায়গাতে কথা বলা জ্ঞানীর কাজ নয়,
কখন চুপ থাকতে হবে—জ্ঞানী মানুষ জানে নিশ্চয়।
নীরবতা কখনো কখনো ইবাদতেরই ঢাল,
অযথা কথার চেয়ে চুপ থাকা মহাকাল।
কথা যদি কল্যাণ আনে—তবে বলো কথা,
কথা যদি ক্ষতি আনে—থামাও তার ব্যথা।
এই নীতিতে চললে জীবন হবে সুন্দর,
জিহ্বা হবে নিয়ন্ত্রিত, হৃদয় হবে নির্মল।
যেখানে নেই চোগলখোরি, নেই পরনিন্দার জাল,
সেখানে মানুষের মাঝে ভালোবাসা ঢাল।
ভাইয়ের প্রতি ভাইয়ের থাকে আন্তরিক টান,
প্রতিবেশীর সুখে হাসে, ভাগ করে নেয় প্রাণ।
শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষক-শিক্ষার্থী শ্রদ্ধায় থাকে এক,
পরিবারে বড়-ছোট সবাই ভালোবাসে এক।
সমাজজুড়ে সত্য ও ন্যায়, সৌহার্দ্য অপরূপ,
চোগলখোরির বিষ না থাকলে জীবন হয় অনুপম।
হে মানুষ, কথা বলার আগে একটু ভেবে নিও,
কথার দায়ও একদিন তোমাকেই দিতে হবে—জেনো।
জিহ্বার উচ্চারিত শব্দ হারিয়ে যায় না হায়,
আমলনামায় লিখিত থাকে—কে কী কথা কয়।
মানুষের ইজ্জত নিয়ে খেলো না কখনো,
অন্যের গোপন কথা প্রকাশ করো না কোনো।
বন্ধুর মাঝে শত্রুতার বীজ বুনো না আর,
কারও চোখের অশ্রু হয়ো না—এটাই অঙ্গীকার।
হে আল্লাহ, আমাদের তুমি পবিত্র জিহ্বা দাও,
মিথ্যা, গিবত, চোগলখোরি থেকে দূরে রাখো।
কটু কথা ও অপবাদ থেকে রাখো নিরাপদ,
সত্য, সুন্দর, কল্যাণময় করো আমাদের শব্দ।
হৃদয়ে দাও তাকওয়া, মুখে দাও সত্যবাণী,
অন্যের দোষ ঢেকে রাখার দাও মহৎ মানসিকতা জানি।
মানুষে মানুষে ভালোবাসা বাড়ুক দিন দিন,
ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে গড়ে উঠুক সুন্দর দ্বীন।
যে ভুল করেছি অতীতে, ক্ষমা করো হে রব,
তওবার পথে চলার শক্তি দাও, দূর করো সব ক্ষত।
আমাদের জিহ্বা হোক সদা তোমার স্মরণে ভরা,
মানুষের কল্যাণে কাটুক জীবন—এই হোক সাধনা।
চোগলখোরি আগুন, এতে পুড়ে সম্পর্ক,
গিবত হলো বিষের মতো, ক্ষত করে অন্তর।
মিথ্যা কথা অন্ধকার, সত্য হলো আলো,
সুন্দর কথায় মানুষ হও, হৃদয় করো ভালো।
কথা দিয়ে ভাঙো না কারও বিশ্বাসের ঘর,
কথা দিয়ে গড়ো বরং ভালোবাসার সেতু সুন্দর।
রাসুলের সতর্কবাণী রাখো হৃদয়জুড়ে,
নামীমাহর পথ ছেড়ে দাও আল্লাহরই নূরে।
**“لا
يدخل الجنة نمام”—সতর্ক হও প্রাণ,
চোগলখোরির পথ ছেড়ে রাখো ঈমান-মান।
জিহ্বা হোক আমানত, কথা হোক নেক,
মানুষের উপকার করে কাটুক জীবন এক।
পরনিন্দা নয়, পরশ্রীকাতরতা নয়—চাই শান্তির সমাজ,
সত্য, ক্ষমা, দয়া, ইহসান—হোক জীবনের সাজ।
মুখে থাকুক সুন্দর বাণী, অন্তরে ঈমান,
মানুষের হক রক্ষা করে—পাই রবের সম্মান।
হে আল্লাহ, আমাদের করো উত্তম চরিত্রের মানুষ,
জিহ্বার সব গুনাহ থেকে রাখো চিরনিরাপদ ও নিষ্পাপ।
দুনিয়াতে শান্তি দাও, আখিরাতে দাও নাজাত,
তোমার রহমতে পূর্ণ হোক আমাদের জীবন ও পরিণাম।
আমিন।
১৪
২৩ মন্তব্য