Loading..

ব্লগ

রিসেট

১২ আগস্ট, ২০২৬ ০৫:০৯ পূর্বাহ্ণ

তাহাজ্জুদের সালাত -মোঃ মুজিবুর রহমান

তাহাজ্জুদের সালাত

মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর

ভূমিকা

রাত মানুষের জীবনে আল্লাহ তাআলার এক অপূর্ব নিয়ামত। দিনের ব্যস্ততা, কর্মচাঞ্চল্য কোলাহল শেষে যখন পৃথিবী ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হয়ে আসে, মানুষ যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়, তখন কিছু মানুষ ঘুমের আরাম ত্যাগ করে তাদের প্রতিপালকের দরবারে দাঁড়ায়। তারা দুনিয়ার কোলাহল থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়ে নীরব রাতে আল্লাহর কাছে নিজেদের দুঃখ-কষ্ট, আশা-আকাঙ্ক্ষা, অপরাধ প্রয়োজনের কথা তুলে ধরে। এই রাতের ইবাদতের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ রূপ হলো তাহাজ্জুদের সালাত

তাহাজ্জুদ শুধু কয়েক রাকাত নফল সালাতের নাম নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, আল্লাহর নৈকট্য, তাওবা, দোয়া, আত্মসমালোচনা আধ্যাত্মিক প্রশান্তি অর্জনের একটি মহৎ মাধ্যম। যে মানুষ দিনের ব্যস্ততার মধ্যেও রাতের কিছু সময় আল্লাহর জন্য নির্ধারণ করতে পারে, সে নিজের জীবনে ইবাদতের একটি গভীর সৌন্দর্য অনুভব করতে পারে।

রাতের নীরবতা যেন মুমিনের অন্তরকে প্রশ্ন করেদিনভর যাঁর দান ভোগ করেছ, যাঁর রহমতে বেঁচে আছ, তাঁর জন্য কি কিছু সময় দিতে পারবে না? তাহাজ্জুদের সালাত সেই প্রশ্নের এক সুন্দর উত্তর।

তাহাজ্জুদ কী

তাহাজ্জুদ শব্দের অর্থ হলো ঘুম থেকে জেগে উঠে ইবাদত করা। শরিয়তের পরিভাষায়, এশার সালাত আদায়ের পর কিছু সময় ঘুমিয়ে উঠে রাতের বেলায় যে নফল সালাত আদায় করা হয়, তাকে তাহাজ্জুদের সালাত বলা হয়। রাতের শেষাংশে আদায় করা এর বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ সময়গুলোর একটি।

তাহাজ্জুদ ফরজ বা ওয়াজিব নয়; এটি নফল ইবাদত। কিন্তু এর ফজিলত মর্যাদা অত্যন্ত বেশি। রাসুলুল্লাহ নিজে নিয়মিত রাতের সালাত আদায় করতেন এবং সাহাবায়ে কেরামও ইবাদতের প্রতি গভীরভাবে যত্নবান ছিলেন।

আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় বান্দাদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন

وَالَّذِينَ يَبِيتُونَ لِرَبِّهِمْ سُجَّدًا وَقِيَامًا

অর্থাৎ, “আর যারা তাদের প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সিজদাবনত দাঁড়িয়ে রাত কাটায়।
সূরা আল-ফুরকান: ৬৪

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, রাতের ইবাদত আল্লাহর নেক বান্দাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।

রাতের নীরবতা তাহাজ্জুদের সৌন্দর্য

দিনের সময় মানুষ নানা কাজে ব্যস্ত থাকে। পরিবার, শিক্ষা, চাকরি, ব্যবসা, সামাজিক দায়িত্বসবকিছু মিলিয়ে মানুষের মন নানা দিকে ছুটতে থাকে। কিন্তু গভীর রাতে যখন চারপাশ শান্ত হয়ে যায়, তখন মানুষের অন্তরও অনেকটা স্থির হওয়ার সুযোগ পায়।

নিভে আসে দিনের আলো,
নেমে আসে রাত;
নীরবতার চাদর জড়ায়
পৃথিবীর সব ঘাট।

এই সময়ে একজন মুমিন যখন অজু করে কিবলামুখী হয়ে দাঁড়ায়, তখন তার সামনে থাকে না দুনিয়ার কোনো দর্শক; থাকে শুধু তার রবের স্মরণ। সে নিজের অন্তরের কথা আল্লাহর কাছে খুলে বলতে পারে। চোখে অশ্রু এলে তা গোপন থাকে, কণ্ঠ কেঁপে উঠলে তা লোকদেখানো হয় না। কারণ সে জানেআল্লাহ তার প্রকাশ্য গোপন সবকিছুই জানেন।

তাহাজ্জুদের এই নির্জনতা মানুষের অন্তরে ইখলাস বা একনিষ্ঠতা সৃষ্টি করতে সাহায্য করে।

শয়তানের তিনটি গিঁটের শিক্ষা

সহিহ হাদিসে এসেছে, মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে, শয়তান তার মাথার পেছনে তিনটি গিঁট দেয় এবং প্রতিটি গিঁটে এমন কথা বলে যে, রাত অনেক দীর্ঘতাই ঘুমিয়ে থাকো। মানুষ জেগে উঠে আল্লাহকে স্মরণ করলে একটি গিঁট খুলে যায়; অজু করলে আরেকটি গিঁট খুলে যায়; এরপর সালাত আদায় করলে শেষ গিঁটটিও খুলে যায়। ফলে সে প্রফুল্ল উদ্যমী হয়ে সকাল শুরু করে। আর যে ব্যক্তি এভাবে জাগে না, তার সকাল অলসতা ভারাক্রান্ত অবস্থায় শুরু হতে পারে।
সহিহ বুখারি সহিহ মুসলিম

এই হাদিসে একটি গভীর শিক্ষণীয় দিক রয়েছে। এখানে গিঁট শুধু শারীরিক কোনো বাঁধন বোঝানোর জন্য নয়; বরং মানুষের ওপর অলসতা, উদাসীনতা ইবাদত থেকে দূরে রাখার প্রবণতার কথাও আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়।

ঘুম থেকে জেগে আল্লাহকে স্মরণ করা হলো প্রথম বিজয়। অজু করা হলো দ্বিতীয় বিজয়। এরপর সালাতে দাঁড়ানো হলো পূর্ণ বিজয়।

অর্থাৎ, তাহাজ্জুদ একজন মানুষকে নিজের অলসতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে শেখায়।

যিকরজাগরণের প্রথম পদক্ষেপ

গভীর ঘুম থেকে উঠে প্রথমেই আল্লাহকে স্মরণ করা একজন মুমিনের জন্য অত্যন্ত সুন্দর অভ্যাস। ঘুমের জড়তা কাটিয়ে যখন জিহ্বায় আল্লাহর নাম উচ্চারিত হয়, তখন অন্তরও ধীরে ধীরে জাগ্রত হয়।

মানুষের প্রকৃত জাগরণ কেবল চোখ খোলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। চোখ খোলা এক ধরনের জাগরণ; কিন্তু হৃদয় জাগ্রত হওয়া তার চেয়ে বড় বিষয়।

কেউ ঘুম থেকে উঠে পৃথিবীর চিন্তায় ডুবে যেতে পারে, আবার কেউ ঘুম থেকে উঠে নিজের স্রষ্টাকে স্মরণ করতে পারে। দ্বিতীয় ব্যক্তির রাতের জাগরণ নিঃসন্দেহে অধিক অর্থবহ।

তাই তাহাজ্জুদের প্রথম শিক্ষা হলোঘুমন্ত দেহের সঙ্গে যেন হৃদয়ও ঘুমিয়ে না থাকে।

অজুর পবিত্রতা

আল্লাহর দরবারে দাঁড়ানোর আগে অজু করা মুমিনের জন্য এক সুন্দর প্রস্তুতি। অজু বাহ্যিক পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি অন্তরে ইবাদতের অনুভূতিও জাগিয়ে তোলে।

নিদ্রার ভারে ক্লান্ত দেহ যখন শীতল পানির স্পর্শ পায়, তখন মানুষ নতুন সতেজতা অনুভব করে। অজু যেন তাকে বলেএখন আর ঘুমের সময় নয়; এখন তোমার রবের সামনে দাঁড়ানোর সময়।

তাহাজ্জুদের জন্য অজু করার সময় একজন মুমিনের মনে অনুভূতি থাকা উচিতআমি এমন একজন মহান সত্তার সামনে দাঁড়াতে যাচ্ছি, যিনি আমার সব কথা জানেন, আমার সব কষ্ট বোঝেন এবং আমার সব প্রয়োজন পূরণ করতে সক্ষম।

সালাতে দাঁড়ানোরবের সামনে আত্মসমর্পণ

যখন একজন মুমিন কিবলামুখী হয়ে তাহাজ্জুদের সালাতে দাঁড়ায়, তখন সে প্রকৃতপক্ষে নিজের অহংকার, দুশ্চিন্তা দুনিয়ামুখী ব্যস্ততাকে কিছু সময়ের জন্য পেছনে রেখে আল্লাহর সামনে আত্মসমর্পণ করে।

কিয়ামে সে কুরআন তিলাওয়াত করে। রুকুতে নিজের দুর্বলতা স্বীকার করে। সিজদায় গিয়ে সে তার রবের সবচেয়ে নিকটবর্তী হওয়ার বিশেষ সুযোগ লাভ করে।

রাসুলুল্লাহ বলেছেন

বান্দা তার রবের সবচেয়ে নিকটবর্তী হয় সিজদার অবস্থায়।
সহিহ মুসলিম

তাই সিজদা শুধু শরীরের একটি ভঙ্গি নয়; এটি বান্দার বিনয়, আত্মসমর্পণ ভালোবাসার প্রকাশ।

তাহাজ্জুদের সিজদায় একজন মানুষ বলতে পারেহে আল্লাহ, আমি দুর্বল, আপনি শক্তিমান; আমি অক্ষম, আপনি সর্বশক্তিমান; আমি ভুল করি, আপনি ক্ষমাশীল; আমি পথ হারাই, আপনি পথপ্রদর্শক।

তাহাজ্জুদ দোয়া

তাহাজ্জুদের অন্যতম সৌন্দর্য হলো দোয়ার সুযোগ। রাতের শেষাংশ দোয়া ইস্তিগফারের জন্য অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ সময়।

আল্লাহ তাআলা বলেন

وَبِالْأَسْحَارِ هُمْ يَسْتَغْفِرُونَ

অর্থাৎ, “আর তারা ভোরের পূর্বমুহূর্তে ক্ষমা প্রার্থনা করত।
সূরা আয-যারিয়াত: ১৮

রাতের শেষভাগে মানুষ যখন পৃথিবীর ব্যস্ততা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে, তখন সে নিজের ভুলগুলো স্মরণ করতে পারে। কারও প্রতি অন্যায় করে থাকলে তাওবা করতে পারে, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে পারে, নিজের ভবিষ্যৎ কল্যাণে জন্য দোয়া করতে পারে এবং অন্য মানুষের জন্যও কল্যাণ কামনা করতে পারে।

তবে দোয়া কবুলের অর্থ এই নয় যে মানুষ যা চাইবে, ঠিক সেই রূপেই তা অবিলম্বে পেয়ে যাবে। আল্লাহ সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময়। তিনি বান্দার জন্য যা কল্যাণকর, তা- নির্ধারণ করেন। তাই তাহাজ্জুদের দোয়ার সঙ্গে আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর পূর্ণ আস্থা থাকা উচিত।

তাহাজ্জুদ আত্মশুদ্ধি

মানুষের বাহ্যিক জীবন যেমন পরিচ্ছন্ন রাখা দরকার, তেমনি অন্তরকেও পরিশুদ্ধ করা দরকার। অহংকার, হিংসা, বিদ্বেষ, লোভ, রাগ, প্রতারণা, গীবত অন্যায়ের মতো ব্যাধি মানুষের অন্তরকে দুর্বল করে।

তাহাজ্জুদের নির্জন সময় আত্মসমালোচনার একটি সুন্দর সুযোগ সৃষ্টি করে।

আমি আজ কাকে কষ্ট দিয়েছি?
কোথায় অন্যায় করেছি?
কোনো মানুষের অধিকার কি নষ্ট করেছি?
কোনো কথা কি অপ্রয়োজনীয়ভাবে বলেছি?
আল্লাহর কোনো বিধান কি অবহেলা করেছি?

এই প্রশ্নগুলো যদি মানুষ নিজের কাছে করতে শেখে, তাহলে তার চরিত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।

তাহাজ্জুদ তাই শুধু রাতের সালাত নয়; এটি দিনের চরিত্র সংশোধনেরও একটি প্রশিক্ষণ।

তাহাজ্জুদ মানসিক প্রশান্তি

মানুষের জীবনে দুঃখ-কষ্ট, ব্যর্থতা, হতাশা, দুশ্চিন্তা অনিশ্চয়তা আসতেই পারে। কখনো মানুষ নিজের কষ্ট কাউকে বলতে পারে না। কখনো কাছের মানুষও তার মনের গভীর কথা বুঝতে পারে না।

কিন্তু আল্লাহর কাছে কিছুই গোপন নয়।

তাহাজ্জুদের সময় একজন মানুষ নিজের কষ্ট আল্লাহর কাছে তুলে ধরতে পারে। কাঁদতে পারে, ক্ষমা চাইতে পারে, সাহায্য চাইতে পারে এবং নিজের দুর্বলতা স্বীকার করতে পারে।

আল্লাহ তাআলা বলেন

أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ

অর্থাৎ, “জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।
সূরা আর-রাদ: ২৮

তবে এটাও মনে রাখতে হবে, ইবাদত মানুষের আধ্যাত্মিক শক্তির গুরুত্বপূর্ণ উৎ হলেও জীবনের গুরুতর সমস্যার ক্ষেত্রে বিশ্বস্ত অভিভাবক, শিক্ষক বা উপযুক্ত বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়াও প্রয়োজন হতে পারে। ইসলাম মানুষকে আল্লাহর ওপর ভরসা করতে শেখায় এবং একই সঙ্গে বৈধ উপকারী উপায় অবলম্বন করতেও উৎসাহিত করে।

তাহাজ্জুদ রাসুলুল্লাহ

রাসুলুল্লাহ -এর জীবনে রাতের ইবাদতের বিশেষ গুরুত্ব ছিল। তিনি দীর্ঘ সময় সালাতে দাঁড়াতেন এবং আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতেন।

আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ এত দীর্ঘ সময় রাতের সালাত আদায় করতেন যে তাঁর পা ফুলে যেত। তাঁকে বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ বান্দা হতে চাওয়ার কথা প্রকাশ করেন।

এখানে আমাদের জন্য বড় শিক্ষা হলোইবাদত শুধু পুরস্কারের আশায় নয়; আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা কৃতজ্ঞতার কারণেও করা উচিত।

তাহাজ্জুদ দাম্পত্য জীবন

ইসলাম এমন পরিবারকে পছন্দ করে, যে পরিবার একে অপরকে নেক কাজে সহযোগিতা করে। স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে নামাজ, সৎকাজ আল্লাহর স্মরণে সাহিত করতে পারে।

হাদিসে এমন দম্পতির প্রশংসা এসেছে, যারা রাতে উঠে আল্লাহর ইবাদত করে এবং একে অপরকে জাগিয়ে দেয়। এমনকি প্রয়োজনে কোমলভাবে পানি ছিটিয়ে জাগানোর কথাও হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।

এখানে মূল শিক্ষা হলোদাম্পত্য সম্পর্ক শুধু পার্থিব আনন্দের সম্পর্ক নয়; এটি আখিরাতের কল্যাণেরও একটি অংশীদারিত্ব।

যে স্বামী স্ত্রীকে নেক কাজে উৎসাহ দেয় এবং যে স্ত্রী স্বামীকে ইবাদতে সহযোগিতা করে, তাদের সংসার পারস্পরিক সহযোগিতা, শ্রদ্ধা আল্লাহভীতির মাধ্যমে আরও সুন্দর হতে পারে।

তবে জাগানো অবশ্যই ভালোবাসা, কোমলতা পারস্পরিক সম্মানের সঙ্গে হওয়া উচিত; বিরক্তি, অপমান বা জোরজবরদস্তির মাধ্যমে নয়।

তাহাজ্জুদ পারিবারিক পরিবেশ

একটি পরিবারে যদি রাতের কিছু সময় আল্লাহর স্মরণে কাটে, তাহলে সেই পরিবারে ইবাদতের সংস্কৃতি গড়ে উঠতে পারে। বাবা-মা নিজেরা নফল ইবাদতে যত্নবান হলে সন্তানরাও তার সুন্দর প্রভাব পেতে পারে।

তবে শিশুদের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে বয়স সক্ষমতা অনুযায়ী ধীরে ধীরে ইবাদতের অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত। ইসলামের শিক্ষা হলোইবাদতে নিয়মিততা, আন্তরিকতা ভারসাম্য বজায় রাখা।

একটি ঘর তখনই সত্যিকার অর্থে আলোকিত হয়, যখন সেখানে শুধু বৈদ্যুতিক আলো নয়, বরং ঈমান, সালাত, কুরআন, যিকর, দয়া সুন্দর চরিত্রের আলোও থাকে।

তাহাজ্জুদ কর্মজীবন

তাহাজ্জুদ আদায় করে দিনের কাজকর্মে উদাসীন হয়ে যাওয়া ইসলামের শিক্ষা নয়। একজন মুমিনের জীবন হওয়া উচিত ভারসাম্যপূর্ণ। সে আল্লাহর ইবাদত করবে, পরিবারের দায়িত্ব পালন করবে, মানুষের হক আদায় করবে, নিজের পেশাগত দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করবে এবং সমাজের কল্যাণে কাজ করবে।

তাই তাহাজ্জুদের উদ্দেশ্য এমন নয় যে মানুষ নিজের শরীরকে অতিরিক্ত ক্লান্ত করে দিনের ফরজ দায়িত্বে দুর্বল হয়ে পড়বে। বরং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী রাতের ইবাদত করে ফজরের সালাত আদায় করা এবং দিনের দায়িত্ব সুন্দরভাবে পালন করাই উত্তম।

ইসলাম অতিরঞ্জন নয়; ইসলাম ভারসাম্যের ধর্ম।

তাহাজ্জুদ নিয়মিততার শিক্ষা

তাহাজ্জুদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো নিয়মিততা। একদিন অনেক বেশি ইবাদত করে পরে দীর্ঘদিন বাদ দেওয়ার চেয়ে সামর্থ্য অনুযায়ী অল্প হলেও নিয়মিত ইবাদত করা উত্তম।

তাই কেউ যদি তাহাজ্জুদ শুরু করতে চায়, তাহলে প্রথমে অল্প কয়েক রাকাত দিয়ে শুরু করতে পারে। ধীরে ধীরে অভ্যাস তৈরি হলে ইবাদতের পরিমাণ বাড়ানো যেতে পারে।

নিজেকে এমন লক্ষ্য দেওয়া উচিত, যা বাস্তবে ধরে রাখা সম্ভব।

কারণ ইবাদতের সৌন্দর্য শুধু পরিমাণে নয়; এর মধ্যে আন্তরিকতা, একনিষ্ঠতা ধারাবাহিকতাও গুরুত্বপূর্ণ।

তাহাজ্জুদের আদব

তাহাজ্জুদের সালাত আদায়ের সময় কয়েকটি বিষয়ের প্রতি বিশেষভাবে খেয়াল রাখা উচিত

. এশার সালাত যথাযথভাবে আদায় করা।
. সম্ভব হলে কিছু সময় ঘুমিয়ে রাতের শেষভাগে ওঠা।
. ঘুম থেকে উঠে আল্লাহকে স্মরণ করা।
. সুন্দরভাবে অজু করা।
. নিরিবিলি মনোযোগের সঙ্গে সালাত আদায় করা।
. কুরআন তিলাওয়াত ধীরে বুঝে করার চেষ্টা করা।
. সিজদায় বেশি বেশি দোয়া করা।
. নিজের জন্য, পরিবার সমগ্র উম্মাহর কল্যাণের জন্য দোয়া করা।
. লোকদেখানো থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
১০. তাহাজ্জুদের কারণে ফজরের সালাত যেন কোনোভাবেই নষ্ট না হয়।
১১. নিজের সামর্থ্যের বাইরে অতিরিক্ত কষ্ট না নেওয়া।
১২. ইবাদতের পাশাপাশি মানুষের অধিকার পারিবারিক দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা।

তাহাজ্জুদের প্রকৃত সাফল্য

তাহাজ্জুদ আদায় করে যদি মানুষের চরিত্রে কোনো পরিবর্তন না আসে, তাহলে তার ইবাদতের উদ্দেশ্য গভীরভাবে উপলব্ধি করা হয়নি। তাহাজ্জুদের প্রভাব মানুষের কথাবার্তা, আচরণ, লেনদেন পারিবারিক জীবনে প্রকাশ পাওয়া উচিত।

যে রাতে আল্লাহর সামনে কাঁদে, সে যেন দিনে মানুষের চোখের পানি না ঝরায়।
যে রাতে ক্ষমা চায়, সে যেন দিনে অন্যায়ের ওপর জেদ না করে।
যে সিজদায় বিনয় প্রকাশ করে, সে যেন মানুষের সামনে অহংকারী না হয়।
যে আল্লাহর কাছে রিজিক চায়, সে যেন হারাম পথে সম্পদ অর্জন না করে।

এটাই তাহাজ্জুদের বাস্তব শিক্ষা।

তাহাজ্জুদ আখিরাতের প্রস্তুতি

দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী। একদিন মানুষের সব ব্যস্ততা থেমে যাবে। সম্পদ, পদমর্যাদা, খ্যাতি পার্থিব সাফল্য পেছনে পড়ে থাকবে। মানুষের সঙ্গে থাকবে তার ঈমান আমল।

তাহাজ্জুদ মানুষকে সেই অনিবার্য ভবিষ্যতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। রাতের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে যখন একজন মুমিন আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়, তখন সে নিজের আখিরাতের কথা চিন্তা করে।

সে মনে রাখেএকদিন আমাকে আমার রবের কাছে ফিরে যেতে হবে।

এই অনুভূতি মানুষের জীবনকে সংযত দায়িত্বশীল করে তুলতে পারে।

তাহাজ্জুদ: ভালোবাসার ইবাদত

ইবাদতের অনেক স্তর আছে। কখনো মানুষ ভয় থেকে আল্লাহকে স্মরণ করে, কখনো আশায়, কখনো কৃতজ্ঞতায়, আবার কখনো ভালোবাসায়।

তাহাজ্জুদের অন্যতম সৌন্দর্য হলোমানুষ নিজের ঘুমের আরাম ত্যাগ করে আল্লাহর জন্য দাঁড়ায়। সেখানে মানুষের কোনো বাহ্যিক প্রশংসার প্রয়োজন নেই।

কেউ দেখছে না, তবু সে দাঁড়ায়।
কেউ প্রশংসা করছে না, তবু সে কাঁদে।
কেউ পুরস্কার দিচ্ছে না, তবু সে দোয়া করে।

এটাই ইখলাসের সৌন্দর্য।

আমাদের করণীয়

আজকের ব্যস্ত জীবনে তাহাজ্জুদের অভ্যাস গড়ে তোলা সহজ নয়। মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিনোদন, অপ্রয়োজনীয় রাতজাগাএসব মানুষের ঘুমের সময় নষ্ট করে। ফলে ভোররাতে ওঠা কঠিন হয়ে যায়।

তাই তাহাজ্জুদের জন্য প্রথমে রাতের জীবনকে শৃঙ্খলিত করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় রাতজাগা কমাতে হবে, সময়মতো ঘুমাতে হবে, ঘুমানোর আগে আল্লাহকে স্মরণ করতে হবে এবং নিজের মধ্যে একটি দৃঢ় সংকল্প তৈরি করতে হবে।

অ্যালার্ম ব্যবহার করা যেতে পারে। পরিবারের সদস্যরা পরস্পরকে সহযোগিতা করতে পারে। তবে সবকিছুর আগে দরকার আন্তরিক ইচ্ছা আল্লাহর কাছে তাওফিক প্রার্থনা।

উপসংহার

তাহাজ্জুদের সালাত হলো রাতের নীরবতায় আল্লাহর সঙ্গে বান্দার এক গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলার অন্যতম মাধ্যম। এটি মানুষের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করতে, আত্মসংযম বাড়াতে, আল্লাহর স্মরণকে গভীর করতে এবং জীবনে আখিরাতমুখী চেতনা সৃষ্টি করতে সহায়তা করে।

রাতের আঁধার যত গভীর হয়, তাহাজ্জুদের আলো ততই হৃদয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। পৃথিবী যখন ঘুমিয়ে থাকে, তখন একজন মুমিন তার রবের সামনে দাঁড়িয়ে বলে

হে আল্লাহ, আমি আপনার বান্দা।
আমার ভুলগুলো ক্ষমা করুন।
আমার অন্তরকে পরিশুদ্ধ করুন।
আমাকে হালাল পথে চলার তাওফিক দিন।
আমার পরিবারকে ঈমান নেক আমলে সমৃদ্ধ করুন।
আমার দুঃখ-কষ্ট দূর করুন।
আমাকে মানুষের হক আদায় করার তাওফিক দিন।
আমার জীবনকে আপনার সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করুন।

তাহাজ্জুদের প্রকৃত সৌন্দর্য এখানেইএটি মানুষকে শুধু রাতের ইবাদতকারী বানায় না; বরং দিনের একজন সৎ, দায়িত্বশীল, বিনয়ী আল্লাহভীরু মানুষ হিসেবেও গড়ে তুলতে পারে।

তাই আসুন, আমরা রাতকে সম্পূর্ণ অলস ঘুমে নষ্ট না করে সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু সময় আল্লাহর জন্য রাখি। ঘুমের আরাম থেকে উঠে অজু করি, কিবলামুখী হয়ে দাঁড়াই, কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত করি, সিজদায় মাথা রাখি এবং নিজের রবের কাছে দোয়া করি।

হে আল্লাহ! আমাদের তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমাদের অলসতা দূর করুন, অন্তরকে আপনার স্মরণে জীবন্ত রাখুন, আমাদের ইবাদতে ইখলাস দান করুন এবং আমাদের রাত দিনকে আপনার সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করুন। আমিন।

 

মন্তব্য করুন