Loading..

ব্লগ

রিসেট

১২ আগস্ট, ২০২৬ ১০:৪৯ পূর্বাহ্ণ

আখেরি চাহার সোম্বা সম্পর্কে সঠিক ইতিহাস জানুন

আখেরি চাহার সোম্বা

ইতিহাস, ঐতিহ্য ও তাৎপর্য

মনিরুল হক,

       প্রতি বছর হিজরি সফর মাসের শেষ বুধবার এলেই বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে একটি পরিচিত নাম শোনা যায়, আখেরি চাহার সোম্বা। এই দিন দেশের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে, মসজিদে মসজিদে দোয়া মাহফিলের আয়োজন হয়, অনেক পরিবারে বিশেষ খাবার রান্না হয়, আবার কোথাও কোথাও অসহায় মানুষের মধ্যে খাদ্য বিতরণ করা হয়। অথচ এই একই দিনকে কেন্দ্র করে মুসলিম সমাজের ভেতরেই দীর্ঘদিনের একটি বিতর্ক আছে। কেউ একে ধর্মীয় কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দিন মনে করেন, আবার কেউ একে ভিত্তিহীন প্রথা বলে প্রত্যাখ্যান করেন। দিনটির প্রকৃত ইতিহাস, নামকরণ এবং এই দ্বিমতের কারণ জানা থাকলে বিষয়টি বুঝতে সুবিধা হয়।

২. নামের অর্থ ও ভাষাগত উৎসঃ

আখেরি চাহার সোম্বা মূলত ফার্সি শব্দবন্ধ। আরবি ও ফার্সি উভয় ভাষাতেই আখেরি শব্দের অর্থ শেষ। আর ফার্সি ভাষায় সপ্তাহের দিনগুলোর নামকরণ শনিবারকে ভিত্তি ধরে হয়। যেমন এক-শনিবার মানে রোববার, দুই-শনিবার মানে সোমবার, তিন-শনিবার মানে মঙ্গলবার, আর চার-শনিবার বা চাহার শোম্বা মানে বুধবার। অর্থাৎ শব্দগত অর্থে আখেরি চাহার সোম্বা মানে দাঁড়ায় সফর মাসের শেষ বুধবার। কিছু জনপ্রিয় লেখায় চাহার শব্দটিকে সরাসরি সফর মাস বলে ব্যাখ্যা করা হয়, কিন্তু ভাষাগতভাবে শব্দটি আসলে সংখ্যা চার-কে নির্দেশ করে, যা বুধবার বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।

৩. ঘটনার বিবরণ ও এর ধর্মীয় ভিত্তিঃ

প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, হযরত আয়েশা (রা.)-এর সূত্রে জানা যায়, নবি মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনের শেষ দিকের দীর্ঘ অসুস্থতার সময় সফর মাসের শেষ বুধবার তিনি সাময়িকভাবে কিছুটা সুস্থবোধ করেছিলেন, যদিও সন্ধ্যা নামার আগেই তিনি আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন। এই সাময়িক সুস্থতার স্মরণেই পরবর্তীকালে মুসলিম সমাজের একাংশ দিনটিকে বিশেষভাবে পালন করতে শুরু করে। তবে হাদিসবিশারদদের একটি বড় অংশ এই নির্দিষ্ট বর্ণনাটিকে সহিহ সনদে প্রমাণিত মনে করেন না। গবেষকদের লেখায় দেখা যায়, নবিজির অসুস্থতা ঠিক কোন দিন শুরু হয়েছিল তা নিয়েই বর্ণনাকারীদের মধ্যে মতভেদ আছে, কেউ বলেন শনিবার, কেউ সোমবার, কেউ বুধবার। এই মতভেদের কারণেই দিনটিকে ঘিরে গড়ে ওঠা প্রথাগুলোর সনদগত ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

৪. উপমহাদেশে প্রচলনের ইতিহাসঃ

আরব বিশ্বে এই দিনটির তেমন কোনো প্রচলন নেই, বরং এটি মূলত ভারতীয় উপমহাদেশ ও ফার্সি সংস্কৃতি প্রভাবিত অঞ্চলের একটি ঐতিহ্য। ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী দিল্লি সালতানাতের শাসকরা এবং এই অঞ্চলের সুফি-দরবেশরা রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বহু শতাব্দী ধরে দিনটি পালন করে আসছিলেন, যা পরে সাধারণ মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। মুঘল আমলেও এই প্রথা অব্যাহত ছিল বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক লেখায় উল্লেখ পাওয়া যায়। এভাবেই দিনটি ধীরে ধীরে দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম সাংস্কৃতিক জীবনের একটি অংশ হয়ে ওঠে, যদিও এর ধর্মশাস্ত্রীয় ভিত্তি নিয়ে আলোচনা কখনোই থামেনি।

৫. বাংলাদেশে দিনটি যেভাবে পালিত হয়ঃ

ক. মসজিদে মসজিদে বিশেষ দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়, যেখানে নবি করিম (সা.)-এর জন্য দোয়া করা হয়।

খ. অনেক পরিবার এই দিনে অসহায় ও দুঃস্থ মানুষের মধ্যে খাবার বিতরণ বা দান-সদকা করেন।

গ. কিছু এলাকায় বিশেষ খাবার তৈরির প্রথাও দেখা যায়, যদিও এই রীতি অঞ্চলভেদে ভিন্ন এবং সর্বজনীন নয়।

ঘ. দেশের সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে দিনটি ছুটির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত থাকে, যদিও তা সাধারণ সরকারি ছুটির মতো সর্বজনীন নয়।

৬. দিনটি নিয়ে আলেমসমাজের দ্বিমতঃ

ক. পালনের পক্ষে যাঁরাঃ ঐতিহ্যবাহী পীর-মাশায়েখ ঘরানার অনেক আলেম মনে করেন, নবি করিম (সা.)-এর সুস্থতার স্মরণে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা, দান-সদকা করা এবং দোয়া মাহফিল করা নিজে থেকেই ভালো কাজ। তাঁদের যুক্তি, এই উপলক্ষে যেসব আমল করা হয় তা মূলত সাধারণ ইবাদত, যা যেকোনো দিনই করা যায়।

খ. আপত্তি জানানো আলেমদের যুক্তিঃ আহলে হাদিস ও দেওবন্দি ধারার অনেক আলেম মনে করেন, এই দিনকে নির্দিষ্টভাবে বিশেষ ইবাদতের দিন গণ্য করা এবং এজন্য আলাদা নামাজ বা রীতি চালু করা দ্বীনের মধ্যে নতুন সংযোজন বা বিদআত, যার পক্ষে সহিহ হাদিসে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা নেই। তাঁরা প্রায়ই এই হাদিসটি উদ্ধৃত করেন, কেউ যদি এমন কোনো আমল করে যার প্রতি নির্দেশ নেই, তা প্রত্যাখ্যাত (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)।

এই দুই ধারার মতপার্থক্য মূলত ইসলামি আইনশাস্ত্রে বিদআত বা ধর্মীয় নবউদ্ভাবনের সংজ্ঞা কতটা সংকীর্ণ বা প্রশস্ত হবে, তা নিয়ে দীর্ঘদিনের ব্যাপক বিতর্কের একটি অংশ, যা শুধু এই দিনটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তাই কোনো একটি পক্ষকে একচেটিয়াভাবে সঠিক বলে ধরে নেওয়ার আগে বিষয়টির শাস্ত্রীয় জটিলতা মাথায় রাখা জরুরি।

     বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রকাশিত শিক্ষাপঞ্জিতে আখেরি চাহার সোম্বা উপলক্ষে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ছুটি রাখা হয়। তবে এটি জাতীয় সাধারণ ছুটির তালিকায় নেই, বরং ঐচ্ছিক ধর্মীয় ছুটি হিসেবে গণ্য হয়। ফলে দিনটিতে স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকলেও সরকারি-বেসরকারি অফিস, ব্যাংক ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান স্বাভাবিকভাবে চালু থাকে। ২০২৬ সালের শিক্ষাপঞ্জি অনুযায়ী ১২ আগস্ট বুধবার দিনটি এই তালিকাভুক্ত হয়েছে।

 

     খেরি চাহার সোম্বা দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম সংস্কৃতিতে বহু শতাব্দী ধরে টিকে থাকা একটি ঐতিহ্য, যার শিকড় ইতিহাস, লোকবিশ্বাস আর ধর্মীয় চর্চার মিশ্রণে গাঁথা। দিনটি নিয়ে আলেমসমাজের মধ্যে যে মতভেদ আছে, তা মূলত হাদিসের সনদ যাচাই এবং ধর্মীয় রীতিনীতির সীমারেখা নির্ধারণ সংক্রান্ত একটি গভীর শাস্ত্রীয় প্রশ্ন। একজন সাধারণ মুসলমানের জন্য সবচেয়ে ভালো পথ হলো, নিজের এলাকার নির্ভরযোগ্য আলেমের কাছ থেকে বিষয়টি জেনে নেওয়া এবং যেকোনো ধর্মীয় আমল গ্রহণের আগে তার উৎস ও ভিত্তি সম্পর্কে সচেতন থাকা। ইতিহাস আর বিশ্বাসের এই মেলবন্ধনই আখেরি চাহার সোম্বাকে বাংলাদেশের সামাজিক-ধর্মীয় জীবনের একটি বিশেষ অধ্যায় করে তুলেছে।

 

মন্তব্য করুন