সম্মান
প্রদর্শনের জন্য দাঁড়ানোর বিষয়ে
ইসলামী স্কলার বা ফকিহগণ হাদিসগুলোর
মধ্যে সমন্বয় করে অত্যন্ত চমৎকার
ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন। মূলত আরবিতে দাঁড়ানোকে ‘কিয়াম’ বলা হয়। আলেমগণ
উদ্দেশ্য ও ধরন অনুযায়ী
এই দাঁড়ানোকে প্রধানত কয়েকটি ভাগে ভাগ করেছেন।
নিম্নে
এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. কিয়াম ইলাইহি (কারও দিকে এগিয়ে
যাওয়ার জন্য বা স্বাগত
জানাতে দাঁড়ানো)
যখন
কোনো সম্মানিত অতিথি, পিতা-মাতা, শিক্ষক
বা দীর্ঘ যাত্রার পর ফিরে আসা
কোনো বন্ধু ঘরে প্রবেশ করেন,
তখন তাকে স্বাগত জানাতে,
মোসাফাহা (করমর্দন) বা মুয়ানাকা (কোলাকুলি)
করার জন্য উঠে দাঁড়ানোকে
'কিয়াম ইলাইহি' বলা হয়।
- বিধান: এটি ইসলামে সম্পূর্ণ বৈধ এবং মুস্তাহাব (উত্তম)।
- দলিল: আপনি সা'দ ইবন মু'আয (রা.)-এর যে হাদিসটি উল্লেখ করেছেন, সেটি এর প্রমাণ। এছাড়া আরেকটি বিখ্যাত হাদিস হলো—রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কন্যা ফাতিমা (রা.) যখন তাঁর কাছে আসতেন, তখন রাসূল (সা.) দাঁড়িয়ে তাঁকে স্বাগত জানাতেন, তাঁর কপালে চুমু খেতেন এবং নিজের জায়গায় বসাতেন। একইভাবে রাসূল (সা.) যখন ফাতিমা (রা.)-এর ঘরে যেতেন, তিনিও বাবার সম্মানে দাঁড়িয়ে যেতেন। (সুনান আবু দাউদ ও তিরমিজি)
২. কিয়াম লাহু (কারও আগমনে শুধু
নিজ জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা)
কোনো
ব্যক্তি মজলিসে প্রবেশ করলে তাকে স্বাগত
জানাতে এগিয়ে না গিয়ে, কেবল
তাকে সম্মান দেখানোর উদ্দেশ্যে সবাই নিজ নিজ
জায়গায় মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকা।
- বিধান: এটি ইসলামে মাকরুহ বা অপছন্দনীয়। বিশেষ করে আগমনকারী যদি আশা করে যে লোকেরা তার জন্য দাঁড়াবে, তবে তার জন্য এটি হারাম।
- দলিল: সাহাবিরা রাসূল (সা.)-কে দেখে দাঁড়াতেন না, কারণ তিনি এটি অপছন্দ করতেন। অনারব রাজা-বাদশাহদের দরবারে এ ধরনের প্রথা ছিল, যা ইসলাম সমর্থন করে না।
৩. কিয়াম আলাল-রাস (বসা
ব্যক্তির পাহারায় বা শিয়রে দাঁড়িয়ে
থাকা)
নেতা
বা বড় কোনো ব্যক্তি
বসে থাকবেন আর তার সম্মান
বা প্রতাপ বোঝানোর জন্য অন্যরা তার
মাথার কাছে বা পেছনে
দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবে।
- বিধান: এটি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
- দলিল: রাসূল (সা.) একবার অসুস্থ অবস্থায় বসে নামাজ পড়ছিলেন, সাহাবিরা তাঁর পেছনে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করছিলেন। তখন তিনি ইশারায় তাদের বসে যেতে বলেন এবং নামাজ শেষে বলেন, “তোমরা কি পারস্য ও রোমানদের মতো করতে চাচ্ছিলে, যারা তাদের রাজাদের সম্মানে দাঁড়িয়ে থাকে অথচ রাজারা বসে থাকে? তোমরা এমনটি করো না।” (সহিহ মুসলিম)
- ব্যতিক্রম: তবে নিরাপত্তা বা পাহারার খাতিরে (যেমন: রাষ্ট্রপ্রধানের পেছনে দেহরক্ষী দাঁড়িয়ে থাকা) যদি দাঁড়াতে হয়, তবে সেটি জায়েজ, কারণ এখানে উদ্দেশ্য অহংকার নয়, বরং নিরাপত্তা।
বিখ্যাত
আলেমদের দৃষ্টিভঙ্গি
- ইমাম নববী (রহ.): তিনি এই বিষয়ে একটি স্বতন্ত্র পুস্তিকা রচনা করেছেন। তার মতে, জ্ঞানী, ধার্মিক এবং সম্মানিত ব্যক্তিদের আগমনে দাঁড়ানো মুস্তাহাব। এটি অহংকারের জন্য নয়, বরং তাদের প্রতি সৌজন্য ও ভালোবাসা প্রকাশের জন্য।
- ইবনে তাইমিয়া (রহ.) ও ইবনুল কাইয়িম (রহ.): তাদের মতে, দাঁড়ানোকে নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত করা উচিত নয়। অর্থাৎ, এমন যেন না হয় যে কেউ না দাঁড়ালে আগত ব্যক্তি মনে কষ্ট পাবেন বা রাগ করবেন। সমাজ ও সংস্কৃতির সাধারণ শিষ্টাচার হিসেবে মাঝে মাঝে দাঁড়ানোতে কোনো দোষ নেই, তবে এটি যেন বাধ্যবাধকতায় রূপ না নেয়।
সারকথা
ইসলামে
সম্মান প্রদর্শনের বিষয়টি মনের অবস্থার সাথে
গভীরভাবে জড়িত। যদি দাঁড়ানোর উদ্দেশ্য
হয় ভালোবাসা প্রকাশ, মেহমানদারি, বয়স্কদের প্রতি শ্রদ্ধা বা সাহায্য করা—তবে তা ইসলামে
অত্যন্ত প্রশংসনীয়। কিন্তু যদি এর পেছনে
থাকে অহংকার, ক্ষমতা প্রদর্শন, নিজেকে অন্যের চেয়ে বড় ভাবা বা
অপরকে ছোট করা—তবে
তা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
৭
৬ মন্তব্য