Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৩ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:৩৩ পূর্বাহ্ণ

আল্লাহর স্মরণ, শোকর, সবর ও সালাত -মোঃ মুজিবুর রহমান

আল্লাহর স্মরণ, শোকর, সবর সালাত

আল্লাহর স্মরণ, কৃতজ্ঞতা, ধৈর্য নামাজের মাধ্যমে শান্তিময় জীবন

মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর

ভূমিকা

মানুষের জীবন সুখ দুঃখ, আশা হতাশা, প্রাপ্তি বঞ্চনা, সাফল্য ব্যর্থতার সমন্বয়ে গঠিত। কখনো জীবনে আনন্দ আসে, আবার কখনো নেমে আসে দুঃখের ছায়া। কখনো মানুষ নিজের সামর্থ্য, সম্পদ সাফল্য নিয়ে আনন্দিত হয়; আবার কখনো বিপদ, অসুস্থতা, অভাব, প্রিয়জনের বিচ্ছেদ কিংবা নানা প্রতিকূলতায় ভেঙে পড়ে। এই পরিবর্তনশীল জীবনে একজন মুমিনের অন্তরকে দৃঢ়, শান্ত আল্লাহমুখী রাখার জন্য ইসলামে চারটি মহৎ গুণ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণস্মরণ, শোকর, সবর সালাত

আল্লাহ তাআলা বলেন

فَاذْكُرُونِي أَذْكُرْكُمْ وَاشْكُرُوا لِي وَلَا تَكْفُرُونِ

অর্থ: তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাদের স্মরণ করব। আর তোমরা আমার প্রতি কৃতজ্ঞ হও এবং অকৃতজ্ঞ হয়ো না।
সূরা আল-বাকারা, :১৫২

আবার তিনি বলেন

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ ۚ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ

অর্থ: হে ঈমানদারগণ! তোমরা ধৈর্য সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।
সূরা আল-বাকারা, :১৫৩

এই দুটি আয়াতে মুমিনের জীবনের এক অসাধারণ পথনির্দেশ রয়েছে। প্রথমে আল্লাহর স্মরণ কৃতজ্ঞতার শিক্ষা, এরপর বিপদ সংকটে সবর সালাতের মাধ্যমে তাঁর সাহায্য প্রার্থনার নির্দেশ। তাই স্মরণ মানুষকে আল্লাহর সঙ্গে যুক্ত করে, শোকর তাকে নিয়ামতের সঠিক ব্যবহার শেখায়, সবর তাকে বিপদের সময় দৃঢ় রাখে এবং সালাত তাকে প্রতিনিয়ত আল্লাহর দরবারে ফিরিয়ে আনে।

আল্লাহর স্মরণ : হৃদয়ের প্রশান্তির উৎ

মানুষের দেহ খাদ্য পানির মাধ্যমে শক্তি পায়, কিন্তু মানুষের আত্মা প্রশান্তি পায় আল্লাহর স্মরণে। পৃথিবীর সম্পদ, ক্ষমতা, খ্যাতি আরাম মানুষকে সাময়িক আনন্দ দিতে পারে; কিন্তু অন্তরের গভীর অস্থিরতা দূর করার প্রকৃত শক্তি আল্লাহর স্মরণে নিহিত।

আল্লাহ তাআলা বলেন

أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ

অর্থ: জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।
সূরা আর-রাদ, ১৩:২৮

জিকির বা আল্লাহর স্মরণ শুধু মুখে কিছু শব্দ উচ্চারণ করার নাম নয়। আল্লাহকে স্মরণ করা মানে তাঁর মহত্ত্ব, ক্ষমতা, দয়া নিয়ামতকে মনে রাখা; তাঁর আদেশ পালন করা; নিষেধ থেকে বিরত থাকা; বিপদে তাঁর ওপর ভরসা করা এবং সুখের সময় তাঁকে ভুলে না যাওয়া।

একজন মানুষ যখন বুঝতে পারে যে তার জীবন, শক্তি, জ্ঞান, সম্পদ, পরিবার, স্বাস্থ্য প্রতিটি সুযোগ আল্লাহর দান, তখন তার হৃদয়ে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা কৃতজ্ঞতা সৃষ্টি হয়। সে অহংকার থেকে দূরে থাকে এবং নিজের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করে।

আল্লাহর স্মরণ মানুষের অন্তরকে গাফেলতা থেকে জাগিয়ে তোলে। দুনিয়ার ব্যস্ততা মানুষকে কখনো কখনো তার স্রষ্টার কথা ভুলিয়ে দেয়। অর্থ, চাকরি, ব্যবসা, শিক্ষা, পরিবার নানা দায়িত্বের মধ্যে মানুষ যখন আল্লাহকে ভুলে যায়, তখন বাহ্যিক সাফল্য থাকলেও অন্তরে শূন্যতা তৈরি হতে পারে। কিন্তু নিয়মিত জিকির, কুরআন তিলাওয়াত, দোয়া, ইস্তিগফার আল্লাহর প্রতি মনোযোগ সেই শূন্যতা দূর করতে সাহায্য করে।

শোকর : নিয়ামতের সঠিক মূল্যায়ন

আল্লাহ মানুষকে অসংখ্য নিয়ামত দিয়েছেন। দৃষ্টি, শ্রবণ, জ্ঞান, বিবেক, সুস্থতা, পরিবার, খাদ্য, পানি, বায়ু, সময়সবই তাঁর দান। মানুষ অনেক সময় যে নিয়ামতগুলো প্রতিদিন ভোগ করে, সেগুলোর মূল্য উপলব্ধি করে না। কোনো একটি নিয়ামত হারানোর পর তখন তার গুরুত্ব বুঝতে পারে।

আল্লাহ তাআলা বলেন

لَئِنْ شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ

অর্থ: তোমরা কৃতজ্ঞ হলে অবশ্যই আমি তোমাদের আরও বাড়িয়ে দেব।
সূরা ইবরাহিম, ১৪:

শোকর অর্থ শুধু মুখে আলহামদুলিল্লাহ বলা নয়; যদিও আল্লাহর প্রশংসা করা শোকরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রকৃত শোকর হলোআল্লাহর দেওয়া নিয়ামতকে স্বীকার করা, তাঁর প্রশংসা করা এবং সেই নিয়ামত তাঁর সন্তুষ্টির পথে ব্যবহার করা।

চোখের শোকর হলো হারাম জিনিস থেকে দৃষ্টি সংযত রাখা এবং কল্যাণকর বিষয় দেখা। কানের শোকর হলো অশ্লীলতা অন্যায় থেকে কান রক্ষা করা এবং সত্য কল্যাণের কথা শোনা। জিহ্বার শোকর হলো সত্য কথা বলা, আল্লাহর প্রশংসা করা, ভালো কথা বলা এবং পরনিন্দা, মিথ্যা অপবাদ থেকে বিরত থাকা। সম্পদের শোকর হলো তা বৈধভাবে উপার্জন করা এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে দান-সদকা করা। জ্ঞানের শোকর হলো তা কল্যাণে ব্যবহার করা এবং অন্যকে উপকার করা।

অতএব, শোকর হলো একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন। যে মানুষ শোকর করতে শেখে, সে অল্পের মধ্যেও তৃপ্তি খুঁজে পায়। সে অন্যের সঙ্গে নিজের তুলনা করে অহেতুক হতাশ হয় না; বরং আল্লাহ তাকে যে নিয়ামত দিয়েছেন, তার জন্য কৃতজ্ঞ থাকে।

অকৃতজ্ঞতার ক্ষতি

অকৃতজ্ঞতা মানুষের অন্তরকে কঠিন করে দেয়। যে ব্যক্তি শুধু কী পায়নি তা নিয়ে চিন্তা করে, সে কী পেয়েছে তা ভুলে যায়। ফলে তার মনে অসন্তোষ, হিংসা হতাশা জন্ম নিতে পারে।

শোকর মানুষকে বিনয়ী করে, আর অকৃতজ্ঞতা তাকে অহংকারী করে তুলতে পারে। শোকর মানুষকে নিয়ামতের মর্যাদা শেখায়, আর অকৃতজ্ঞতা নিয়ামতের অপব্যবহারের দিকে ঠেলে দেয়।

তাই একজন মুমিনের উচিত সুখের সময় আল্লাহকে স্মরণ করা এবং দুঃখের সময়ও তাঁর রহমতের আশা না হারানো। জীবনে যা আছে, তার জন্য শোকর করতে হবে; যা নেই, তার জন্য বৈধ চেষ্টা করতে হবে; আর ফলাফল আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিতে হবে।

সবর : বিপদের সময় ঈমানের শক্তি

মানুষের জীবনে বিপদ আসবেই। কখনো অর্থনৈতিক সমস্যা, কখনো পারিবারিক সংকট, কখনো অসুস্থতা, কখনো ব্যর্থতা, আবার কখনো প্রিয়জনের বিচ্ছেদবিভিন্ন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে মানুষের জীবন অতিক্রম করে।

ইসলাম বিপদের সময় হতাশ হয়ে পড়তে শেখায় না; বরং সবর করতে শেখায়। সবর মানে অন্যায়ের কাছে আত্মসমর্পণ করা নয় এবং চেষ্টা ছেড়ে দেওয়াও নয়। বরং সবর হলো আল্লাহর বিধান মেনে চলার ক্ষেত্রে দৃঢ় থাকা, বিপদের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং বৈধ উপায়ে সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।

আল্লাহ বলেন

إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ

অর্থ: নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।
সূরা আল-বাকারা, :১৫৩

আল্লাহর সঙ্গে থাকা বলতে এখানে মানুষের মতো স্থানগত বা শারীরিক সঙ্গ বোঝায় না। বরং এর অর্থ হলোআল্লাহ তাঁর জ্ঞান, সাহায্য, রহমত, হেফাজত বিশেষ অনুগ্রহের মাধ্যমে ধৈর্যশীল বান্দাদের সহায়তা করেন।

সবরের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। প্রথমত, আল্লাহর আনুগত্যে অবিচল থাকা। দ্বিতীয়ত, গুনাহ নিষিদ্ধ কাজ থেকে নিজেকে সংযত রাখা। তৃতীয়ত, বিপদ-আপদে অস্থির না হয়ে আল্লাহর ওপর আস্থা রাখা এবং বৈধ উপায়ে প্রতিকার গ্রহণ করা।

সবর মানুষকে দুর্বল করে না; বরং তাকে মানসিক নৈতিকভাবে শক্তিশালী করে। রাগের সময় নিজেকে সংযত রাখা, প্রলোভনের সময় হারাম থেকে দূরে থাকা, কষ্টের সময় হতাশ না হওয়া এবং ইবাদতে নিয়মিত থাকাসবই সবরের অন্তর্ভুক্ত।

পরীক্ষার সময় সবর

আল্লাহ তাআলা বলেন

وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنْفُسِ وَالثَّمَرَاتِ ۗ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ

অর্থ: আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা এবং সম্পদ, জীবন ফল-ফসলের ক্ষয়ক্ষতির মাধ্যমে। আর ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও।
সূরা আল-বাকারা, :১৫৫

এই আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে পরীক্ষা জীবনের স্বাভাবিক অংশ। বিপদ এলেই আল্লাহ আমাদের পরিত্যাগ করেছেনএমন ধারণা সঠিক নয়। কখনো বিপদ মানুষের জন্য পরীক্ষা, কখনো সতর্কতা, কখনো শিক্ষা এবং কখনো তার মর্যাদা বৃদ্ধির মাধ্যম হতে পারে। তবে কোনো নির্দিষ্ট বিপদকে নিশ্চিতভাবে আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তি বা বিশেষ পুরস্কার বলে ঘোষণা করার আগে শরিয়তের প্রমাণের প্রয়োজন।

মুমিনের কর্তব্য হলো বিপদের সময় আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়া, দোয়া করা, বৈধ উপায়ে চিকিৎসা বা সমাধান গ্রহণ করা এবং ধৈর্য ধারণ করা।

সালাত : আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সম্পর্কের প্রধান মাধ্যম

সালাত ইসলামের অন্যতম প্রধান ইবাদত। এটি শুধু একটি আনুষ্ঠানিক কাজ নয়; বরং একজন মুসলমানের দৈনন্দিন জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। দিনে পাঁচবার সালাত মানুষকে দুনিয়ার ব্যস্ততা থেকে কিছু সময়ের জন্য আল্লাহর সামনে দাঁড় করায়।

সালাতে মানুষ দাঁড়ায়, রুকু করে এবং সিজদায় অবনত হয়। এতে মানুষের অহংকার ভেঙে যায় এবং সে উপলব্ধি করেসে আল্লাহর বান্দা।

সালাত মানুষের সময়কে শৃঙ্খলিত করে। ফজর দিনের সূচনা করে আল্লাহর স্মরণে; জোহর আসর দিনের ব্যস্ততার মাঝে আল্লাহকে স্মরণ করিয়ে দেয়; মাগরিব দিনের সমাপ্তির কথা মনে করায় এবং এশা মানুষকে রাতের আগে আত্মসমালোচনার সুযোগ দেয়।

আল্লাহ বলেন

وَأَقِمِ الصَّلَاةَ لِذِكْرِي

অর্থ: আমার স্মরণের জন্য সালাত কায়েম করো।
সূরা ত্ব-হা, ২০:১৪

কারণে সালাত জিকিরের মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। সালাত মানুষকে আল্লাহর স্মরণে ফিরিয়ে আনে এবং তার অন্তরকে পরিশুদ্ধ করার সুযোগ সৃষ্টি করে।

সালাত দুঃখ-কষ্ট

বিপদের সময় মানুষ অনেকের কাছে সাহায্য চায়। কিন্তু একজন মুমিন সর্বপ্রথম তার রবের দিকে ফিরে যায়। আল্লাহ নিজেই বলেছেন

اسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ

অর্থ: ধৈর্য সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো।

সালাত মানুষের দুঃখকে অস্বীকার করে না; বরং দুঃখের মধ্যেও আল্লাহর ওপর নির্ভর করার শক্তি দেয়। সিজদায় মানুষ নিজের দুর্বলতা স্বীকার করে এবং মহান আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে।

তবে সালাতকে কেবল দুঃখের সময়ের ইবাদত মনে করা উচিত নয়। সুখে যেমন সালাত আদায় করতে হবে, তেমনি দুঃখেও। বিপদ চলে গেলে আল্লাহকে ভুলে যাওয়া মুমিনের বৈশিষ্ট্য নয়। বরং সুখ-দুঃখ উভয় অবস্থায় আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রাখা ঈমানের দাবি।

স্মরণ, শোকর, সবর সালাতের পারস্পরিক সম্পর্ক

এই চারটি বিষয় পরস্পর গভীরভাবে সম্পর্কিত। স্মরণ মানুষকে আল্লাহর সঙ্গে যুক্ত করে। শোকর তাকে আল্লাহর নিয়ামতের মূল্য বুঝতে শেখায়। সবর তাকে বিপদে দৃঢ় রাখে। আর সালাত তাকে নিয়মিতভাবে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হওয়ার সুযোগ দেয়।

সুখের সময় শোকর এবং দুঃখের সময় সবরমুমিনের জীবনের দুটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। আর উভয় অবস্থাতেই আল্লাহর স্মরণ সালাত তার শক্তির উৎস।

রাসুলুল্লাহ বলেছেন, মুমিনের ব্যাপারটি আশ্চর্যজনকতার সব অবস্থাই কল্যাণকর। সুখ পেলে সে শোকর করে, আর তা তার জন্য কল্যাণকর; বিপদে পড়লে সে সবর করে, আর সেটিও তার জন্য কল্যাণকর।
সহিহ মুসলিম

এই শিক্ষা আমাদের জীবনকে নতুন দৃষ্টিতে দেখতে শেখায়। সুখ পেলে অহংকার নয়শোকর; বিপদ এলে হতাশা নয়সবর; সব অবস্থায় গাফেলতা নয়আল্লাহর স্মরণ; আর প্রতিটি অবস্থায় সালাতের মাধ্যমে তাঁর কাছে ফিরে যাওয়াএটাই মুমিনের পথ।

বাস্তব জীবনে এই শিক্ষার প্রয়োগ

স্মরণ, শোকর, সবর সালাত শুধু বক্তৃতা বা বইয়ের বিষয় নয়; এগুলো জীবনের বাস্তব অনুশীলন।

একজন শিক্ষার্থী পড়াশোনায় মনোযোগ দেবে, জ্ঞান অর্জনের সুযোগের জন্য আল্লাহর শোকর করবে এবং ব্যর্থ হলে হতাশ না হয়ে নতুনভাবে চেষ্টা করবে।

একজন শিক্ষক জ্ঞানদানকে দায়িত্ব মনে করবেন, নিজের জ্ঞানের জন্য আল্লাহর শোকর করবেন এবং শিক্ষার্থীদের কল্যাণে ধৈর্য আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করবেন।

একজন অভিভাবক সন্তানকে আল্লাহর আমানত হিসেবে দেখবেন। সন্তানকে ভালোবাসার পাশাপাশি নৈতিক ধর্মীয় শিক্ষায় গড়ে তুলবেন।

একজন ব্যবসায়ী হালাল উপার্জনের চেষ্টা করবেন, লাভ হলে শোকর করবেন এবং ক্ষতি হলে ধৈর্য ধারণ করে ভুল বিশ্লেষণ করে নতুনভাবে চেষ্টা করবেন।

একজন কর্মজীবী মানুষ নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবেন, কর্মক্ষেত্রের সুযোগের জন্য কৃতজ্ঞ থাকবেন এবং সমস্যার সময় ধৈর্য প্রজ্ঞার সঙ্গে সমাধানের পথ খুঁজবেন।

এভাবেই ইসলামের শিক্ষা মানুষের ব্যক্তিগত জীবন থেকে পরিবার, শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র সমাজজীবন পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।

স্মরণ শোকর মানুষের চরিত্র গঠন করে

যে মানুষ আল্লাহকে স্মরণ করে, সে নিজের কাজের হিসাব সম্পর্কে সচেতন থাকে। সে জানে, তার প্রতিটি কাজ আল্লাহর জ্ঞানের বাইরে নয়। ফলে তার মধ্যে জবাবদিহির অনুভূতি তৈরি হয়।

যে মানুষ শোকর করে, সে অহংকারী হয় না। সে জানে, তার অর্জনের পেছনে নিজের চেষ্টা থাকলেও সামর্থ্য, সুযোগ উপায় আল্লাহর দান।

যে মানুষ সবর করে, সে তাড়াহুড়ো করে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বাঁচে। সে রাগের মুহূর্তে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে এবং সংকটে বিচক্ষণতার পরিচয় দেয়।

যে মানুষ সালাত কায়েম করে, তার জীবনে নিয়ম-শৃঙ্খলা, পবিত্রতা আল্লাহভীতি গড়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টি হয়।

অতএব, এই চারটি গুণ শুধু ব্যক্তিগত ইবাদত নয়; এগুলো সুন্দর চরিত্র সুস্থ সমাজ গঠনেরও গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

উপসংহার

মানুষের জীবন কখনো একই রকম থাকে না। কখনো আলো, কখনো অন্ধকার; কখনো প্রাপ্তি, কখনো বঞ্চনা; কখনো হাসি, কখনো অশ্রুএভাবেই জীবন এগিয়ে চলে। কিন্তু একজন মুমিনের পথ হারিয়ে যাওয়ার কথা নয়। কারণ তার হাতে রয়েছে আল্লাহর দেওয়া চারটি মহান পথনির্দেশস্মরণ, শোকর, সবর সালাত

আল্লাহর স্মরণ আমাদের গাফেলতা দূর করুক। শোকর আমাদের অন্তরকে কৃতজ্ঞ বিনয়ী করুক। সবর আমাদের বিপদে দৃঢ় রাখুক। সালাত আমাদের প্রতিদিন আল্লাহর দরবারে ফিরে যাওয়ার পথ দেখাক।

আমরা যেন সুখের সময় আল্লাহকে ভুলে না যাই, দুঃখের সময় তাঁর রহমত থেকে নিরাশ না হই, নিয়ামত পেয়ে অহংকার না করি এবং বিপদে হতাশ হয়ে পড়ি না। বরং প্রতিটি অবস্থায় আল্লাহর দিকে ফিরে যাই।

আমাদের মুখে থাকুক আল্লাহর স্মরণ, অন্তরে থাকুক শোকর, আচরণে থাকুক সবর এবং জীবনে প্রতিষ্ঠিত হোক সালাত। আমাদের পরিবারে ছড়িয়ে পড়ুক ঈমানের আলো, সমাজে প্রতিষ্ঠিত হোক ধৈর্য, কৃতজ্ঞতা নৈতিকতা এবং আমাদের জীবন পরিচালিত হোক আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে।

হে আল্লাহ! আমাদের অন্তরকে আপনার স্মরণে জীবন্ত রাখুন, আপনার নিয়ামতের জন্য প্রকৃত শোকর করার তাওফিক দিন, বিপদ-আপদে সুন্দর সবর করার শক্তি দিন এবং সালাতকে আমাদের জীবনের শান্তি, শৃঙ্খলা নাজাতের মাধ্যম বানিয়ে দিন। আমাদের গুনাহ ক্ষমা করুন, ঈমানের ওপর অটল রাখুন এবং দুনিয়া আখিরাতে আপনার রহমত সন্তুষ্টি দান করুন।

আমিন।

মন্তব্য করুন