সহকারী অধ্যাপক
১৩ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:৫৮ পূর্বাহ্ণ
হিদায়াতের পথ (আল-বাকারা: ৩৮-এর আলোকে) -মোঃ মুজিবুর রহমান
হিদায়াতের পথ
(আল-বাকারা: ৩৮-এর আলোকে)
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর
ভূমিকা
মানুষের জীবন একটি পরীক্ষাময় যাত্রা। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষ নানা সুখ-দুঃখ, আশা-নিরাশা, সাফল্য-ব্যর্থতা, প্রাচুর্য-অভাব ও নানা প্রলোভনের মধ্য দিয়ে পথ চলে। এই দীর্ঘ পথচলায় মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো সঠিক পথের দিশা। কারণ জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও মানুষ ভুল করতে পারে, বুদ্ধি থাকা সত্ত্বেও অন্যায়কে ন্যায় মনে করতে পারে এবং সাময়িক স্বার্থের মোহে চিরস্থায়ী কল্যাণের পথ থেকে বিচ্যুত হতে পারে। তাই মহান আল্লাহ মানুষের জন্য যে শ্রেষ্ঠ অনুগ্রহ দান করেছেন, তার অন্যতম হলো হিদায়াত—সত্য ও সঠিক পথের নির্দেশনা।
পবিত্র কুরআনের সূরা আল-বাকারার ৩৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা আদম (আ.) ও তাঁর বংশধরদের উদ্দেশে পথনির্দেশের একটি মৌলিক নীতি ঘোষণা করেছেন। আল্লাহ বলেন—
قُلْنَا اهْبِطُوا مِنْهَا جَمِيعًا ۖ فَإِمَّا يَأْتِيَنَّكُمْ مِنِّي هُدًى فَمَنْ تَبِعَ هُدَايَ فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ
অর্থাৎ, “আমি বললাম, তোমরা সবাই এখান থেকে নেমে যাও। অতঃপর যখন আমার পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে কোনো হিদায়াত আসবে, তখন যারা আমার হিদায়াত অনুসরণ করবে, তাদের কোনো ভয় থাকবে না এবং তারা দুঃখিতও হবে না।” — সূরা আল-বাকারা, ২:৩৮
এই আয়াত মানবজীবনের জন্য এক গভীর আশ্বাস ও সুস্পষ্ট নির্দেশনা বহন করে। মানুষ পৃথিবীতে পরীক্ষার জন্য এসেছে, কিন্তু তাকে পথহীন করে পাঠানো হয়নি। মহান আল্লাহ নবী-রাসূল, আসমানি কিতাব, বিশেষত আল-কুরআন এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শের মাধ্যমে মানুষের সামনে সত্য ও মিথ্যা, ন্যায় ও অন্যায়, কল্যাণ ও অকল্যাণের পার্থক্য স্পষ্ট করে দিয়েছেন। যে ব্যক্তি আল্লাহর হিদায়াত অনুসরণ করবে, তার জন্য রয়েছে দুনিয়ায় সঠিক পথের নিশ্চয়তা এবং আখিরাতে সফলতার আশা।
হিদায়াতের অর্থ ও তাৎপর্য
‘হিদায়াত’ শব্দের অর্থ হলো পথ দেখানো, সঠিক দিকনির্দেশ দেওয়া এবং সত্যের পথে পরিচালিত করা। ইসলামী পরিভাষায় হিদায়াত বলতে এমন আল্লাহপ্রদত্ত পথনির্দেশকে বোঝায়, যা মানুষকে সঠিক আকিদা, সৎ আমল, উত্তম চরিত্র এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করে।
মানুষের সামনে সাধারণত দুটি পথ থাকে—একটি সত্য ও কল্যাণের পথ, অন্যটি ভ্রান্তি ও অকল্যাণের পথ। মানুষ যদি নিজের প্রবৃত্তি, শয়তানের প্ররোচনা কিংবা দুনিয়ার মোহকে পথপ্রদর্শক বানায়, তাহলে সে সহজেই বিপথে যেতে পারে। আর যদি আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাহকে জীবন পরিচালনার ভিত্তি বানায়, তাহলে সে হিদায়াতের পথে অগ্রসর হতে পারে।
হিদায়াত শুধু ধর্মীয় কিছু আচার পালনের নাম নয়। হিদায়াত মানুষের চিন্তা, বিশ্বাস, কথা, আচরণ, পরিবার, সমাজ, অর্থনীতি ও নৈতিক জীবনকে সুন্দর ও সুশৃঙ্খল করে। হিদায়াতপ্রাপ্ত মানুষ আল্লাহকে ভয় করে, মানুষের অধিকার রক্ষা করে, অন্যায় থেকে বিরত থাকে এবং নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকে।
আদম (আ.)-এর পৃথিবীতে আগমন ও হিদায়াতের সূচনা
আদম (আ.) ছিলেন প্রথম মানুষ ও প্রথম নবী। তাঁর মাধ্যমে মানবজাতির পৃথিবীর জীবন শুরু হয়। জান্নাতের একটি পরীক্ষামূলক অবস্থান থেকে পৃথিবীতে আগমনের পর মহান আল্লাহ মানবজাতিকে অন্ধকারে ছেড়ে দেননি। বরং স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে তাঁর পক্ষ থেকে হিদায়াত আসবে এবং যারা সেই হিদায়াত অনুসরণ করবে, তাদের জন্য ভয় ও দুঃখের ব্যাপারে বিশেষ আশ্বাস রয়েছে।
এখানে মানুষের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। পৃথিবীর জীবন যদিও পরীক্ষা, তবু এই পরীক্ষার প্রশ্নপত্র মানুষকে অজানা অবস্থায় দেওয়া হয়নি। আল্লাহ মানুষকে বিবেক দিয়েছেন, বুদ্ধি দিয়েছেন, নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন, কিতাব নাজিল করেছেন এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্য বোঝার সুযোগ দিয়েছেন।
অতএব, মানুষ যদি সত্যের সন্ধান করে এবং আল্লাহর নির্দেশ অনুসরণ করে, তবে তার জন্য সফলতার পথ উন্মুক্ত। আর হিদায়াতকে উপেক্ষা করে প্রবৃত্তির অনুসরণ করলে মানুষ নিজের ক্ষতির কারণ নিজেই হয়ে দাঁড়ায়।
হিদায়াতের প্রধান উৎস
হিদায়াতের সর্বশ্রেষ্ঠ উৎস হলো মহান আল্লাহ। তিনি তাঁর বান্দাদের পথ দেখানোর জন্য যুগে যুগে নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন। তাঁদের মাধ্যমে মানুষ জেনেছে—কে সৃষ্টিকর্তা, কেন মানুষ পৃথিবীতে এসেছে, কীভাবে জীবন পরিচালনা করতে হবে এবং মৃত্যুর পর কী হবে।
মহান আল্লাহর সর্বশেষ ও পূর্ণাঙ্গ হিদায়াতের গ্রন্থ হলো আল-কুরআন। কুরআন শুধু তিলাওয়াতের জন্য নয়; এটি জীবন পরিচালনার পথনির্দেশ। এতে ঈমান, ইবাদত, নৈতিকতা, পরিবার, সমাজ, অর্থনীতি, ন্যায়বিচার, মানবিকতা এবং আখিরাতের সফলতার বিষয়ে দিকনির্দেশনা রয়েছে।
আল-কুরআনের পাশাপাশি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ হিদায়াতের অপরিহার্য উৎস। তিনি কুরআনের শিক্ষা নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করে মানুষকে দেখিয়েছেন—কীভাবে একজন মুমিন আল্লাহর বান্দা, পরিবারের সদস্য, প্রতিবেশী, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, শাসক কিংবা সাধারণ মানুষ হিসেবে জীবনযাপন করবে।
হিদায়াত ও ঈমান
হিদায়াতের প্রথম ও প্রধান ভিত্তি হলো ঈমান। আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, তাঁর ফেরেশতা, কিতাবসমূহ, রাসূলগণ, আখিরাত এবং তাকদিরের প্রতি বিশ্বাস মানুষের জীবনকে সঠিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করে।
যার অন্তরে ঈমান দৃঢ় হয়, সে বুঝতে পারে যে পৃথিবীর জীবন চূড়ান্ত জীবন নয়। ফলে সে দুনিয়ার সাময়িক লাভের জন্য অন্যায় করতে চায় না। সে জানে, প্রতিটি কাজের হিসাব দিতে হবে। মানুষের চোখ এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হলেও আল্লাহর জ্ঞান থেকে কোনো কিছুই গোপন নয়।
এই বিশ্বাস মানুষের চরিত্রে সততা, আমানতদারি, সংযম ও দায়িত্ববোধ সৃষ্টি করে।
হিদায়াত ও সালাত
সালাত হিদায়াতপ্রাপ্ত জীবনের অন্যতম প্রধান পরিচয়। সালাত মানুষকে দিনে-রাতে বারবার আল্লাহর সামনে দাঁড় করায়। এতে বান্দা নিজের দুর্বলতা উপলব্ধি করে এবং আল্লাহর সাহায্য কামনা করে।
নামাজ শুধু কিছু নির্দিষ্ট অঙ্গভঙ্গির সমষ্টি নয়; এর উদ্দেশ্য হলো মানুষের অন্তরকে আল্লাহর স্মরণে জীবন্ত রাখা এবং তাকে অশ্লীলতা ও অন্যায় থেকে বিরত রাখার শক্তি দেওয়া।
যে ব্যক্তি নিয়মিত সালাত আদায় করে, সে যদি সালাতের শিক্ষা তার চরিত্রে ধারণ করতে পারে, তবে তার জীবনেও হিদায়াতের প্রভাব প্রকাশ পায়। তার কথায় সত্য, আচরণে নম্রতা এবং কাজে দায়িত্বশীলতা দেখা যায়।
হিদায়াত ও চরিত্র
হিদায়াতপ্রাপ্ত মানুষের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো উত্তম চরিত্র। সে মিথ্যা বলে না, প্রতারণা করে না, অন্যের অধিকার নষ্ট করে না, অহংকার করে না এবং মানুষের সঙ্গে অশোভন আচরণ করে না।
একজন সত্যবাদী ব্যবসায়ী সঠিক মাপে পণ্য দেয়। একজন শিক্ষক নিষ্ঠার সঙ্গে জ্ঞান বিতরণ করেন। একজন শ্রমিক সততার সঙ্গে শ্রম দেন। একজন শিক্ষার্থী মনোযোগ দিয়ে জ্ঞান অর্জন করে। একজন সন্তান মা-বাবার সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করে। একজন প্রতিবেশী অন্য প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা করে। এসবই হিদায়াতের বাস্তব প্রকাশ।
অতএব, হিদায়াত শুধু মুখের দাবি নয়; এটি মানুষের চরিত্র ও কর্মের মাধ্যমে প্রকাশ পায়।
হিদায়াত ও পরিবার
পরিবার মানুষের প্রথম শিক্ষালয়। সন্তান তার বাবা-মা ও পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকেই অনেক গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবোধ শেখে। তাই পরিবারে হিদায়াতের পরিবেশ সৃষ্টি করা অত্যন্ত জরুরি।
মা-বাবার দায়িত্ব হলো সন্তানকে আল্লাহর পরিচয় দেওয়া, সালাতের প্রতি উৎসাহিত করা, সত্যবাদিতা শেখানো, ভালো-মন্দের পার্থক্য বোঝানো এবং নৈতিক চরিত্র গঠনে সহায়তা করা। একইভাবে সন্তানের দায়িত্ব হলো মা-বাবার প্রতি সম্মান, ভালোবাসা ও দায়িত্বশীলতা প্রদর্শন করা।
স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করলে পরিবারে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। পারিবারিক জীবনে ধৈর্য, ক্ষমা, পরামর্শ, সহানুভূতি ও দায়িত্ববোধ হিদায়াতের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।
হিদায়াত ও যুবসমাজ
যুবসমাজ একটি দেশের ভবিষ্যৎ। তাদের চিন্তা, চরিত্র ও কর্মের ওপর সমাজের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করে। কিন্তু যৌবনের সময় নানা আকর্ষণ ও প্রলোভন মানুষকে বিপথে নিতে পারে।
একজন হিদায়াতপ্রাপ্ত তরুণ তার সময়কে মূল্যবান মনে করে। সে জ্ঞান অর্জন করে, সালাত আদায় করে, পিতা-মাতাকে সম্মান করে, নিজের দৃষ্টি ও আচরণ সংযত রাখে এবং হারাম থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে। সে বুঝতে পারে, যৌবন আল্লাহর একটি আমানত এবং এর হিসাবও দিতে হবে।
যে তরুণ নিজের শক্তি, মেধা ও সময়কে কল্যাণের কাজে ব্যবহার করে, সে ব্যক্তি ও সমাজ—উভয়ের জন্য সম্পদে পরিণত হয়।
হিদায়াত ও অর্থনৈতিক জীবন
ইসলাম মানুষের অর্থনৈতিক জীবনকেও হিদায়াতের আলোয় পরিচালিত করতে চায়। হালাল উপার্জন, সততা, আমানতদারি, ন্যায্য লেনদেন এবং মানুষের অধিকার সংরক্ষণ ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
একজন হিদায়াতপ্রাপ্ত ব্যবসায়ী মাপে কম দেয় না, মিথ্যা প্রচারণা করে না, প্রতারণা করে না এবং অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করে না। একজন কর্মজীবী ব্যক্তি দায়িত্বে অবহেলা করে না। একজন নিয়োগকর্তা শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার রক্ষা করে।
কারণ মুমিন জানে, অর্থ উপার্জন শুধু দুনিয়ার বিষয় নয়; উপার্জনের পদ্ধতি ও ব্যয়ের ক্ষেত্র সম্পর্কেও তাকে আল্লাহর কাছে জবাব দিতে হবে।
হিদায়াত ও দুঃখ-কষ্ট
হিদায়াতপ্রাপ্ত হওয়া মানে এই নয় যে মানুষের জীবনে কোনো বিপদ আসবে না। নবী-রাসূল ও নেককার মানুষরাও নানা পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন। তবে হিদায়াত মানুষকে বিপদের সময় সঠিকভাবে চলার শক্তি দেয়।
বিপদ এলে মুমিন ধৈর্য ধারণ করে, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখে এবং বৈধ উপায়ে সমস্যার সমাধান খোঁজে। সে হতাশ হয়ে অন্যায় পথে পা বাড়ায় না। বরং মনে রাখে—দুঃখের পর স্বস্তি আসতে পারে, আর আল্লাহর প্রতিটি পরীক্ষার মধ্যেও বান্দার জন্য শিক্ষা ও কল্যাণ থাকতে পারে।
তাই হিদায়াত মানুষের জীবন থেকে সব পরীক্ষা সরিয়ে দেয় না; বরং পরীক্ষার সময় সঠিকভাবে পথ চলার শক্তি দেয়।
হিদায়াত ও শয়তানের প্ররোচনা
মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রুদের একজন হলো শয়তান। সে মানুষকে অন্যায়, অহংকার, লোভ, হিংসা, মিথ্যা, অশ্লীলতা ও অবাধ্যতার দিকে আহ্বান করে। তার লক্ষ্য মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া।
কিন্তু মুমিন যদি আল্লাহকে স্মরণ করে, কুরআনের শিক্ষা অনুসরণ করে এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শকে সামনে রাখে, তাহলে সে শয়তানের প্ররোচনা প্রতিহত করার শক্তি লাভ করতে পারে।
হিদায়াতের পথ তাই আত্মসংযমের পথ। নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিকে জীবনের প্রধান লক্ষ্য বানানো এই পথের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
হিদায়াত ও তাওবা
মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। প্রত্যেক মানুষই কোনো না কোনো সময় ভুল করতে পারে। কিন্তু হিদায়াতপ্রাপ্ত মানুষের বৈশিষ্ট্য হলো—সে ভুলকে আঁকড়ে ধরে থাকে না। ভুল বুঝতে পারলে আল্লাহর কাছে ফিরে আসে।
তাওবা হলো আল্লাহর দিকে ফিরে আসার দরজা। বান্দা আন্তরিকভাবে নিজের অপরাধ স্বীকার করে, পাপ ত্যাগ করে, অনুতপ্ত হয় এবং পুনরায় সেই অপরাধে না ফেরার সংকল্প করে। এভাবে তাওবার মাধ্যমে মানুষ নতুনভাবে হিদায়াতের পথে এগিয়ে যেতে পারে।
তাই কোনো মানুষকে তার অতীত ভুলের কারণে চিরদিনের জন্য হতাশ করে দেওয়া উচিত নয়। বরং তাকে আল্লাহর রহমতের দিকে আহ্বান করা উচিত এবং সৎ পথে ফিরে আসতে উৎসাহিত করা উচিত।
হিদায়াত ও সমাজজীবন
একজন মানুষের হিদায়াত শুধু তার ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব সমাজেও পড়ে। সমাজের মানুষ যদি সত্যবাদী, আমানতদার, ন্যায়পরায়ণ ও সহানুভূতিশীল হয়, তাহলে সেখানে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়।
হিদায়াতপ্রাপ্ত ব্যক্তি অন্যের কষ্টে আনন্দ পায় না। সে প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা করে, অসহায়কে সাহায্য করে, এতিম ও দরিদ্রের প্রতি সহানুভূতিশীল হয় এবং সমাজে অন্যায়-অবিচার কমাতে নিজের অবস্থান থেকে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে।
সুতরাং হিদায়াত ব্যক্তিকে যেমন সুন্দর করে, তেমনি পরিবার ও সমাজকেও সুন্দর করে।
হিদায়াত ও আখিরাত
পৃথিবীর জীবন ক্ষণস্থায়ী। একদিন প্রত্যেক মানুষকে মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হবে। এরপর শুরু হবে আখিরাতের জীবন। সেখানে মানুষের দুনিয়ার বিশ্বাস, কর্ম ও দায়িত্ব সম্পর্কে হিসাব নেওয়া হবে।
সেদিন ধন-সম্পদ, ক্ষমতা, পদমর্যাদা কিংবা সামাজিক পরিচয় মানুষের প্রকৃত সফলতার নিশ্চয়তা দেবে না। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং ঈমান ও সৎকর্মই হবে প্রকৃত সফলতার ভিত্তি।
সূরা আল-বাকারার ৩৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন—যারা তাঁর হিদায়াত অনুসরণ করবে, তাদের কোনো ভয় থাকবে না এবং তারা দুঃখিত হবে না—এটি মুমিনের জন্য গভীর আশ্বাস। আখিরাতের সফলতা অর্জনের জন্য তাই হিদায়াতের পথে অবিচল থাকা অপরিহার্য।
হিদায়াতের পথে চলার বাস্তব উপায়
হিদায়াতের পথে চলতে হলে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন।
প্রথমত, আল্লাহর প্রতি ঈমান দৃঢ় করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত ও তার অর্থ বোঝার চেষ্টা করতে হবে।
তৃতীয়ত, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ ও আদর্শ অনুসরণ করতে হবে।
চতুর্থত, সালাতসহ ফরজ ইবাদত যথাযথভাবে পালন করতে হবে।
পঞ্চমত, হারাম ও অন্যায় কাজ থেকে বেঁচে থাকতে হবে।
ষষ্ঠত, সৎ ও নেককার মানুষের সঙ্গ গ্রহণ করতে হবে।
সপ্তমত, ভুল হলে দ্রুত তাওবা করতে হবে।
অষ্টমত, আল্লাহর কাছে নিয়মিত হিদায়াতের জন্য দোয়া করতে হবে।
আমরা প্রতিদিন সালাতে সূরা আল-ফাতিহায় বলি—
اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ
অর্থাৎ, “আমাদের সরল পথ দেখাও।”
এই দোয়া প্রমাণ করে যে একজন মুমিন যতই ঈমানদার হোক, তবুও সে প্রতিনিয়ত আল্লাহর হিদায়াতের মুখাপেক্ষী।
উপসংহার
হিদায়াত মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদগুলোর একটি। অর্থ-সম্পদ হারিয়ে গেলে তা পুনরায় অর্জন করা সম্ভব, কিন্তু হিদায়াত হারিয়ে ফেললে মানুষের জীবন তার প্রকৃত লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে যেতে পারে। তাই প্রতিটি মানুষের উচিত আল্লাহর দেওয়া হিদায়াতকে আঁকড়ে ধরা এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তার বাস্তব প্রয়োগ করা।
পৃথিবীর চাকচিক্য, ক্ষমতা, সম্পদ ও খ্যাতি একদিন শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা সৎকর্ম মানুষের আখিরাতের জীবনে উপকারে আসবে। তাই জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্তে নিজেকে প্রশ্ন করা প্রয়োজন—আমি কি আল্লাহর দেখানো পথে চলছি? আমার কথা, কাজ ও চরিত্র কি তাঁর সন্তুষ্টির উপযোগী?
সূরা আল-বাকারার ৩৮ নম্বর আয়াত আমাদের আশার আলো দেখায়। আল্লাহর হিদায়াত অনুসরণকারী মানুষের জন্য ভয় ও দুঃখের পরিবর্তে রয়েছে নিরাপত্তা ও সফলতার প্রত্যাশা। অতএব, আমাদের প্রত্যেকের উচিত কুরআনের আলোয় জীবনকে পরিচালিত করা, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণ করা, সত্য ও ন্যায়ের পথে অটল থাকা এবং আল্লাহর কাছে বারবার হিদায়াত প্রার্থনা করা।
হে আল্লাহ, আমাদের সরল পথ দেখান, সেই পথে অটল রাখুন এবং ঈমানের সঙ্গে জীবন ও মৃত্যু দান করুন। আমিন।
৬৪
১০০ মন্তব্য