Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৩ আগস্ট, ২০২৬ ০৭:৫৫ পূর্বাহ্ণ

ইসলামী জীবন ইসলামে প্যাসিভ ইনকামের বৈধ কিছু উপায়


প্যাসিভ ইনকাম হলো এমন এক ধরণের আয়, যা অর্জনের জন্য প্রতিদিন নিয়মিত কাজ বা শ্রম দিতে হয় না। শুরুতে একবার সময়, মেধা বা অর্থ বিনিয়োগ করে কোনো সিস্টেম বা সম্পদ তৈরি করতে হয়।

এরপর সেই উৎস থেকে নিয়মিত স্বয়ংক্রিয়ভাবে টাকা আসতে থাকে, এমনকি ঘুমিয়ে থাকলেও বা ছুটিতে থাকলেও। বর্তমানে এটি অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি আইডিয়া। ইসলাম সম্পদ অর্জনকে নিষিদ্ধ করেনি; বরং হালাল উপায়ে উপার্জন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সম্পদের সঠিক ব্যবহারকে উৎসাহিত করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।

’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৭৫)

প্যাসিভ ইনকামের বৈধ কিছু উপায় হলো-

১. ভাড়া থেকে আয় করা : নিজের বৈধ মালিকানাধীন বাড়ি, দোকান, অফিস, জমি, গুদাম বা অন্য কোনো বৈধ সম্পদ ভাড়া দিয়ে আয় করা প্যাসিভ ইনকামের একটি সুপরিচিত ও বৈধ মাধ্যম। এ ক্ষেত্রে সম্পত্তির মালিক ভাড়াটিয়াকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্দিষ্ট ভাড়ার বিনিময়ে সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ দেন। এটি শরিয়াহসম্মত ভাড়া/লিজ চুক্তি হিসাবে গণ্য হবে। তবে সম্পত্তিটি বৈধ কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, তা খেয়াল রাখতে হবে।

যেমন—জেনে-শুনে মদ, জুয়া, সুদি কার্যক্রম বা অন্য কোনো হারাম কাজে ব্যবহারের জন্য সম্পত্তি ভাড়া দেওয়া বৈধ হবে না।

২. হালাল ব্যবসায় অংশীদার হওয়া : কেউ নিজে সার্বক্ষণিক ব্যবসা পরিচালনা না করেও বৈধ ব্যবসায় মূলধন বিনিয়োগ করে অংশীদার হতে পারেন। ব্যবসা পরিচালনা করবেন অন্য অংশীদার, আর চুক্তি অনুযায়ী লাভ বণ্টিত হবে। এ ক্ষেত্রে মুশারাকা বা মুদারাবার পন্থা অবলম্বন করা হবে । তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—‘প্রতি মাসে নিশ্চিত ১০ শতাংশ লাভ’—এভাবে মূলধনের ওপর নির্দিষ্ট ও গ্যারান্টিযুক্ত রিটার্ন নির্ধারণ করা মুদারাবা বা মুশারাকার স্বাভাবিক কাঠামো নয়।

লাভ সাধারণত প্রকৃত লাভের নির্ধারিত অনুপাতে ভাগ হবে। ব্যবসায়িক ক্ষতির বিধানও চুক্তি ও শরিয়াহর নীতিমালা অনুযায়ী হতে হবে।

৩. কৃষিজমি বা ফলের বাগান থেকে আয় করা : নিজের জমিতে কৃষিকাজ, ফলের বাগান, মাছের চাষ বা অন্যান্য বৈধ উৎপাদনমূলক কার্যক্রমে বিনিয়োগ করে আয় করা যেতে পারে। নিজে সময় দিতে না পারলে বৈধ চুক্তির মাধ্যমে অন্যকে দায়িত্ব দিয়ে লাভের অংশ নেওয়ার ব্যবস্থা করা যায়। তবে চুক্তি স্পষ্ট হতে হবে এবং প্রতারণা, অস্পষ্টতা ও অন্যায় শর্ত থাকা যাবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস কোরো না; তবে পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসা হলে ভিন্ন কথা।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ২৯)

৪. বই বা ডিজিটাল কনটেন্টের রয়্যালটি : কেউ একটি মানসম্মত ও হালাল বই লিখলেন, সফটওয়্যার তৈরি করলেন, শিক্ষামূলক কোর্স বানালেন বা বৈধ ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করলেন। পরে সেটি বিক্রি বা লাইসেন্স দেওয়ার মাধ্যমে নিয়মিত আয় হতে পারে। এ ধরনের আয় মূলত পূর্বে সম্পাদিত সৃজনশীল শ্রম ও বৈধ অধিকার ব্যবহারের বিনিময়ে আসে। তবে কনটেন্ট অবশ্যই হালাল হতে হবে এবং কপিরাইট লঙ্ঘন, পাইরেসি বা অন্যের মেধাস্বত্ব চুরি করা যাবে না।

৫. ওয়াকফ সম্পদ : কেউ নিজের সম্পদ শরিয়াহসম্মতভাবে ওয়াকফ করে দিলে তার সম্পদ থেকে মসজিদ, মাদরাসা, এতিম, দরিদ্র বা জনকল্যাণমূলক কাজে দীর্ঘমেয়াদি উপকার হতে পারে। এখানে আর্থিক লাভের পরিবর্তে সদকায়ে জারিয়ার সওয়াব পাওয়ার প্রত্যাশাই বড় বিষয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মানুষ মারা গেলে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি বিষয় ব্যতিক্রম—সদকায়ে জারিয়া, উপকারী জ্ঞান এবং এমন নেক সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৬৩১)

৬. হালাল সম্পদ থেকে লাভ : নিজের বৈধ মালিকানাধীন কোনো সম্পদ এমনভাবে বিনিয়োগ করা যেতে পারে, যেখানে বাস্তব সম্পদ বা বৈধ ব্যবসায়িক কার্যক্রমের মাধ্যমে আয় সৃষ্টি হয়। এখানে গুরুত্বপূর্ণ হলো—শুধু টাকা দিয়ে টাকা বানানোর ব্যবস্থা যেন সুদভিত্তিক না হয়। কারণ আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৭৫)

সুতরাং ব্যাংক বা কোনো প্রতিষ্ঠানের ‘নিশ্চিত সুদ’কে প্যাসিভ ইনকাম হিসেবে গ্রহণ করা হালাল প্যাসিভ ইনকামের উদাহরণ নয়।

৭. হালাল শেয়ার বা ব্যবসায়িক মালিকানায় বিনিয়োগ : শরিয়াহসম্মত ব্যবসা পরিচালনাকারী কোনো কোম্পানির শেয়ারে প্রকৃত মালিকানার ভিত্তিতে বিনিয়োগ করে লভ্যাংশ পাওয়া কিছু ক্ষেত্রে বৈধ হতে পারে। তবে শুধু কোম্পানির নাম মুসলিম বা আকর্ষণীয় হলেই হবে না। কোম্পানির মূল ব্যবসা, সুদি ঋণ ও বিনিয়োগ, হারাম পণ্য-সেবা এবং শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগের মানদণ্ড যাচাই করতে হবে। তাই শেয়ারবাজারের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো কোম্পানিকে ‘হালাল’ বলার আগে শরিয়াহ বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে তার আর্থিক অবস্থা ও ব্যবসার প্রকৃতি যাচাই করা জরুরি।

৮. হালাল ফ্র্যাঞ্চাইজি বা ব্যবসায়িক অংশীদারি : কেউ কোনো বৈধ ব্যবসার অংশীদার হতে পারেন এবং অন্যরা ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন। যেমন—হালাল খাদ্য, কৃষি, উৎপাদন, শিক্ষা বা বৈধ সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ। তবে লাভের হিসাব, ক্ষতির দায়, মূলধনের মালিকানা এবং পরিচালনার দায়িত্ব লিখিত চুক্তিতে পরিষ্কার থাকা উচিত।

প্যাসিভ ইনকাম মানেই ‘বসে বসে টাকা পাওয়া’ নয়

এখানে একটি ভুল ধারণা দূর করা জরুরি। ইসলাম এমন কোনো ‘সহজ টাকা’ ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করে না যেখানে বাস্তব সম্পদ, শ্রম, ব্যবসা, সেবা বা ঝুঁকি কিছুই নেই—শুধু টাকা রাখলেই নিশ্চিতভাবে টাকা বাড়তে থাকে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কেউ নিজের হাতের উপার্জনের চেয়ে উত্তম খাবার কখনো খায়নি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২০৭২)

অর্থাৎ হালাল উপার্জনে শ্রম, সম্পদ, উদ্যোগ বা বৈধ ব্যবসায়িক ঝুঁকির কোনো না কোনো ভূমিকা থাকা স্বাভাবিক। প্যাসিভ ইনকাম বলতে বোঝানো যেতে পারে—প্রাথমিক শ্রম বা বিনিয়োগের পর সম্পদ বা ব্যবসা থেকে তুলনামূলক কম প্রত্যক্ষ শ্রমে আয় পাওয়া; একেবারে শ্রমহীন ও ঝুঁকিহীন নিশ্চিত অর্থপ্রাপ্তি নয়।

যেসব ‘প্যাসিভ ইনকাম’ থেকে সতর্ক থাকতে হবে

বর্তমানে প্যাসিভ ইনকামের নামে অনেক স্কিম প্রচার করা হয়। বিশেষ করে—

১. সুদভিত্তিক নির্দিষ্ট রিটার্ন

২. পিরামিড বা পনজি স্কিম

৩. শুধু নতুন সদস্য আনার ওপর কমিশন

৪. বাস্তব ব্যবসা ছাড়া টাকা দ্বিগুণ করার প্রতিশ্রুতি

৫. অতিরিক্ত অনিশ্চয়তা ও জুয়ার মতো বিনিয়োগ

৬. প্রতারণামূলক অনলাইন ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যাটফর্ম

৭. হারাম পণ্য বা সেবার ব্যবসা। এসব থেকে সতর্ক থাকা জরুরি।

মন্তব্য করুন

ব্লগ