সহকারী অধ্যাপক
১৩ আগস্ট, ২০২৬ ১০:৩৩ পূর্বাহ্ণ
বিচার দিনের প্রস্তুতি - মোঃ মুজিবুর রহমান
বিচার দিনের প্রস্তুতি
(সূরা আলে ইমরান: ৬, ৭, ৯ ও ১০-এর আলোকে)
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর
ভূমিকা
মানুষের জীবন কেবল জন্ম, কর্ম, ভোগ ও মৃত্যুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের পার্থিব জীবন একটি পরীক্ষার সময়; মৃত্যুর পর রয়েছে অনিবার্য প্রত্যাবর্তন, পুনরুত্থান, হিসাব-নিকাশ এবং কর্মফলের চূড়ান্ত পরিণতি। পৃথিবীতে মানুষ যত ক্ষমতাবান, ধনী, জ্ঞানী কিংবা সম্মানিতই হোক না কেন, একদিন তাকে তার প্রতিপালকের সামনে দাঁড়াতে হবে। সেদিন কোনো পদমর্যাদা, সম্পদ, বংশগৌরব কিংবা পার্থিব প্রভাব তাকে আল্লাহর বিচার থেকে রক্ষা করতে পারবে না।
সূরা আলে ইমরানের ৬, ৭, ৯ ও ১০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা মানুষের সৃষ্টি, কুরআনের আয়াতের প্রকৃতি, কিয়ামতের অবশ্যম্ভাবিতা এবং পার্থিব সম্পদ ও সন্তান-সন্ততির সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে গভীর শিক্ষা দিয়েছেন। এই আয়াতগুলো মানুষকে একদিকে আল্লাহর অসীম ক্ষমতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, অন্যদিকে সত্যের ওপর অবিচল থাকা, কুরআনের সঠিক অনুসরণ করা এবং আখিরাতের জন্য প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানায়।
বিচারের দিন এমন এক দিন, যেদিন কোনো গোপন বিষয় গোপন থাকবে না, কোনো মিথ্যা অজুহাত কাজে আসবে না এবং মানুষের প্রকৃত সফলতা প্রকাশিত হবে। তাই সেই দিনের ভয়াবহতা স্মরণ করার উদ্দেশ্য শুধু ভয় সৃষ্টি করা নয়; বরং মানুষকে তাওবা, ঈমান, সৎকর্ম, ন্যায়পরায়ণতা ও আল্লাহভীতির পথে ফিরিয়ে আনা।
________________________________________
আল্লাহর সৃষ্টিশক্তি ও মানুষের অসহায়ত্ব
সূরা আলে ইমরানের ৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা মানুষের সৃষ্টির রহস্যের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তিনি এমন সত্তা, যিনি মায়ের গর্ভে মানুষকে নিজের ইচ্ছামতো আকৃতি দান করেন। মানুষের চেহারা, দেহের গঠন, বৈশিষ্ট্য ও পরিচয়—সবই তাঁর জ্ঞান ও ক্ষমতার অধীন।
মানুষ পৃথিবীতে এসে নিজের শক্তি নিয়ে অহংকার করে। কেউ অর্থের গর্ব করে, কেউ জ্ঞানের, কেউ সৌন্দর্যের, কেউ ক্ষমতার। অথচ তার অস্তিত্বের সূচনাই এমন এক অবস্থায়, যেখানে তার নিজের কোনো ক্ষমতা ছিল না। সে নিজের জন্ম নির্ধারণ করতে পারেনি, নিজের দেহের আকৃতি নির্ধারণ করতে পারেনি এবং নিজের জীবন-মৃত্যুর সময়ও নির্ধারণ করতে পারে না।
এ বাস্তবতা মানুষকে বিনয়ী করে। যে আল্লাহ মানুষকে অস্তিত্ব দিয়েছেন, তিনিই তাকে মৃত্যুর পর পুনরায় জীবিত করতে সক্ষম। অতএব, পুনরুত্থান অসম্ভব নয়; বরং আল্লাহর ক্ষমতার সামনে তা সম্পূর্ণ সহজ।
________________________________________
কুরআনের আয়াত বুঝতে ভারসাম্য ও সতর্কতা
সূরা আলে ইমরানের ৭ নম্বর আয়াতে কুরআনের আয়াতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয়েছে। কুরআনে এমন কিছু আয়াত রয়েছে যেগুলো সুস্পষ্ট ও মৌলিক নির্দেশনার ভিত্তি, আবার কিছু আয়াতের অর্থ ও তাৎপর্য বুঝতে গভীর জ্ঞান ও সতর্কতার প্রয়োজন হয়।
এখানে মুমিনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—কুরআনের কোনো একটি অংশকে বিচ্ছিন্নভাবে নিয়ে নিজের ইচ্ছামতো অর্থ দাঁড় করানো যাবে না। বরং সুস্পষ্ট আয়াতকে ভিত্তি করে কুরআনের সামগ্রিক শিক্ষা বুঝতে হবে। যেসব বিষয়ে মানুষের জ্ঞান সীমিত, সেসব বিষয়ে আল্লাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস ও বিনয় বজায় রাখতে হবে।
যারা অন্তরে বক্রতা পোষণ করে, তারা অস্পষ্ট বিষয়ের অনুসরণ করে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু সত্যিকার মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো—সে কুরআনের প্রতি ঈমান রাখে, আল্লাহর বাণীর প্রতি সম্মান দেখায় এবং নিজের সীমিত জ্ঞানকে আল্লাহর অসীম জ্ঞানের ওপর প্রাধান্য দেয় না।
এ শিক্ষা বিচার দিনের প্রস্তুতির সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। কারণ কিয়ামতের দিন মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ হবে সঠিক ঈমান এবং আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী পরিচালিত জীবন।
________________________________________
কিয়ামত অবশ্যম্ভাবী
সূরা আলে ইমরানের ৯ নম্বর আয়াতে মুমিনদের একটি গুরুত্বপূর্ণ দোয়ার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে—আল্লাহ মানুষকে সেই দিনের জন্য একত্র করবেন, যে দিনের আগমনে কোনো সন্দেহ নেই। অর্থাৎ কিয়ামত কোনো কাল্পনিক বিষয় নয়; এটি আল্লাহর নিশ্চিত ঘোষণা।
মানুষ পৃথিবীতে এসে ভাবে, তার জীবন অনেক দীর্ঘ। সে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করে, সম্পদ জমায়, বাড়িঘর নির্মাণ করে, ব্যবসা-বাণিজ্য করে, সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করে। কিন্তু মৃত্যুর মুহূর্তে এসে বোঝা যায়—পার্থিব জীবন আসলে কত ক্ষণস্থায়ী!
একদিন পৃথিবীর সব ব্যস্ততা থেমে যাবে। বাজার থাকবে, কিন্তু ক্রেতা-বিক্রেতার কোলাহল থাকবে না। প্রাসাদ থাকবে, কিন্তু তার মালিক থাকবে না। সম্পদ থাকবে, কিন্তু মালিক তা সঙ্গে নিতে পারবে না। পরিচিত পৃথিবী পেছনে পড়ে থাকবে; মানুষ একা তার রবের সামনে উপস্থিত হবে।
সেদিন মানুষ বুঝবে—দুনিয়ার জীবন ছিল পরীক্ষার ক্ষেত্র, চূড়ান্ত আবাস নয়।
________________________________________
বিচার দিনের বাস্তবতা
বিচারের দিন মানুষের জন্য এমন এক বাস্তবতা, যার সামনে পৃথিবীর সব অহংকার ম্লান হয়ে যাবে। সেখানে মানুষের পরিচয় হবে তার ঈমান ও আমলের ভিত্তিতে।
দুনিয়াতে মানুষ নিজের ভুল ঢেকে রাখতে পারে। মিথ্যা বলতে পারে, অন্যকে বিভ্রান্ত করতে পারে, অন্যায়কে বৈধ বলে প্রচার করতে পারে। কিন্তু আল্লাহর আদালতে কোনো কিছুই গোপন থাকবে না।
মানুষের কথা, কাজ, আচরণ, দায়িত্ব, অন্যের প্রতি তার ব্যবহার—সবকিছুর হিসাব হবে। সে কী অর্জন করেছে এবং কীভাবে তা অর্জন করেছে—তারও জবাবদিহি করতে হবে।
এই কারণেই ইসলামে ঈমানের সঙ্গে সৎকর্মের গুরুত্ব এত বেশি। মুখে ঈমানের দাবি করলেই যথেষ্ট নয়; ঈমানের প্রভাব মানুষের চরিত্র, আচরণ ও কর্মে প্রকাশ পেতে হবে।
________________________________________
সেদিন সম্পদ ও সন্তান কোনো কাজে আসবে না
সূরা আলে ইমরানের ১০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, যারা সত্য অস্বীকার করে, তাদের সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি আল্লাহর শাস্তির মোকাবিলায় কোনো কাজে আসবে না।
এ আয়াত মানুষের অহংকারের মূলকে আঘাত করে। পৃথিবীতে সম্পদ মানুষের জন্য অনেক দরজা খুলে দেয়। অর্থ দিয়ে মানুষ বাড়ি বানায়, শিক্ষা গ্রহণ করে, ব্যবসা করে, সম্মান অর্জন করে। সন্তান-সন্ততিও মানুষের জীবনে আনন্দ, ভালোবাসা ও সামাজিক মর্যাদার কারণ হতে পারে।
কিন্তু এসবই দুনিয়ার সীমার মধ্যে। আখিরাতের সফলতা সম্পদ দিয়ে কেনা যাবে না।
অতএব ইসলাম সম্পদ অর্জনকে নিষিদ্ধ করেনি; বরং সম্পদের প্রতি অন্ধ আসক্তি থেকে সতর্ক করেছে। সম্পদ যদি হালাল পথে অর্জিত হয় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির কাজে ব্যয় করা হয়, তবে তা কল্যাণের মাধ্যম হতে পারে। কিন্তু সম্পদ যদি মানুষকে অহংকারী, অন্যায়কারী ও আল্লাহবিমুখ করে তোলে, তবে সেটিই তার জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
________________________________________
মুখের আলো ও অন্ধকার: সফলতার প্রতীক
কুরআনের অন্যান্য আয়াতে কিয়ামতের দিন কিছু মুখমণ্ডল উজ্জ্বল এবং কিছু মুখমণ্ডল অন্ধকার হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এটি মানুষের চূড়ান্ত সফলতা ও ব্যর্থতার এক গভীর প্রতীক।
যারা ঈমান এনেছে, আল্লাহর আনুগত্য করেছে এবং সৎকর্মের মাধ্যমে জীবন পরিচালনা করেছে, তাদের জন্য রয়েছে আল্লাহর রহমত ও সম্মান। আর যারা সত্যকে অস্বীকার করেছে, অবাধ্যতা ও অন্যায়ের পথ বেছে নিয়েছে, তাদের জন্য রয়েছে কঠিন পরিণতি।
এখানে আমাদের শিক্ষা হলো—বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়, অন্তরের ঈমানই মানুষের প্রকৃত সৌন্দর্য। দুনিয়াতে কারও চেহারা উজ্জ্বল হতে পারে, পোশাক মূল্যবান হতে পারে, সামাজিক অবস্থান মর্যাদাপূর্ণ হতে পারে; কিন্তু আল্লাহর কাছে মানুষের প্রকৃত মর্যাদা নির্ধারিত হয় তাকওয়া ও সৎকর্মের মাধ্যমে।
________________________________________
বিচার দিনের আগে নিজেকে সংশোধন করতে হবে
বিচারের দিন এসে যাওয়ার পর সংশোধনের সুযোগ থাকবে না। তাই সংশোধনের সময় এখনই।
আজ মানুষ জীবিত। আজ তার হাতে সময় আছে। আজ সে ভুল বুঝতে পারলে তাওবা করতে পারে। অন্যায় করলে ক্ষমা চাইতে পারে। কারও অধিকার নষ্ট করলে তা ফিরিয়ে দিতে পারে। নামাজে অবহেলা করলে তা সংশোধন করতে পারে। মিথ্যা, প্রতারণা, অহংকার, হিংসা ও অন্যায় থেকে ফিরে আসতে পারে।
কিন্তু মৃত্যুর পর মানুষের আমল করার সুযোগ শেষ হয়ে যাবে।
তাই বুদ্ধিমান মানুষ ভবিষ্যতের আফসোসের অপেক্ষা করে না; বরং বর্তমানকে সংশোধনের কাজে ব্যবহার করে।
________________________________________
মানুষের অধিকার রক্ষা: বিচার দিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতি
ইসলামে আল্লাহর হক যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি মানুষের হকও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নামাজ পড়া, রোজা রাখা, কুরআন তিলাওয়াত করা—এসব ইবাদতের পাশাপাশি মানুষের সঙ্গে ন্যায়পরায়ণ আচরণ করাও ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
কারও সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রহণ করা, প্রতারণা করা, মিথ্যা অপবাদ দেওয়া, অন্যের সম্মান নষ্ট করা, আমানতের খিয়ানত করা, দুর্বল মানুষের অধিকার হরণ করা—এসব থেকে বেঁচে থাকা জরুরি।
মানুষ কখনো ভাবতে পারে, তার অন্যায় কেউ দেখেনি। কিন্তু আল্লাহ সব দেখেন। তাই বিচার দিনের কথা স্মরণ করলে মানুষের মধ্যে দায়িত্ববোধ সৃষ্টি হয়।
যে ব্যক্তি জানে তাকে একদিন জবাব দিতে হবে, সে অন্যায় করার আগে থেমে যায়।
________________________________________
“শ্রেষ্ঠ উম্মত” হওয়ার দায়িত্ব
কুরআনে মুসলিম উম্মতকে কল্যাণের জন্য মানুষের সামনে প্রতিষ্ঠিত শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে—কারণ তারা সৎকাজের নির্দেশ দেয়, অসৎকাজ থেকে নিষেধ করে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখে।
অতএব শ্রেষ্ঠত্ব কোনো বংশগত বা জাতিগত গৌরব নয়; এটি দায়িত্বের নাম।
শুধু নিজের ভালো হওয়াই যথেষ্ট নয়। সমাজে ভালো কাজকে উৎসাহিত করা, অন্যায় থেকে মানুষকে সতর্ক করা, দুর্বলকে সহযোগিতা করা, সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো—এসবও মুমিনের সামাজিক দায়িত্ব।
তবে সৎকাজের আহ্বান হতে হবে জ্ঞান, প্রজ্ঞা, নম্রতা ও উত্তম আচরণের সঙ্গে। অন্যকে অপমান করে বা ঘৃণা ছড়িয়ে সংশোধন করা ইসলামের সৌন্দর্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
________________________________________
সত্য জেনেও সত্য থেকে ফিরে যাওয়া
মানুষের একটি বড় দুর্বলতা হলো—সে অনেক সময় সত্য জানে, কিন্তু নিজের স্বার্থের কারণে তা মানতে চায় না।
লোভ মানুষকে সত্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। অহংকার মানুষকে উপদেশ গ্রহণে বাধা দেয়। ক্ষমতার মোহ মানুষকে অন্যায়কে ন্যায় হিসেবে দেখাতে শেখায়। আর অতিরিক্ত পার্থিব আসক্তি মানুষকে আখিরাত ভুলিয়ে দেয়।
তাই জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি আত্মশুদ্ধিও জরুরি।
শুধু জানা যথেষ্ট নয়; জানা অনুযায়ী চলতে হবে। কুরআন পড়া যথেষ্ট নয়; কুরআনের নির্দেশকে জীবনে বাস্তবায়ন করতে হবে। ঈমানের দাবি শুধু মুখে নয়; চরিত্রে, আচরণে ও কর্মে তার প্রমাণ থাকতে হবে।
________________________________________
সম্পদ হবে আমানত, অহংকারের কারণ নয়
পৃথিবীর সম্পদ আল্লাহর দান। মানুষ সম্পদের মালিক নয়—বরং সে সম্পদের ব্যবহারকারী ও আমানতদার।
এই দৃষ্টিভঙ্গি মানুষের জীবনকে বদলে দিতে পারে।
যদি মানুষ মনে করে, “এই সম্পদ আমার, আমি যা খুশি করব”, তাহলে সে অহংকার ও অন্যায়ের দিকে যেতে পারে। কিন্তু যদি সে মনে করে, “আল্লাহ আমাকে এই সম্পদ দিয়েছেন; এর হিসাবও আমাকে দিতে হবে”, তাহলে তার মধ্যে দায়িত্বশীলতা সৃষ্টি হবে।
সে হালাল উপার্জনের চেষ্টা করবে, অপচয় থেকে বাঁচবে, দরিদ্রের অধিকার দেবে, আত্মীয়-স্বজনের প্রতি দায়িত্ব পালন করবে এবং মানুষের কল্যাণে সম্পদ ব্যয় করবে।
তখন সম্পদ তার জন্য পরীক্ষার বিষয় না হয়ে নেক আমলের মাধ্যম হয়ে উঠবে।
________________________________________
সন্তান-সন্ততিও একটি আমানত
সন্তান আল্লাহর বিশেষ নিয়ামত। কিন্তু সন্তান শুধু আনন্দের বিষয় নয়; এটি একটি আমানত ও দায়িত্ব।
অভিভাবকের কর্তব্য হলো সন্তানকে ঈমান, নৈতিকতা, শিষ্টাচার, জ্ঞান ও মানবিক মূল্যবোধ শিক্ষা দেওয়া। সন্তানকে শুধু অর্থ উপার্জনের যোগ্য করে তুললেই দায়িত্ব শেষ হয় না; তাকে সত্যবাদী, ন্যায়পরায়ণ, দয়ালু ও আল্লাহভীরু মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাও জরুরি।
কারণ সন্তান একদিন নিজের কর্মের জন্য নিজেই জবাবদিহি করবে। আর অভিভাবকের ওপরও তার প্রতিপালন ও শিক্ষাদানের দায়িত্ব রয়েছে।
________________________________________
বিচার দিনের কথা মনে রাখলে সমাজ বদলে যেতে পারে
একটি সমাজে যদি মানুষ সত্যিই বিশ্বাস করে যে তাকে একদিন আল্লাহর কাছে জবাব দিতে হবে, তাহলে দুর্নীতি কমবে, প্রতারণা কমবে, মিথ্যা কমবে, অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করার প্রবণতা কমবে।
একজন ব্যবসায়ী ওজনে কম দেবে না, কারণ সে জানবে আল্লাহর কাছে তাকে জবাব দিতে হবে।
একজন শিক্ষক দায়িত্বে অবহেলা করবেন না, কারণ তিনি জানবেন তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্বের হিসাব দিতে হবে।
একজন কর্মকর্তা ক্ষমতার অপব্যবহার করবেন না, কারণ তিনি জানবেন পদটি স্থায়ী নয়।
একজন অভিভাবক সন্তানের অধিকার নষ্ট করবেন না, একজন সন্তান পিতা-মাতার প্রতি অবিচার করবে না, একজন প্রতিবেশী অন্য প্রতিবেশীর ক্ষতি করবে না—যদি প্রত্যেকে আল্লাহর জবাবদিহিতাকে অন্তরে ধারণ করে।
এই বিশ্বাস ব্যক্তি থেকে পরিবারে, পরিবার থেকে সমাজে এবং সমাজ থেকে রাষ্ট্রে ন্যায় ও কল্যাণের পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে।
________________________________________
হতাশা নয়, আশার বার্তা
বিচারের দিনের আলোচনা শুধু ভয় দেখানোর জন্য নয়। এটি মানুষকে আশাবাদীও করে।
যে ব্যক্তি ভুল করেছে, তার জন্য তাওবার দরজা খোলা। যে অন্যায় করেছে, সে অন্যায় ছেড়ে দিতে পারে। যে আল্লাহ থেকে দূরে চলে গেছে, সে আবার আল্লাহর দিকে ফিরে আসতে পারে।
আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া মুমিনের বৈশিষ্ট্য নয়। তাই অতীতের ভুল নিয়ে হতাশ না হয়ে আজ থেকেই সংশোধনের পথ গ্রহণ করতে হবে।
আজকের একটি আন্তরিক তাওবা আগামী দিনের পরিণতি বদলে দিতে পারে। আজকের একটি সৎকর্ম, একটি সত্য কথা, একটি ক্ষমা, একটি দান, একটি ন্যায়সংগত সিদ্ধান্ত—আখিরাতে মূল্যবান হয়ে উঠতে পারে।
________________________________________
আজকের সিদ্ধান্তই আগামী দিনের পরিণতি
জীবন অত্যন্ত মূল্যবান, কিন্তু সময় সীমিত। মানুষ জানে না তার পৃথিবীর যাত্রা কখন শেষ হবে। তাই “পরে করব”, “বৃদ্ধ হলে ইবাদত করব”, “সময় হলে তাওবা করব”—এ ধরনের চিন্তা বিপজ্জনক।
মৃত্যুর কোনো নির্দিষ্ট সময় মানুষ জানে না।
তাই নামাজ আজ থেকেই, তাওবা আজ থেকেই, সত্যবাদিতা আজ থেকেই, মানুষের অধিকার রক্ষা আজ থেকেই, অন্যায় বর্জন আজ থেকেই, কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক আজ থেকেই এবং আখিরাতের প্রস্তুতিও আজ থেকেই শুরু করতে হবে।
________________________________________
আমাদের করণীয়
বিচার দিনের জন্য প্রস্তুত হতে হলে আমাদের জীবনে কয়েকটি বিষয় দৃঢ়ভাবে ধারণ করতে হবে—
১. বিশুদ্ধ ঈমান প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
২. কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা জ্ঞান ও প্রজ্ঞার সঙ্গে অনুসরণ করতে হবে।
৩. নামাজ ও অন্যান্য ফরজ ইবাদত যথাযথভাবে পালন করতে হবে।
৪. হালাল উপার্জনের চেষ্টা করতে হবে এবং হারাম থেকে বেঁচে থাকতে হবে।
৫. মিথ্যা, প্রতারণা, গিবত, অপবাদ, অহংকার ও হিংসা পরিত্যাগ করতে হবে।
৬. মানুষের অধিকার রক্ষা করতে হবে।
৭. অন্যায়ভাবে কারও সম্পদ গ্রহণ করলে তা ফিরিয়ে দিতে হবে।
৮. সৎকাজে উৎসাহ দিতে হবে এবং অসৎকাজ থেকে বিরত রাখতে হবে।
৯. সন্তান ও পরিবারের সদস্যদের নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষায় গড়ে তুলতে হবে।
১০. নিয়মিত তাওবা ও আত্মসমালোচনার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
১১. সম্পদ ও সন্তানকে আল্লাহর নিয়ামত ও আমানত হিসেবে দেখতে হবে।
১২. মৃত্যু ও আখিরাতকে স্মরণ করে প্রতিদিন নিজের আমলের হিসাব নিতে হবে।
________________________________________
উপসংহার
সূরা আলে ইমরানের ৬, ৭, ৯ ও ১০ নম্বর আয়াত আমাদের সামনে মানুষের সৃষ্টি, আল্লাহর অসীম ক্ষমতা, কুরআনের সঠিক উপলব্ধি, কিয়ামতের নিশ্চিত আগমন এবং পার্থিব সম্পদ ও সন্তান-সন্ততির সীমাবদ্ধতার এক গভীর শিক্ষা তুলে ধরে।
মানুষ পৃথিবীতে যত বড়ই হোক, আল্লাহর সামনে সে একজন বান্দা। সে যত সম্পদই অর্জন করুক, মৃত্যুর পর তা সঙ্গে নিয়ে যেতে পারবে না। সে যত ক্ষমতাই অর্জন করুক, কিয়ামতের ময়দানে সে নিজের আমল ছাড়া কোনো কৃত্রিম শক্তির ওপর নির্ভর করতে পারবে না।
সেদিন সত্য প্রকাশিত হবে। সেদিন মানুষের প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পাবে। সেদিন বোঝা যাবে—কে দুনিয়ার মোহে সত্যকে ভুলে গিয়েছিল এবং কে দুনিয়ার জীবনকে আখিরাতের প্রস্তুতির ক্ষেত্র হিসেবে গ্রহণ করেছিল।
তাই বিচার দিনের অপেক্ষায় বসে থাকা নয়; বিচার দিনের জন্য আজ থেকেই প্রস্তুত হওয়াই মুমিনের কর্তব্য।
আজ যদি আমরা ঈমানকে দৃঢ় করি, কুরআনের পথে চলি, নামাজ কায়েম করি, মানুষের অধিকার রক্ষা করি, অন্যায় বর্জন করি, তাওবা করি এবং সৎকর্মে জীবন সাজাই—তবে আল্লাহর রহমতের আশা করতে পারি।
হে মানুষ, মনে রেখো—
দুনিয়ার সম্মান ক্ষণস্থায়ী,
সম্পদ ক্ষণস্থায়ী,
যৌবন ক্ষণস্থায়ী,
ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী,
জীবনও ক্ষণস্থায়ী।
কিন্তু আখিরাতের জীবন চিরস্থায়ী।
তাই আজই নিজেকে প্রশ্ন করি—
আমি কোথায় যাচ্ছি?
আমার জীবনের উদ্দেশ্য কী?
আমার আমল কি আমাকে আল্লাহর সন্তুষ্টির দিকে নিয়ে যাচ্ছে?
মানুষের হক কি আমি আদায় করছি?
যদি আজই আমার জীবনের শেষ দিন হয়, তবে কি আমি আমার রবের সামনে দাঁড়ানোর জন্য প্রস্তুত?
এই আত্মজিজ্ঞাসাই হতে পারে জীবনের পরিবর্তনের সূচনা।
আল্লাহ তাআলা আমাদের বিশুদ্ধ ঈমান দান করুন, কুরআনের সঠিক বুঝ দান করুন, সত্যের ওপর অটল রাখুন, মানুষের অধিকার আদায়ের তাওফিক দিন এবং সেই অনিবার্য বিচার দিনের জন্য উত্তম প্রস্তুতি গ্রহণের সামর্থ্য দান করুন। তিনি যেন আমাদের দুনিয়ার পরীক্ষায় সফল করেন এবং আখিরাতে তাঁর রহমত, ক্ষমা ও সন্তুষ্টি লাভকারীদের অন্তর্ভুক্ত করেন।
আমিন, ইয়া রব্বাল আলামিন।
১৩
১৮ মন্তব্য