Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৩ আগস্ট, ২০২৬ ০২:২১ অপরাহ্ণ

অনলাইনে ই-পাসপোর্টের জন্য আবেদন করার সম্পূর্ণ নিয়ম

অনলাইনে ই-পাসপোর্টের জন্য আবেদন করার সম্পূর্ণ নিয়ম

 

মনিরুল হক,

        পাসপোর্ট শুধু বিদেশ ভ্রমণের একটি কাগজ নয়; এটি একজন নাগরিকের আন্তর্জাতিক পরিচয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন প্রচলিত মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি)-এর জায়গা ধীরে ধীরে দখল করেছে বায়োমেট্রিক তথ্যসমৃদ্ধ ই-পাসপোর্ট, যার ইলেকট্রনিক চিপে ছবি, আঙুলের ছাপসহ নানা তথ্য সংরক্ষিত থাকে। ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর (ডিআইপি)-এর অনলাইন পোর্টাল epassport.gov.bd চালুর পর আবেদন প্রক্রিয়ার একটা বড় অংশ এখন ঘরে বসেই সারা যায়—তথ্য পূরণ, পাসপোর্টের ধরন নির্বাচন, ফি পরিশোধ, এমনকি অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুকিং পর্যন্ত। তবে ড্রাইভিং লাইসেন্সের মতোই এখানে পুরো কাজটা স্ক্রিনেই শেষ হয় না। ছবি তোলা, আঙুলের ছাপ ও চোখের আইরিশ স্ক্যানের মতো বায়োমেট্রিক তথ্য দেওয়ার জন্য অন্তত একবার সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে সশরীরে যেতেই হয়। নিচে ধাপে ধাপে পুরো প্রক্রিয়াটি দেখানো হলো।

২। যোগ্যতা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রঃ

ক. জাতীয় পরিচয়পত্রঃ ২০ বছরের বেশি বয়সী সবার জন্য বৈধ NID বাধ্যতামূলক। ১৮ থেকে ২০ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে NID না থাকলে অনলাইন জন্ম নিবন্ধন সনদও গ্রহণযোগ্য।

খ. জন্ম নিবন্ধন সনদঃ ১৮ বছরের নিচে বয়সীদের জন্য অনলাইন জন্ম নিবন্ধনের (BDRIS) ইংরেজি সংস্করণ আবশ্যক, সঙ্গে বাবা-মায়ের NID-র কপি লাগবে।

গ. পেশাগত প্রমাণপত্রঃ সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য এনওসি (NOC) বা জিও (GO), অবসরপ্রাপ্তদের জন্য পিআরএল সংক্রান্ত কাগজ। শিক্ষার্থীদের জন্য পেশার ঘরে "Student" উল্লেখ করলেই যথেষ্ট, আলাদা সনদ সাধারণত লাগে না।

ঘ. নবায়নের ক্ষেত্রেঃ আগের পাসপোর্টের মূল কপি ও ফটোকপি সঙ্গে রাখতে হবে।

ঙ. তথ্যের সামঞ্জস্যঃ আবেদনের আগে NID বা জন্ম নিবন্ধনে নাম, জন্মতারিখ বা ঠিকানায় কোনো অসংগতি আছে কি না দেখে নেওয়া ভালো, কারণ পাসপোর্টের তথ্য এসব সরকারি ডেটাবেজের সঙ্গে মিলিয়েই চূড়ান্ত করা হয়।

৩। ধাপে ধাপে অনলাইন আবেদন প্রক্রিয়াঃ

ক. অনলাইন অ্যাকাউন্ট তৈরিঃ epassport.gov.bd ওয়েবসাইটে গিয়ে বর্তমান ঠিকানা অনুযায়ী জেলা ও থানা নির্বাচন করে ইমেইল দিয়ে অ্যাকাউন্ট খুলতে হয়।

খ. ব্যক্তিগত তথ্য পূরণঃ NID বা জন্ম নিবন্ধন অনুযায়ী নাম, বাবার নাম, মায়ের নাম ও জন্মতারিখ হুবহু ইংরেজিতে লিখতে হবে। এই ধাপে সামান্য বানান ভুলও পরে বড় ঝামেলার কারণ হতে পারে, তাই বাড়তি সতর্কতা জরুরি।

গ. পাসপোর্টের ধরন নির্বাচনঃ পৃষ্ঠা সংখ্যা (৪৮ বা ৬৪ পাতা), মেয়াদ (৫ বা ১০ বছর) এবং ডেলিভারির ধরন (রেগুলার, এক্সপ্রেস বা সুপার এক্সপ্রেস) বেছে নিতে হয়।

ঘ. ফি পরিশোধঃ এ-চালান বা অনলাইন পেমেন্টের মাধ্যমে, অথবা সোনালী, ওয়ান, ট্রাস্ট, ব্যাংক এশিয়া, প্রিমিয়ার বা ঢাকা ব্যাংকের কাউন্টারে গিয়ে ফি জমা দেওয়া যায়। ব্যাংকে জমা দিলে আবেদনের রেফারেন্স নম্বর সঠিকভাবে উল্লেখ করা আবশ্যক, নইলে পেমেন্ট যাচাই হবে না।

ঙ. আবেদনপত্র প্রিন্টঃ ফি জমা নিশ্চিত হলে আবেদন সারসংক্ষেপ (Application Summary) বারকোডসহ প্রিন্ট করে নিতে হয়। সাধারণত ডকুমেন্ট আপলোডের প্রয়োজন হয় না—কাগজপত্র শুধু পরের ধাপে সশরীরে যাচাই করা হয়।

চ. অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুকিংঃ ছবি তোলা ও বায়োমেট্রিক তথ্য দেওয়ার জন্য সুবিধাজনক তারিখ ও সময় বেছে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া যায়।

৪। পাসপোর্ট অফিসে সশরীরে উপস্থিতিঃ

ক. প্রয়োজনীয় কাগজঃ আবেদনপত্রের প্রিন্ট কপি, NID বা জন্ম নিবন্ধনের মূল কপি, ফি জমার রশিদ এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে অন্যান্য সহায়ক কাগজ সঙ্গে নিতে হবে।

খ. বায়োমেট্রিক এনরোলমেন্টঃ নির্ধারিত কম্পিউটারে ছবি তোলা, দুই হাতের আঙুলের ছাপ, চোখের আইরিশ স্ক্যান এবং স্বাক্ষর নেওয়া হয়।

গ. ডেলিভারি স্লিপ সংগ্রহঃ এনরোলমেন্ট শেষে একটি ডেলিভারি স্লিপ দেওয়া হয়, যা পরবর্তীতে পাসপোর্ট সংগ্রহের সময় প্রয়োজন হবে।

৫। যাচাই প্রক্রিয়াঃ

সনাতনভাবে প্রতিটি নতুন পাসপোর্ট আবেদনে স্থানীয় থানার মাধ্যমে পুলিশ ভেরিফিকেশন করা হতো, যেখানে সংশ্লিষ্ট এলাকার একজন কর্মকর্তা আবেদনকারীর ঠিকানা ও পরিচয় সরেজমিনে যাচাই করতেন। সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় পরিচয়পত্রের বায়োমেট্রিক তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচয় নিশ্চিত করার একটি ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে এই ধাপকে আরও দ্রুত করে দিতে পারে। তবে এই পরিবর্তন এখনো সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত হয়নি, তাই আবেদনের সময় নিজ নিজ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস থেকে সবশেষ নিয়ম জেনে নেওয়াই নিরাপদ।

৬। পাসপোর্ট প্রস্তুত ও সংগ্রহঃ

ভেরিফিকেশন ইতিবাচক হলে পাসপোর্ট প্রিন্টিংয়ে পাঠানো হয়। পাসপোর্ট প্রস্তুত হয়ে গেলে নিবন্ধিত মোবাইল নম্বরে এসএমএস পাঠানো হয়। এরপর ডেলিভারি স্লিপ নিয়ে নির্ধারিত পাসপোর্ট অফিস থেকে সংগ্রহ করা যায়; কিছু ক্ষেত্রে ডাকযোগেও পাঠানোর ব্যবস্থা থাকে। আবেদনের সবশেষ অবস্থা যেকোনো সময় অনলাইনে ট্র্যাকিং অপশন থেকে দেখে নেওয়া যায়।

৭। ফি কাঠামোঃ

পাসপোর্টের পৃষ্ঠা সংখ্যা, মেয়াদ এবং ডেলিভারির ধরনের ওপর ভিত্তি করে ফি নির্ধারিত হয়। নিচের তালিকায় বর্তমান সময়ের ফি (১৫% ভ্যাটসহ) দেওয়া হলোঃ

পাসপোর্টের ধরন

মেয়াদ

রেগুলার (১৫ কার্যদিবস)

এক্সপ্রেস (৭ কার্যদিবস)

৪৮ পৃষ্ঠা

৫ বছর

৪,০২৫ টাকা

৬,৩২৫ টাকা

৪৮ পৃষ্ঠা

১০ বছর

৫,৭৫০ টাকা

৮,০৫০ টাকা

৬৪ পৃষ্ঠা

৫ বছর

৬,৩২৫ টাকা

৮,৬২৫ টাকা

৬৪ পৃষ্ঠা

১০ বছর

৮,০৫০ টাকা

১০,৩৫০ টাকা

দ্রষ্টব্যঃ সুপার এক্সপ্রেস (২ কার্যদিবস) সেবা কিছু নির্দিষ্ট অফিসে পাওয়া যায়, ফি ক্যাটাগরিভেদে প্রায় ৮,৬২৫ থেকে ১৩,৮০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। ৬৪ পৃষ্ঠার পাসপোর্ট অতীতে কয়েকবার সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছিল, তাই আবেদনের আগে এই অপশন সক্রিয় আছে কি না এবং সবশেষ ফি কত, তা epassport.gov.bd থেকে একবার যাচাই করে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

৮। সাধারণ ভুল ও কিছু বাস্তব পরামর্শঃ

ক. আগেই NID ও জন্ম নিবন্ধন মিলিয়ে নিনঃ আবেদনের আগে এসব সরকারি নথিতে নাম, জন্মতারিখ বা ঠিকানায় কোনো গরমিল আছে কি না যাচাই ও সংশোধন করে রাখা ভালো। শেষ মুহূর্তে এই সংশোধনী করাতে গেলে পুরো প্রক্রিয়াই পিছিয়ে যেতে পারে।

খ. বানানে সতর্ক থাকুনঃ নাম ও ঠিকানার ইংরেজি বানান NID-র সঙ্গে হুবহু মিলিয়ে দিন; ভবিষ্যতে ভিসা বা অন্য আন্তর্জাতিক নথির সঙ্গেও এটি মিলিয়ে দেখা জরুরি।

গ. দালাল এড়িয়ে চলুনঃ পুরো প্রক্রিয়া এখন এতটাই সহজ যে চাইলে নিজে নিজেই আবেদন করা সম্ভব। দালালের মাধ্যমে করাতে গেলে বাড়তি খরচ ছাড়াও ভুল তথ্যের ঝুঁকি থাকে।

ঘ. হাতে সময় রাখুনঃ ভ্রমণের তারিখ চূড়ান্ত হওয়ার অনেক আগেই আবেদন করা ভালো, কারণ ভেরিফিকেশন বা কারিগরি কারণে দেরি হতে পারে। জরুরি প্রয়োজনে এক্সপ্রেস বা সুপার এক্সপ্রেস সেবার কথা মাথায় রাখা যায়, তবে তার জন্য বাড়তি ফি লাগবে।

          ই-পাসপোর্ট চালুর পর বাংলাদেশে পাসপোর্ট পাওয়ার প্রক্রিয়া অনেকটাই সহজ ও স্বচ্ছ হয়েছে, বিশেষত অনলাইনে তথ্য পূরণ ও ফি পরিশোধের সুবিধার কারণে। তবে বায়োমেট্রিক এনরোলমেন্ট ও যাচাই প্রক্রিয়ার জন্য এখনো ধৈর্য এবং অন্তত একবার সশরীরে উপস্থিতি প্রয়োজন। যেহেতু সরকারি ডিজিটাল সেবা ও নিয়মকানুন নিয়মিত হালনাগাদ হয়, তাই আবেদনের আগে সবশেষ নিয়ম ও ফি একবার ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট থেকে যাচাই করে নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।

 

 

মনিরুল হক

সহকারী শিক্ষক

আমলাবাড়ী মাধ্যমিক বিদ্যালয়

খোকসা, কুষ্টিয়া

০১৭২২ ২৭৩২৭২

           [email protected]

 

মন্তব্য করুন