Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৩ আগস্ট, ২০২৬ ০৩:০৯ অপরাহ্ণ

ছোটদের ঝগড়া, বিচার ও সমাধান: একজন শিক্ষকের ভাবনা

ছোটদের ঝগড়া, বিচার ও সমাধান: একজন শিক্ষকের ভাবনা

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতে গেলে প্রতিদিনই নানা রকম অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়। কখনো শ্রেণিকক্ষে পড়ানোর আনন্দ, কখনো কোনো শিশুর নতুন কিছু শেখার উচ্ছ্বাস, আবার কখনো ছোট্ট শিক্ষার্থীদের ঝগড়া-বিবাদ মেটানোর দায়িত্ব। বড়দের কাছে যে বিষয়টি একেবারেই তুচ্ছ, একটি শিশুর কাছে সেটিই হয়ে উঠতে পারে অনেক বড় একটি ঘটনা।

স্যার, ও আমাকে মেরেছে।’

স্যার, ও আমার পেন্সিল নিয়েছে।’

স্যার, ও আমাকে আগে ধাক্কা দিয়েছে।’

এমন অভিযোগ নিয়ে প্রতিদিনই কোনো না কোনো শিশু শিক্ষকের কাছে আসে। তাদের চোখে তখন রাগ, অভিমান কিংবা কান্না। একজন শিক্ষক হিসেবে তখন বুঝতে হয়এটি শুধু একটি ঝগড়া নয়; বরং শিশুদের সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষা দেওয়ার একটি সুযোগ।

 

বিচার নয়, আগে শুনতে হয়:

শিশুদের ঝগড়া মেটানোর ক্ষেত্রে আমার মনে হয়, প্রথম কাজ হলো দুপক্ষের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা। তাড়াহুড়ো করে একজনকে দোষী ঘোষণা করলে অনেক সময় প্রকৃত ঘটনা জানা যায় না। কারণ শিশুরা তাদের বয়স ও বোঝাপড়ার সীমাবদ্ধতার কারণে ঘটনাকে ভিন্নভাবে দেখতে পারে।

তাই আমি মনে করি, শিক্ষককে বিচারকের চেয়ে একজন অভিভাবকের ভূমিকা বেশি পালন করতে হয়। কে আগে কী করেছে, কেন করেছে, অন্যজনের ওপর তার কী প্রভাব পড়েছেএসব বিষয় ধৈর্য ধরে বুঝতে হয়।

 

শাস্তি নয়, সংশোধনের সুযোগ:

একজন শিশুকে ভুলের জন্য শাস্তি দেওয়া খুব সহজ। কিন্তু তাকে নিজের ভুল বুঝতে সাহায্য করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

কেউ যদি বন্ধুকে ধাক্কা দিয়ে থাকে, তাকে শুধু বকা না দিয়ে বোঝানো দরকারতার আচরণে অন্য শিশুটি কষ্ট পেয়েছে। প্রয়োজনে তাকে বন্ধুর কাছে দুঃখ প্রকাশ করতে উৎসাহিত করা যেতে পারে। আবার যে শিশু কষ্ট পেয়েছে, তাকেও ক্ষমা করতে শেখাতে হবে।

কারণ বিদ্যালয় শুধু বই পড়ার জায়গা নয়। এখানে শিশুরা বন্ধুত্ব, সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ, শৃঙ্খলা ও ক্ষমার মতো জীবনের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাগুলোও অর্জন করে।

 

শিক্ষকের ধৈর্যই সবচেয়ে বড় শক্তি:

ছোটদের ঝগড়া কখনো কখনো খুবই সাধারণ বিষয়। কিন্তু একই ধরনের ঘটনা বারবার ঘটলে শিক্ষককে আরও গভীরভাবে ভাবতে হয়। শিশুটি কেন এমন আচরণ করছে? সে কি কোনো বিষয় নিয়ে হতাশ? সে কি অন্যের অনুভূতি বুঝতে পারছে না? নাকি সে শুধু নিজের কথা প্রকাশ করতে পারছে না?

একজন শিক্ষক যদি এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজেন, তাহলে সমস্যার মূল কারণটি অনেক সময় সহজেই বোঝা যায়।

আমাদের মনে রাখতে হবে, শিশু ভুল করবেইআর সেই ভুলের মধ্য দিয়েই সে শিখবে। তাই তার ভুলকে শুধরে দেওয়ার দায়িত্ব আমাদের।

ছোটদের বিচারেও থাকতে হবে ন্যায় ও মানবিকতা:

বিদ্যালয়ে কোনো ঘটনার বিচার করার সময় শিক্ষককে অবশ্যই নিরপেক্ষ থাকতে হয়। পরিচিত বা প্রিয় শিক্ষার্থী বলে একদিকে ঝুঁকে যাওয়া কিংবা কারও কথা না শুনেই সিদ্ধান্ত নেওয়া কখনোই কাম্য নয়।

একটি শিশুর মনে যদি তৈরি হয় যে, ‘স্যার/ম্যাডাম আমার কথা শোনেননি’, তাহলে তার মনে বিদ্যালয় ও শিক্ষকের প্রতি দূরত্ব তৈরি হতে পারে। তাই প্রত্যেক শিশুকে তার কথা বলার সুযোগ দেওয়া জরুরি।

 

ঝগড়ার পর যখন আবার বন্ধুত্ব হয়:

সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্ত তখনই, যখন ঝগড়া করা দুটি শিশু কিছুক্ষণ পর আবার পাশাপাশি বসে। একজন আরেকজনকে পেন্সিল দেয়, একসঙ্গে খেলতে যায় কিংবা হাসিমুখে কথা বলে।

তখন মনে হয়, আজকের ছোট্ট ঘটনাটির মধ্য দিয়ে তারা একটি বড় শিক্ষা পেলরাগ করা যায়, কিন্তু রাগ ধরে রাখা নয়; ভুল হতে পারে, কিন্তু ভুল স্বীকার করতে হয়; আর বন্ধুত্বের মূল্য সবসময় বড়।

 

শেষ কথা:

একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে আমি মনে করি, ছোট শিক্ষার্থীদের ঝগড়া কোনো বিরক্তিকর বিষয় নয়; বরং এটি তাদের মানুষ হয়ে ওঠার পথে শেখার একটি অংশ।

আমাদের কাজ শুধু ‘কে দোষী’ তা খুঁজে বের করা নয়। আমাদের কাজ হলোশিশুকে নিজের ভুল বুঝতে শেখানো, অন্যের অনুভূতিকে সম্মান করতে শেখানো এবং ভালোবাসা ও সহমর্মিতার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের পথ দেখানো।

আজ যে ছোট্ট শিশুটি বন্ধুর সঙ্গে ঝগড়া করছে, আগামী দিনের সেই শিশুই সমাজের একজন দায়িত্বশীল মানুষ হবে। তাই তাদের ছোট ছোট আচরণে আমরা যদি আজ থেকেই ন্যায়বোধ, সহনশীলতা ও মানবিকতার শিক্ষা দিতে পারি, তবে সেটিই হবে একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় সাফল্য।

শিশুর হাতে শুধু বই তুলে দিলেই শিক্ষা পূর্ণ হয় না; তাকে মানুষ হওয়ার শিক্ষাও দিতে হয়। আর সেই শিক্ষার শুরু হতে পারে একটি ছোট্ট ঝগড়া মিটিয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়েই।

চাইলে এটিকে আরও সাহিত্যিক ও হৃদয়স্পর্শী করে, একজন শিক্ষকের বাস্তব দিনের ঘটনার মতো লিখে দিতে পারি

মন্তব্য করুন

ব্লগ