Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৩ আগস্ট, ২০২৬ ০৭:২৫ অপরাহ্ণ

বর্ষায় ছড়িয়ে পড়ুক সবুজের বার্তা: ৬৫ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিনামূল্যে আড়াই লাখ গাছ

বর্ষা মানেই প্রকৃতিতে এক নতুন প্রাণের সঞ্চার। চারপাশের ধূসরতা মুছে গিয়ে গাঢ় সবুজে সেজে ওঠে রূপসী বাংলাদেশ। আর এই সতেজ বর্ষাকালই হলো বৃক্ষরোপণের সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। প্রতিবছর এই সময়ে সরকারি ও বেসরকারি নানা উদ্যোগে গাছ লাগানো হলেও, আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি—ক্ষুদ্র একটি পদক্ষেপে কত বিশাল পরিবর্তন আনা সম্ভব?

 

আজ এমন একটি সম্ভাবনার কথা বলব, যা বাস্তবায়ন করতে সরকারের বা কোনো প্রতিষ্ঠানের এক টাকাও বাড়তি খরচ হবে না, অথচ সারা দেশে রাতারাতি যুক্ত হতে পারে আড়াই লাখেরও বেশি নতুন গাছ!



একটি ছোট্ট অংক এবং বিশাল সম্ভাবনা

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক তথ্যকণিকা অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে মোট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৫,৫৬৯টিসংখ্যাটি আপাতদৃষ্টিতে একটি পরিসংখ্যান মাত্র, কিন্তু এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক সবুজ বিপ্লবের সম্ভাবনা।

 

আমরা যদি ধরে নিই, এই বর্ষায় প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ন্যূনতম ৪টি করে গাছের চারা রোপণ করা হবে, তবে একযোগে সারা দেশে মোট বৃক্ষের সংখ্যা দাঁড়াবে ,৬২,২৮০টি! চিন্তা করে দেখুন, একটি সহজ উদ্যোগ কীভাবে দেশের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় আড়াই লক্ষাধিক গাছের বিশাল এক সবুজ বলয় তৈরি করতে পারে।


!কোনো খরচ ছাড়াই কীভাবে এটি সম্ভব?

সাধারণত বড় কোনো রোপণ কর্মসূচি মানেই বড় বাজেটের বিষয়—চারা কেনা, পরিবহণ খরচ এবং আরও নানা আনুষ্ঠানিকতা। কিন্তু এই উদ্যোগে কোনো আর্থিক খরচের প্রয়োজন নেই।

 

এর মূল চালিকাশক্তি হবেন আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। শিক্ষকেরা যদি শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থীদের একটু উৎসাহিত করেন এবং বুঝিয়ে বলেন—"তোমরা তোমাদের বাড়ির আশপাশ বা আঙিনা থেকে যেকোনো একটি ফলজ, বনজ বা ঔষধি গাছের চারা এনে প্রাঙ্গণে লাগাবে।"

 

গ্রামের পরিবেশ এমন যে, প্রতিটি বাড়ির আনাচে-কানাচে আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, নিম বা মেহগনির বহু চারা আপনা-আপনি গজিয়ে ওঠে। অনেক সময় পরিচর্যার অভাবে সেগুলো নষ্টও হয়। শিশুরা যদি তাদের নিজ হাত দিয়ে সেই চারাটি এনে ভালোবাসায় স্কুলের মাঠে রোপণ করে, তবে গাছটির জন্য যেমন নতুন জীবন তৈরি হবে, তেমনি শিশুটির মনেও প্রকৃতির প্রতি তৈরি হবে গভীর ভালোবাসা।



গ্রাম ও শহরের বাস্তবতা: একটি সুস্পষ্ট পার্থক্য

তবে এই দারুণ পরিকল্পনাটির একটি বাস্তবমুখী দিক বিবেচনা করা জরুরি। উদ্যোগটি গ্রামাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোর জন্য শতভাগ কার্যকর হলেও শহরের বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে কিছুটা চ্যালেঞ্জ রয়েছে।



গ্রামের বিদ্যালয়: গ্রামের প্রতিটি বাড়ির চারপাশে অসংখ্য প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো চারার উৎস রয়েছে। শিক্ষার্থীরা খুব সহজেই বিনা খরচে এসব চারা স্কুলে নিয়ে আসতে পারে। এছাড়া গ্রামের স্কুলে পর্যাপ্ত খোলা জায়গা ও মাটি থাকে।

 

শহরের বিদ্যালয়: শহরের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। সেখানে বাড়ির আশপাশে প্রাকৃতিকভাবে চারা গজানোর সুযোগ নেই বললেই চলে; গাছ কিনতে হয় নার্সারি থেকে। তাছাড়া শহরের বহু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাঠ বা খালি মাটি খুঁজে পাওয়া কঠিন।

 

তাই শহরের ক্ষেত্রে শিক্ষক বা অভিভাবকেরা চাইলে নার্সারি থেকে স্বল্পমূল্যে চারা কিনে কিংবা ছাদে ও বারান্দায় টবের মাধ্যমে রোপণ করতে পারেন। তবে মূল শক্তির জায়গা কিন্তু আমাদের ছড়িয়ে থাকা অজস্র গ্রামের স্কুলগুলোই!


শিক্ষার্থীদের মনে রোপিত হবে দায়িত্ববোধের বীজ

এই উদ্যোগের সবচেয়ে সুন্দর দিকটি শুধু গাছ লাগানোতেই সীমাবদ্ধ নয়। কোমলমতি শিশুরা যখন নিজের বাড়ি থেকে চারা এনে স্কুলের মাটিতে রোপণ করবে এবং প্রতিদিন সেটিতে পানি দেবে, তখন গাছটির সাথে তার একটি আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠবে।

 

তারা ছোটবেলা থেকেই শিখবে:

১. পরিবেশ রক্ষা করা আমাদের নিজেদের দায়িত্ব।

২. গাছ আমাদের পরম বন্ধু।

৩. সামাজিক ও যৌথ কাজের আনন্দ কতটা চমৎকার।


এখনই উদ্যোগ নেওয়ার সঠিক সময়

এখন আকাশজুড়ে মেঘের আনাগোনা, মাটিতে আর্দ্রতা। চারা রোপণের এরচেয়ে উপযুক্ত সময় আর হতে পারে না। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ যদি নিজ নিজ বিদ্যালয়ে আজই এই বার্তা ছড়িয়ে দেন, তবে কালই দেখা যাবে শিশুরা হাসিমুখে হাতে একটি করে চারা নিয়ে স্কুলের মাঠে হাজির হয়েছে।

 

আসুন, এই বর্ষায় আমরা আমাদের সন্তানদের হাত ধরে দেশের ৬৫ হাজারেরও বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে এক একটি সবুজ দ্বীপে পরিণত করি। সামান্য সদিচ্ছা আর একটু ভালোবাসাই পারে আমাদের আগামী প্রজন্মকে একটি সুন্দর, সবুজ ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ উপহার দিতে।

মন্তব্য করুন

ব্লগ