সহকারী শিক্ষক
১৩ আগস্ট, ২০২৬ ০৭:৪৫ অপরাহ্ণ
প্রযুক্তি ও শিক্ষার সঠিক মেলবন্ধন নির্দেশক
আজকের ডিজিটাল যুগে শিশু লালন-পালনের ক্ষেত্রে মা-বাবা এবং অভিভাবক সমাজের সবচেয়ে বড় দ্বিমুখী টানাপোড়েনের একটি হলো—শিশুর হাতে প্রযুক্তি দেওয়া উচিত, নাকি এটি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া উচিত? বাংলাদেশে সাধারণত শিশুদের টিভিতে কার্টুন দেখা বা মোবাইলে গেম খেলাকে নেতিবাচক দৃষ্টিতেই দেখা হয়। অনেক ক্ষেত্রেই অভিভাবকরা মনে করেন যে এগুলো শিশুদের পড়াশোনা নষ্ট করে, চোখের ক্ষতি করে এবং তাদের অলস বানিয়ে তোলে।
এই উদ্বেগের পেছনে যৌক্তিক কারণ রয়েছে, এতে সন্দেহ নেই। অবাধ ও অনিয়ন্ত্রিত কার্টুন দেখা বা গেমসের আসক্তি অনেক শিশুর মানসিক ও শারীরিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করছে। কিন্তু তাই বলে কি একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে আমরা প্রযুক্তিকে পুরোপুরি অস্বীকার করতে পারি? উত্তর হলো—না। প্রযুক্তি এখন আর কোনো বিলাসবহুল বিষয় নয়, বরং এটি আমাদের জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই শিশুকে ডিজিটাল মাধ্যম থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে রাখা বাস্তবসম্মত সমাধান নয়, বরং বুদ্ধিমানের কাজ হলো একে শেখার একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে রূপান্তর করা।
অবাধ ব্যবহার নয়, প্রয়োজন সময়সীমা ও নজরদারি
প্রযুক্তির ক্ষতিকর দিকগুলো মূলত উঠে আসে 'অবাধ্য ব্যবহার' থেকে। শিশুরা যদি সারাদিন মোবাইল স্ক্রিনে মুখ গুঁজে থাকে বা যা ইচ্ছা তা-ই দেখে, তবে তা নিশ্চিতভাবেই ক্ষতিকর। কিন্তু আমরা যদি দৈনিক একটি নির্দিষ্ট সময়সূচি (যেমন: দিনে ৩০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা) নির্ধারণ করে দিই, তবে এটি তাদের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
আজকাল শিক্ষামূলক কার্টুন ও ভিডিও শিশুদের সৃজনশীলতা, ভাষা দক্ষতা এবং প্রবলেম-সলভিং এবিলিটি (সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা) বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। উদাহরণস্বরূপ, বহু শিশুই কার্টুন বা শিক্ষামূলক ভিডিও দেখে বেশ অল্প বয়সেই ইংরেজি বা বিভিন্ন ধরনের সাধারণ জ্ঞান খুব সহজেই রপ্ত করে ফেলছে।
প্রাথমিক শিক্ষার সিলেবাস ও ডিজিটাল কন্টেন্ট
ইতিবাচক খবর হলো—এখন বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা সিলেবাসের বহু বিষয় ইউটিউবসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে চমৎকার অ্যানিমেশনের মাধ্যমে পাওয়া যায়। ছড়া, বর্ণমালা শেখা, সায়েন্স এক্সপেরিমেন্ট কিংবা গণিতের বেসিক নিয়মগুলো ভিজ্যুয়াল বা দৃশ্যমান কন্টেন্টের মাধ্যমে শিখলে শিশুরা তা দ্রুত অনুধাবন করতে পারে এবং পড়ালেখাকে আর বোঝা মনে করে না।
এর সাথে যোগ হয়েছে শিক্ষামূলক ম্যাথ গেমস (Math Games) এবং পাজল গেমস। গেমসের মাধ্যমে যখন একটি শিশু গণিতের সমস্যা সমাধান করে বা চিন্তাশক্তি বাড়ায়, তখন তার কাছে শেখার প্রক্রিয়াটি আনন্দের হয়ে ওঠে।
শিক্ষা কর্তৃপক্ষের করণীয়
যেহেতু বর্তমান প্রজন্মের শিশুরা ভিজ্যুয়াল কন্টেন্ট বেশি পছন্দ করে, তাই আমাদের জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (NCTB) এবং শিক্ষা কর্তৃপক্ষের উচিত এই খাতটিতে আরও জোর দেওয়া। প্রাথমিক সিলেবাসের যে বিষয়গুলো এখনও মানসম্মত ভিডিও বা ডিজিটাল কন্টেন্ট হিসেবে ইউটিউব ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে নেই, সেগুলোর জন্য দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
সরকার ও সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের উচিত অভিজ্ঞ শিক্ষাবিদ ও দক্ষ অ্যানিমেটরদের সমন্বয়ে পুরো সিলেবাসকে আকর্ষণীয় কন্টেন্টে রূপান্তর করা। এটি দেশের প্রান্তিক অঞ্চলের শিশুদের জন্যও সমানভাবে মানসম্মত শিক্ষা পাওয়ার সুযোগ তৈরি করবে।
উপসংহার
প্রযুক্তি কোনো অভিশাপ বা আশীর্বাদ নয়, এটি একটি মাধ্যম মাত্র। এটি আমরা কীভাবে ব্যবহার করছি তার ওপরই নির্ভর করে এর প্রভাব। শিশুদের শৈশবকে স্ক্রিনের বন্দিশালায় পরিণত না করে, আবার আধুনিক প্রযুক্তি থেকে দূরে না রেখে আমাদের একটি ভারসাম্যপূর্ণ পথ বেছে নিতে হবে। পরিমিত সময়, শিক্ষামূলক কন্টেন্ট নির্বাচন এবং অভিভাবকদের সঠিক নির্দেশনাই পারে প্রযুক্তিকে শিশুদের মেধা বিকাশের সেরা সহায়ক হিসেবে গড়ে তুলতে।
১
১ মন্তব্য