সহকারী অধ্যাপক
১৪ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:৩৯ পূর্বাহ্ণ
সবরের দীপশিখা - মোঃ মুজিবুর রহমান
সবরের দীপশিখা
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর
ভূমিকা
জীবন কখনো সরল ও মসৃণ পথে চলে না। মানুষের জীবনে যেমন আনন্দ আসে, তেমনি আসে দুঃখ; যেমন সাফল্য আসে, তেমনি আসে ব্যর্থতা; যেমন প্রাপ্তির হাসি আছে, তেমনি আছে হারানোর বেদনা। কখনো জীবনের আকাশ নির্মল থাকে, আবার কখনো দুঃখ, সংকট, অভাব, রোগ, শোক, অপমান, ব্যর্থতা কিংবা বিচ্ছেদের কালো মেঘে আচ্ছন্ন হয়ে যায়। এমন কঠিন সময়ে মানুষ কীভাবে নিজেকে স্থির রাখবে, কীভাবে ঈমানকে অটুট রাখবে এবং কীভাবে সঠিক পথে অবিচল থাকবে—ইসলাম তার একটি মহৎ শিক্ষা দিয়েছে। সেই শিক্ষার নাম সবর।
সবর অর্থ শুধু কষ্ট সহ্য করে নীরবে বসে থাকা নয়। সবর হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজেকে সংযত রাখা, সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকা, বিপদে ভেঙে না পড়া, পাপের আকর্ষণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা এবং আল্লাহর ফয়সালার ওপর আস্থা রেখে বৈধ ও কল্যাণকর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। তাই সবর দুর্বলতার প্রতীক নয়; বরং এটি ঈমানি শক্তি, আত্মসংযম, মানসিক দৃঢ়তা ও আল্লাহর ওপর গভীর নির্ভরতার প্রকাশ।
আপনার মূল রচনাতেও সবরকে অন্তরের নীরব শক্তি, বিপদের সময় স্থিরতা এবং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের আলো হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
সবরের প্রকৃত অর্থ
সবর শব্দের মধ্যে গভীর জীবনদর্শন নিহিত রয়েছে। মানুষ যখন কোনো দুঃখ-কষ্টে পড়ে, তখন তার মন অস্থির হয়ে যেতে পারে। কিন্তু একজন মুমিন জানে, পৃথিবীর কোনো পরিস্থিতিই চিরস্থায়ী নয়। সুখ যেমন স্থায়ী নয়, দুঃখও তেমনি স্থায়ী নয়। তাই বিপদের সময় হতাশ হয়ে পড়া নয়; বরং আল্লাহর প্রতি আস্থা রেখে নিজেকে সঠিক পথে স্থির রাখাই সবর।
সবরের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আল্লাহর আনুগত্যে অবিচল থাকা। নামাজ আদায়ে অলসতা না করা, রোজা পালন করা, সত্য কথা বলা, মানুষের হক আদায় করা এবং সৎকাজে নিয়মিত থাকা—এসবের জন্যও সবর প্রয়োজন। কারণ ভালো কাজের পথে নফস ও শয়তানের নানা প্রলোভন আসে। সেই প্রলোভন অতিক্রম করে আল্লাহর আনুগত্যে স্থির থাকা সবরেরই পরিচয়।
সবরের দ্বিতীয় দিক হলো পাপ থেকে নিজেকে বিরত রাখা। কোনো অন্যায় কাজের সুযোগ সামনে এলেও আল্লাহর ভয়ে নিজেকে সংযত করা, রাগের সময় অন্যায় কথা না বলা, লোভের সময় হারাম পথে না যাওয়া এবং প্রবৃত্তির তাড়নায় সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত না হওয়া—এসব আত্মসংযমও সবরের অন্তর্ভুক্ত।
তৃতীয় দিক হলো বিপদ-আপদে ধৈর্য ধারণ করা। রোগ, শোক, অভাব, ব্যর্থতা, প্রিয়জনের বিচ্ছেদ কিংবা জীবনের অন্য কোনো পরীক্ষার সময় আল্লাহর ওপর বিশ্বাস অটুট রাখা এবং বৈধ উপায়ে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া মুমিনের গুণ।
কুরআনের আলোকে সবর
পবিত্র কুরআনে বহু স্থানে সবরের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা মুমিনদের ধৈর্য, দৃঢ়তা ও তাকওয়ার পথে অবিচল থাকার শিক্ষা দিয়েছেন। বিপদের সময় আল্লাহর সাহায্য কামনা করতে বলা হয়েছে এবং সবর ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
“নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।”
—সূরা আল-বাকারা, ২:১৫৩
এই আয়াত একজন মুমিনের জন্য গভীর আশ্বাস বহন করে। বিপদের মুহূর্তে মানুষ নিজেকে একা মনে করতে পারে; কিন্তু আল্লাহর ওপর ঈমান তাকে মনে করিয়ে দেয় যে, তার রব তার অবস্থা জানেন, তার কষ্ট জানেন এবং তার দোয়া শোনেন। তাই মুমিন বিপদের কাছে আত্মসমর্পণ করে না; বরং আল্লাহর সাহায্যের প্রত্যাশায় দৃঢ় থাকে।
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন—
“নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদের তাদের প্রতিদান অপরিমিতভাবে প্রদান করা হবে।”
—সূরা আয-যুমার, ৩৯:১০
অতএব, সবর এমন একটি আমল যার পুরস্কার আল্লাহর কাছে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ।
বিপদের সময় সবর
মানুষের প্রকৃত চরিত্র অনেক সময় সুখের দিনে নয়, বরং বিপদের দিনে প্রকাশ পায়। সুখের সময় আল্লাহকে স্মরণ করা সহজ; কিন্তু দুঃখের সময়ও যদি কেউ আল্লাহর প্রতি আস্থা বজায় রাখে, তখন তার ঈমানি শক্তির পরিচয় পাওয়া যায়।
রোগে আক্রান্ত হলে মানুষ দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। আর্থিক সংকটে পড়লে উদ্বেগ দেখা দিতে পারে। প্রিয়জনকে হারালে হৃদয়ে গভীর শোক জন্ম নিতে পারে। কোনো স্বপ্ন ব্যর্থ হলে হতাশা গ্রাস করতে পারে। কিন্তু একজন মুমিন এসব অবস্থায় আল্লাহর প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ না করে তাঁর কাছে সাহায্য চায়, নিজের করণীয় পালন করে এবং বিশ্বাস রাখে যে আল্লাহর জ্ঞান মানুষের জ্ঞানের চেয়ে অসীম।
তবে সবর মানে অন্যায়কে মেনে নেওয়া নয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়সংগত ও বৈধ ব্যবস্থা নেওয়া, নিজের অধিকার রক্ষার চেষ্টা করা, প্রয়োজন হলে অভিজ্ঞ ও বিশ্বস্ত মানুষের সাহায্য নেওয়া—এসবের সঙ্গে সবরের কোনো বিরোধ নেই। সবর হলো প্রতিকূলতার মধ্যেও অন্যায়, হতাশা ও অধৈর্যের পথে না যাওয়া।
সবর ও তাওয়াক্কুল
সবরের সঙ্গে তাওয়াক্কুলের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তাওয়াক্কুল অর্থ আল্লাহর ওপর ভরসা করা। তবে তাওয়াক্কুল কখনো চেষ্টা পরিত্যাগ করার নাম নয়। বরং মানুষ তার সামর্থ্য অনুযায়ী বৈধ চেষ্টা করবে, পরিকল্পনা করবে, পরামর্শ নেবে এবং এরপর ফলাফল আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেবে।
একজন কৃষক জমিতে বীজ বপন করে, জমি প্রস্তুত করে, পানি দেয় এবং ফসলের যত্ন নেয়। কিন্তু ফলন দেওয়ার ক্ষমতা তার হাতে নয়। সে চেষ্টা করে এবং আল্লাহর ওপর ভরসা করে। জীবনের ক্ষেত্রেও একই শিক্ষা প্রযোজ্য।
তাই বলা যায়—চেষ্টা মানুষের দায়িত্ব, ফলাফল আল্লাহর হাতে। এই উপলব্ধি মানুষের হৃদয়ে প্রশান্তি সৃষ্টি করে। সাফল্যে সে অহংকারী হয় না এবং ব্যর্থতায় সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে না।
সবর ও নফসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম
মানুষের সবচেয়ে কঠিন সংগ্রামগুলোর একটি হলো নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করা। রাগ, লোভ, অহংকার, হিংসা, প্রতিশোধস্পৃহা এবং অতিরিক্ত ভোগের আকাঙ্ক্ষা মানুষকে সত্য ও ন্যায়ের পথ থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে।
আপনার মূল রচনার “নফসের সাথে যুদ্ধ” অংশে এই আত্মসংযমের বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে রাগ, লোভ ও হিংসাকে ধৈর্যের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করার কথা বলা হয়েছে।
কেউ যদি রাগের মুহূর্তে নিজেকে সংযত করতে পারে, অন্যায় প্রতিশোধ থেকে বিরত থাকতে পারে এবং ক্ষমার পথ বেছে নিতে পারে, তবে সে নিজের নফসের ওপর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিজয় অর্জন করে। তাই সবর শুধু বাইরের বিপদের বিরুদ্ধে ধৈর্য নয়; নিজের ভেতরের দুর্বলতার বিরুদ্ধেও এক মহান আত্মসংগ্রাম।
রাগ নিয়ন্ত্রণে সবর
রাগ মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতি। কিন্তু রাগের বশে বলা একটি কথা কখনো কখনো বহু বছরের সম্পর্ক নষ্ট করতে পারে। একটি কঠোর বাক্য মানুষের হৃদয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষত তৈরি করতে পারে। তাই রাগের মুহূর্তে নিজেকে থামানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইসলাম রাগ দমন ও ক্ষমাকে মহৎ গুণ হিসেবে শিক্ষা দিয়েছে। যে ব্যক্তি অন্যের ভুলে সঙ্গে সঙ্গে প্রতিশোধ না নিয়ে নিজেকে সংযত করতে পারে, সে প্রকৃত অর্থে শক্তিশালী।
সবর মানুষকে শেখায়—প্রতিটি কথার উত্তর সঙ্গে সঙ্গে দিতে হয় না, প্রতিটি অপমানের প্রতিশোধ নিতে হয় না এবং প্রতিটি বিরোধকে সংঘাতে রূপ দিতে হয় না। কখনো নীরবতা, কখনো ক্ষমা, কখনো সুন্দর কথা এবং কখনো ন্যায়সংগত দূরত্ব—এসবই প্রজ্ঞার পরিচয় হতে পারে।
মানুষের আচরণে সবর
মানুষ সামাজিক জীব। পরিবার, বিদ্যালয়, কর্মক্ষেত্র ও সমাজে চলতে গেলে নানা মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয়। সবাই একই রকম চিন্তা করে না, একইভাবে কথা বলে না এবং একইভাবে আচরণও করে না। ফলে ভুল বোঝাবুঝি, মতপার্থক্য ও কষ্টের ঘটনা ঘটতেই পারে।
এমন পরিস্থিতিতে সবর অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তবে সবর মানে নিজের ওপর অন্যায়কে স্থায়ীভাবে চাপিয়ে নেওয়া নয়। বরং উত্তেজনা এড়িয়ে, ন্যায়সংগত পদ্ধতিতে সমস্যার সমাধান করা, ক্ষমার সুযোগ থাকলে ক্ষমা করা এবং প্রয়োজন হলে দৃঢ়ভাবে নিজের সীমা নির্ধারণ করাও ইসলামী প্রজ্ঞার অংশ।
ক্ষমা মানুষের হৃদয়কে হালকা করে। প্রতিশোধের আগুন মানুষকে ভেতর থেকে পুড়িয়ে দেয়; আর ক্ষমা হৃদয়ে প্রশান্তির দ্বার খুলে দিতে পারে।
সবর ও আত্মশুদ্ধি
মানুষের হৃদয়ে কখনো লোভ, হিংসা, অহংকার ও বিদ্বেষ জমে যায়। এসব প্রবৃত্তি হৃদয়ের স্বচ্ছতা নষ্ট করে। সবর মানুষকে নিজের আবেগ ও প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখায়।
যে ব্যক্তি নিজের ভুল স্বীকার করতে পারে, অন্যের ভালো দেখে ঈর্ষান্বিত না হয়ে আল্লাহর কাছে কল্যাণ চায়, সামান্য প্রাপ্তিতে সন্তুষ্ট থাকে এবং হারাম আকাঙ্ক্ষাকে দমন করতে পারে—তার হৃদয় ধীরে ধীরে পরিশুদ্ধ হয়।
সবর তাই শুধু বাহ্যিক আচরণের গুণ নয়; এটি অন্তর গঠনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
সবর ও সময়ের শিক্ষা
সময় কখনো থেমে থাকে না। আজকের কষ্ট আগামী দিনের অভিজ্ঞতা হয়ে যেতে পারে। আজ যে সমস্যা অসহনীয় মনে হচ্ছে, কিছুদিন পর তার সমাধানও হতে পারে। তাই তাড়াহুড়ো করে হতাশ সিদ্ধান্ত না নিয়ে ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি বিবেচনা করা জরুরি।
সবর মানুষকে অপেক্ষা করতে শেখায়—তবে নিষ্ক্রিয়ভাবে নয়; সচেতন ও সৎ প্রচেষ্টার সঙ্গে। একজন ধৈর্যশীল মানুষ জানে, সব ফল তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায় না। শিক্ষা অর্জন, চরিত্র গঠন, কর্মজীবনের উন্নতি, সম্পর্কের সৌন্দর্য কিংবা আত্মশুদ্ধি—সবকিছুর জন্য সময় লাগে।
সবর ও জ্ঞান
জ্ঞান মানুষের দৃষ্টিকে প্রসারিত করে। অজ্ঞ মানুষ কোনো ঘটনার তাৎক্ষণিক দিক দেখে সিদ্ধান্ত নিতে পারে; কিন্তু জ্ঞানী মানুষ তার পরিণতি বিবেচনা করে।
জীবনের অনেক পরীক্ষার তাৎক্ষণিক কারণ আমরা বুঝতে পারি না। কিন্তু একজন মুমিন বিশ্বাস করে, আল্লাহ সর্বজ্ঞ এবং তাঁর জ্ঞান সীমাহীন। এই বিশ্বাস মানুষকে অস্থিরতার পরিবর্তে চিন্তা, দোয়া ও সৎ প্রচেষ্টার পথে পরিচালিত করে।
আপনার রচনাতেও “জ্ঞান ছাড়া সবর অন্ধ” এই ভাবের মাধ্যমে সবরের সঙ্গে সঠিক উপলব্ধি ও প্রজ্ঞার সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে।
সবর ও সামাজিক শান্তি
একজন মানুষের সবর শুধু তার নিজের জীবনকে সুন্দর করে না; এর প্রভাব পরিবার ও সমাজেও পড়ে। একজন ব্যক্তি যদি রাগের পরিবর্তে সংযম, ঘৃণার পরিবর্তে সৌজন্য, প্রতিশোধের পরিবর্তে ক্ষমা এবং বিদ্বেষের পরিবর্তে সহমর্মিতা বেছে নেয়, তাহলে তার চারপাশের পরিবেশও শান্ত হয়।
পরিবারে স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা ও সন্তান, ভাই-বোন কিংবা আত্মীয়স্বজন—সবার সম্পর্কেই ধৈর্য দরকার। কর্মক্ষেত্রে সহকর্মীদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণেও সবর দরকার। শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কেও ধৈর্য, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক সম্মান অপরিহার্য।
একজন ধৈর্যশীল মানুষ অনেক সময় একটি সংঘাতকে বড় হওয়ার আগেই থামিয়ে দিতে পারে। এভাবেই ব্যক্তিগত সবর সামাজিক শান্তির শক্তিতে পরিণত হয়।
তরুণ প্রজন্মের জীবনে সবর
তরুণদের জীবনে নানা ধরনের প্রলোভন ও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দ্রুত সাফল্য পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চাপ, অন্যের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করা, অযথা ভোগের আকাঙ্ক্ষা, পড়াশোনায় ব্যর্থতা কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ—এসব তাদের মানসিক স্থিরতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
এ সময় সবরের শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তরুণকে বুঝতে হবে—জীবন কোনো তাৎক্ষণিক প্রতিযোগিতা নয়। প্রত্যেক মানুষের পথ আলাদা। অন্যের সাফল্য দেখে হতাশ হওয়ার পরিবর্তে নিজের যোগ্যতা, শিক্ষা, চরিত্র ও কর্মদক্ষতা গড়ে তোলাই বুদ্ধিমানের কাজ।
আজকের ছোট ব্যর্থতা আগামী দিনের বড় শিক্ষা হতে পারে। তাই ব্যর্থতার পর নিজেকে শেষ মনে না করে ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে আবার চেষ্টা করাই সবরের শিক্ষা।
সবর মানে নিষ্ক্রিয়তা নয়
একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার—সবর মানে হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়। বিপদে পড়ে চিকিৎসা না নেওয়া সবর নয়; বরং চিকিৎসা গ্রহণ করে আল্লাহর ওপর ভরসা করা সবর। আর্থিক সমস্যায় পড়ে কোনো পরিকল্পনা না করা সবর নয়; বরং বৈধ উপায়ে আয় ও সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করা সবর। অন্যায়ের শিকার হয়ে নীরবে অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়াও সবর নয়; বরং শান্তিপূর্ণ ও ন্যায়সংগত উপায়ে প্রতিকার চাওয়া সবরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সুতরাং সবর হলো দায়িত্বশীল ধৈর্য—যেখানে হৃদয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা থাকে এবং হাতে থাকে সৎ প্রচেষ্টা।
সবরের পুরস্কার
দুনিয়ার জীবনে সবরের অনেক ফল রয়েছে। সবর মানুষের মানসিক স্থিরতা বাড়ায়, সিদ্ধান্ত গ্রহণে পরিণত করে, সম্পর্ককে সুন্দর করে, রাগ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং বিপদের সময় সঠিক পথ বেছে নেওয়ার শক্তি দেয়।
এর পাশাপাশি আখিরাতের দিক থেকেও সবরের মর্যাদা অসীম। কুরআন ধৈর্যশীলদের জন্য আল্লাহর বিশেষ পুরস্কারের কথা ঘোষণা করেছে। মুমিনের চূড়ান্ত লক্ষ্য শুধু দুনিয়ার সাময়িক সাফল্য নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি ও আখিরাতের মুক্তি।
তাই দুঃখের সময় মুমিন মনে রাখে—এই পৃথিবী চিরস্থায়ী নয়। মানুষের কষ্ট, আনন্দ, সম্পদ, ক্ষমতা ও জীবনের সময়—সবই সীমিত। কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টি ও আখিরাতের পুরস্কার চিরস্থায়ী।
সবর ও আশা
সবর কখনো হতাশার শিক্ষা দেয় না। বরং সবরের সঙ্গে থাকে আশা। যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর বিশ্বাস রাখে, সে জানে—আজকের পরিস্থিতি আগামীকাল একই থাকবে এমন নয়।
তাই বিপদের সময় বলা উচিত নয়, “আমার আর কোনো পথ নেই।” বরং বলা উচিত—“আমি আমার সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা করব, আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইব এবং তাঁর ওপর ভরসা রাখব।”
এই আশাই মানুষকে আবার দাঁড়াতে শেখায়। এই আশাই ব্যর্থ মানুষকে নতুন করে চেষ্টা করার শক্তি দেয়। এই আশাই দুঃখী হৃদয়কে আল্লাহর দরজায় ফিরিয়ে আনে।
দোয়া ও সবর
সবর অর্জনের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ নিজের শক্তিতে সব সময় ধৈর্যশীল থাকতে পারে না। তাই আল্লাহর সাহায্য চাইতে হবে।
দোয়া মানুষের অন্তরকে আল্লাহর সঙ্গে যুক্ত করে। নীরব রাতে যখন মানুষ নিজের কষ্ট, দুর্বলতা ও অসহায়ত্ব আল্লাহর কাছে তুলে ধরে, তখন তার হৃদয়ে এক ধরনের প্রশান্তি জন্মায়। দোয়া সমস্যার সমাধানের পাশাপাশি মানুষকে সমস্যার মোকাবিলা করার শক্তিও দেয়।
সুতরাং সবরের পথে দোয়া, সালাত, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, তাওবা এবং সৎকর্ম গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক।
দৈনন্দিন জীবনে সবরের চর্চা
সবর একদিনে অর্জিত হয় না। এটি নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে চরিত্রের অংশ হয়ে ওঠে। ছোট ছোট বিষয় থেকেই এর চর্চা শুরু করা যায়।
রাগের সময় কয়েক মুহূর্ত নীরব থাকা, কারও ভুলে সঙ্গে সঙ্গে কঠোর প্রতিক্রিয়া না দেখানো, কোনো কাজের ফল পেতে সময় লাগলে অস্থির না হওয়া, নামাজে নিয়মিত থাকা, পাপের সুযোগ এলে নিজেকে সংযত করা, অভাবের সময় হারাম পথে না যাওয়া, অন্যের সাফল্যে হিংসা না করা এবং বিপদের সময় আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া—এসবই সবরের বাস্তব অনুশীলন।
যে ব্যক্তি প্রতিদিন নিজেকে সামান্য একটু করে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে, একসময় তার মধ্যে দৃঢ়তা তৈরি হয়।
উপসংহার
সবর মানুষের জীবনের এক অমূল্য গুণ। এটি কেবল দুঃখ সহ্য করার নাম নয়; এটি ঈমানের দৃঢ়তা, আত্মসংযম, আল্লাহর ওপর ভরসা, ন্যায়ের পথে অবিচলতা এবং সৎ প্রচেষ্টার সমন্বিত রূপ। সবর মানুষকে শেখায়—বিপদে ভেঙে পড়া যাবে না, সুখে অহংকারী হওয়া যাবে না, পাপের সামনে আত্মসমর্পণ করা যাবে না এবং ব্যর্থতাকে জীবনের শেষ অধ্যায় মনে করা যাবে না।
সবরের আলো হৃদয়ে জ্বলে উঠলে মানুষ নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, রাগকে সংযত করতে পারে, অন্যকে ক্ষমা করতে পারে, বিপদে আল্লাহকে স্মরণ করতে পারে এবং জীবনের প্রতিকূলতার মধ্যেও সঠিক পথ অনুসরণ করতে পারে। আপনার মূল রচনার শেষাংশেও সবরকে জীবনের পথে আলোর দিশা ও আল্লাহর সন্তুষ্টির দিকে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
অতএব, আমাদের প্রত্যেকের হৃদয়ে সবরের দীপশিখা জ্বালাতে হবে। সুখে আল্লাহর শুকরিয়া, দুঃখে সবর, পাপে সংযম, ইবাদতে নিষ্ঠা, মানুষের প্রতি ক্ষমা ও দয়া এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল—এই হোক আমাদের জীবনদর্শন।
ঝড় আসবে, কিন্তু আমরা ভেঙে পড়ব না;
দুঃখ আসবে, কিন্তু আমরা হতাশ হব না;
পরীক্ষা আসবে, কিন্তু আমরা সত্যের পথ ছাড়ব না।
কারণ আমাদের হৃদয়ে থাকবে ঈমানের আলো,
আর সেই আলোর সঙ্গে জ্বলবে—সবরের দীপশিখা।
৭
৬ মন্তব্য