সহকারী অধ্যাপক
১৪ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:৪৪ পূর্বাহ্ণ
সফলতার দুই সোপান - মোঃ মুজিবুর রহমান
সফলতার দুই সোপান
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর।
ভূমিকা
সফলতা মানুষের জীবনের একটি কাঙ্ক্ষিত অর্জন। প্রত্যেক মানুষই জীবনে কিছু না কিছু পেতে চায়, নিজের জন্য একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়তে চায় এবং পরিবার, সমাজ ও দেশের কল্যাণে অবদান রাখতে চায়। কিন্তু শুধু স্বপ্ন দেখলেই সফলতা আসে না। সফলতার জন্য প্রয়োজন সঠিক দিকনির্দেশনা, সুস্পষ্ট লক্ষ্য, দৃঢ় সংকল্প, নিরলস পরিশ্রম, ধৈর্য, সততা এবং আল্লাহর ওপর যথাযথ ভরসা। জীবনের দীর্ঘ পথে কখনো আসে আনন্দ, কখনো ব্যর্থতা; কখনো পথ মসৃণ হয়, আবার কখনো বাধা ও প্রতিকূলতায় ভরে ওঠে। যে মানুষ প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের লক্ষ্যকে সামনে রেখে অবিচলভাবে কাজ করে যেতে পারে, সফলতার দ্বার একদিন তার জন্য উন্মুক্ত হয়।
সফলতার মূলনীতিকে সংক্ষেপে দুটি সোপানে প্রকাশ করা যায়—প্রথমত, সঠিক লক্ষ্য নির্ধারণ করা; দ্বিতীয়ত, সেই লক্ষ্যে অবিচল থেকে নিরন্তর কাজ করে যাওয়া। তবে ইসলামী জীবনদর্শনে এই দুটি সোপানের সঙ্গে ঈমান, সৎ উদ্দেশ্য, হালাল পন্থা, তাওয়াক্কুল ও আল্লাহর সন্তুষ্টির বিষয়টি অবিচ্ছেদ্য। কারণ একজন মুমিনের কাছে প্রকৃত সফলতা শুধু দুনিয়ার অর্থ, সম্মান বা খ্যাতি অর্জন নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং আখিরাতে মুক্তি লাভই চূড়ান্ত সফলতা।
সঠিক লক্ষ্য নির্ধারণ
সফলতার প্রথম সোপান হলো সঠিক লক্ষ্য নির্ধারণ। লক্ষ্যহীন জীবন অনেকটা পালহীন নৌকার মতো। নৌকার গন্তব্য নির্ধারিত না থাকলে বাতাস ও স্রোত তাকে যেদিকে নিয়ে যায়, সেদিকেই যেতে হয়। তেমনি জীবনের লক্ষ্য স্পষ্ট না থাকলে মানুষ কখনো একদিকে, কখনো অন্যদিকে ছুটতে থাকে; তার শ্রম ব্যয় হয়, সময় চলে যায়, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত অর্জন আসে না।
তাই জীবনের শুরুতেই নিজেকে প্রশ্ন করা প্রয়োজন—আমি কী হতে চাই? কী অর্জন করতে চাই? আমার জীবনের উদ্দেশ্য কী? আমার প্রতিভা, যোগ্যতা ও আগ্রহ কোন কাজে সবচেয়ে ভালোভাবে ব্যবহার করা সম্ভব? আমার লক্ষ্য কি শুধু নিজের স্বার্থকেন্দ্রিক, নাকি এর সঙ্গে পরিবার, সমাজ, দেশ ও মানবতার কল্যাণও যুক্ত আছে?
সঠিক লক্ষ্য অবশ্যই ন্যায়সংগত, কল্যাণময় ও বাস্তবসম্মত হতে হবে। অন্যায় পথে অর্থ উপার্জন, প্রতারণার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা লাভ, অন্যের ক্ষতি করে নিজের উন্নতি কিংবা অবৈধ উপায়ে খ্যাতি অর্জন কখনো প্রকৃত সফলতা হতে পারে না। একজন মুমিনের লক্ষ্য হবে এমন, যা দুনিয়ার জীবনে কল্যাণ বয়ে আনে এবং আখিরাতেও উপকার করে।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
“আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করবে, সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।”
—সূরা আল-আহযাব, ৩৩:৭১
অতএব, একজন মুসলমানের জীবনের সর্বোচ্চ লক্ষ্য হওয়া উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। শিক্ষা, পেশা, ব্যবসা, চাকরি, গবেষণা, সমাজসেবা—সবকিছুই যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে এবং হালাল পন্থায় সম্পন্ন হয়, তবে সেগুলোও ইবাদতের মর্যাদা লাভ করতে পারে।
বড় স্বপ্ন ও ছোট ছোট লক্ষ্য
বড় লক্ষ্য অর্জনের জন্য ছোট ছোট লক্ষ্য নির্ধারণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশাল ভবন যেমন একটি একটি ইট দিয়ে নির্মিত হয়, তেমনি বড় সাফল্যও অসংখ্য ছোট অর্জনের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে। যে শিক্ষার্থী একদিনে শ্রেষ্ঠ হতে চায়, কিন্তু প্রতিদিনের পড়াশোনায় নিয়মিত নয়, তার স্বপ্ন বাস্তবায়ন কঠিন। পক্ষান্তরে যে শিক্ষার্থী প্রতিদিন সামান্য হলেও নিয়মিত পড়ে, ভুল সংশোধন করে এবং নিজের অগ্রগতি মূল্যায়ন করে, সে ধীরে ধীরে বড় সাফল্যের দিকে এগিয়ে যায়।
একটি বীজের মধ্যে যেমন বিশাল বৃক্ষের সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে, তেমনি একটি ছোট ভালো অভ্যাসের মধ্যেও বড় সাফল্যের বীজ নিহিত থাকে। প্রতিদিন সময়মতো ঘুম থেকে ওঠা, নিয়মিত পড়াশোনা করা, সময়ের মূল্য বোঝা, নামাজ আদায় করা, সত্য কথা বলা, প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা এবং নিজের কাজ নিজে সম্পন্ন করার মতো ছোট ছোট অভ্যাস ভবিষ্যতে একজন মানুষকে সুশৃঙ্খল ও সফল করে তুলতে পারে।
দ্বিতীয় সোপান—অবিচল কর্মপ্রচেষ্টা
লক্ষ্য নির্ধারণের পর দ্বিতীয় এবং অপরিহার্য সোপান হলো সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য নিরন্তর কাজ করে যাওয়া। শুধু স্বপ্ন, পরিকল্পনা বা ইচ্ছা সফলতার জন্য যথেষ্ট নয়। স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে কর্মে পরিণত করতে হয়।
অনেক মানুষ সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে, কিন্তু কঠোর পরিশ্রম করতে চায় না। তারা দ্রুত ফল পেতে চায়, কিন্তু দীর্ঘদিনের সাধনা ও অপেক্ষার ধৈর্য তাদের থাকে না। এভাবে সফলতা অর্জন করা সম্ভব নয়। প্রকৃত সফলতা সাধারণত ধীরে ধীরে আসে। নিয়মিত প্রচেষ্টা, ভুল থেকে শিক্ষা, নিজের দুর্বলতা সংশোধন এবং প্রতিদিন সামান্য করে এগিয়ে যাওয়াই সাফল্যের নির্ভরযোগ্য পথ।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
“আর মানুষ যা চেষ্টা করে, তা-ই তার জন্য।”
—সূরা আন-নাজম, ৫৩:৩৯
এই আয়াত মানুষকে কর্মপ্রচেষ্টার গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়। তাই ভাগ্যের ওপর বসে না থেকে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সৎ ও বৈধ প্রচেষ্টা চালাতে হবে।
পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই
সফলতার অন্যতম প্রধান চাবিকাঠি হলো পরিশ্রম। পৃথিবীর কোনো বড় অর্জনই সাধারণত অলসতার মাধ্যমে আসে না। কৃষক জমিতে বীজ বপন করেন, জমি প্রস্তুত করেন, সেচ দেন এবং ফসলের পরিচর্যা করেন; তারপর তিনি ফসলের আশা করেন। একইভাবে জীবনের ক্ষেত্রেও শ্রম ও সাধনার বীজ বপন করতে হয়।
ঘামের প্রতিটি ফোঁটা মানুষের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাকে সমৃদ্ধ করে। আজকের পরিশ্রম আগামী দিনের সম্ভাবনাকে শক্তিশালী করে। যে শিক্ষার্থী আজ মনোযোগ দিয়ে পড়ে, যে তরুণ আজ দক্ষতা অর্জনের চেষ্টা করে, যে কর্মী আজ নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে—ভবিষ্যতে তারাই নিজেদের জন্য শক্ত ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
অলসতা মানুষের প্রতিভাকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়। সময় নষ্ট করার অভ্যাস ধীরে ধীরে মানুষকে লক্ষ্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। তাই অলসতার শৃঙ্খল ভেঙে কর্মমুখী হতে হবে।
ব্যর্থতা সফলতার অন্তরায় নয়
জীবনে ব্যর্থতা আসতেই পারে। একটি পরীক্ষায় খারাপ ফল, কোনো কাজে প্রত্যাশিত সাফল্য না পাওয়া, ব্যবসায় ক্ষতি, কোনো পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়া—এসব জীবনের স্বাভাবিক অভিজ্ঞতা। ব্যর্থতাকে জীবনের শেষ অধ্যায় মনে করা উচিত নয়।
বরং ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিতে হবে। কোথায় ভুল হয়েছে, কেন হয়েছে এবং ভবিষ্যতে কীভাবে সেই ভুল এড়ানো যায়—তা খুঁজে বের করতে হবে। একজন সফল মানুষ ব্যর্থতায় ভেঙে পড়েন না; তিনি ব্যর্থতাকে অভিজ্ঞতায় পরিণত করেন।
ঝড়ের পরে যেমন আকাশ পরিষ্কার হয়, তেমনি কঠিন সময়ের পরও নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলতে পারে। তাই ব্যর্থতার মুহূর্তে হতাশ না হয়ে ধৈর্য ধরতে হবে এবং আবার চেষ্টা করতে হবে।
ধৈর্য ও অধ্যবসায়
সাফল্য অর্জনের পথে ধৈর্যের গুরুত্ব অপরিসীম। অনেকেই শুরুতে উৎসাহ নিয়ে কাজ শুরু করে, কিন্তু কিছুদিন পর ফল না পেয়ে থেমে যায়। অথচ বড় অর্জনের জন্য দীর্ঘ সময় ধরে নিয়মিত কাজ করে যেতে হয়।
অধ্যবসায়ী মানুষ বাধাকে ভয় পায় না। সে জানে, প্রতিটি কঠিন পরিস্থিতি তাকে নতুন কিছু শেখাবে। ধৈর্য তাকে স্থির রাখে, আর অধ্যবসায় তাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
“নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।”
—সূরা আল-বাকারা, ২:১৫৩
সুতরাং বিপদে ধৈর্য এবং কাজে অধ্যবসায়—দুটিই একজন মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ গুণ।
তাওয়াক্কুলের শিক্ষা
ইসলামে তাওয়াক্কুলের অর্থ হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়। বরং যথাসাধ্য বৈধ চেষ্টা করার পর ফলাফলের ব্যাপারে আল্লাহর ওপর নির্ভর করাই তাওয়াক্কুল। একজন কৃষক জমি চাষ করেন, বীজ বপন করেন, পরিচর্যা করেন; এরপর ফলনের জন্য আল্লাহর ওপর ভরসা করেন। এটাই কর্ম ও তাওয়াক্কুলের সুন্দর সমন্বয়।
কাজ না করে শুধু “আল্লাহর ওপর ভরসা করছি” বলা তাওয়াক্কুলের পূর্ণ শিক্ষা নয়। আবার নিজের সামর্থ্যকে সবকিছু মনে করে আল্লাহকে ভুলে যাওয়াও মুমিনের পথ নয়। সঠিক পথ হলো—পরিকল্পনা করব, সৎভাবে চেষ্টা করব, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব এবং ফলাফল আল্লাহর হাতে ছেড়ে দেব।
এই ভারসাম্য মানুষকে আত্মবিশ্বাসী, ধৈর্যশীল ও আল্লাহনির্ভর করে তোলে।
সততা ও নৈতিকতা
সফলতার সঙ্গে নৈতিকতার সম্পর্ক গভীর। অসৎ উপায়ে অর্জিত অর্থ, প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত সম্মান কিংবা অন্যের অধিকার নষ্ট করে পাওয়া সুবিধা প্রকৃত সফলতা নয়। এমন অর্জন বাহ্যিকভাবে যত আকর্ষণীয়ই হোক, তাতে প্রকৃত শান্তি থাকে না।
সততা মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদগুলোর একটি। সত্যবাদী মানুষ ধীরে এগোলেও তার ভিত্তি শক্ত থাকে। মিথ্যা ও প্রতারণার ওপর গড়া সাফল্য টেকসই হয় না।
তাই জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সত্য, ন্যায়, আমানতদারি, বিশ্বস্ততা, বিনয় ও উত্তম চরিত্রকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ইসলামের শিক্ষা হলো—মানুষের সঙ্গে সুন্দর আচরণ করা, অন্যের অধিকার রক্ষা করা এবং অন্যায় থেকে নিজেকে বিরত রাখা।
সময়ের মূল্য
সফলতার পথে সময়ের সঠিক ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থ হারালে তা কোনো না কোনোভাবে পুনরায় অর্জন করা সম্ভব; কিন্তু যে সময় চলে যায়, তা আর ফিরে আসে না।
একজন সফল মানুষ তার সময়কে পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করে। পড়াশোনা, ইবাদত, পরিবার, কাজ, বিশ্রাম ও আত্মোন্নয়নের জন্য সে যথাযথ সময় নির্ধারণ করে। অন্যদিকে অতিরিক্ত অলসতা, উদ্দেশ্যহীন বিনোদন এবং সময়ের অপচয় মানুষকে ধীরে ধীরে তার লক্ষ্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
তাই প্রতিটি দিনকে নতুন সম্ভাবনার দিন হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আজকের একটি ভালো সিদ্ধান্ত আগামী দিনের জীবনকে পরিবর্তন করে দিতে পারে।
শিক্ষা ও আত্মোন্নয়ন
সফল জীবনের অন্যতম ভিত্তি হলো শিক্ষা। তবে শিক্ষা শুধু বই পড়া বা পরীক্ষায় ভালো ফল করার নাম নয়। প্রকৃত শিক্ষা মানুষের জ্ঞান বৃদ্ধি করে, চরিত্র গঠন করে, বিবেক জাগ্রত করে এবং তাকে দায়িত্বশীল করে তোলে।
একজন শিক্ষিত মানুষ যদি সততা, বিনয়, ন্যায়বোধ ও মানবিকতা অর্জন করতে না পারে, তবে তার শিক্ষা পূর্ণতা লাভ করে না। তাই জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি জ্ঞানকে জীবনে প্রয়োগ করতে হবে।
নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া, নতুন বিষয় শেখা, অভিজ্ঞ মানুষের পরামর্শ গ্রহণ করা এবং নিজের দুর্বলতা সংশোধন করা আত্মোন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
মানুষের কল্যাণে সফলতা
সফলতা শুধু নিজের জন্য কিছু অর্জনের নাম নয়। প্রকৃত সফলতা তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা অন্য মানুষের উপকারে আসে। একজন চিকিৎসক রোগীর সেবা করেন, একজন শিক্ষক জ্ঞানের আলো ছড়ান, একজন কৃষক খাদ্য উৎপাদন করেন, একজন শ্রমিক তার শ্রম দিয়ে সমাজের অগ্রযাত্রায় ভূমিকা রাখেন—প্রত্যেকের সৎ কাজই সমাজের জন্য মূল্যবান।
মানুষের মুখে হাসি ফোটানো, অসহায়কে সাহায্য করা, জ্ঞান দিয়ে অন্যকে উপকৃত করা, দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখা—এসবই মহৎ জীবনের পরিচয়।
সুতরাং আমাদের সফলতার সংজ্ঞা এমন হওয়া উচিত, যাতে নিজের উন্নতির পাশাপাশি অন্যের কল্যাণও নিশ্চিত হয়।
তরুণদের প্রতি আহ্বান
তরুণরাই একটি দেশের ভবিষ্যৎ। তাদের হাতে থাকে নতুন সমাজ নির্মাণের শক্তি। তাই তরুণদের লক্ষ্যহীনতা, অলসতা, হতাশা ও অনৈতিকতার পথ থেকে দূরে থাকতে হবে।
তাদের উচিত জ্ঞান অর্জন করা, দক্ষতা বৃদ্ধি করা, সময়ের মূল্য বোঝা, নিয়মিত ইবাদত করা, উত্তম চরিত্র গঠন করা এবং দেশ ও মানুষের কল্যাণে নিজেদের প্রস্তুত করা।
তরুণদের মনে রাখতে হবে—সফলতার কোনো শর্টকাট নেই। রাতারাতি বড় কিছু হওয়ার আকাঙ্ক্ষার চেয়ে প্রতিদিন একটু একটু করে নিজেকে উন্নত করা অনেক বেশি কার্যকর। আজকের পরিশ্রমই আগামী দিনের শক্ত ভিত্তি।
দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতা
ইসলামী দৃষ্টিতে দুনিয়ার সফলতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটিই চূড়ান্ত নয়। অর্থ, পদ, খ্যাতি, সম্পদ ও সামাজিক মর্যাদা সবই ক্ষণস্থায়ী। মানুষের প্রকৃত সফলতা নির্ধারিত হবে তার ঈমান, আমল, চরিত্র ও আল্লাহর সন্তুষ্টির ভিত্তিতে।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
“যে ব্যক্তি জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হলো এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হলো, সে-ই সফলতা লাভ করল।”
—সূরা আলে ইমরান, ৩:১৮৫
অতএব, দুনিয়ার জীবনে আমাদের লক্ষ্য ও কর্মপ্রচেষ্টা যেমন থাকবে, তেমনি আখিরাতের প্রস্তুতিও থাকতে হবে। হালাল উপার্জন, নামাজ, সৎকর্ম, মানুষের অধিকার রক্ষা, দান-সদকা, পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ এবং উত্তম চরিত্র—এসবই মুমিনের প্রকৃত সফলতার পথ।
সফলতার সমন্বিত সূত্র
সফলতার দুই প্রধান সোপান হলো—
প্রথম সোপান: সঠিক লক্ষ্য নির্ধারণ।
দ্বিতীয় সোপান: সেই লক্ষ্যে অবিচল থেকে নিরন্তর কাজ করে যাওয়া।
তবে এই দুই সোপানকে শক্তিশালী করার জন্য আরও কিছু গুণ প্রয়োজন—ঈমান, সৎ উদ্দেশ্য, জ্ঞান, পরিকল্পনা, পরিশ্রম, ধৈর্য, অধ্যবসায়, সততা, সময়ানুবর্তিতা এবং তাওয়াক্কুল।
সঠিক লক্ষ্য থাকলে মানুষ দিক খুঁজে পায়। নিরলস শ্রম তাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়। ধৈর্য তাকে বিপদের সময় স্থির রাখে। সততা তার পথকে পবিত্র রাখে। আর তাওয়াক্কুল তার অন্তরে আল্লাহর ওপর নির্ভরতার শক্তি সৃষ্টি করে।
উপসংহার
জীবন একটি দীর্ঘ যাত্রা। এই যাত্রায় প্রত্যেক মানুষেরই একটি গন্তব্য থাকা দরকার। লক্ষ্যহীন মানুষ যেমন দিকহীন হয়ে পড়ে, তেমনি কর্মহীন স্বপ্নও কখনো বাস্তব সফলতায় রূপ নেয় না। তাই জীবনে প্রথমে সঠিক ও কল্যাণময় লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে এবং সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য নিয়মিত, সৎ ও নিরলসভাবে কাজ করে যেতে হবে।
বাধা এলে ভেঙে পড়া যাবে না, ব্যর্থতা এলে থেমে যাওয়া যাবে না, মানুষের সমালোচনায় হতাশ হওয়া যাবে না। বরং ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে, ধৈর্য ধারণ করে, আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে আবার সামনে এগিয়ে যেতে হবে।
মনে রাখতে হবে—সফলতা শুধু গন্তব্যে পৌঁছানোর নাম নয়; সঠিক পথে চলার নামও সফলতা। যে লক্ষ্য সত্য, যে কর্ম ন্যায়সংগত, যে উপার্জন হালাল, যে চরিত্র সুন্দর এবং যে জীবন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিবেদিত—সেই জীবনই প্রকৃত অর্থে সফল জীবন।
তাই আমাদের জীবনের অঙ্গীকার হোক—
সঠিক লক্ষ্য স্থির করব,
সৎ পথে চলব,
নিরলস পরিশ্রম করব,
ব্যর্থতায় হতাশ হব না,
সময়ের মূল্য দেব,
মানুষের কল্যাণে কাজ করব,
এবং সব প্রচেষ্টার পর আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করব।
কারণ—
সঠিক লক্ষ্য জীবনের দিকনির্দেশনা দেয়,
আর নিরলস কর্ম সেই লক্ষ্যকে বাস্তবে রূপ দেয়।
ঈমান ও তাওয়াক্কুল সেই পথকে আলোকিত করে।
এই সমন্বিত পথেই নিহিত দুনিয়া ও আখিরাতের প্রকৃত সফলতার সম্ভাবনা।
নীতিবাণী
“সঠিক লক্ষ্য নির্ধারণ করো, সেই লক্ষ্যে অবিচল থাকো; সৎ প্রচেষ্টা, ধৈর্য ও তাওয়াক্কুলের মাধ্যমে এগিয়ে চলো—তবেই সফলতার পথ সুদৃঢ় হবে।”
১৩
১৮ মন্তব্য