সহকারী শিক্ষক
১৪ আগস্ট, ২০২৬ ০৬:৩৭ পূর্বাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
শিক্ষার্থীদের অনলাইন গেম আসক্তি বর্তমানে একটি গুরুতর সামাজিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, বিশেষ করে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ২০১৮ সালে একে গেমিং ডিসঅর্ডার (Gaming Disorder) হিসেবে ICD-11-এ স্বীকৃতি দিয়েছে। এটি তখনই আসক্তি হিসেবে গণ্য হয় যখন গেম খেলা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, দৈনন্দিন জীবন, পড়াশোনা ও সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ব্যক্তি এর নেতিবাচক পরিণতি জেনেও খেলা চালিয়ে যায়।
বাংলাদেশ ও অঞ্চলে পরিস্থিতি
বাংলাদেশে মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর একটি বড় অংশ (বিটিআরসির পুরনো তথ্য অনুযায়ী প্রায় ৩৫%) এই বয়সী। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৬২.৭% শিক্ষার্থী সপ্তাহে ৩০ ঘণ্টার বেশি অনলাইন গেম খেলে। পুরুষ শিক্ষার্থীদের মধ্যে আসক্তির হার মেয়েদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। জনপ্রিয় গেমগুলোর মধ্যে Free Fire, PUBG/BGMI, Mobile Legends অন্যতম। সেমি-আরবান এলাকায়ও Free Fire-এর ব্যাপক জনপ্রিয়তা দেখা গেছে, যেখানে সহপাঠীদের চাপ, সামাজিক স্বীকৃতির চাহিদা ও কম হার্ডওয়্যারের প্রয়োজনীয়তা আসক্তির কারণ হয়।
মূল্যবোধের ওপর প্রভাব
অনলাইন গেম আসক্তি শুধু সময় নষ্ট বা পড়াশোনার ক্ষতি করে না—এটি শিক্ষার্থীদের মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও আচরণকেও প্রভাবিত করে। গবেষণাগুলো দেখায়:
· নৈতিক উপলব্ধি কমে যায়: ডিজিটাল আসক্তি ডিজিটাল পরিবেশে নৈতিক মূল্যবোধের উপলব্ধিকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। গেমের তীব্রতা বাড়লে শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ, সততা ও সহানুভূতি কমে যায়।
· আগ্রাসন ও সহিংসতা: অনেক গেমে সহিংসতা, প্রতিযোগিতা ও “জয়ের জন্য যেকোনো কিছু” মানসিকতা থাকে। এতে বাস্তব জীবনে রাগ, আক্রমণাত্মক আচরণ, সাইবার বুলিং বা অন্যদের প্রতি অসংবেদনশীলতা বাড়তে পারে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, গেম আসক্তি ইন্টারনেট নৈতিকতাকে কমিয়ে সাইবার বুলিংয়ের সম্ভাবনা বাড়ায়।
· সামাজিক ও ধর্মীয়/সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ: পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কমে যায়, একাকীত্ব বাড়ে। ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে (যেমন নামাজ, কোরআন তেলাওয়াত বা সামাজিক দায়িত্ব) অনীহা তৈরি হয়। কিছু গবেষণায় বলা হয়েছে, অতিরিক্ত গেমিং কিশোর-কিশোরীদের নৈতিক শিক্ষা (আখলাক) ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধকে দুর্বল করে।
· দায়িত্ববোধ ও সময়ের মূল্য: গেমের রিওয়ার্ড সিস্টেম (পয়েন্ট, লেভেল, সিজনাল র্যাঙ্ক) তাৎক্ষণিক সন্তুষ্টি দেয়, যার ফলে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য (পড়াশোনা, ক্যারিয়ার, পরিবার) গুরুত্ব হারায়। মিথ্যা বলা (পড়াশোনা শেষ করেছি বলে গেম খেলা), অভিভাবকের কথা না শোনা বা অর্থনৈতিক চাপ (ইন-অ্যাপ পারচেজ) বাড়তে পারে।
· ইতিবাচক দিক সীমিত: নিয়ন্ত্রিতভাবে খেললে সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, দলগত কাজ বা আত্মবিশ্বাস বাড়তে পারে। কিন্তু আসক্তি হলে এসব সুবিধা ম্লান হয়ে যায় এবং নেতিবাচক প্রভাবই প্রাধান্য পায়।
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, অনলাইন গেম খেলার তীব্রতা বাড়লে নৈতিক বিকাশের স্তর (নৈতিক জ্ঞান, আবেগ, ইচ্ছা ও আচরণ) কমে যায়। অন্য গবেষণায় ডিজিটাল আসক্তি ও ডিজিটাল পরিবেশে নৈতিক মূল্যবোধের মধ্যে নেতিবাচক সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
অন্যান্য ক্ষতিকর প্রভাব
· পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যাওয়া, CGPA কমে যাওয়া, ক্লাস ফাঁকি।
· ঘুমের ব্যাঘাত, মাথাব্যথা, চোখের সমস্যা, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা।
· মানসিক চাপ, উদ্বেগ, বিষণ্নতা, একাকীত্ব।
· পরিবারের সঙ্গে দ্বন্দ্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা।
প্রতিরোধ ও মোকাবিলার উপায়
· সময়সীমা নির্ধারণ: পরিবারে আলোচনা করে দৈনিক/সাপ্তাহিক গেম খেলার সময় ঠিক করা। হঠাৎ নিষেধ না করে ধীরে ধীরে কমানো ভালো।
· বিকল্প কার্যক্রম: খেলাধুলা, বই পড়া, শখের কাজ, পরিবারের সঙ্গে সময় বা ধর্মীয়/সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বাড়ানো।
· অভিভাবকদের ভূমিকা: খোলামেলা কথা বলা, নিয়মিত মনিটরিং (কিন্তু অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ নয়), নিজেরাও স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণ করা।
· স্কুল ও সমাজ: সচেতনতা কর্মসূচি, কাউন্সেলিং, সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা। প্রয়োজনে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া।
· স্ব-নিয়ন্ত্রণ: গেমের নোটিফিকেশন বন্ধ করা, নির্দিষ্ট সময়ে ডিভাইস রাখা, লক্ষ্য নির্ধারণ (যেমন পড়াশোনার পর গেম)।
গেম নিজে খারাপ নয়—অতিরিক্ত ও নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহারই সমস্যা। মূল্যবোধ গঠনের বয়সে (কিশোরকাল) এই আসক্তি দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই পরিবার, শিক্ষক ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগে সচেতনতা ও ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি।
আপনি যদি কোনো নির্দিষ্ট দিক (যেমন প্রতিরোধের উপায়, গবেষণার বিস্তারিত বা কোনো বিশেষ গেম) জানতে চান, আরও বিস্তারিত বলতে পারেন।
১৩
১৮ মন্তব্য