প্রধান শিক্ষক
১৪ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:০০ অপরাহ্ণ
বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সারের উপসর্গ।
বিভিন্ন ক্যান্সারের উপসর্গ: শরীরের সতর্ক সংকেতগুলো চিনুন
-----------------------------
ক্যান্সার একক কোনো রোগ নয়; এটি বিভিন্ন ধরনের রোগের একটি বৃহৎ গোষ্ঠী। শরীরের প্রায় যেকোনো অঙ্গ বা টিস্যুতে ক্যান্সার হতে পারে এবং ক্যান্সারের ধরন ও অবস্থান অনুযায়ী উপসর্গও ভিন্ন হয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো স্পষ্ট উপসর্গ নাও থাকতে পারে। আবার কিছু সাধারণ উপসর্গ অন্য অনেক রোগেও দেখা যায়। তাই কোনো একটি উপসর্গ দেখলেই ক্যান্সার হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়। তবে অস্বাভাবিক, দীর্ঘস্থায়ী বা ক্রমশ বাড়তে থাকা পরিবর্তনকে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
১. স্তন ক্যান্সার
সম্ভাব্য উপসর্গগুলো হলো—
স্তনে নতুন কোনো শক্ত বা অস্বাভাবিক চাকা অনুভূত হওয়া, বগলের নিচে চাকা বা ফুলে যাওয়া
স্তনের আকার বা আকৃতিতে পরিবর্তন, স্তনের ত্বক কুঁচকে যাওয়া বা কমলার খোসার মতো হয়ে স্তনবৃন্ত ভেতরের দিকে ঢুকে যাওয়া, স্তনবৃন্ত থেকে অস্বাভাবিক তরল বা রক্ত বের হওয়া, স্তন বা স্তনবৃন্তের ত্বকে দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন, লালভাব বা খসখসে ভাব
২. ফুসফুসের ক্যান্সার
সম্ভাব্য লক্ষণ—
দীর্ঘস্থায়ী বা ক্রমশ পরিবর্তিত কাশি
কাশির সঙ্গে রক্ত আসা
শ্বাসকষ্ট
বুকে ব্যথা
বারবার নিউমোনিয়া বা শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ
অকারণে ওজন কমে যাওয়া
দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা ও ক্লান্তি
দীর্ঘস্থায়ী কণ্ঠস্বর পরিবর্তন বা ভেঙে যাওয়া
৩. মুখ ও গলার ক্যান্সার
বিশেষ করে দীর্ঘদিনের তামাক, জর্দা, গুল বা অন্যান্য ক্ষতিকর পদার্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
সম্ভাব্য উপসর্গ—
মুখের ভেতর দীর্ঘদিনের ক্ষত, যা ভালো হচ্ছে না
মুখে সাদা বা লাল দাগ
মুখ বা জিহ্বায় অস্বাভাবিক চাকা
চিবাতে বা গিলতে অসুবিধা
দীর্ঘস্থায়ী গলা ব্যথা
কণ্ঠস্বর পরিবর্তন
মুখ খুলতে অসুবিধা
দাঁত নড়বড়ে হয়ে যাওয়া বা অকারণে পড়ে যাওয়া
ঘাড়ে অস্বাভাবিক চাকা।
৪. খাদ্যনালির ক্যান্সার
খাবার বা পানি গিলতে ক্রমবর্ধমান অসুবিধা
গিলতে গেলে ব্যথা
খাবার গলায় বা বুকে আটকে থাকার অনুভূতি
অকারণে ওজন কমে যাওয়া
বুকজ্বালা বা বদহজমের দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন
বমি
রক্তপাতের কারণে কালো পায়খানা বা রক্তবমি হতে পারে
৫. পাকস্থলীর ক্যান্সার
দীর্ঘস্থায়ী বদহজম বা পেটের অস্বস্তি
অল্প খাবারেই পেট ভরে যাওয়ার অনুভূতি
ক্ষুধামন্দা
বমি বমি ভাব বা বমি
পেটে ব্যথা
অকারণে ওজন কমে যাওয়া
দুর্বলতা বা রক্তস্বল্পতা
কখনো বমি বা পায়খানায় রক্ত
৬. কোলন ও রেকটাল ক্যান্সার
পায়খানার অভ্যাসে নতুন ও স্থায়ী পরিবর্তন
দীর্ঘদিন কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়া
পায়খানা সরু হয়ে যাওয়া
পায়খানার সঙ্গে রক্ত
পায়খানা করার পরও পুরোপুরি পরিষ্কার হয়নি এমন অনুভূতি
পেটে ব্যথা, অস্বস্তি বা ফাঁপা ভাব
অকারণে ওজন কমে যাওয়া
দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা বা রক্তস্বল্পতা
৭. লিভার ক্যান্সার
পেটের ডানদিকে ওপরের অংশে ব্যথা বা অস্বস্তি
পেট ফুলে যাওয়া
অকারণে ওজন কমে যাওয়া
ক্ষুধামন্দা
বমি বমি ভাব
চোখ ও ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া বা জন্ডিস
প্রস্রাব গাঢ় হয়ে যাওয়া
অস্বাভাবিক দুর্বলতা
সহজে শরীরে পানি জমা বা পা ফুলে যাওয়া
৮. অগ্ন্যাশয়ের (Pancreas) ক্যান্সার
পেটের ওপরের অংশে ব্যথা, যা পিঠেও ছড়াতে পারে
জন্ডিস
অকারণে ওজন কমে যাওয়া
ক্ষুধামন্দা
হজমের সমস্যা
বমি বমি ভাব
পায়খানার ধরনে পরিবর্তন
৯. জরায়ুমুখের (Cervical) ক্যান্সার
প্রাথমিক পর্যায়ে উপসর্গ নাও থাকতে পারে। পরবর্তীতে—
যৌনমিলনের পর অস্বাভাবিক রক্তপাত
মাসিকের মধ্যবর্তী সময়ে রক্তপাত
মেনোপজের পর রক্তপাত
স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বা দীর্ঘস্থায়ী মাসিক
অস্বাভাবিক বা দুর্গন্ধযুক্ত যোনিপথের স্রাব
তলপেটে বা পেলভিসে ব্যথা
যৌনমিলনের সময় ব্যথা
১০. জরায়ুর (Endometrial/Uterine) ক্যান্সার
মেনোপজের পর যেকোনো যোনিপথের রক্তপাত
মাসিকের সময় অতিরিক্ত বা অস্বাভাবিক রক্তপাত
মাসিকের মধ্যবর্তী সময়ে রক্তপাত
অস্বাভাবিক যোনিপথের স্রাব
পেলভিক ব্যথা বা চাপ অনুভূত হওয়া
মেনোপজের পর রক্তপাতকে কখনো স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়।
১১. ডিম্বাশয়ের ক্যান্সার
পেট ফাঁপা বা দীর্ঘস্থায়ী bloating
তলপেট বা পেলভিসে ব্যথা
অল্প খাবারেই পেট ভরে যাওয়ার অনুভূতি
ক্ষুধার পরিবর্তন
বারবার বা জরুরি প্রস্রাবের অনুভূতি
কোষ্ঠকাঠিন্য
অকারণে ওজন কমে যাওয়া বা বেড়ে যাওয়া
দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি
১২. প্রোস্টেট ক্যান্সার
প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় কোনো উপসর্গ থাকে না। পরবর্তী পর্যায়ে—
প্রস্রাব শুরু করতে অসুবিধা
প্রস্রাবের ধারা দুর্বল বা থেমে থেমে হওয়া
বারবার প্রস্রাবের প্রয়োজন হওয়া, বিশেষ করে রাতে
প্রস্রাবের সময় ব্যথা বা জ্বালা
প্রস্রাব বা বীর্যে রক্ত
মূত্রথলি পুরোপুরি খালি হয়নি এমন অনুভূতি
অগ্রসর পর্যায়ে কোমর, নিতম্ব বা হাড়ে ব্যথা
১৩. কিডনি ক্যান্সার
প্রস্রাবে রক্ত
কোমর বা পাশের অংশে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা
পেটে বা কোমরের পাশে চাকা অনুভূত হওয়া
অকারণে ওজন কমে যাওয়া
ক্ষুধামন্দা
দীর্ঘস্থায়ী জ্বর
অতিরিক্ত ক্লান্তি
রক্তস্বল্পতা
১৪. মূত্রথলির ক্যান্সার
প্রস্রাবে রক্ত—অনেক সময় ব্যথা ছাড়াই
বারবার প্রস্রাবের বেগ
প্রস্রাবের সময় জ্বালা বা ব্যথা
প্রস্রাবের প্রবাহে পরিবর্তন
বারবার মূত্রনালির সংক্রমণের মতো উপসর্গ
১৫. লিউকেমিয়া
লিউকেমিয়া রক্ত ও অস্থিমজ্জার ক্যান্সার। সম্ভাব্য লক্ষণ—
অস্বাভাবিক দুর্বলতা ও ক্লান্তি
বারবার সংক্রমণ
দীর্ঘস্থায়ী বা বারবার জ্বর
সহজে নীল দাগ পড়া
নাক বা মাড়ি থেকে রক্তপাত
ত্বকে ছোট ছোট লাল/বেগুনি দাগ
ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া
হাড় বা জয়েন্টে ব্যথা
লিম্ফ নোড ফুলে যাওয়া
অকারণে ওজন কমে যাওয়া
১৬. লিম্ফোমা
ঘাড়, বগল বা কুঁচকিতে সাধারণত ব্যথাহীন লিম্ফ নোড ফুলে যাওয়া
দীর্ঘস্থায়ী জ্বর
রাতে অতিরিক্ত ঘাম
অকারণে ওজন কমে যাওয়া
দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি
শরীরে চুলকানি
বারবার সংক্রমণ
বুকের লিম্ফ নোড আক্রান্ত হলে কাশি বা শ্বাসকষ্ট হতে পারে
১৭. মস্তিষ্কের টিউমার/ক্যান্সার
সব মস্তিষ্কের টিউমার ক্যান্সার নয়। সম্ভাব্য উপসর্গ—
নতুন ধরনের বা ক্রমশ বাড়তে থাকা মাথাব্যথা
বমি বমি ভাব বা বমি
খিঁচুনি
দৃষ্টিশক্তির পরিবর্তন
কথা বলতে বা বুঝতে সমস্যা
স্মৃতি বা আচরণে পরিবর্তন
শরীরের কোনো অংশ দুর্বল বা অবশ হয়ে যাওয়া
হাঁটা বা ভারসাম্য রক্ষায় সমস্যা
অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব বা চেতনার পরিবর্তন
১৮. ত্বকের ক্যান্সার
ত্বকে নতুন কোনো অস্বাভাবিক দাগ, চাকা বা ক্ষত দেখা দিলে এবং সেটি পরিবর্তিত হলে সতর্ক হওয়া উচিত।
বিশেষ করে তিল বা দাগের ক্ষেত্রে ABCDE লক্ষণগুলো মনে রাখা যায়—
A — Asymmetry: দুই অর্ধেক দেখতে একরকম নয়
B — Border: কিনারা অনিয়মিত বা অস্পষ্ট
C — Color: রঙে অস্বাভাবিক বৈচিত্র্য
D — Diameter: আকার তুলনামূলক বড় বা ক্রমশ বাড়ছে
E — Evolving: সময়ের সঙ্গে আকার, রঙ বা আকৃতির পরিবর্তন
এ ছাড়া এমন ক্ষত যা বারবার রক্তপাত করে, খোসা পড়ে বা দীর্ঘদিনেও ভালো হয় না—সেটিও চিকিৎসকের কাছে দেখানো উচিত।
১৯. হাড়ের ক্যান্সার
নির্দিষ্ট কোনো হাড়ে দীর্ঘস্থায়ী বা ক্রমশ বাড়তে থাকা ব্যথা
রাতে ব্যথা বেশি হওয়া
আক্রান্ত স্থানে ফোলা বা চাকা
হাড় দুর্বল হয়ে সহজে ভেঙে যাওয়া
চলাফেরায় অসুবিধা
-----------
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি?
নিচের যেকোনো পরিবর্তন দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে, বারবার হলে অথবা ক্রমশ বাড়তে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত—
অকারণে ওজন কমে যাওয়া, অস্বাভাবিক রক্তপাত, শরীরে নতুন চাকা, দীর্ঘস্থায়ী কাশি বা কণ্ঠস্বর পরিবর্তন, পায়খানা বা প্রস্রাবের অভ্যাসে স্থায়ী পরিবর্তন, দীর্ঘদিনের ক্ষত না শুকানো, গিলতে সমস্যা, দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, অস্বাভাবিক ক্লান্তি কিংবা ত্বকের কোনো দাগের পরিবর্তন।
---------
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা
ক্যান্সারের উপসর্গ মানেই ক্যান্সার নয়; আবার উপসর্গ না থাকলেও কিছু ক্যান্সার থাকতে পারে। তাই কোনো লক্ষণকে আতঙ্কের কারণ হিসেবে না দেখে বরং শরীরের অস্বাভাবিক ও স্থায়ী পরিবর্তনের প্রতি সচেতন হওয়াই গুরুত্বপূর্ণ। বয়স, লিঙ্গ, পারিবারিক ইতিহাস, জীবনযাপন ও ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে প্রয়োজনীয় screening (স্ক্রিনিং) করাও ক্যান্সার শনাক্তকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণ অনেক ক্যান্সারের চিকিৎসার সুযোগ ও ফলাফল উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করতে পারে।
৬৪
১০০ মন্তব্য