সহকারী শিক্ষক
১৪ আগস্ট, ২০২৬ ১০:৫২ অপরাহ্ণ
ছোট্ট আয়ানের বড় মন (শিশুতোষ গল্প)
শিশুতোষ গল্প (গ্রেড-৩)
ছোট্ট আয়ানের বড় মন
খলিশাটোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র আয়ান। চেহারা তো নয়, যেন ইরান বোস্তানের পরী রাজকুমার। হাসিখুশি আর মিশুক স্বভাব ছেলেটিকে করেছে সবার থেকে আলাদা। সবকিছু ছাপিয়ে আলাদা করে ছেলেটিকে পরিচয় করিয়ে দিতে চাইলে যেটি বলতেই হয়— আয়ানের মন আকাশের মতো বিশাল এবং সাগরের মতো উদার।
কোনো এক গ্রীষ্মের দুপুরে টিফিনের সময় আয়ান লক্ষ্য করল, তার সহপাঠী বিক্রম শুধু পানি খাচ্ছে। এই ব্যাপারটি তার হৃদয়কে নাড়া দিল। সে কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল—
— “বন্ধু, তুমি শুধু পানি খাচ্ছ কেন? তোমার টিফিন কোথায়?”
— “সত্যি বলতে, আম্মু আজ টিফিন দেননি।”
আয়ান ভাবল, হয়তো তার মা অসুস্থ, তাই আজ টিফিন দিতে পারেননি।
বিক্রম চুপ করে রইল। কিছুক্ষণ পর পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার কথা জানালো।
আয়ান ব্যথিত হলো। সে বিক্রমকে তার টিফিন খাওয়ার প্রস্তাব দিল। যদিও প্রথমে বিক্রম খাওয়ার জন্য রাজি ছিল না, কিন্তু আয়ানের জোড়াজুড়িতে শেষে রাজি হলো। দুটো পরোটা আর একটু আলুভাজি ছিল তাদের টিফিন। যদিও খাবারটি ছিল সাধারণ, কিন্তু আয়ানের আন্তরিকতায় খাবারটি হয়ে উঠেছিল অসাধারণ। দুটি মনের বন্ধন তৈরিতে খাবারটি হয়ে উঠেছিল একটি সেতু।
খাওয়া শেষে বিক্রমের মুখে হাসি ফুটল। আয়ানের মনেও এক ধরনের আনন্দের শিহরণ তৈরি হলো। বিক্রম কৃতজ্ঞতা স্বরূপ আয়ানকে ধন্যবাদ দিলে, আয়ান বলল—
— “বন্ধু মানে No Thanks, No Sorry! আমি তো আছি, Don’t worry!”
স্কুল থেকে বাসায় ফেরার পথে আয়ানের মনে এলো এক চিন্তা— “আজ না হয় ভাগাভাগি করে খেলাম, কিন্তু বিক্রমের তো প্রতিদিন খাবার লাগবে!”
সে বাসায় গিয়ে সন্ধ্যায় মাকে জড়িয়ে ধরে বলল, “আম্মু, টিফিন সহপাঠী বন্ধুর সঙ্গে ভাগাভাগি করে খাওয়া কি ভালো কাজ?”
মা হাসলেন এবং বুঝতে পারলেন, আয়ান আজ তার টিফিন বন্ধুর সঙ্গে শেয়ার করেছে। আয়ানের মা নিজেকে গর্বিত অনুভব করলেন। আয়ানকে অনুপ্রাণিত করার জন্য তিনি বললেন—
— “আয়ান, তুমি কি জানো, পৃথিবীর বিখ্যাত ব্যক্তিরাও তোমার মতো কাজ করেছেন? বাংলার কিংবদন্তি নেতা নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, সত্যজিৎ রায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখ তাঁদের টিফিন সহপাঠীদের সঙ্গে ভাগ করে খেতেন। শুধু তাই নয়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও কাজী নজরুল ইসলাম অভাবী হওয়া সত্ত্বেও নিজেদের খাবার অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নিতেন।”
— “আম্মু, তুমি বলেছিলে, ‘ইসলামে সবচেয়ে উত্তম কাজ হলো খাওয়ানো। ক্ষুধার্তকে খাবার খাওয়ালে আল্লাহ খুশি হন।’”
মা মুচকি হাসলেন আর বললেন, “জীবনের সৌন্দর্য হলো, যখন আমরা একজন আরেকজনের পাশে থাকি।”
আয়ান বুঝতে পারল, তাকে কী করতে হবে! পরদিন সে টিফিনে নিজের জন্য অর্ধেক খাবার নিল আর বাকি অর্ধেক আলাদা একটা প্যাকেটে রাখল। স্কুলে গিয়ে চুপচাপ বিক্রমের ব্যাগে সেটা রেখে দিল।
এভাবেই কেটে গেল কিছু দিন। বিক্রম জানত না কে তার ব্যাগে খাবার রাখে। একদিন সে আবিষ্কার করল, এটা আয়ানের কাজ। বিক্রম কেঁদে দিল আর আয়ানকে জড়িয়ে ধরে বলল—
— “তুই তো আমার আসল বন্ধু!”
আয়ান ও বিক্রমের এমন ভালোবাসার সম্পর্ক দেখে অন্যরা সবাই হাততালি দেওয়া শুরু করল।
আয়ান সবাইকে অবাক করে দিয়ে বলল, “যতদিন আমরা অন্যের কষ্ট লাঘবের জন্য চেষ্টা করব, ততদিন আমরা সত্যিকারভাবে বাঁচব।”
আয়ানের কথাটি সকল সহপাঠীর ভালো লাগল। তাই ক্লাসের সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিল— “আজ থেকে আমাদের ক্লাসে কেউ অভুক্ত থাকবে না।”
আয়ান মনে মনে বলল, “দান পবিত্রতার আসবাব, আত্মশুদ্ধির মাধ্যম ও সৎকাজের বৃদ্ধিকারক।”
লেখকঃ মোঃ মানিক হোসেন,
সহকারী শিক্ষক, খলিশাটোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সদর, নোয়াখালী।
এম.এ (ইংরেজি) ; এম.এস.এস (রাষ্ট্রবিজ্ঞান) , ডিপি.এড , বি.এড
১
১ মন্তব্য