সহকারী অধ্যাপক
১৫ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:৫১ পূর্বাহ্ণ
সময়ের কসম - মোঃ মুজিবুর রহমান
সময়ের কসম
(সময়ের মূল্য, ঈমান, সৎকাজ, সত্য ও ধৈর্যের পথে সফল জীবনের আহ্বান)
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর।
সময় নদীর স্রোতের মতো বয়ে যায় নিরবধি,
ফিরে আসে না হারানো কোনো ক্ষণ;
যে সময়কে কাজে লাগায় ঈমান ও আমলে,
তার জীবনেই ফুটে ওঠে সফলতার ফুল।
ভূমিকা
সময় মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদগুলোর একটি। অর্থ হারালে তা পরিশ্রম করে আবার অর্জন করা যায়, স্বাস্থ্য নষ্ট হলে চিকিৎসা ও পরিচর্যার মাধ্যমে অনেক সময় তা ফিরে পাওয়া যায়; কিন্তু একবার যে সময় চলে যায়, তা কোনোভাবেই আর ফিরে আসে না। গতকাল আর আজ হয় না, অতীত আর বর্তমান হয় না। জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত আমাদের হাতে অর্পিত একেকটি আমানত। এই আমানত কীভাবে ব্যবহার করছি, তার ওপরই নির্ভর করে আমাদের দুনিয়ার জীবন, আত্মিক শান্তি এবং আখিরাতের সফলতা।
মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনের একটি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর তাৎপর্যপূর্ণ সূরা—সূরা আল-আসর-এ সময়ের কসম করে মানবজাতিকে সতর্ক করেছেন। আল্লাহ বলেন—
وَالْعَصْرِ إِنَّ الْإِنسَانَ لَفِي خُسْرٍ إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ
অর্থাৎ—
“সময়ের কসম! নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। তবে তারা নয়, যারা ঈমান আনে, সৎকাজ করে এবং পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দেয় ও পরস্পরকে ধৈর্যের উপদেশ দেয়।”
মাত্র কয়েকটি আয়াতের এই সূরার মধ্যে মানুষের মুক্তি ও সফলতার এক পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন নিহিত রয়েছে। এখানে চারটি বিষয়কে সফলতার ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে—ঈমান, সৎকাজ, সত্যের উপদেশ এবং ধৈর্যের উপদেশ। অর্থাৎ শুধু ঈমানের দাবি যথেষ্ট নয়; ঈমানকে সৎকাজে প্রকাশ করতে হবে, সত্যকে ধারণ করতে হবে এবং সত্য ও ন্যায়ের পথে চলতে গিয়ে ধৈর্য ধারণ করতে হবে।
সময়—আল্লাহর দেওয়া অমূল্য আমানত
সময়কে আমরা দেখতে পাই না, হাতে ধরে রাখতে পারি না; কিন্তু সময়ের প্রবাহে মানুষের জীবন প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়। সকাল আসে, দুপুর পেরিয়ে বিকেল নামে; সূর্য অস্ত যায়, রাত আসে; আবার নতুন সকাল হয়। এভাবেই দিন থেকে সপ্তাহ, সপ্তাহ থেকে মাস, মাস থেকে বছর—আর বছর থেকে জীবনের একটি বড় অংশ অজান্তেই চলে যায়।
একটি শিশু মায়ের কোলে হাসতে হাসতে বড় হয়। একসময় সে বিদ্যালয়ে যায়, কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে প্রবেশ করে। তারপর কর্মজীবন, সংসার, সন্তান, দায়িত্ব—সবকিছুর মধ্য দিয়ে একদিন বার্ধক্য এসে দরজায় কড়া নাড়ে। তখন মানুষ পেছনে তাকিয়ে দেখে—জীবনের কত সময় যে চলে গেছে!
তাই সময়কে অবহেলা করা মানে নিজের জীবনকে অবহেলা করা। সময়ের অপচয় মূলত জীবনেরই অপচয়।
ঘড়ির কাঁটা কখনো বলে না—“আমি তোমার জন্য একটু থামছি।” সূর্যও কারও জন্য উদয় বা অস্ত হওয়া বন্ধ করে না। সময় কারও ধনসম্পদ দেখে থামে না, ক্ষমতা দেখে থামে না, পদমর্যাদা দেখে থামে না। রাজা ও প্রজা, ধনী ও দরিদ্র, শিক্ষিত ও অশিক্ষিত—সবার জীবনেই সময় সমানভাবে প্রবাহিত হয়।
কেন আল্লাহ সময়ের কসম করলেন?
কসম একটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে মানুষের সামনে তুলে ধরে। সূরা আল-আসরে আল্লাহ তাআলা সময়ের কসম করেছেন। এর মধ্যে সময়ের অপরিসীম গুরুত্বের প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে।
মানুষের জীবন আসলে সময়ের সমষ্টি। আমরা যখন বলি—“আমার বয়স এত বছর”—তখন মূলত আমরা আমাদের জীবনের অতিবাহিত সময়ের হিসাব দিই। মানুষের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত তার আমলনামায় কোনো না কোনোভাবে যুক্ত হচ্ছে।
আজকের একটি ঘণ্টা আগামীকাল আর পাওয়া যাবে না। আজকের একটি সুযোগ কাল নাও থাকতে পারে। আজ যে ব্যক্তি নামাজ পড়তে পারে, কাল তার সেই সুযোগ নাও থাকতে পারে। আজ যে মানুষ তওবা করতে পারে, কাল সে তওবার সুযোগ পাবে কি না, কেউ জানে না।
তাই বুদ্ধিমান মানুষ সময়কে শুধু কাটায় না; সময়কে কাজে লাগায়।
মানুষ কেন ক্ষতিগ্রস্ত?
আল্লাহ তাআলা বলেছেন—
“নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে।”
এই ঘোষণা অত্যন্ত গভীর ও সতর্কতামূলক। কারণ মানুষের জীবন যতই দীর্ঘ হোক, প্রতিটি মুহূর্ত অতিবাহিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার জীবনও কমে যাচ্ছে। মানুষ যদি এই সময়কে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে ব্যবহার না করে, তাহলে সে প্রকৃত অর্থেই ক্ষতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
কেউ সম্পদ অর্জন করতে গিয়ে জীবন পার করে দেয়, কিন্তু অন্তরের শান্তি অর্জন করতে পারে না। কেউ পদ-পদবি ও খ্যাতির পেছনে ছুটতে ছুটতে একদিন মৃত্যুর মুখোমুখি হয়। কেউ দুনিয়ার আনন্দে এতটাই মগ্ন হয়ে পড়ে যে আখিরাতের প্রস্তুতির কথা ভুলে যায়।
অট্টালিকা থাকতে পারে, ব্যাংকে অর্থ থাকতে পারে, সামাজিক মর্যাদা থাকতে পারে, মানুষের প্রশংসা থাকতে পারে—কিন্তু এগুলোর কোনোটিই মানুষের সঙ্গে কবরে যাবে না। মানুষের প্রকৃত সম্পদ হলো তার ঈমান ও নেক আমল।
ঈমান—সফলতার প্রথম শর্ত
সূরা আল-আসর আমাদের প্রথম শিক্ষা দেয়—ঈমান।
ঈমান হলো মানুষের জীবনের মূল আলো। ঈমান মানুষকে তার স্রষ্টাকে চিনতে শেখায়, জীবনের উদ্দেশ্য বুঝতে শেখায় এবং দুনিয়ার পরীক্ষার মধ্যেও সঠিক পথে অবিচল থাকতে সাহায্য করে।
ঈমানের অর্থ শুধু মুখে কিছু কথা বলা নয়; বরং অন্তরে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, তাঁর একত্ব স্বীকার, তাঁর রাসুলদের সত্য বলে মানা এবং তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন পরিচালনার চেষ্টা করা।
যার অন্তরে ঈমান রয়েছে, সে জানে—দুনিয়ার জীবন চূড়ান্ত গন্তব্য নয়। এখানে সুখ যেমন স্থায়ী নয়, তেমনি দুঃখও চিরস্থায়ী নয়। মানুষের প্রকৃত গন্তব্য আখিরাত।
তাই বিপদে পড়েও মুমিন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে না। সে দুঃখ পায়, কাঁদে, কষ্ট অনুভব করে; কিন্তু আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয় না। কারণ তার বিশ্বাস—আল্লাহ সবকিছু জানেন, সবকিছু দেখেন এবং তিনি বান্দার জন্য কল্যাণকর পথ খুলে দিতে সক্ষম।
সৎকাজ—ঈমানের বাস্তব প্রকাশ
ঈমানের পরই এসেছে সৎকাজ। এতে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে—শুধু বিশ্বাসের দাবি যথেষ্ট নয়; সেই বিশ্বাসের প্রভাব মানুষের কর্মে প্রকাশিত হতে হবে।
নামাজ আদায় করা, রোজা রাখা, কুরআন তিলাওয়াত করা, হালাল-হারাম মেনে চলা, মা-বাবার সেবা করা, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা, মানুষের হক আদায় করা, অসহায়কে সাহায্য করা, এতিমের প্রতি সদয় হওয়া, সত্য কথা বলা, আমানত রক্ষা করা—এসবই নেক আমলের অন্তর্ভুক্ত।
একটি সুন্দর কথা, একটি সহানুভূতিশীল আচরণ, একজন বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো—এসবও মানুষের জীবনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে মানুষের প্রতি জুলুম, প্রতারণা, মিথ্যা, গিবত, অহংকার, হিংসা, অন্যের অধিকার নষ্ট করা—এসব থেকে বেঁচে থাকাও নেক জীবনের অংশ।
সত্যের পথে অবিচল থাকা
সূরা আল-আসরের তৃতীয় শিক্ষা হলো—পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দেওয়া।
সত্য সবসময় সহজ নয়। কখনো সত্য বললে মানুষ অসন্তুষ্ট হতে পারে, কখনো নিজের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, কখনো সামাজিক চাপ আসতে পারে। তবুও একজন মুমিন সত্যকে ভালোবাসে এবং ন্যায় ও সত্যের পক্ষে থাকার চেষ্টা করে।
সত্য মানে শুধু মুখে মিথ্যা না বলা নয়। সত্য মানে কথা, কাজ, লেনদেন, দায়িত্ব, প্রতিশ্রুতি ও আচরণে সততা বজায় রাখা।
ব্যবসায় সত্য, শিক্ষায় সত্য, কর্মক্ষেত্রে সত্য, পরিবারে সত্য, বন্ধুত্বে সত্য—জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সত্যের প্রয়োজন।
সমাজে যখন মিথ্যা, প্রতারণা ও অন্যায় বৃদ্ধি পায়, তখন সত্যবাদী মানুষের দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। তবে সত্যের উপদেশ দিতে গিয়ে কাউকে অপমান, হেয় বা বিদ্বেষের শিকার করা ইসলাম সমর্থন করে না। সত্য বলতে হবে হিকমত, সুন্দর ভাষা ও উত্তম আচরণের সঙ্গে।
ধৈর্য—সফলতার অপরিহার্য শক্তি
সত্যের পথে চলা এবং সৎকাজ করা সবসময় সহজ নয়। তাই আল্লাহ তাআলা বলেছেন—পরস্পরকে ধৈর্যের উপদেশ দিতে।
জীবনে সুখ আছে, দুঃখও আছে; সাফল্য আছে, ব্যর্থতাও আছে; প্রাপ্তি আছে, বঞ্চনাও আছে। কখনো মানুষ আপনজনের আচরণে কষ্ট পায়, কখনো বন্ধুর অবহেলায় ব্যথিত হয়, কখনো অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে, কখনো স্বপ্ন পূরণে বাধা আসে। এসব পরিস্থিতিতে ধৈর্য মানুষকে ভেতর থেকে শক্ত করে।
ধৈর্য মানে অন্যায় মেনে নেওয়া নয়। ধৈর্য মানে অন্যায় প্রতিশোধের পথে না গিয়ে ন্যায়সংগত উপায়ে সমস্যার মোকাবিলা করা; বিপদে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা; আবেগের বশে ভুল সিদ্ধান্ত না নেওয়া; এবং কল্যাণের পথে অবিচল থাকা।
কুরআনে আল্লাহ তাআলা ধৈর্যশীলদের জন্য বিশেষ সুসংবাদ দিয়েছেন। তাই বিপদের সময় মুমিনের মুখে অভিযোগের পরিবর্তে দোয়া, হতাশার পরিবর্তে আশা এবং অস্থিরতার পরিবর্তে ধৈর্য থাকা উচিত।
দুঃখের আড়ালেও থাকে আল্লাহর রহমত
পৃথিবীতে এমন অনেক মানুষ আছে, যাদের মুখে হাসি থাকলেও হৃদয়ের ভেতর গভীর কষ্ট থাকে। কেউ আপনজন হারিয়েছে, কেউ বিশ্বাসভঙ্গের শিকার হয়েছে, কেউ অভাবের সঙ্গে লড়ছে, কেউ দীর্ঘ অপেক্ষায় ক্লান্ত, কেউ নিজের ব্যর্থতা নিয়ে কষ্ট পাচ্ছে।
মানুষের চোখে যা অদৃশ্য, আল্লাহর কাছে তা অদৃশ্য নয়।
রাতের নিঃশব্দ কান্না, মানুষের অগোচরে করা দোয়া, হৃদয়ের গোপন ব্যথা—সবই আল্লাহ জানেন। তাই একজন মুমিন বিপদে পড়ে মানুষের কাছ থেকে সাহায্য না পেলেও আল্লাহর দরজা থেকে ফিরে আসে না।
সে জানে—আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া মুমিনের পথ নয়।
তাহাজ্জুদের সিজদা ও মুমিনের হৃদয়
যখন পৃথিবী ঘুমিয়ে পড়ে, তখন কোনো কোনো মুমিন তার রবের সামনে দাঁড়ায়। গভীর রাতের নীরবতায় সে কুরআন তিলাওয়াত করে, নামাজ পড়ে, দোয়া করে। তার চোখের পানি হয়তো পৃথিবীর কেউ দেখে না; কিন্তু তার রব দেখেন।
তাহাজ্জুদের সিজদা মানুষকে মনে করিয়ে দেয়—দুনিয়ার সব দরজা বন্ধ হয়ে গেলেও আল্লাহর দরজা বন্ধ হয় না।
মুমিন তখন বলতে পারে—
“হে আমার রব! পৃথিবীর মানুষ আমাকে বুঝুক বা না বুঝুক, তুমি আমার অন্তরের অবস্থা জানো। আমি দুর্বল হলে আমাকে শক্তি দাও, বিপদে পড়লে আমাকে পথ দেখাও, ভুল করলে আমাকে ক্ষমা করো এবং তোমার সন্তুষ্টির পথে আমাকে অবিচল রাখো।”
দুনিয়ার মোহ—চিরস্থায়ী নয়
দুনিয়ার সম্পদ, সৌন্দর্য, ক্ষমতা, খ্যাতি, পদমর্যাদা—সবই সাময়িক। এগুলো আল্লাহর দেওয়া নিয়ামত; কিন্তু এগুলো মানুষের চূড়ান্ত পরিচয় নয়।
মানুষ কখনো সম্পদের মালিক হয়, আবার কখনো সম্পদ তার হাতছাড়া হয়ে যায়। কেউ আজ সম্মানিত, কাল হয়তো মানুষের স্মৃতি থেকেও হারিয়ে যায়। কেউ আজ শক্তিশালী, কাল অসুস্থতা বা বার্ধক্যে দুর্বল হয়ে পড়ে।
তাই দুনিয়া অর্জন করতে হবে, কিন্তু দুনিয়াকে হৃদয়ের একমাত্র লক্ষ্য বানানো যাবে না।
ইসলাম মানুষকে দুনিয়া ত্যাগ করতে বলে না; বরং দুনিয়াকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে শেখায়। হালাল উপার্জন করতে হবে, পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব পালন করতে হবে, জ্ঞান অর্জন করতে হবে, উন্নতি করতে হবে—কিন্তু সবকিছুর সঙ্গে আখিরাতের প্রস্তুতি রাখতে হবে।
যৌবন—সময়কে কাজে লাগানোর শ্রেষ্ঠ সুযোগ
যৌবন মানুষের জীবনের শক্তিশালী একটি সময়। এ সময় শরীর শক্তিশালী থাকে, শেখার ক্ষমতা থাকে, স্বপ্ন দেখার সাহস থাকে, কাজ করার সামর্থ্য থাকে।
কিন্তু এই সময়ই যদি পাপ, অলসতা, অশ্লীলতা, মাদক, অন্যায়, অনর্থক বিনোদন ও সময়ের অপচয়ে নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে পরে আফসোস করেও অনেক কিছু ফিরে পাওয়া যায় না।
তরুণদের উচিত—জ্ঞান অর্জন করা, নামাজের প্রতি যত্নশীল হওয়া, চরিত্র গঠন করা, বাবা-মাকে সম্মান করা, ভালো বন্ধু নির্বাচন করা, প্রযুক্তিকে উপকারী কাজে ব্যবহার করা এবং নিজের ভবিষ্যৎকে সুন্দরভাবে গড়ে তোলা।
মোবাইল ও প্রযুক্তি মানুষের জন্য উপকারী হতে পারে; আবার অপব্যবহারে সময়ের ভয়াবহ অপচয়ের কারণও হতে পারে। তাই প্রযুক্তি যেন আমাদের নিয়ন্ত্রণ না করে; বরং আমরা যেন প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে কল্যাণের কাজে ব্যবহার করি।
নামাজ—সময়কে শৃঙ্খলিত করার শিক্ষা
ইসলামের পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মানুষের জীবনে সময়ের শৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। ফজর দিনের শুরুতে মানুষকে আল্লাহর স্মরণে জাগায়। জোহর কর্মব্যস্ততার মধ্যে রবের কথা স্মরণ করায়। আসর দিনের শেষভাগে মানুষকে সতর্ক করে। মাগরিব দিনের সমাপ্তির কথা মনে করায়। এশা রাতের নীরবতায় আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর সুযোগ দেয়।
অর্থাৎ একজন মুমিনের দিন কেবল দুনিয়াবি কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তার দিনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে আল্লাহর স্মরণ জড়িয়ে থাকে।
আযানের ধ্বনি তাই শুধু নামাজের ডাক নয়—এটি সফলতার ডাক।
“হাইয়া আলাস সালাহ”—এসো নামাজের দিকে।
“হাইয়া আলাল ফালাহ”—এসো সফলতার দিকে।
যে মানুষ এই আহ্বান শুনে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, সে তার জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্যকে স্মরণ করে।
কবর—দুনিয়ার মোহ ভাঙার বাস্তব শিক্ষা
মানুষ যত বড়ই হোক, একদিন তাকে পৃথিবী ছেড়ে যেতে হবে। কবরের দরজায় কারও পদবি কাজে আসে না, সম্পদের অহংকার কাজে আসে না, বাহ্যিক পরিচয়ের গর্ব কাজে আসে না।
মানুষ একা আসে এবং একা চলে যায়। দুনিয়ায় তার রেখে যাওয়া সম্পদ অন্যরা ব্যবহার করবে; তার পদ অন্য কেউ গ্রহণ করবে; তার ঘর অন্যরা ব্যবহার করবে। কিন্তু তার আমলনামা তার সঙ্গে থাকবে।
তাই কবরের কথা স্মরণ করা মানে হতাশ হওয়া নয়; বরং জীবনকে সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্য সচেতন হওয়া।
মৃত্যুর স্মরণ মানুষকে অহংকার থেকে দূরে রাখে, অন্যায় থেকে বিরত রাখে এবং ভালো কাজের প্রতি উৎসাহিত করে।
আজকের কাজ—আগামীকালের ফল
জীবনকে একটি ক্ষেতের সঙ্গে তুলনা করা যায়। কৃষক যেমন বীজ বপন করে ভবিষ্যতে ফসল পাওয়ার আশায়, তেমনি মানুষ আজ যা করছে, তার ফল ভবিষ্যতে পাবে।
আজ একটি ভালো কাজ—আগামী দিনের জন্য সঞ্চয়।
আজ একটি ভুল থেকে ফিরে আসা—আগামী দিনের নিরাপত্তা।
আজ একটি তওবা—জীবনের নতুন সূচনা।
আজ একটি মানুষের উপকার—আখিরাতের জন্য মূল্যবান আমল।
তাই “একদিন করব”, “পরে নামাজ পড়ব”, “বৃদ্ধ হলে তওবা করব”—এমন চিন্তা বিপজ্জনক। কারণ ভবিষ্যৎ আমাদের হাতে নয়। আমাদের হাতে আছে আজকের দিন, এই মুহূর্ত।
তওবা—ফিরে আসার দরজা
মানুষ ভুল করবে—এটাই মানুষের স্বভাব। কিন্তু ভুলের পর ভুল আঁকড়ে ধরে থাকা মুমিনের পথ নয়। আল্লাহ তাআলা বান্দাকে তওবার মাধ্যমে তাঁর দিকে ফিরে আসার সুযোগ দিয়েছেন।
কেউ যত ভুলই করে থাকুক, আন্তরিকভাবে আল্লাহর দিকে ফিরে আসা উচিত। পাপ ছেড়ে দিতে হবে, অনুতপ্ত হতে হবে, পুনরায় সেই পাপে না ফেরার দৃঢ় সংকল্প করতে হবে এবং কারও অধিকার নষ্ট করে থাকলে তা যথাসম্ভব ফিরিয়ে দিতে হবে।
তওবা শুধু চোখের পানি নয়; তওবা হলো জীবনের মোড় পরিবর্তন করা।
মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্ব
ইসলাম শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতের শিক্ষা দেয় না; মানুষের অধিকারও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
মায়ের সেবা, বাবার প্রতি সম্মান, স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক দায়িত্ব, সন্তানদের সঠিক শিক্ষা, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা, প্রতিবেশীর অধিকার, এতিমের যত্ন, দরিদ্রের পাশে দাঁড়ানো, অসুস্থকে দেখতে যাওয়া, মানুষের সঙ্গে সুন্দর আচরণ—এসবই ইসলামী জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
একজন মানুষ অনেক নফল ইবাদত করেও যদি মানুষের অধিকার নষ্ট করে, অন্যায় করে, প্রতারণা করে বা জুলুম করে, তাহলে তার জীবন পূর্ণাঙ্গ নেক জীবনের আদর্শ হতে পারে না।
সুতরাং ঈমানের সৌন্দর্য মানুষের আচরণে ফুটে উঠতে হবে।
ক্ষমা—হৃদয়ের সৌন্দর্য
মানুষ আমাদের কষ্ট দিতে পারে। কেউ অন্যায় করতে পারে, কেউ ভুল বুঝতে পারে, কেউ আমাদের প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যর্থ হতে পারে। এসব কষ্টের মধ্যেও ক্ষমার মানসিকতা হৃদয়কে প্রশান্ত করে।
ক্ষমা মানে অন্যায়কে বৈধ ঘোষণা করা নয়। বরং ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা এবং ন্যায়সংগত পথে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা।
যে হৃদয় ক্ষমা করতে শেখে, সে হৃদয় হিংসা ও বিদ্বেষের ভার থেকে মুক্ত হতে পারে।
সময়ের অপচয়—নীরব ক্ষতি
সময়ের সবচেয়ে বড় শত্রু হলো অযথা সময় নষ্ট করা। দীর্ঘ সময় অনর্থক আলাপ, উদ্দেশ্যহীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার, অতিরিক্ত বিনোদন, অলসতা, গীবত, পরনিন্দা, অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক—এসব ধীরে ধীরে মানুষের জীবন থেকে মূল্যবান সময় কেড়ে নেয়।
সময়ের অপচয় প্রথমে ছোট মনে হয়। কিন্তু মিনিট জমে ঘণ্টা হয়, ঘণ্টা জমে দিন হয়, দিন জমে বছর হয়। একসময় মানুষ বুঝতে পারে—তার জীবনের একটি বড় অংশ এমন কাজে চলে গেছে, যার কোনো স্থায়ী উপকার নেই।
তাই প্রতিদিন নিজেকে প্রশ্ন করা দরকার—
আজ আমি কী শিখলাম?
কী ভালো কাজ করলাম?
কার উপকার করলাম?
কোন ভুল থেকে ফিরে এলাম?
আল্লাহর সঙ্গে আমার সম্পর্ক আজ কেমন হলো?
এই আত্মজিজ্ঞাসা মানুষকে সময়ের মূল্য বুঝতে সাহায্য করবে।
একজন সফল মানুষের দৈনন্দিন জীবন
সময়কে মূল্য দিতে হলে জীবনে শৃঙ্খলা প্রয়োজন। একজন মুমিনের দিন হতে পারে এমন—
ভোরে ঘুম থেকে উঠে ফজরের নামাজ আদায় করা, কুরআন তিলাওয়াত ও দোয়ার মাধ্যমে দিন শুরু করা; এরপর পড়াশোনা, কর্ম ও দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা; নির্ধারিত সময়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা; পরিবার ও মানুষের অধিকার রক্ষা করা; প্রয়োজনীয় বিশ্রাম নেওয়া; রাতে দিনের কাজের হিসাব করা এবং ভুলের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া।
এভাবে দিনগুলো সুন্দরভাবে গড়ে উঠলে জীবনও সুন্দর হয়ে ওঠে।
সময়ের চারটি মুক্তির পথ
সূরা আল-আসর আমাদের যেন একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন-মানচিত্র দিয়েছে। সেখানে চারটি বিষয়কে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে—
প্রথমত—ঈমান:
আল্লাহর প্রতি সঠিক বিশ্বাস ও তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন গড়ার চেষ্টা।
দ্বিতীয়ত—সৎকাজ:
ঈমানকে বাস্তব জীবনের ভালো কাজের মাধ্যমে প্রকাশ করা।
তৃতীয়ত—সত্যের উপদেশ:
নিজে সত্যের পথে থাকা এবং প্রজ্ঞা ও সুন্দর আচরণের মাধ্যমে অন্যকেও সত্যের পথে আহ্বান করা।
চতুর্থত—ধৈর্যের উপদেশ:
সত্য ও সৎকাজের পথে অবিচল থাকা এবং বিপদে একে অপরকে ধৈর্য ধারণে উৎসাহিত করা।
এই চারটি বিষয় ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজকে সুন্দর করে তুলতে পারে।
পরিবারে সময়ের সঠিক ব্যবহার
পরিবার মানুষের প্রথম বিদ্যালয়। সন্তানদের সঙ্গে কথা বলা, তাদের কথা শোনা, তাদের চরিত্র গঠনে সময় দেওয়া এবং ইসলামী মূল্যবোধ শেখানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অনেক সময় দেখা যায়, একই ঘরে বসেও পরিবারের সদস্যরা একে অপরের সঙ্গে কথা বলছে না; সবাই নিজ নিজ পর্দার জগতে ব্যস্ত। প্রযুক্তির ব্যবহার যেন সম্পর্কের উষ্ণতা নষ্ট না করে।
সন্তানের হাতে শুধু মোবাইল তুলে না দিয়ে তাকে সময় দিতে হবে; তার প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে, ভালো বই পড়তে উৎসাহিত করতে হবে, নামাজ ও নৈতিকতার শিক্ষা দিতে হবে।
কারণ সন্তানের জন্য বাবা-মায়ের দেওয়া সবচেয়ে বড় সম্পদ শুধু অর্থ নয়—সুন্দর চরিত্র, সঠিক শিক্ষা ও ঈমানি মূল্যবোধ।
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সময়ের দায়িত্ব
শিক্ষকের সময় শুধু তাঁর নিজের সম্পদ নয়; তাঁর সময়ের সঙ্গে অসংখ্য শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ জড়িয়ে থাকে। তাই শিক্ষককে দায়িত্বশীল, সময়নিষ্ঠ ও আদর্শবান হতে হবে।
অন্যদিকে শিক্ষার্থীদেরও সময়ের মূল্য বুঝতে হবে। পড়াশোনার সময় পড়াশোনা, ইবাদতের সময় ইবাদত, বিশ্রামের সময় বিশ্রাম এবং বিনোদনের সময় সীমিত ও শালীন বিনোদন—এই ভারসাম্য জীবনকে সুন্দর করে।
যে শিক্ষার্থী সময়কে সম্মান করতে শেখে, সে ভবিষ্যতে দায়িত্বশীল নাগরিক হওয়ার পথ তৈরি করে।
সমাজ গঠনে সময়ের মূল্য
একটি জাতির উন্নতি নির্ভর করে তার মানুষের সময়ের ব্যবহারের ওপর। যে জাতি সময়কে মূল্য দেয়, শিক্ষা ও গবেষণায় মনোযোগ দেয়, শ্রমকে সম্মান করে, শৃঙ্খলা বজায় রাখে এবং নৈতিকতাকে গুরুত্ব দেয়, সে জাতি এগিয়ে যায়।
অন্যদিকে অলসতা, দুর্নীতি, দায়িত্বহীনতা, সময়ক্ষেপণ ও অনিয়ম একটি সমাজের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে।
তাই সময়ের মূল্যবোধ শুধু ব্যক্তিগত শিক্ষা নয়; এটি জাতীয় উন্নয়নেরও গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
দুনিয়া ও আখিরাতের ভারসাম্য
ইসলাম দুনিয়ার বৈধ জীবনযাপনকে নিষিদ্ধ করেনি। বরং হালাল উপার্জন, পরিবার পালন, জ্ঞানচর্চা, সমাজসেবা ও মানুষের কল্যাণে কাজ করার উৎসাহ দিয়েছে। তবে দুনিয়ার ব্যস্ততা যেন মানুষকে আখিরাত থেকে গাফেল না করে—এটাই মূল শিক্ষা।
দুনিয়া হবে কর্মক্ষেত্র, আর আখিরাত হবে চূড়ান্ত ফলাফলের স্থান।
তাই আমাদের এমন জীবন চাই, যেখানে কর্ম আছে কিন্তু অহংকার নেই; সম্পদ আছে কিন্তু লোভ নেই; জ্ঞান আছে কিন্তু অহমিকা নেই; ক্ষমতা আছে কিন্তু জুলুম নেই; আনন্দ আছে কিন্তু আল্লাহকে ভুলে যাওয়া নেই।
শেষ সময়ের আগে জেগে ওঠা
মানুষ সাধারণত ভাবে—“আমার হাতে এখনও অনেক সময় আছে।” কিন্তু জীবন কখন শেষ হবে, তা কেউ জানে না। তাই কালকের ওপর সবকিছু ছেড়ে না দিয়ে আজ থেকেই শুরু করতে হবে।
আজ যদি নামাজে অবহেলা থাকে—আজই সংশোধন করি।
আজ যদি কারও হক নষ্ট করে থাকি—আজই তা ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করি।
আজ যদি কারও সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হয়ে থাকে—সুন্দরভাবে সমাধানের চেষ্টা করি।
আজ যদি কোনো পাপে জড়িয়ে থাকি—আল্লাহর কাছে তওবা করি।
আজ যদি সময় নষ্ট করে থাকি—আজ থেকেই সময়ের হিসাব শুরু করি।
কারণ জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন হতে পারে আজকের দিনটি।
একটি অঙ্গীকার
এসো, আমরা আজ অঙ্গীকার করি—
আমরা সময়কে অবহেলা করব না।
আমরা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের প্রতি যত্নশীল হব।
আমরা কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলব।
আমরা সত্য কথা বলব।
আমরা অন্যের অধিকার নষ্ট করব না।
আমরা বাবা-মাকে সম্মান করব।
আমরা শিক্ষক ও বয়োজ্যেষ্ঠদের মর্যাদা দেব।
আমরা ছোটদের স্নেহ করব।
আমরা অসহায়ের পাশে দাঁড়াব।
আমরা মিথ্যা, প্রতারণা ও অন্যায় থেকে দূরে থাকব।
আমরা হিংসা ও অহংকার পরিহার করব।
আমরা ভুল হলে তওবা করব।
আমরা বিপদে ধৈর্য ধরব।
আমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হব না।
আমরা প্রতিটি দিনের হিসাব রাখব।
আমরা দুনিয়ার দায়িত্ব পালন করব এবং আখিরাতের প্রস্তুতিও নেব।
উপসংহার
সময়ের কসম!
সময় চলে যাচ্ছে। আমাদের জীবনও ধীরে ধীরে শেষের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। যে সকালটি চলে গেল, তা আর ফিরে আসবে না। যে যৌবন পেরিয়ে গেল, তা আর ফিরে আসবে না। যে সুযোগ হারিয়ে গেল, তা হয়তো আর পাওয়া যাবে না।
তাই জীবনকে অর্থবহ করতে হবে। সম্পদ থাকবে, কিন্তু সম্পদের দাস হওয়া যাবে না। সম্মান থাকবে, কিন্তু অহংকার করা যাবে না। দুঃখ আসবে, কিন্তু হতাশ হওয়া যাবে না। বিপদ আসবে, কিন্তু আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া যাবে না।
সূরা আল-আসরের মহান শিক্ষা আমাদের সামনে স্পষ্ট—মানুষ সাধারণভাবে ক্ষতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে; কিন্তু যারা ঈমান আনে, সৎকাজ করে, সত্যের পথে আহ্বান করে এবং ধৈর্যের শিক্ষা দেয়, তারা এই ক্ষতি থেকে মুক্তির পথে থাকে।
জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত তাই মূল্যবান। আজকের সময়কে আগামী দিনের আফসোসে পরিণত না করে আজই তাকে নেক আমল, জ্ঞান, সত্য, সেবা ও আল্লাহর স্মরণে সাজাতে হবে।
একদিন পৃথিবীর ব্যস্ততা থেমে যাবে। বাজারের কোলাহল থেমে যাবে। পদ-পদবি, অর্থ-সম্পদ ও বাহ্যিক পরিচয়ের অধ্যায় শেষ হবে। তখন মানুষ নিজের জীবনের দিকে তাকাবে। সে বুঝবে—সময়ই ছিল তার মূলধন; কিন্তু সেই মূলধন সে কীভাবে ব্যয় করেছে, সেটিই ছিল আসল পরীক্ষা।
হে মানুষ, তাই সময়কে সম্মান করো।
আজকের মুহূর্তকে অবহেলা করো না।
আল্লাহর দিকে ফিরে এসো।
ঈমানকে হৃদয়ের আলো বানাও।
সৎকাজকে জীবনের সঙ্গী করো।
সত্যকে আঁকড়ে ধরো।
ধৈর্যকে শক্তি বানাও।
মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করো।
সময়ের কসম—জীবন ক্ষণিক।
সময়ের কসম—সুযোগ সীমিত।
সময়ের কসম—ফিরে আসবে না অতীত।
সময়ের কসম—সফল সেই মানুষ,
যে তার সময়কে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে ব্যয় করে।
প্রার্থনা
হে মহান আল্লাহ!
আমাদের সময়ের মূল্য বোঝার তাওফিক দাও।
অলসতা ও সময়ের অপচয় থেকে আমাদের রক্ষা করো।
আমাদের অন্তরে খাঁটি ঈমান দাও।
আমাদের আমলকে কবুলযোগ্য করো।
আমাদের সত্যের পথে অবিচল রাখো।
বিপদে ধৈর্য ধারণের শক্তি দাও।
আমাদের ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করো।
মা-বাবা, পরিবার, শিক্ষক, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও সমগ্র মানবসমাজের হক আদায় করার তাওফিক দাও।
আমাদের হৃদয় থেকে অহংকার, হিংসা, বিদ্বেষ ও অন্যায় দূর করে দাও।
জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে তোমার সন্তুষ্টির কাজে ব্যয় করার তাওফিক দাও।
আমাদের দুনিয়ার জীবনকে কল্যাণময় করো এবং আখিরাতে তোমার রহমত ও সন্তুষ্টি দান করো।
আমিন, ইয়া রব্বাল আলামিন।
৭
৬ মন্তব্য