Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৫ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:৫৮ পূর্বাহ্ণ

লম্বা জীবনের পাথেয় -মোঃ মুজিবুর রহমান

লম্বা জীবনের পাথেয়

মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর

ভূমিকা

মানুষের জীবন একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দেওয়া মহান আল্লাহর আমানত। জন্মের মাধ্যমে পৃথিবীর জীবনে আমাদের আগমন, আর মৃত্যুর মাধ্যমে দুনিয়ার জীবন থেকে বিদায়। পৃথিবীর জীবন যত দীর্ঘই মনে হোক, বাস্তবে তা অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী। মানুষ শৈশব পেরিয়ে কৈশোরে, যৌবনে, বার্ধক্যে পৌঁছে যায়; তারপর একদিন তাকে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হয়। কেউ ধনী, কেউ দরিদ্র; কেউ ক্ষমতাবান, কেউ সাধারণ; কেউ প্রাসাদে বাস করে, কেউ ছোট ঘরেকিন্তু মৃত্যুর সামনে সবাই সমান।

মহান আল্লাহ বলেন, “প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।সূরা আলে ইমরান, :১৮৫

এই আয়াত মানুষের জন্য এক গভীর সত্যের স্মারক। মৃত্যু কোনো কল্পকাহিনি নয়, কোনো দূরবর্তী ঘটনা নয়; এটি প্রত্যেক মানুষের অবধারিত পরিণতি। তাই জীবনের প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা হলোমৃত্যুকে ভয় করে জীবন থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়; বরং মৃত্যুকে স্মরণ করে জীবনকে সঠিক পথে পরিচালিত করা।

মানুষ দুনিয়ায় ঘর বানায়, সম্পদ অর্জন করে, শিক্ষা গ্রহণ করে, ব্যবসা করে, পদ-পদবি লাভ করে, সন্তান-সন্ততি গড়ে তোলে এবং ভবিষ্যতের জন্য নানা পরিকল্পনা করে। এসব প্রয়োজনীয় হতে পারে; কিন্তু একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় প্রস্তুতি হওয়া উচিত মৃত্যুর পরের জীবনের জন্য। কারণ দুনিয়ার জীবন শেষ হলেও মানুষের যাত্রা শেষ হয় না। মৃত্যুর পর শুরু হয় বারযাখের জীবন, এরপর পুনরুত্থান, হাশর, হিসাব-নিকাশ, মীযান, সিরাত এবং শেষ পর্যন্ত জান্নাত অথবা জাহান্নামের চিরস্থায়ী পরিণতি।

দুনিয়া চিরস্থায়ী নয়

মানুষের সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি হলোদুনিয়াকে স্থায়ী ঠিকানা মনে করা। অথচ পৃথিবীর কোনো কিছুই স্থায়ী নয়। আজ যে বাড়ি আমাদের, কাল তা অন্যের। আজ যে সম্পদ আমরা গুনছি, কাল তা উত্তরাধিকারীদের হাতে চলে যাবে। আজ যে পদ-পদবি নিয়ে গর্ব করছি, কাল সেখানে অন্য কেউ দায়িত্ব পালন করবে।

মহান আল্লাহ বলেন, “প্রত্যেকেই তার ওপর যা আছে, তা নশ্বর; আর অবশিষ্ট থাকবে তোমার প্রতিপালকের মহিমান্বিত সম্মানিত সত্তা।সূরা আর-রহমান, ৫৫:২৬২৭

অতএব দুনিয়ার সৌন্দর্য, সম্পদ, ক্ষমতা খ্যাতি যত আকর্ষণীয়ই হোক, এগুলোকে জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য বানানো উচিত নয়। এগুলো মানুষের প্রয়োজন পূরণে সহায়ক হতে পারে, কিন্তু মুক্তির নিশ্চয়তা দিতে পারে না।

অহংকারের পরিণতি

অহংকার মানুষকে সত্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। অর্থ, জ্ঞান, সৌন্দর্য, ক্ষমতা, পদ-পদবি কিংবা সামাজিক মর্যাদাযে কোনো বিষয় নিয়ে মানুষ অহংকার করতে পারে। কিন্তু মৃত্যুর পর এসব পরিচয়ের কোনো মূল্য থাকে না।

আজ যে মানুষ নিজের শক্তি নিয়ে গর্ব করে, একদিন সে অন্যের কাঁধে ভর করে শেষ যাত্রায় যাবে। আজ যে হাত দিয়ে অট্টালিকা নির্মাণ করে, একদিন সেই হাতই কর্মহীন হয়ে যাবে। আজ যে কণ্ঠে নিজের শ্রেষ্ঠত্বের কথা উচ্চারিত হয়, একদিন সেই কণ্ঠ নীরব হয়ে যাবে।

কবর মানুষকে একটি গভীর শিক্ষা দেয়দুনিয়ার মর্যাদা সাময়িক, কিন্তু আমলের মর্যাদা আখিরাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

তাই ইসলামের শিক্ষা হলো বিনয়ী হওয়া। নিজের যোগ্যতার জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা এবং অন্য মানুষকে তুচ্ছ না করা। মহান আল্লাহ অহংকারীদের পছন্দ করেন না।

মৃত্যুর অনিবার্যতা

মৃত্যু বয়স দেখে আসে না। কেউ দীর্ঘ জীবন পায়, কেউ অল্প বয়সেই পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়। কেউ সুস্থ অবস্থায় থাকে, আবার হঠাৎ তার জীবনের সময় শেষ হয়ে যায়। তাই আরও পরে ভালো হয়ে যাব, “বৃদ্ধ হলে ইবাদত করব, “সময় পেলে তওবা করব”—এমন চিন্তা একজন মুমিনের জন্য নিরাপদ নয়।

মৃত্যু আসার পর ফিরে এসে নতুন করে আমল করার সুযোগ থাকবে না। তখন মানুষ নিজের ভুল বুঝতে পারলেও সময় ফিরে পাবে না।

আল্লাহ বলেন, “যখন তাদের কারও কাছে মৃত্যু আসে, তখন সে বলে, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে আবার ফেরত পাঠান, যাতে আমি সৎকাজ করতে পারি।’”সূরা আল-মুমিনূন, ২৩:৯৯১০০

এই আয়াত আমাদের সতর্ক করে দেয়তওবা সৎকাজের সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হলো এখন

কবর: নতুন জীবনের প্রথম ধাপ

দুনিয়ার জীবন শেষ হওয়ার পর মানুষের জন্য কবরের জীবন শুরু হয়। কবর হলো বারযাখের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। এটি নিছক মাটির গর্ত নয়; বরং দুনিয়ার জীবন কিয়ামতের মধ্যবর্তী এক বাস্তব জগতের সূচনা।

মানুষ কবরের মধ্যে একা প্রবেশ করে। তার সঙ্গে যায় না বাড়ি, গাড়ি, ব্যাংকের অর্থ, ব্যবসা, পদ-পদবি কিংবা সামাজিক পরিচিতির বাহ্যিক জৌলুশ। সঙ্গে থাকে তার ঈমান আমল।

রাসুলুল্লাহ বলেছেন, “মৃত ব্যক্তির সঙ্গে তিনটি জিনিস যায়তার পরিবার, তার সম্পদ এবং তার আমল। দুটি ফিরে আসে এবং একটি তার সঙ্গে থেকে যায়; তার পরিবার সম্পদ ফিরে আসে, আর তার আমল তার সঙ্গে থেকে যায়।সহিহ বুখারি সহিহ মুসলিম

এই হাদিস মানুষের জীবনের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে দেয়। পরিবার সম্পদ গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু মৃত্যুর পরে মানুষের সঙ্গে থাকে তার আমল।

কবরের জন্য কী পাথেয়?

দীর্ঘ জীবনের প্রকৃত পাথেয় হলো এমন আমল, যা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য। শুধু বেশি আমল করলেই হবে না; আমল হতে হবে ঈমান, ইখলাস সুন্নাহসম্মত পদ্ধতির ওপর প্রতিষ্ঠিত।

. বিশুদ্ধ ঈমান

ঈমান হলো মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ। আল্লাহর একত্বে বিশ্বাস, তাঁর রাসুলদের প্রতি বিশ্বাস, আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস এবং ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসগুলো অন্তরে দৃঢ়ভাবে ধারণ করা একজন মুমিনের প্রথম দায়িত্ব।

. সালাত

সালাত মুমিনের জীবনের অন্যতম প্রধান ইবাদত। সালাত মানুষকে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করতে সাহায্য করে এবং অন্যায় থেকে দূরে থাকার শিক্ষা দেয়।

তাই সালাতকে বোঝা নয়, বরং রবের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।

. কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক

আল-কুরআন মানুষের জন্য হিদায়াতের গ্রন্থ। কুরআন শুধু তিলাওয়াতের জন্য নয়; এর শিক্ষা বোঝা, চিন্তা করা এবং জীবনে বাস্তবায়ন করাও জরুরি।

যে ঘরে কুরআনের শিক্ষা থাকে, সে ঘরে নৈতিকতা, সত্যবাদিতা, দয়া, ন্যায় তাকওয়ার পরিবেশ গড়ে উঠতে পারে।

. তওবা ইস্তিগফার

মানুষ ভুল করবেএটাই মানবিক বাস্তবতা। কিন্তু ভুলের পর আল্লাহর দিকে ফিরে আসাই মুমিনের বৈশিষ্ট্য। আন্তরিক তওবার মাধ্যমে মানুষ নিজের জীবন পরিবর্তন করতে পারে।

মহান আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করে দেন।সূরা আয-যুমার, ৩৯:৫৩

তাই কোনো গুনাহকে হালকা মনে করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়াও ঠিক নয়।

. হালাল উপার্জন

হালাল উপার্জন একজন মুমিনের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ পাথেয়। হারাম সম্পদ যত বেশি হোক, তা মানুষের প্রকৃত কল্যাণ বয়ে আনে না। বরং হালাল পবিত্র উপার্জন জীবনে বরকত আনে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে সহায়ক হয়।

. মানুষের হক আদায়

ইবাদতের পাশাপাশি মানুষের অধিকার রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারও সম্পদ আত্মসাৎ করা, প্রতারণা করা, অন্যায়ভাবে কষ্ট দেওয়া, অপবাদ দেওয়া, আমানতের খেয়ানত করাএসব থেকে বেঁচে থাকা জরুরি।

কোনো মানুষের হক নষ্ট করলে শুধু মুখে ক্ষমা চাওয়াই যথেষ্ট নয়; সম্ভব হলে তার অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে এবং আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাইতে হবে।

. সদকা কল্যাণকর কাজ

মানুষের উপকার করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। ক্ষুধার্তকে খাবার দেওয়া, অসহায়কে সাহায্য করা, জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়া, পথিককে সহযোগিতা করা, বিপদগ্রস্তের পাশে দাঁড়ানোএসব নেক কাজ মানুষের জীবনে কল্যাণ বয়ে আনে।

রাসুলুল্লাহ সদকায়ে জারিয়ার গুরুত্ব শিক্ষা দিয়েছেন। এমন কল্যাণকর কাজ করা উচিত, যার উপকার মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিন অব্যাহত থাকে।

. উপকারী জ্ঞান

মানুষ মৃত্যুবরণ করলেও তার রেখে যাওয়া উপকারী জ্ঞান মানুষের কাজে লাগতে পারে। একজন শিক্ষক যখন শিক্ষার্থীর মধ্যে জ্ঞান, নৈতিকতা সত্যের শিক্ষা ছড়িয়ে দেন, তখন তার কর্মের প্রভাব তার জীবনের পরেও অব্যাহত থাকতে পারে।

তাই জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি জ্ঞানকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করা উচিত।

. নেক সন্তান গড়ে তোলা

সন্তান শুধু পরিবারের আনন্দ নয়; সে একটি আমানত। সন্তানকে ঈমান, নৈতিকতা, শিষ্টাচার, দায়িত্ববোধ মানবিকতার শিক্ষা দেওয়া বাবা-মায়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

সৎ সন্তান তার বাবা-মায়ের জন্য দোয়া করলে তা তাদের জন্য কল্যাণের কারণ হতে পারে। তাই সন্তানের ভবিষ্য বলতে শুধু চাকরি বা অর্থনৈতিক সাফল্য বোঝা উচিত নয়; তার ঈমান চরিত্র গঠনও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

মৃত্যুর পর কী থাকবে?

একদিন মানুষ মারা যাবে। তার ব্যাংক হিসাব থাকবে, কিন্তু সে নিজে থাকবে না। বাড়ি থাকবে, কিন্তু সে থাকবে না। জমি থাকবে, ব্যবসা থাকবে, আসবাব থাকবে, স্মৃতি থাকবেকিন্তু সে পৃথিবীর জীবন থেকে বিদায় নেবে।

তার জন্য থাকবে কাফন, জানাজা, দাফন এবং কবর।

তখন মানুষ বুঝতে পারবেযে সম্পদ নিয়ে সে এত ব্যস্ত ছিল, তার সবকিছু তার সঙ্গে যায়নি। যে খ্যাতি নিয়ে সে অহংকার করেছিল, তা তাকে কবরে সঙ্গ দেয়নি। যে পদ-পদবি নিয়ে সে মানুষকে তুচ্ছ করেছিল, তা তার কবরের পরিচয় হয়ে থাকেনি।

সঙ্গে থাকবে তার আমল।

তাই জীবনের প্রকৃত সাফল্য সম্পদের পরিমাণে নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মধ্যে।

দুনিয়া আখিরাতের ভারসাম্য

ইসলাম দুনিয়া ত্যাগ করতে বলে না। হালালভাবে উপার্জন করা, পরিবারকে দেখাশোনা করা, জ্ঞান অর্জন করা, সমাজের কল্যাণ করাএসবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে দুনিয়ার ব্যস্ততা যেন আখিরাতকে ভুলিয়ে না দেয়।

মুমিন দুনিয়াকে ব্যবহার করবে, কিন্তু দুনিয়াকে নিজের হৃদয়ের চূড়ান্ত লক্ষ্য বানাবে না। সে সম্পদ রাখবে, কিন্তু সম্পদ যেন তাকে নিয়ন্ত্রণ না করে। সে সম্মান পেলে শুকরিয়া আদায় করবে, আর না পেলেও আল্লাহর ওপর ভরসা রাখবে।

আল্লাহ বলেন, “আর আল্লাহ তোমাকে যা দিয়েছেন, তা দিয়ে আখিরাতের আবাস অনুসন্ধান করো; তবে দুনিয়া থেকে তোমার অংশও ভুলে যেয়ো না।সূরা আল-কাসাস, ২৮:৭৭

এই আয়াত আমাদের ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপনের শিক্ষা দেয়।

হাশরের প্রস্তুতি

কবরের জীবন শেষ নয়। একদিন মহান আল্লাহ সবাইকে পুনরুত্থিত করবেন। মানুষ হাশরের ময়দানে সমবেত হবে এবং প্রত্যেককে নিজের কর্মের হিসাব দিতে হবে।

সেদিন মানুষের প্রকৃত পরিচয় প্রকাশিত হবে। দুনিয়ায় মানুষ যা গোপন করেছিল, আল্লাহর জ্ঞানের বাইরে তা কিছুই ছিল না। তাই এখন থেকেই নিজের আমল পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

নিজেকে প্রশ্ন করা দরকার

আমি কি আল্লাহর হক আদায় করছি?
আমি কি মানুষের হক নষ্ট করছি?
আমার উপার্জন কি হালাল?
আমার জবান কি সত্য কথা বলে?
আমার চোখ কি সংযত?
আমার অন্তর কি হিংসা অহংকারে আক্রান্ত?
আমি কি নিয়মিত তওবা করি?
আমি কি মানুষের উপকার করি?

এই আত্মজিজ্ঞাসাই মানুষকে সংশোধনের পথে নিয়ে যেতে পারে।

মীযানের পাল্লা

কিয়ামতের দিন আমলের ওজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই ছোট কোনো নেক কাজকে অবহেলা করা উচিত নয়। আবার ছোট কোনো গুনাহকেও তুচ্ছ মনে করা উচিত নয়।

একটি ভালো কথা, একটি ক্ষমা, একটি সাহায্যের হাত, একটি সত্যবাদী আচরণ, একটি আন্তরিক দোয়াএসব মানুষের কাছে ছোট মনে হলেও আল্লাহর কাছে তা মূল্যবান হতে পারে।

তাই জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে নেক আমলের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।

সিরাতের পথ

ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী কিয়ামতের বিভিন্ন পর্যায়ের পর সিরাত অতিক্রমের বিষয়ও রয়েছে। তাই একজন মুমিনের উচিত দুনিয়াতেই নিজের পথকে সোজা করাঈমান, তাকওয়া, সত্য, ন্যায় আনুগত্যের পথে চলা।

যে মানুষ দুনিয়ায় আল্লাহর নির্দেশিত পথে চলার চেষ্টা করে, সে আখিরাতের সফলতার প্রত্যাশা করতে পারে।

আজই পরিবর্তনের সময়

মানুষের সবচেয়ে বড় ভুল হলোসে মনে করে তার হাতে অনেক সময় আছে। কিন্তু সময় কারও জন্য অপেক্ষা করে না।

তাই যদি জীবনে কোনো ভুল থাকে, আজই সংশোধন করতে হবে।
কারও হক নষ্ট করে থাকলে ফিরিয়ে দিতে হবে।
কাউকে কষ্ট দিয়ে থাকলে ক্ষমা চাইতে হবে।
নামাজে অবহেলা থাকলে তা সংশোধন করতে হবে।
হারাম উপার্জন থেকে ফিরে আসতে হবে।
মিথ্যা প্রতারণা ত্যাগ করতে হবে।
হিংসা বিদ্বেষের পরিবর্তে ক্ষমা ভালোবাসা গ্রহণ করতে হবে।
আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে তওবা করতে হবে।

কারণ আগামীকাল আমাদের হবে নিশ্চয়তা কারও নেই।

লম্বা জীবনের প্রকৃত পাথেয়

দুনিয়ায় মানুষ দীর্ঘ জীবন কামনা করে। দীর্ঘ জীবন পাওয়া আল্লাহর একটি নিয়ামত। তবে দীর্ঘ জীবন তখনই প্রকৃত অর্থে কল্যাণময়, যখন সেই জীবনে নেক আমল বৃদ্ধি পায়।

শুধু বয়স বাড়লেই জীবন সফল হয় না; বরং ঈমান, জ্ঞান, চরিত্র নেক আমল বাড়তে হয়।

একজন মানুষের প্রকৃত পাথেয় হতে পারে

বিশুদ্ধ ঈমান,
নিয়মিত সালাত,
আল-কুরআনের শিক্ষা,
আন্তরিক তওবা,
তাকওয়া,
হালাল উপার্জন,
সৎ চরিত্র,
সত্যবাদিতা,
আমানতদারি,
মানুষের হক আদায়,
পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ,
পরিবারের দায়িত্ব পালন,
অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো,
সদকা কল্যাণকর কাজ,
উপকারী জ্ঞান,
সৎ সন্তান গড়ে তোলা এবং
আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা প্রতিটি নেক আমল।

এই পাথেয়ই মানুষের প্রকৃত সম্পদ।

উপসংহার

দুনিয়ার জীবন একটি সফর। এখানে আমরা পথিক। পথিকের কাজ হলো গন্তব্য ভুলে যাওয়া নয়; বরং গন্তব্যের জন্য প্রস্তুত হওয়া।

আজ আমরা যে পৃথিবীতে আছি, একদিন তা ছেড়ে যেতে হবে। আজ যে ঘরে বাস করছি, একদিন অন্যরা সেখানে থাকবে। আজ যে সম্পদকে নিজের বলছি, একদিন তা অন্যের হাতে চলে যাবে। কিন্তু আমাদের আমল আমাদের সঙ্গে থাকবে।

তাই অহংকার নয়বিনয় চাই।
অন্যায় নয়ন্যায় চাই।
হিংসা নয়ভালোবাসা চাই।
অপচয় নয়সদকা চাই।
মিথ্যা নয়সত্য চাই।
হারাম নয়হালাল চাই।
অবহেলা নয়সালাত চাই।
গাফিলতি নয়তওবা চাই।
মানুষের বাহবা নয়আল্লাহর সন্তুষ্টি চাই।

মনে রাখতে হবে, কবর আমাদের শেষ ঠিকানা নয়; বরং আখিরাতের দীর্ঘ যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। তাই দুনিয়ার সংক্ষিপ্ত জীবনে এমন পাথেয় সংগ্রহ করতে হবে, যা মৃত্যুর পরও আমাদের উপকারে আসে।

হে আল্লাহ! আমাদের ঈমানকে দৃঢ় করুন, সালাতকে প্রিয় করে দিন, কুরআনের আলোয় জীবন পরিচালনার তাওফিক দিন। আমাদের অন্তরকে অহংকার, হিংসা, বিদ্বেষ লোভ থেকে পবিত্র করুন। মানুষের হক আদায় করার শক্তি দিন। হালাল রিজিক দান করুন। মৃত্যুর আগে আন্তরিক তওবার তাওফিক দিন। আমাদের কবরকে প্রশান্তিময় করুন, হিসাব সহজ করুন, নেক আমল কবুল করুন এবং আপনার রহমতে জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করুন।

আমিন, ইয়া রব্বাল আলামিন।

 

মন্তব্য করুন

ব্লগ