প্রাথমিক শিক্ষকদের উচ্চতর গ্রেড জটিলতা: কেন ২০০৮-২০১৯ ব্যাচ বঞ্চনার শিকার? ২০২৬ পে-স্কেলে সমাধান কী?
ভূমিকা:
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা হলেন জাতি গড়ার কারিগর। অথচ আজ তারা আমলাতান্ত্রিক মারপ্যাঁচে পিষ্ট। ২০১৫ সালের পে-স্কেল কার্যকর হওয়ার পর থেকে 'উচ্চতর গ্রেড' বা 'টাইমস্কেল' নিয়ে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে, তা সাধারণ শিক্ষকদের কাছে এক গোলকধাঁধার মতো। বিশেষ করে ২০০৮ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকরা এক অদ্ভুত বৈষম্যের শিকার। আজ আমরা সহজ ভাষায় বিশ্লেষণ করব কেন এই বঞ্চনা এবং কেন আসন্ন ২০২৬ পে-স্কেলে এর সমাধান জরুরি।
১. ‘উন্নীত স্কেল’ বনাম ‘উচ্চতর গ্রেড’: আমলাতান্ত্রিক মারপ্যাঁচ
বর্তমানে হিসাব রক্ষণ অফিসগুলোর প্রধান অজুহাত হলো— শিক্ষকরা যেহেতু ০৯/০৩/২০১৪ এবং ০৯/০২/২০২০ তারিখে ‘উন্নীত স্কেল’ (Substantive Grade) পেয়েছেন, তাই তারা আর ১০ বা ১৬ বছর পূর্তিতে ‘উচ্চতর গ্রেড’ পাবেন না।
কিন্তু আইন কী বলে?
আইনত, সবার জন্য পদমর্যাদা বৃদ্ধি (যেমন ২০১৩ সালে সরকারি হওয়া বা সবার গ্রেড পরিবর্তন) একটি সামগ্রিক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। আর ১০/১৬ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেড হলো একজন শিক্ষকের ব্যক্তিগত চাকরির মেয়াদের স্বীকৃতি। এই দুটিকে এক করে ফেলা আইনি অপব্যাখ্যা ছাড়া আর কিছুই নয়।
২. অর্থ বিভাগের দ্বিমুখী আচরণের প্রমাণ (বিশ্লেষণ)
অর্থ বিভাগ যে বৈষম্যমূলক আচরণ করছে, তা নিচের দুটি উদাহরণ দিলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে:
উদাহরণ ১: ২০০৩-২০০৬ ব্যাচের শিক্ষকদের ক্ষেত্রে ২৯/০৮/২০০৬ তারিখে স্কেল উন্নীত হয়েছিল। কিন্তু তাদের কিন্তু ৮ বছর পূর্তিতে (২০১৪ সালে) ১ম টাইমস্কেল পেতে কোনো বাধা হয়নি।
উদাহরণ ২: ২০০৭ সালে যোগদানকৃত শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও ০৯/০৩/২০১৪ তারিখের উন্নীত স্কেলটি বাধা হয়নি। তারা ঠিকই ২০১৫ সালে উচ্চতর গ্রেড পেয়েছেন।
প্রশ্ন হলো— আগের ব্যাচগুলো যদি উন্নীত স্কেল পাওয়ার পরও টাইমস্কেল পেতে পারে, তবে ২০০৮-২০১৯ ব্যাচের ক্ষেত্রে কেন ‘উন্নীত স্কেল’ বাধা হিসেবে কাজ করছে? এই ‘পাতলা অফিস আদেশ’ দিয়ে একটি বিশাল অংশকে বঞ্চিত রাখা কি অমানবিক নয়?
৩. ভবিষতের এক ভয়ংকর বৈষম্য: সিনিয়র বনাম জুনিয়র
বর্তমান নিয়ম যদি ২০২৬ পে-স্কেলে পরিবর্তন করা না হয়, তবে এক অদ্ভুত পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। লক্ষ্য করুন:
সিনিয়র শিক্ষক (০৯/০২/২০২০ এর পূর্বে নিয়োগ): তারা প্রশিক্ষণ গ্রেড ও উন্নীত স্কেল পাওয়ার কারণে আজীবন ১৩তম গ্রেডেই আটকে থাকবেন (অনেকের ক্ষেত্রে)। কারণ তাদের আগের সুবিধাগুলোকে ‘উচ্চতর গ্রেড’ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।
জুনিয়র শিক্ষক (২০২০ পরবর্তী নিয়োগ): তাদের নিয়োগের পর যেহেতু কোনো সামগ্রিক স্কেল উন্নীত হয়নি, তাই তারা নিয়ম অনুযায়ী ২০৩০ সালে ১২তম গ্রেড এবং ২০৩৬ সালে ১১তম গ্রেড পাবেন।
ফলাফল কী? ২০ বছর পর দেখা যাবে একজন সিনিয়র শিক্ষক ১৩তম গ্রেডে বেতন পাচ্ছেন, আর তার জুনিয়র শিক্ষক ১১তম বা ১২তম গ্রেডে। এই যে প্রশাসনিক অদূরদর্শিতা, এটি শিক্ষকদের মধ্যে চরম অসন্তোষ এবং দীর্ঘমেয়াদী পেশাগত জটিলতা তৈরি করবে।
৪. আসন্ন ২০২৬ পে-স্কেলে আমাদের দাবি
আমরা আসন্ন পে-স্কেলে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান চাই। আমাদের দাবিগুলো হলো:
১. স্পষ্টীকরণ পরিপত্র: নতুন পে-স্কেলের গেজেটে পরিষ্কার লিখতে হবে যে, সামগ্রিক পদমর্যাদা বা স্কেল উন্নীতকরণ (২০১৪ বা ২০২০ সালের মতো ঘটনা) ব্যক্তিগত উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্তিতে বাধা হবে না।
২. স্বয়ংক্রিয় গ্রেড প্রদান: ১০ ও ১৬ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেড যেন কোনো ‘আবেদন’ বা ‘ব্যাখ্যা’ ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয়।
৩. বকেয়া সুবিধা (Arrear): ভুল ব্যাখ্যার কারণে এ পর্যন্ত যারা বঞ্চিত হয়েছেন, তাদের বকেয়াসহ পাওনা পরিশোধ করতে হবে।
৪. বৈষম্যমুক্ত কাঠামো: প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত ও প্রশিক্ষণ বিহীন শিক্ষকদের গ্রেড বৈষম্য দূর করে একটি সম্মানজনক বেতন কাঠামো নিশ্চিত করতে হবে।
উপসংহার:
মাননীয় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মহোদয়ের কাছে আমাদের আকুল আবেদন— আপনি এই সূক্ষ্ম কিন্তু গভীর বঞ্চনার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করুন। শিক্ষকদের মনে ক্ষোভ রেখে গুণগত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন। বাস্তব অবস্থা বিবেচনা করে এবং সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে ২০২৬ পে-স্কেলে এই সমস্যার সমাধান করা এখন সময়ের দাবি।
আমরা বিশ্বাস করি, সমস্যার গভীরে গিয়ে যৌক্তিক সমাধান করলেই প্রাথমিক শিক্ষার মান ও শিক্ষকদের মর্যাদা অটুট থাকবে।
১৩
১৮ মন্তব্য