Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৬ আগস্ট, ২০২৬ ০৭:৪০ পূর্বাহ্ণ

প্রবন্ধ: শিখব, শিখাবো, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ব, মোস্তাফিজুর রহমান কবি ও শিক্ষক

শিখব, শিখাবো, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ব

​মাধ্যমিক শিক্ষাকাল—ষষ্ঠ থেকে নবম-দশম শ্রেণি—কৈশোরের এক অতীব সংবেদনশীল ও সোনালী বেলা। এই ক্ষণে শিশুর মননে নানা আবেগিক রূপান্তর ঘটে, সে পরিচিত হয় এক নতুন বহুমাত্রিক পৃথিবীর সাথে। সুস্নিগ্ধ পরিচর্যা ও অভিভাবকীয় নিবিড় তত্ত্বাবধানের অনুপস্থিতিতে এই চারাগুলো অনেক সময় বিপথগামী হয়। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘ছুটি’ গল্পের ফটিক চরিত্রের মধ্য দিয়ে এই বয়সের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জন্য মা-বাবার নিবিড় সান্নিধ্যের যে আকুতি প্রকাশ করেছেন, তা চিরন্তন। তাই এই ধাপে তাদের সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ ছেড়ে দেওয়া চলে না; বরং বন্ধুসুলভ মন নিয়ে তাদের পাশে দাঁড়ানো, তাদের অন্তর্নিহিত বেদনা বা জিজ্ঞাসা শোনা এবং সুপথে পরিচালনা করা প্রতিটি অভিভাবকের অবশ্যম্ভাবী দায়িত্ব।

​ফেলে আসা সোনালী দিন, বর্তমানের ব্যস্ততা ও জীবনদর্শন

​স্মৃতির জানলা খুলে তাকালে ভেসে ওঠে আমাদের ফেলে আসা সোনালী দিনগুলোর কথা। আমরা চার ভাই ও চার বোন এক সাধারণ মধ্যবিত্তানুগ বড় পরিবারের সন্তান ছিলাম। সন্ধ্যার পর প্রদীপের স্নিগ্ধ আলোয় চলত পড়াশোনা। প্রতি দুই জনের জন্য ছিল একটি হারিকেন—এই চার হারিকেনের আলোয় চার ভাই-বোন জ্ঞানার্জনে মগ্ন হতাম। এরপর নিয়মমাফিক প্রার্থনা, গুরুজনদের মুখে মানবকল্যাণ ও সত্যনিষ্ঠার জীবনবোধের গল্প শুনে নিদ্রায় যাওয়া এবং ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথেই আত্মিক প্রশান্তির মধ্য দিয়ে দিন শুরু করা ছিল আমাদের প্রাত্যহিক অভ্যস্ততা।

​সকালবেলা অবধারিতভাবে ঘণ্টাখানেক বাবার কৃষিকাজে সাহায্য করা এবং সাড়ে তিন কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে শ্রীপুর-রামনগর আলিম মাদ্রাসায় যাতায়াত করা আমাদের জীবনকে করেছিল কর্মঠ। নিজের পোশাক নিজ হাতে পরিষ্কার করা এবং বিকেলবেলা ক্রীড়ানুশীলনে অংশ নেওয়া আমাদের সামাজিকীকরণের ভিত্তি শক্ত করেছিল। পক্ষান্তরে, আজকের এই আধুনিক ও যান্ত্রিক যুগে আর্থিক সক্ষমতা ও কর্মব্যস্ততা বৃদ্ধি পেলেও পারিবারিক উষ্ণতা ও সময়দানের প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। কিন্তু এই সভ্যতার ব্যস্ত কোলাহলেও আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সঠিক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সময় দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।

​গাণিতিক ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ এবং সত্য-সুন্দরের সাধনা

​শিক্ষার্থীর মনোজগতে কেবল আবেগ নয়, সমানভাবে প্রয়োজনীয় হলো গাণিতিক এবং বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের শক্তি। বস্তুত, বিজ্ঞানমনস্কতা এবং শাশ্বত সত্য ও সুন্দরের অনুসারী হয়ে ওঠা একজন শিক্ষার্থীর প্রধান ভূষণ হওয়া উচিত। মিথ্যার ওপর বা অসত্যের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা কোনো জ্ঞান মানুষকে কখনো সঠিক গন্তব্যে পৌঁছে দেয় না; বরং তা বিভ্রান্তির চোরাবালিতে নিমজ্জিত করে। তাই সত্যনিষ্ঠা, যুক্তিভিত্তিক চিন্তা, এবং গাণিতিক শুদ্ধবোধের মেলবন্ধনেই শিশুর বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ পূর্ণতা পায়।

​পাশাপাশি, স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে শিখন প্রক্রিয়ায় মস্তিষ্কে পর্যাপ্ত অক্সিজেন সঞ্চালনের জন্য শরীরচর্চা এবং খেলাধুলার ভূমিকা অপরিসীম। সুষম খাদ্য, পরিমিত নিদ্রা এবং প্রাকৃতিক আলো-বাতাসপূর্ণ গৃহকোণ শিশুর মেধার উৎকর্ষ ঘটাতে অনন্য ভূমিকা পালন করে।

​ভুল থেকেই শিক্ষা ও সমস্যাভিত্তিক শিখন (Problem-Based Education)

​শিখন-শেখানো প্রক্রিয়ার একটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও চিরন্তন সত্য হলো—ভুল করা মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি এবং এই ভুলের মধ্য দিয়েই প্রকৃত জ্ঞান অর্জনের সিঁড়ি তৈরি হয়। কেউ যদি আমাকে প্রশ্ন করেন, "আপনি আজকে নতুন কী শিখেছেন?" তবে তার উত্তর হওয়া উচিত, "আমি আজকে ঠিক সেই বিষয়টি শিখেছি, যেটিতে আমার ভুল হয়েছিল।" অর্থাৎ, ভুল সংশোধন ও ত্রুটি উত্তরণের মাধ্যমেই আমরা প্রকৃত শিক্ষা গ্রহণ করে থাকি।

​এই দর্শন থেকেই বিকশিত হয় সমস্যাভিত্তিক শিক্ষা বা প্রবলেম-সলিউশন পদ্ধতি। শিক্ষার্থীর সামনে কোনো সমস্যা বা জটিলতা হাজির হলে সে নিজে তা চিহ্নিত করবে এবং তার আশপাশের নিরাপদ ও সহজলভ্য যোগাযোগ মাধ্যম—তা হতে পারে তার কোনো সহপাঠী, কোনো স্নেহশীল বড় ভাই, কিংবা শিক্ষক বা অভিভাবক—তার সাথে স্বাচ্ছন্দ্যে যোগাযোগ করে সেই সমস্যার সমাধানটি লুফে নেবে। এই ধারাবাহিক অনুশীলনের মাধ্যমেই শিক্ষার্থীর মধ্যে তৈরি হয় অনন্য সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বা প্রবলেম সলিউশন স্কিল, যা তাকে ভবিষ্যতে একজন দক্ষ ও আত্মবিশ্বাসী মানুষে পরিণত করে।

​সার্বজনীন নৈতিক মূল্যবোধ ও পারিবারিক অনুশাসন

​নৈতিক চরিত্র গঠনে সর্বজনীন মানবিক মূল্যবোধ এবং যার যার নিজ নিজ বিশ্বাসের শাশ্বত নৈতিক অনুশাসনের চর্চা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যে সংস্কৃতি বা বিশ্বাসের অনুসারী হই না কেন, নিজ নিজ বিশ্বাসের পবিত্র বিধান ও মানবতার শিক্ষাগুলো নিয়মিত চর্চা করা উচিত। সন্তান তার চারপাশের পরিবেশ ও গুরুজনদের মার্জিত আচরণ থেকেই সবচেয়ে বেশি শেখে। তাই তাদের সামনে সর্বদা শালীন, সত্যবাদী ও রুচিশীল আচরণ প্রদর্শন করা জরুরি। দিনের শুরুটা সুন্দর কোনো প্রার্থনা বা ইতিবাচক চিন্তার মধ্য দিয়ে করলে মন নির্মল থাকে এবং পারিবারিক পরিমণ্ডলে সততার চর্চা শিশুদের আদর্শ মানবিক গুণসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।

​সন্তানের বিকাশে প্রতিদিনের 'পাঁচ মিনিট'

​মহাব্যস্ততার মাঝেও সন্তানের সুপ্ত প্রতিভাকে জাগিয়ে তুলতে প্রতিদিন অন্তত পাঁচ মিনিট ব্যয় করুন। শিক্ষা বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে এই স্বল্প পরিসরে সন্তানের সাথে অন্তরঙ্গ আলাপে জেনে নিন:

  • ​বিদ্যালয়ে তার কোন বিষয়টি সবচেয়ে ভালো লেগেছে?

  • ​সে নতুন কোনো শব্দ, জ্ঞান বা নৈতিক শিক্ষা অর্জন করেছে কি না?

  • ​শিক্ষকরা বোর্ডে যা লিখেছেন, সেগুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খ নোট সে খাতায় টুকে নিয়েছে কি না?

​সন্তানের কথা অন্ধভাবে বিশ্বাস না করে, প্রয়োজনে বিদ্যালয় প্রধানের সাথে যোগাযোগ করে তা নিশ্চিত করুন। যদি আপনার সন্তান আগামী তিন মাস প্রতিটি বিষয় থেকে অন্তত একটি করে টীকা বা নোট সংরক্ষণের অভ্যাস গড়ে তোলে, তবে তার প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্য এবং মৌলিক মানবিক গুণাবলির বিকাশ কেউ রোধ করতে পারবে না। অন্ধভাবে সর্বোচ্চ নম্বর অর্জনের মোহের চেয়ে সন্তানকে একজন সৎ ও পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই আসল লক্ষ্য হওয়া উচিত। এই ক্ষুদ্র পাঁচ মিনিটের বিনিয়োগ আপনার জীবনের শেষ প্রান্তে এনে দেবে সন্তানের অন্তহীন ভালোবাসা ও সময়।

​গুণগত শিক্ষা ও সমন্বিত প্রয়াস

​শিক্ষা কখনো বলপ্রয়োগে অর্জিত হয় না; এটি সম্পূর্ণ আত্মস্থকরণের বিষয়। বিদ্যালয়, শিক্ষক, অভিভাবক এবং শিক্ষার্থীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠে শিক্ষার প্রকৃত আবহ। শিক্ষক হিসেবে আমরাও জন্মগতভাবে পরিপক্ব নই; আমাদের শিক্ষার্থীদের কৌতূহল, জিজ্ঞাসু দৃষ্টি ও নতুন উদ্ভাবনী চিন্তা-চেতনা আমাদের পেশাগত উৎকর্ষ দান করে।

​অতএব, সচেতন অভিভাবক, কৌতূহলী শিক্ষার্থী এবং নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকের ত্রিবেণী সঙ্গমে রচিত হোক এক আলোকোজ্জ্বল ভবিষ্যৎ।

​বিশেষ বার্তা: 'পারবো' নয়, 'আমি পারলাম'

​শিক্ষার্থীদের মনস্তত্ত্বে এবং সার্বিকভাবে আমাদের জীবনচর্চায় একটি সূক্ষ্ম অথচ সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। যখন কোনো শিক্ষক বা অভিভাবক শিক্ষার্থীদের সামনে কোনো কাজের দায়িত্ব দেন, তখন তারা প্রায়ই বলে ওঠে—"আমি কাজটি করতে পারব।" এই "পারবো" শব্দটি অনেক সময় কাজটিকে বিলম্বিত করার, পিছিয়ে দেওয়ার বা অজুহাত খোঁজার মানসিক সুযোগ তৈরি করে দেয়।

​এর পরিবর্তে কাজটি তাৎক্ষণিকভাবে সম্পন্ন করে বলা উচিত—"আমি পারলাম।" কাজটি সম্পন্ন করার পর "আমি পারলাম" বলার মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীর আত্মমর্যাদাবোধ, অধ্যবসায় এবং শিখন-শেখানো প্রক্রিয়ার এক কোমল, গতিশীল ও বাস্তব রূপ ফুটে ওঠে। তাই শিক্ষক, অভিভাবক তথা সর্বস্তরের মানুষের উদ্দেশ্যে বলছি—কোনো কাজের দায়িত্ব পেলে তা কালক্ষেপণ না করে নিজের প্রচেষ্টায় সম্পন্ন করে বলুন, "আমি পারলাম।" এই মনস্তাত্ত্বিক অনুশীলনই শিক্ষার্থীকে করে তুলবে আত্মবিশ্বাসী, কর্মঠ ও দক্ষ।

​স্মৃতি হোক সুন্দর, দেশ হোক সমৃদ্ধ।

লেখক: মোস্তাফিজুর রহমান

কবি ও শিক্ষক

#Mostafezur_Rahman_

মন্তব্য করুন