Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৬ আগস্ট, ২০২৬ ০৯:২৬ পূর্বাহ্ণ

প্রাত্যহিক সমাবেশ: শিক্ষার্থীর মূল্যবোধ বিকাশ, সামাজিকীকরণ এবং সঠিক নির্দেশনার গুরুত্ব ​নিবন্ধকার: মোস্তাফিজুর রহমান কবি ও শিক্ষক, চৌবাড়ীয়া মালশিরা উচ্চ বিদ্যালয়।

প্রাত্যহিক সমাবেশ: শিক্ষার্থীর মূল্যবোধ বিকাশ, সামাজিকীকরণ এবং সঠিক নির্দেশনার গুরুত্ব

নিবন্ধকার: মোস্তাফিজুর রহমান

কবি ও শিক্ষক, চৌবাড়ীয়া মালশিরা উচ্চ বিদ্যালয়।

​বিদ্যালয় কেবল পুঁথিগত বিদ্যা অর্জনের কোনো চারদেয়ালের প্রকোষ্ঠ নয়, বরং এটি একজন শিক্ষার্থীর প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার প্রধানতম সূতিকাগার। একটি শিশুর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার দিনটি শুরু হয় 'প্রাত্যহিক সমাবেশ' বা অ্যাসেম্বলির মধ্য দিয়ে। প্রাত্যহিক সমাবেশ কেবল কিছু শারীরিক কসরত বা নিয়ম রক্ষার আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি শিক্ষার্থীর মনন, শৃঙ্খলাবোধ এবং দলগত ঐক্যের এক নীরব পাঠশালা।

শিক্ষার্থীর সামাজিকীকরণ ও মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ

স্কুল জীবন শিক্ষার্থীর সামাজিকীকরণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। পরিবার নামক ক্ষুদ্র গণ্ডি থেকে বেরিয়ে শিশু যখন বিদ্যালয়ের বিশাল আঙিনায় পা রাখে, তখন সে নানা মত, নানা মনন ও ভিন্ন ভিন্ন পারিবারিক পটভূমি থেকে আসা সহপাঠীদের সংস্পর্শে আসে। প্রাত্যহিক সমাবেশের মাঠে যখন সব শিক্ষার্থী কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ায়, তখন তাদের মধ্যে থেকে ধনী-দরিদ্র, সামাজিক মর্যাদা বা ধর্ম-বর্ণের সকল ভেদাভেদ নিমেষেই দূর হয়ে যায়।

​একসাথে একই সুরে জাতীয় সংগীত গাওয়া, সমস্বরে দেশপ্রেমের শপথ পাঠ করা এবং পরম করুণাময়ের কাছে প্রার্থনা করার যে প্রাত্যহিক চর্চা— তা তাদের মধ্যে গভীর সহমর্মিতা, ঐক্য ও মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করে। এই সামষ্টিক কার্যক্রমটি তাদের শেখায় কীভাবে সমাজের বৃহত্তর কাঠামোর অংশ হতে হয়, কীভাবে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে একসাথে চলতে হয়। এভাবেই স্কুল জীবনের প্রাত্যহিক সমাবেশ একদল শিশুকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার প্রাথমিক দীক্ষা প্রদান করে।

প্রাত্যহিক সমাবেশের তাত্ত্বিক ভিত্তি

তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রাত্যহিক সমাবেশ হলো একটি সামষ্টিক ড্রিল (Mass Drill), যা শরীর ও মনকে দিনের পরবর্তী কাজের জন্য প্রস্তুত করে। এর প্রতিটি উপাদানের একটি সুনির্দিষ্ট মনস্তাত্ত্বিক দিক রয়েছে। পবিত্র ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠ মনকে প্রশান্ত ও আধ্যাত্মিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে, শপথ বাক্য নিজের ও দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা তৈরি করে এবং শারীরিক কসরত (পিটি) শিক্ষার্থীদের স্নায়ু ও পেশিকে সতেজ করে শ্রেণিকক্ষের পাঠগ্রহণের জন্য প্রস্তুত করে।

কমান্ডারের শুদ্ধস্বর ও সঠিক নির্দেশনার (Command) গুরুত্ব

সমাবেশের সবচেয়ে স্পর্শকাতর, শৈল্পিক ও গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো 'কমান্ড' বা নির্দেশ প্রদান। যিনি কমান্ড দিচ্ছেন (কমান্ডার বা দলনেতা), তার স্বর, উচ্চারণ এবং নির্দেশের যৌক্তিকতার ওপর পুরো সমাবেশের গাম্ভীর্য ও সৌন্দর্য নির্ভর করে।

​কমান্ডারের কণ্ঠস্বর হতে হবে শুদ্ধ, দরাজ, তীক্ষ্ণ এবং আত্মবিশ্বাসী। কমান্ড প্রদানের ক্ষেত্রে অযাচিত বা বিভ্রান্তিকর শব্দের ব্যবহার (যেমন— "সমাবেশ সাবধান, দল সাবধান, সমাবেশ শব্দ, দল সাবধান" ইত্যাদি ধারাবাহিকভাবে বলা) সমাবেশের শৃঙ্খলার পরিপন্থী। নির্দেশ হতে হবে সুনির্দিষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন। একটি শুদ্ধ কমান্ডের দুটি অংশ থাকে— 'সতর্কতামূলক' (যেমন- সমাবেশ...) এবং 'কার্যকরী' (যেমন- ...সাবধান!)। এই দুই অংশের মাঝে সঠিক বিরতি (Pause) থাকা বাঞ্ছনীয়।

​যখন একজন কমান্ডার শুদ্ধস্বরে, স্পষ্ট উচ্চারণে ও নির্ভুল নিয়মে কমান্ড দেন, তখন মাঠে উপস্থিত শত শত শিক্ষার্থীর মধ্যে স্বতঃস্ফূর্তভাবে একটি বৈদ্যুতিক শিহরণ ও একাগ্রতা তৈরি হয়। সবাই একযোগে কমান্ড পালন করে। অন্যদিকে, ভুল, অস্পষ্ট বা পুনরাবৃত্তিমূলক কমান্ড শিক্ষার্থীদের মনে বিভ্রান্তি ছড়ায়, মনোযোগ বিঘ্নিত করে এবং কমান্ডারের প্রতি তাদের আস্থার সংকট তৈরি করে। এতে সমাবেশের মূল উদ্দেশ্য— 'শৃঙ্খলার চর্চা' ব্যাহত হয়।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, প্রাত্যহিক সমাবেশ একটি শিল্প এবং মনস্তাত্ত্বিক প্রস্তুতির শ্রেষ্ঠ সময়। শিক্ষক, সমাবেশ পরিচালনাকারী এবং শিক্ষার্থী— সকলেরই উচিত এই সমাবেশকে অত্যন্ত গাম্ভীর্য ও গুরুত্বের সাথে অনুধাবন করা। শুদ্ধস্বর ও সঠিক কমান্ডের মাধ্যমে পরিচালিত একটি সুশৃঙ্খল সমাবেশ কেবল বিদ্যালয়ের পরিবেশকেই দৃষ্টিনন্দন করে না, বরং প্রতিটি শিক্ষার্থীর হৃদয়ে বপন করে শৃঙ্খলা, দেশপ্রেম ও নিয়মানুবর্তিতার এমন এক বীজ, যা ভবিষ্যতে তাকে একজন আলোকিত মানুষে পরিণত করে।

#Mostafezur_Rahman_


মন্তব্য করুন