Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৭ আগস্ট, ২০২৬ ১০:১১ পূর্বাহ্ণ

"১৮ বছরের চাকরি, তবুও প্রাথমিক সহকারী শিক্ষকগণ ফিডার গ্রেড ১৩তম গ্রেড!" আমলাতন্ত্রের মারপ্যাচে প্রাথমিকে 'উচ্চতর গ্রেড' নিখোঁজ!

"১৮ বছরের চাকরি, তবুও প্রাথমিক সহকারী শিক্ষকগণ ফিডার গ্রেড ১৩তম গ্রেড!"
আমলাতন্ত্রের মারপ্যাচে প্রাথমিকে 'উচ্চতর গ্রেড' নিখোঁজ!

সরকারি চাকুরীজীবীদের উচ্চতর গ্রেড, টাইমস্কেল, সিলেকশন গ্রেড এবং উন্নীত স্কেল সংক্রান্ত নির্দেশাবলী তারিখের ধারাবাহিকতায় নিচের টেবিলে উপস্থাপন করা হলো:

ক্রমিক

তারিখ

জারিকারী কর্তৃপক্ষ, স্মারক নম্বর, সূত্র (স্মারক ও তারিখ)

বিষয়বস্তু ও মূল বক্তব্য

১৫/১২/২০১৫

অর্থ মন্ত্রণালয় (অর্থ বিভাগ)

চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ ২০১৫

-

জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ গেজেট: পূর্বের টাইমস্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বাতিল করে চাকরির ১০ ও ১৬ বছর সন্তোষজনক পূর্তিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে উচ্চতর গ্রেড প্রদানের নিয়ম প্রবর্তন করা হয় ।

২১/০৯/২০১৬

অর্থ মন্ত্রণালয় (বাস্তবায়ন-১)

স্মারক নম্বরঃ- ০৭.০০.০০০০.১৬১.০০.০০২.১৬-২৩২

-

উচ্চতর গ্রেডের মূল ভিত্তি: উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্তির শর্তাবলী এবং "সন্তোষজনক চাকরির" সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়। জানানো হয় যে, একই পদে কর্মরত থাকাকালীন সর্বোচ্চ দুটি উচ্চতর গ্রেড পাওয়া যাবে ।

২৭/০৯/২০১৬

হিসাব মহানিয়ন্ত্রক (সিজিএ) কার্যালয়

স্মারক নম্বরঃ- ০৭.০৩.০০০০.০০৯.৫০.১৩৩.১৪-১৪৩

অর্থ মন্ত্রণালয়ের স্মারক নং-২৩২; তারিখ: ২১/০৯/২০১৬

অর্থ মন্ত্রণালয়ের ২১/০৯/২০১৬ তারিখের পরিপত্রের আলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ প্রদান ।

০৫/১০/২০১৬

অর্থ মন্ত্রণালয় (প্রশাসন-৩)

স্মারক নম্বরঃ- ০৭.০৮৩.০০২.০১.০০.০৪১.২০১০-৭৫২

-

বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে উচ্চতর গ্রেড প্রদানের জন্য প্রতিনিধি মনোনয়ন ও অডিট সমন্বয় সংক্রান্ত নির্দেশনা ।

১২/০১/২০১৭

সুপ্রিম কোর্ট (আপীল বিভাগ)

Civil Misc Petition 28/2017

-

টাইমস্কেল সংক্রান্ত মামলায় আদালত কর্তৃক স্থিতাবস্থা (No order) বজায় রাখা হয়।

১৩/০৯/২০১৭

বংলাদেশ কম্পট্রলার এণ্ড অডিটর জেনারেল (সিএজি) কার্যালয়

স্মারক নম্বরঃ- সিএজি/পদ্ধতি-১/বেতন নির্ধারন মতামত/৫৪৫/১০৪

(ক) ০২/০৮/২০১৭ (সিএজি মতামত); (খ) ০৬/০৬/২০১৭ (সিজিডিএফ); (গ) ০৯/০৮/২০১৭ (সিজিডিএফ)

অডিটর পদে চাকরির ১০ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেড সুবিধার প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা হয় ।

১৫/১১/২০১৭

অর্থ মন্ত্রণালয় (বাস্তবায়ন-১)

স্মারক নম্বরঃ- ০৭.০০.০০০০.১৬১.৩৮.০০১.১৭-২৩১

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পত্র নং-৫৮১; তারিখ: ১২/১২/২০১৬

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের উন্নীত বেতনস্কেলে বেতন নির্ধারণের পদ্ধতি চূড়ান্ত করা হয় ।

১৩/০৯/২০১৮

অর্থ মন্ত্রণালয় (বাস্তবায়ন-১)

স্মারক নম্বরঃ- ০৭.০০.০০০০.১৬১.০০.০০৭.১৬-২৮৫

-

উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্তির বিষয়ে মামলা বিচারাধীন থাকায় কোনো সিদ্ধান্ত প্রদানের সুযোগ নেই বলে জানানো হয় ।

০৯/১০/২০১৮

হিসাব মহানিয়ন্ত্রক (সিজিএ)

স্মারক নম্বরঃ- ০৭.০৩.০০০০.০০৯.৫০.১৩৩.১৪-২৭৪

-

উচ্চতর গ্রেড ও করেসপন্ডিং সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে সিজিএ কার্যালয়ের পর্যবেক্ষণ ও মতামত প্রকাশ ।

১০

১৪/০২/২০১৯

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI)

স্মারক নম্বরঃ- ১২.২১.০০০০.০০৫.৭০.৪৪৭.১৮/১০৪৯০

-

মঞ্জুরকৃত উচ্চতর গ্রেড স্কেলে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তার বেতন নির্ধারণের অফিস আদেশ।

১১

০৮/০৪/২০১৯

হিসাব মহানিয়ন্ত্রক (সিজিএ)

স্মারক নম্বরঃ- ০৭.০৩.০০০০.০০৯.৩৭.৪৩৬.০৩-৩৩৫

-

আদালতের কোনো স্থগিতাদেশ না থাকলে উচ্চতর গ্রেড প্রদান অব্যাহত রাখার নির্দেশনা।

১২

১৯/০৬/২০১৯

অর্থ মন্ত্রণালয় (বাস্তবায়ন-১)

স্মারক নম্বরঃ- ০৭.০০.০০০০.১৬১.০০.০০৭.১৬-১৭২

হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের স্মারক নং-৩৪০; তারিখ: ১১/০৪/২০১৯

চাকরির ১০ ও ১৬ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্তির বিষয়ে পুনরায় স্পষ্টীকরণ।

১৩

২০/১১/২০১৯

হিসাব মহানিয়ন্ত্রক (সিজিএ)

স্মারক নম্বরঃ- ০৭.০৩.০০০০.০০৯.৫০.১৩৩.১৪-৪২০

-

আদালত বা প্রশাসনিক আদেশে বকেয়া ইনক্রিমেন্ট ও বেতন নির্ধারণ সমন্বয়ের নির্দেশ প্রদান।

১৪

২৬/১১/২০১৯

অর্থ মন্ত্রণালয় (বাস্তবায়ন-১)

স্মারক নম্বরঃ- ০৭.০০.০০০০.১৬১.৩১.০০৭.১২-৩৪১

ভূমি মন্ত্রণালয়ের পত্র নং-৭৪৭; তারিখ: ৩০/১০/২০১৯

কানুনগোসহ অন্যান্য পদের উন্নীত স্কেলে বেতন নির্ধারণের পদ্ধতি ও বৈষম্য নিরসন করা হয়।

১৫

২১/০১/২০২০

হিসাব মহানিয়ন্ত্রক (সিজিএ)

স্মারক নম্বরঃ- ০৭.০৩.০০০০.০০৯.৪৪.১৮৬.১৯-১৮

(১) ২৮/০৭/২০১৯; (২) ২৬/১২/২০১৯ (অর্থ বিভাগ)

ভূতাপেক্ষভাবে (Retroactive) সিলেকশন গ্রেড বা টাইমস্কেল মঞ্জুরির বিষয়ে মতামত প্রদান।

১৬

০৯/০২/২০২০

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়

স্মারক নম্বরঃ- ৩৮.০০.০০০০.০০১.৩৪.০৯১.১৯-৯৫

অর্থ বিভাগের পত্র নং-৩০৮; তারিখ: ০৭/১১/২০১৯

সহকারী শিক্ষকদের বেতন বৈষম্য দূর করতে বেতন গ্রেড ১৪/১৫ থেকে ১৩তম গ্রেডে উন্নীতকরণ করা হয় ।

১৭

৩১/০৫/২০২০

অর্থ মন্ত্রণালয় (বাস্তবায়ন-২)

স্মারক নম্বরঃ- ০৭.০০.০০০০.১৬২.৩৭.০০.০৮৫.১৯-৬৬

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের পত্র নং-৬৭; তারিখ: ০৯/০৩/২০২০

এম.পি.ও. ভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কমচারীদের উচ্চতর স্কেল প্রদান সংক্রান্ত স্পষ্টীকরণ ।

১৮

১০/০৬/২০২০

মাউশি (DSHE)

স্মারক নম্বরঃ- ৩৭.০২.০০০০.১০৭.৩১.০০২.২০.২০

মাউশি বিভাগের পত্র নং-৮৯; তারিখ: ০৭/০৬/২০২০

এম.পি.ও. শিক্ষকদের উচ্চতর স্কেল প্রদানের প্রশাসনিক বাস্তবায়ন ও অধিদপ্তরীয় নির্দেশনা প্রদান।

১৯

২৮/০৭/২০২০

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়

স্মারক নম্বরঃ- ৩৮.০০.০০০০.০০৮.১২.০০১.১৭-২৫৪

অর্থ বিভাগের সম্মতি; তারিখ: ০৭/১১/২০১৯

সহকারী শিক্ষকদের ১৩তম গ্রেডে উন্নীত বেতন স্কেলে বেতন নির্ধারণের আদেশ ।

২০

১৩/০৯/২০২০

অর্থ মন্ত্রণালয় (বাস্তবায়ন-৫)

স্মারক নম্বরঃ- ০৭.০০.০০০০.১৬৫.০৭.০০১.১৩-৭৪

হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের স্মারক নং-৯২; তারিখ: ১৬/০৮/২০২০

জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবে উচ্চতর গ্রেড প্রদানের ব্যাখ্যা প্রদান করা হয় ।

২১

১১/১০/২০২০

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়

স্মারক নম্বরঃ- ৩৮.০০.০০০০.০০৮.১২.০০১.১৭-৩৫৪

-

১৩তম গ্রেডে উন্নীত শিক্ষকদের উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্যতা নিয়ে সৃষ্ট জটিলতার প্রশাসনিক ব্যাখ্যা।

২২

০৫/১১/২০২০

অর্থ মন্ত্রণালয় (বাস্তবায়ন-১)

স্মারক নম্বরঃ- ০৭.০০.০০০০.১৬১.২১.০০২.১৩-১৫২

বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের স্মারক নং-৪০; তারিখ: ১২/১০/২০২০

উচ্চতর গ্রেড মঞ্জুরির বিষয়ে চূড়ান্ত মতামত প্রদান ।

২৩

১৮/১১/২০২০

হিসাব মহানিয়ন্ত্রক (সিজিএ)

স্মারক নম্বরঃ- ০৭.০৩.০০০০.০০৯.৩৭.১৪৪.১৫-১৫৯

পত্র নং-২৫৮; তারিখ: ২৮/১০/২০২০

হাইকোর্টের রায়ের আলোকে শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের টাইমস্কেল/সিলেকশন গ্রেড প্রদান নিশ্চিতকরণ।

২৪

০৯/১২/২০২০

হিসাব মহানিয়ন্ত্রক (সিজিএ)

স্মারক নম্বরঃ- ০৭.০৩.০০০০.০০৯.৫০.১৩৩.১৪-৭৮৩

অর্থ মন্ত্রণালয়ের স্মারক নং-১৫২; তারিখ: ০৫/১১/২০২০

উচ্চতর গ্রেড প্রদান সংক্রান্ত অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার পৃষ্ঠাঙ্কন।

২৫

২৪/০১/২০২২

অর্থ মন্ত্রণালয় (বাস্তবায়ন-৫)

স্মারক নম্বরঃ- ০৭.০০.০০০০.১৬১.৩১.৩৪৩.মতাদর্শ

-

উন্নীত স্কেলে বেতন নির্ধারণের পর ১০ বছর পূর্ণ হলে উচ্চতর গ্রেড সমন্বয় সংক্রান্ত আইনি মতামত প্রদান ।

২৬

০২/০৭/২০২৫

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়

স্মারক নম্বরঃ- ৩৮.০০.০০০০.০০৮.১২.০০৭.১৬-৩০৭

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পত্র; তারিখ: ২৭/০৫/২০২৫

শিক্ষকদের উচ্চতর গ্রেড বঞ্চনা নিরসনে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পুনরায় প্রস্তাব প্রেরণ।

২৭

২০/০৮/২০২৫

অর্থ মন্ত্রণালয় (বাস্তবায়ন-১)

স্মারক নম্বরঃ- ০৭.০০.০০০০.১৬১.৩৮.০০৫.১২-১৫৭

-

বঞ্চনার মূল ভিত্তি: জানানো হয় যে, পদের স্কেল উন্নীত করা হলে ওই তারিখ হতে পুনরায় ১০ বছর পর উচ্চতর গ্রেড মিলবে।

২৮

০৯/০৯/২০২৫

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়

স্মারক নম্বরঃ- ৩৮.০০.০০০০.০০০.০০৮.১২.০০০১.১৭.৩৯৯

অর্থ মন্ত্রণালয়ের স্মারক নং-১৫৭; তারিখ: ২০/০৮/২০২৫

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ১০ ও ১৬ বছর পূর্তিতে উচ্চতর স্কেল প্রদানের অফিস আদেশ।

২৯

১০/০৮/২০২৬

হিসাব মহানিয়ন্ত্রক (সিজিএ)

স্মারক নম্বরঃ- ০৭.০৩.০০০০.০০৯.৩৮.১৭৯.২৩-৮৯

তারিখ: ১১/০৭/২০২৬

সর্বশেষ সিদ্ধান্ত: উন্নীত স্কেল ও টাইমস্কেল সমন্বয়ের মাধ্যমে উচ্চতর গ্রেড সুবিধা সীমিতকরণ করা হয়।

প্রাথমিক শিক্ষকদের উচ্চতর গ্রেড জটিলতা: একটি প্রশাসনিক অদূরদর্শিতা ও অধিকার হরণের বিশ্লেষণ

ভূমিকা:
একটি দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা সেই জাতির ভিত্তি হিসেবে গণ্য হয়। অথচ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকগণ বর্তমানে আমলাতান্ত্রিক মারপ্যাঁচে পিষ্ট। বিগত ১৫/১২/২০১৫ তারিখের জাতীয় বেতন স্কেল জারির পর থেকে অধ্যবধি উচ্চতর গ্রেড, টাইমস্কেল এবং উন্নীত স্কেল নিয়ে ৩০টিরও অধিক পরিপত্র, অফিস আদেশ ও স্পষ্টীকরণ জারি করা হয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, খোদ সিজিএ (Controller General of Accounts) কার্যালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন নির্দেশনার ফলে শিক্ষকদের দীর্ঘ ১৮-২০ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা আজ কেবল ‘সমন্বয়’ (Adjustment) নামক একটি শব্দের বেড়াজালে বিলীন হতে চলেছে। বিশেষ করে গত ১০-০৮-২০২৬ খ্রিষ্টাব্দের স্মারক নং-০৭.০৩.০০০০.০০৯.০৮.১৭৯.২৩-৮৯৭ এর ফলে শিক্ষকদের বেতন কাঠামোতে যে স্থবিরতা সৃষ্টি হয়েছে, তা কেবল আর্থিক ক্ষতিই নয়, বরং ন্যায়বিচারের চরম পরিপন্থী।

প্রশাসনিক নির্দেশনার গাণিতিক ফাঁদ ও ব্যাচ ভিত্তিক বঞ্চনা:
সিজিএ কার্যালয়ের নির্দেশনায় বলা হয়েছে যে, চাকরির ১০ বছর পূর্তিতে প্রাপ্য ১ম উচ্চতর গ্রেড পূর্বের প্রাপ্ত উচ্চতর গ্রেড বা উন্নীত স্কেলের সাথে সমন্বয় হবে। এই ‘সমন্বয়’ নীতির কারণে বিভিন্ন ব্যাচের শিক্ষকদের মধ্যে যে অদ্ভুত ও বৈষম্যমূলক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:

১. প্রবীণ ব্যাচের (২০০৩-২০০৬) সাথে পরবর্তী ব্যাচের ব্যবধান: যারা ২০১৫ সালের পে-স্কেল গেজেটের আগে টাইমস্কেল ও প্রশিক্ষণ স্কেল পেয়ে ১০ম বা ১১তম গ্রেডে পৌঁছেছেন, তারা বর্তমানে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে আছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সমযোগ্যতা ও একই পদে কর্মরত থাকা সত্ত্বেও পরবর্তী ব্যাচগুলো কেন এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে?

২. বঞ্চিত প্রজন্ম (২০০৭-২০১৯ ব্যাচ): এই বিশাল সংখ্যক শিক্ষক বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। তারা ২০০৬ বা ২০১৪ সালের উন্নীত স্কেল এবং ২০২০ সালের ১৩তম গ্রেডের সুবিধা পেয়েছেন। ৮৯৭ নং স্মারকের সমন্বয় নীতি অনুযায়ী, এই পদের সম্মান বৃদ্ধিতে পাওয়া উন্নীত স্কেলকেই তাদের ব্যক্তিগত ‘উচ্চতর গ্রেড’ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। এর ফলে চাকরির ১০ বা ১৬ বছর পূর্ণ হলেও তারা নতুন কোনো উচ্চতর গ্রেড পাচ্ছেন না এবং আজীবন ১৩তম গ্রেডেই (ফিডার পদ) আটকে থাকছেন। ১৮ বছর চাকরির পর একজন শিক্ষক জানতে চান—তার পাওনা ২ টি উচ্চতর গ্রেড কোথায় গেল?

৩. জুনিয়র বনাম সিনিয়র বৈষম্যের মহোৎসব: ২০২০ সালের ৯ই ফেব্রুয়ারির পর যারা নিয়োগ পেয়েছেন, তাদের ফিডার পদ সরাসরি ১৩তম গ্রেড। তারা ১০ বছর পর সহজেই ১২তম এবং ১৬ বছর পর ১১তম গ্রেডে যাবেন। কিন্তু ২০০৮ সালে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষক আজীবন ১৩তম গ্রেডেই পড়ে থাকবেন। অর্থাৎ, ২০৩০ সালে দেখা যাবে ১২ বছরের জুনিয়র শিক্ষক তার সিনিয়রের চেয়ে বেশি বেতন ও উপরের গ্রেডে অবস্থান করছেন। এটি একটি চরম প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা।

নীতিনির্ধারকদের কাছে তাত্ত্বিক ও আইনি জিজ্ঞাসা:
বর্তমান নির্দেশনার ফলে সৃষ্ট এই অচলাবস্থা নিরসনে আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন রাখতে চাই:

  • প্রশ্ন-১: বিধির কি ভূতাপেক্ষ (Retroactive) কার্যকারিতা হয়?
    ১৫/১২/২০১৫ তারিখের পূর্বে প্রাপ্ত প্রশিক্ষণ গ্রেড বা ২০১৪ সালের উন্নীত স্কেল তৎকালীন বেতন কাঠামোর স্বতন্ত্র প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ছিল। ২০১৫ সালের নতুন গেজেটের বিধি কেন পূর্বের অর্জিত বা ভোগকৃত সুবিধাকে বর্তমানের প্রাপ্যতার পথে ‘বাঁধা’ হিসেবে বিবেচনায় নেবে? এটি কি ন্যাায়বিচারের পরিপন্থী নয়?

  • প্রশ্ন-২: সমতার নীতি কোথায়?
    ১৫/১২/২০১৫ সালের আগে যারা ২টির বেশি টাইমস্কেল বা উন্নীত স্কেল পেয়েছেন, তাদের থেকে তো বাড়তি সুবিধা ফেরত নেওয়া হচ্ছে না। তবে পরবর্তী নিয়োগপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে কেন উন্নীত স্কেলকে ‘উচ্চতর গ্রেড’ হিসেবে সমন্বয় করে তাদের প্রাপ্য আটকে দেওয়া হচ্ছে? এক দেশে দুই নিয়ম কেন?

  • প্রশ্ন-৩: উন্নীত স্কেল কি ব্যক্তিগত পদোন্নতি?
    আইনত ‘পদের মানোন্নয়ন’ (Substantive Grade) এবং ‘ব্যক্তিগত উচ্চতর গ্রেড’ দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। পুরো ক্যাডার বা পদের গ্রেড পরিবর্তনকে কেন একজন ব্যক্তির ১০ বছর চাকরির স্বীকৃতি হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে? এটি কি ব্যক্তিগত ইনক্রিমেন্ট আর পদের গ্রেড আপগ্রেডেশনকে এক করে দেখার ভুল ব্যাখ্যা নয়?

  • প্রশ্ন-৪: ফিডার পদে আজীবন বন্দি রাখা কি যৌক্তিক?
    ১৫/১২/২০১৫ সালের পরের উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্য যারা প্রশিক্ষণ গ্রেড ও উন্নীত স্কেলের সমন্বয় বিধির মারপ্যাঁচে পড়েছেন, তাদের যদি পদোন্নতি না হয়, তবে কি তারা সারাজীবন একই গ্রেডে চাকরি করবেন? তাদের ১০ ও ১৬ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতার কি কোনো আর্থিক ও সামাজিক মূল্য নেই?

  • প্রশ্ন-৫: জুনিয়ররা কি সিনিয়রের চেয়ে বেশি বেতন পাবেন?
    ২০২০ সালের পরে নিয়োগপ্রাপ্তদের বেতন গ্রেড ও ১০/১৬ বছরের প্রাপ্যতা যেভাবে সুনিশ্চিত করা হয়েছে, সে তুলনায় সিনিয়রদের (২০০৮-২০১৯ নিয়োগপ্রাপ্ত) ১৩তম গ্রেডে রেখে যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হলো, তার নৈতিক দায়ভার কে নেবে? মাঠ পর্যায়ে এই অসন্তোষ কি শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে বাধা দিবে না?

সমাধানের পথ ও উত্তরণ:
এই সার্বজনীন সমস্যা কোনো মাঠ পর্যায়ের অফিস বা অধিদপ্তরের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব নয়, কারণ তারা ২০১৫ সালের গেজেটের সীমাবদ্ধতায় বন্দি। এর একমাত্র সমাধান হতে পারে আসন্ন জাতীয় পে-স্কেল ২০২৬-এ একটি সাহসী ও যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ। আমাদের প্রত্যাশা:
১. নতুন পে-স্কেলে "সামগ্রিক পদের উন্নীত স্কেল (Substantive Upgrade)" এবং "ব্যক্তিগত চাকরির সন্তোষজনক পূর্তির সুবিধা (Higher Grade)"—এই দুটিকে সম্পূর্ণ পৃথক বিষয় হিসেবে ঘোষণা করতে হবে।
২. প্রশিক্ষণ গ্রেড বা পদের মানোন্নয়নকে ‘উচ্চতর গ্রেড’ হিসেবে সমন্বয় করার অফিস আদেশ (স্মারক ১৫৭ ও ৮৯৭) অবিলম্বে বাতিল বা সংশোধন করতে হবে।
৩. ১৫/১২/২০১৫ এর পূর্বের সুবিধাকে বর্তমানের প্রাপ্যতার পথে বাধা হিসেবে না দেখিয়ে বরং সিনিয়রিটির ভিত্তিতে সবাইকে ‘করেসপন্ডিং’ সুবিধা প্রদান করতে হবে।

উপসংহার:
প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত জনবলকে অনুপ্রাণিত করার জন্য, তাদের প্রাপ্য অধিকার কেড়ে নেওয়ার জন্য নয়। প্রাথমিক শিক্ষকরা মানুষ গড়ার কারিগর। তাদের মনে বঞ্চনা ও ক্ষোভ রেখে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা অসম্ভব। আমরা আশা করি, মাননীয় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী এবং অর্থ সচিব মহোদয় এই বৈষম্যটি গভীরভাবে অনুধাবন করবেন এবং আসন্ন ২০২৬ পে-স্কেলে শিক্ষকদের ন্যায্য অধিকার ও সম্মান ফিরিয়ে দিবেন।

#প্রাথমিক_শিক্ষক #উচ্চতর_গ্রেড_বৈষম্য #সিজিএ_আদেশ_বাতিল_চাই #PrimaryTeacherRights #PayScale2026

মন্তব্য করুন

ব্লগ