সহকারী অধ্যাপক
১৭ আগস্ট, ২০২৬ ১০:৪৩ পূর্বাহ্ণ
সহকারী অধ্যাপক
পর্যটনের অপার সম্ভাবনাময় স্থান আমাদের চলন বিল
ডক্টর মোহাম্মদ ইদ্রিস
নয়নাভিরাম চলন বিল
যতদূর চোখ যায় ওই দূর নীলিমায়-চোখ দুটো ভরে যায় সবুজের বন্যায়..। চারদিকে বিস্তৃত জররাশি ও সবুজের হাতছানি মাঝে মাঝে খড়ার জাল ফেলা ও ডিঙ্গি নৌকার ব্যস্ত চলাচল, ঢেউয়ের দোলায় জাগা শিহরণ, দূরের ধানের ক্ষেত থেকে ভেসে আসা ভাটিয়ায়ালী ও ভাওয়াইয়া গান। কলম গ্রামের তীরে অবস্থিত এক বিশাল জলাভূমি চলন বিল। কথায় আছে ‘বিল দেখতে চলন আর গ্রাম দেখতে কলম’। চলন বিল বিস্তৃত জররাশি নিয়ে চলতে চলতে অনেক পথ পাড়ি দিয়ে পুর্ব দিকে যমুনা ও দক্ষিণে পদ্মায় গিয়ে পতিত হয়। চলন বিল সব সময় চলমান অথাৎ অন্যান্য বিলের মত স্থীর নয়, প্রবল শ্রোতসহ প্রবাহমান থাকে। বর্ষার মৌসুমে চলন গতি থেকেই এ বিলের নাম ‘চলন বিল’ হিসাবে নামকরণ করা হয়েছে বলে জানা যায়। অনেক ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সৌন্দর্যের লীলাভূমি এ চলন বিল। যেখানে মিশে আছে দুঃখ-বেদনা, হাসি-আনন্দে ভরা এ অঞ্চলের মানুষের জীবনও জীবিকা। বিল পাড়ের মানুষদের জীবনচিত্র সবকিছু দেখে মুগ্ধ হওয়া ছাড়া উপায় নেই। লেখক জনাব সরদার আব্দুল হামিদ ‘চলন বিলের ইতিকথা’ বইয়ে সার্থকভাবে এগুলো ফুটিয়ে তুলেছেন।
২৭ সেপ্টেম্বর পালিত হয় বিশ্ব পর্যটন দিবস। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি গুরুত্বের সাথে পালিত হয়। আমাদের দেশে যেমন আছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ঠিক তেমনি আছে গৌরবময় ইতিহাস-ঐতিহ্যে। এ সকল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পর্যটকদের সামনে তুলে ধরা দরকার। পর্যটনের অপার সম্ভাবনাময় স্থান বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিল আমাদের চলন বিল। আসুন তাহলে আমরা একটু ঘুরি আসি আমাদের নয়নাভিরাম চলন বিল থেকে। জেনে আসি এর রুপ বৈচিত্র সম্পর্কে-
রুপ বৈচিত্রে চলন বিল: চলনবিলের রুপ-বৈচিত্র বিভিন্ন সময় বিভিন্ন আকার ধারন করে। ষড়ঋতুর প্রতি ঋতুতে যেন ভিন্ন ভিন্ন পোষাকে দেখা যায় এ বিলকে। বর্ষায় সাগরের মতো বিশাল জলরাশি বুকে নিয়ে ভয়ংকর রূপ ধারণ, শরতে শান্ত জলরাশির ওপর ছোপ ছোপ সবুজ রঙের খেলা। হেমন্তে পাকা ধানের মৌ মৌ গন্ধে মূখরিত করে চারদিক। শীতে গম ও শরিষার ক্ষেতে হলুদ আর সবুজের নিধুয়া পাথার এবং গ্রীষ্মে চলনের রূপ রুক্ষ বেদনার্ত। যেকোনো ঋতুতে চলনবিলের মূল আকর্ষণ হলো নৌকাভ্রমণ। রূপবদলের বৈচিত্র্যে শরতের চলনবিল হয়ে উঠে এক ভিন্ন জগৎ। নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা। নানা রঙের ফুল, হরেক পাখির কলরব। এ যেন প্রকৃতির এক অপরূপ সাজ। তাই চলনবিলে নিরাপদে নৌকায় ভ্রমণ করার জন্য শরত কালই শ্রেষ্ঠ সময়।
চলন বিলের উত্তরে পাবনার চাটমোহর, ভাঙ্গুরা কিংবা ফরিদপুর উপজেলার দিক থেকে; পূর্ব-উত্তরের সিরাজগঞ্জের তারাশ বা রায়গঞ্জ উপজেলার দিক থেকে; পশ্চিমে নাটোরের বড়াইড়গ্রাম সিংড়া ও গুরুদাসপুর উপজেলার দিক থেকে। অথাৎ যেকোনো প্রান্ত থেকে নৌকা নিয়ে ভেসে ভেসে আপনি যেতে পারেন বিলের গভীর প্রদেশে। একের পর এক গ্রাম, বিল, নদী নৌকায় ভেসে পার হতে হতে ধরে রাখতে পারেন জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্মৃতি। নৌকা ভাড়া করে প্রয়োজনীয় লাইফ জ্যাকেট এবং নিরাপত্তা সরঞ্জাম নিয়ে আপনি দল বেঁধে ঘুরে আসতে পারেন চলনের স্বচ্ছ জলে। পুরোটা না হলেও খোলা হাওয়ায় বিলের একটা বড় অংশ ঘুরে বেড়ানো যাবে এক দিনে। চাটমোহর ও ভাঙ্গুরার বেশ কয়েকটি স্পট থেকে লাইফ জ্যাকেট সহ চলন বিল ভ্রমণের জন্য বিভিন্ন প্যাকেজের সু-ব্যবস্থা রয়েছে। স্বল্প খরচেই আপনি ভ্রমণের সুবিধা গ্রহন করতে পারেন। চাইলে মাঝিদের বলে নৌকাতেই রান্নাবান্নার আয়োজনও করতে পারেন।
বর্ষা এবং শরতে আপনার আর ভ্রম জাগবে না যে আপনি সমুদ্রে আছেন, নাকি কোনো বিলে আছেন। এখানে জায়গায় জায়গায় দেখতে পাবেন ধানখেত, দেখতে পাবেন চাষিদের পাট ধোয়া কিংবা মাছ শিকার। এসব দেখতে দেখতে আপনি নিশ্চই অজানা অনুভূতির দেশে হারিয়ে যাবেন। ইতিহাস থেকে জানা যায়, চলন বিলের বুকে প্রমোদতরি ভাসিয়ে একসময় রাজা-বাদশারা ক্লান্তি ঝেড়েছেন। বিদেশী পর্যটকেরাও চলনবিলের বিশালতা দেখে অভিভূত হয়েছেন। লেখকেরা রচনা করেছেন বিভিন্ন কাহিনি। কালের বিবর্তে এসবের অনেকটাই এখন বিবর্ণ। উজানের ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে বিলের তলদেশে পলি জমে ধীরে ধীরে মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাচ্ছে এ বিলের বিশালতা।
বাংলাদেশের বড় বিল: চলন বিল বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিল। এটি বর্তমানে পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও নাটোর জেলা জুড়ে বিস্তৃত। সাত চল্লিশটি বিল ও ষোলটি নদী অনান্য খাল চলন বিলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত। রাজশাহী বিভাগের তিনটি জেলা, আটটি উপজেলা, ষাটটি ইউনিয়ন, এক হাজার ছয় শত গ্রাম ও দিয়ে এর বিস্তৃতি। পুরো অঞ্চলের লোকসংখ্যা প্রায় অর্ধকোটি। চলন বিলের পঠন ও ঐতিহাসিকভাবেই আত্রাই ও বড়ার নদী প্রবাহের সাথে সম্পর্কযুক্ত। বর্ষাকালে চলন বিল আশে-পাশের সকল নদী-খাল-বিল একাকার হয়ে প্রবাহিত হয়। ‘ইম্পিরিয়াল গেজেটিয়ার অব ইন্ডিয়া’ নামক বই থেকে জানা যায়, নাটোর জেলার বড়াইগ্রাম, গুরুদাসপুর, সিংড়া; নওগাঁ জেলার রানীনগর, আত্রাই; সিরাজগঞ্জ জেলার তাড়াশ, রায়গঞ্জ, উল্লাপাড়া; পাবনা জেলার চাটমোহর, ভাঙ্গুরা, ফরিদপুর, বেড়া এবং বগুড়া জেলার দক্ষিণভাগ শেরপুর মিলেই ছিল বিশাল আয়তনের চলনবিল। একসময় এর পুরোটাই ছিল বিশাল ও বিস্তীর্ণ। ১৯১৪ সালে ঈশ্বরদী-সিরাজগঞ্জ রেলপথ স্থাপনের পর উত্তর-পশ্চিম-দক্ষিণ তিন অংশে চলনবিল বিভক্ত হয়। সম্প্রতিকালে চলনবিলের মাঝখান দিয়ে বনপাড়া-হাটিকুমরুল অত্যাধুনিক হাইওয়ে সড়ক ও খুবজীপুর থেকে রায়গঞ্জ সড়ক স্থাপনের ফলে আরো কয়েকটি অংশে চলনবিল বিভক্ত হয়ে যায়।
বিলের সমাহার: আপনি হয়তবা অবাগ হতে পারেন যখন শুনবেন চলনবিলে রয়েছে বিভিন্ন নামের অনেক বিল! হ্যাঁ, বিস্তীর্ণ চলনবিলের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন নামের সাতচল্লিশটি বড় বড় বিল। আর এসকল বিলের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে চলনবিল। এই বিলগুলো চলনকে বিশালতা দিয়েছে। নানা রূপে সাজিয়েছে বিলের সৌন্দর্যকে। বিলগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ছয়আনি বিল, বাঁইড়ার বিল, সাধুগাড়ি বিল, সাঁতৈল বিল, কুড়ালিয়া বিল, ঝাকড়ার বিল, কচুগাড়ী বিল, চাতরার বিল, নিহলগাড়ি বিল, চেচুয়া বিল, টেঙ্গরগাড়ি বিল, খোলার বিল, কুমীরাগাড়ি বিল, খৈগাড়ি বিল, বৃগরিলা বিল, দিগদাড়িয়া বিল, খুলুগাড়ি বিল, কচিয়ারবিল, ধলার বিল, ধরইল বিল, বড়বিলা, বালোয়া বিল, রহুয়া বিল, সোনাডাঙ্গা বিল, তাড়াশের বড় বিল, প্রভৃতি। চলন বিলের পানি যে সব বিল দিয়ে বেশী পানি প্রবাহিত হয়, তার মধ্যে পাবনা জেলায় বিলই বেশী। পাবনা সাঁথিয়ার সোনাতলার বিল, ঘুঘুদহের বিল, ফাল্টা বিল, বড় বিল, পাবনা চাটমোহরের কুরুলিয়া বিল, দিক্ষীল বিল, দিঘীর বিল, সুজানগরের গাজনার বিল, এসব বিলের মধ্য দিয়ে চলন বিলের পানি পদ্মা ও যমুনায় পতিত হয়। এক সময় চলন বিলের আয়তন ছিল প্রায় এক হাজার বর্গকিলোমিটার। বর্তমান এর আয়তন পাঁচ শত বর্গকিলোমিটার। উত্তর উজানের ফারাক্কার বাঁধের কারণে চলন বিল দিন দিন ভরাট হয়ে যাচ্ছে ফলে জীব বৈচিত্রে এর প্রভাব পড়ছে।
নদ-নদী ও খাল: বিলের মধ্যে যখন আপনি নৌকাভ্রমণে ব্যস্ত থাকবেন, তখন শুনতে পাবেন, আপনি একটি নদীও পার হচ্ছেন। বেশ কিছু নদ-নদী ও খাল আঁকাবাঁকা জলরাশিতে তৈরি করেছে চলনবিলের আলাদা সৌন্দর্য।
চলনবিলে রয়েছে ৪ হাজার ২৮৬ হেক্টর আয়তনের ১৬টি নদী এবং ১২০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ২২টি খাল। আত্রাই নদী চলন বিলের প্রধান নদী যা বৃহত্তর রাজশাহী বিভাগের ও দিনাজপুরের বিশাল এলাকার পানি নিস্কাশন করে। বড়ার নদী চলন বিলের পানি নির্গম পথ হিসাবে কাজ করে। চলন বিলের পানি বহন করে এ নদী যমুনা নদীতে নিয়ে যায়। চলন বিলের পানি করতোয়া, ইছামতি, চিকনাই, গুমানী, তুলশি, ভাদই, বড়নোজা, তেলকুপি, ফুলঝোর, বিল সূর্য, কুমারডাঙ্গা ইত্যাদী নদীর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পদ্মা ও যমুনায় পতিত হয়। খালগুলোর মধ্যে নবী হাজির খাল, হক সাহেবের খাল, নিয়ামত খাল, সাত্তার খাল, কিনু সরকারের ধর, পানাউল্লার খাল, নিমাইচরা-বেশানী খাল, বেশানী-গুমানী খাল, উলিপুর-মাগুরা খাল, দোবিলা খাল, বেহুলার খাড়ি, বাঁকাই খাড়ি, গোহালা নদী, গাঁড়াবাড়ি-ছারুখালি খাল ও জানিগাছার জোলা অন্যতম।
১৯৬৭ সালে প্রকাশিত ‘চলনবিলের ইতিকথা’ বই থেকে জানা যায়, ১৮২৭ সালে চলনবিলের আয়তন ছিল ১০০০ বর্গমাইলের ওপরে। কিন্তু অতীব দুঃখের বিষয় বর্তমানে এই চলন বিল দ্রুত ভরাট হয়ে যাচ্ছে। প্রতি বছর পলি পড়ার কারণে বিগত দেড়শ বছরে বিলটি দক্ষিণ দিক থেকে অন্ততপক্ষে ১৯.৩২ কিলোমিটার সরে এসেছে। বিলটির পানি নিষ্কাশন প্রণালী এবং পলির বিষয়টি অনুসন্ধান করে দেখার জন্য গণপূর্ত বিভাগ ১৯০৯ সালে একটি জরিপ চালিয়ে দেখেছে যে, চলন বিল তার পূর্বেকার আয়তন ১,০৮৫ বর্গ কি.মি থেকে সংকুচিত হয়ে ৩৬৮ বর্গ কিলোমিটারে দাঁড়িয়েছে।
জীব বৈচিত্র: উত্তর উজানের পলি বয়ে আনার কারণে চলন বিলের মাটি খুবই উর্বর। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সাথে সাথে বিলের কাঁদা মাটিতে বর্তমানে বিশেষ পদ্ধতিতে বড় আকৃতির রসুনের আবাদ করা হয়। এ বিলের প্রধান ফসল হলো রসুন, ধান, গম ও সরিষা। মিঠা পানির সবচেয়ে বড় উৎস চলন বিল। চলন বিলে বছরের সব সময় প্রচুর পরিমানে দেশী মাছ পাওয়া যায়। যা সমগ্র উত্তরবঙ্গসহ সারাদেশের মাছের চাহিদা পূরণ করে থাকে। চলন বিলে পাওয়া যায় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- চিতল, কৈ, মাগুর, শিং, টাকি, বোয়াল, শোল, ফলই, মৃগেল, চিংড়ি, টেংরা, মৌসি, কালিবাউশ, রিটা, গজার, বৌ, সরপুটি, তিতপুটি, পুঁটি, গুজা, গাগর, বাঘাইর কাঁটা প্রভৃতি জাতের মাছ।
শরতের চলনবিলের রূপবিকাশে আরেকটি বৈচিত্র হচ্ছে ফুলÍশাপলা, পদ্ম, কচুরিপানা তো আছেই। আর নানা রঙের বুনো ফুল দেখা যাবে বিলজুড়ে। বিভিন্ন জলজ গাছ ও ধানের আইলে দেখা মিলবে হরেক রকম বুনো ফুল। এ ছাড়া শরতের শান্ত চলনে দেখা মিলবে হরেক পাখির। রঙিন মাছরাঙার শিকার ধরা তো আছেই। শরতের এই সময়টাতে মিলবে সবুজ ধানের খেতে সাদা বক আর জলে পানকৌড়িদের ডুবসাঁতার খেলা। এ ছাড়া শালিক, ডাহুক, ফিঙে, দোয়েল তো আছেই। এখানে শীতকালে আসে হাজার হাজার অতিথি পাখি। এদের মধ্যে আছে সরালি, লেনজা, জিরিয়া, পিয়ং, চখাচখি, রাঙ্গামুখি, ভূতিহাঁসসহ নানা রকম হাঁস, রাজহাঁস, কাঁদাখোচা, জিরিয়া, বাটান, গুলিন্দাসহ নানা রকম জলজ পাখি, হরেক রকমের গাং চিল, কাস্তেচড়া ইত্যাদি। তবে বি-রুপ পরিবেশের কারণে এসব অতিথিদের আনা-গুনা বর্তমানে অনেক কমে গেছে।
লোক-সংস্কৃতি: এখানে ভ্রমণে এলে আপনি শুনতে পাবেন দূর থেকে ভেসে আসা ধানখেতে কাজ করা, চাষিদের পাট ধোয়া, কিংবা মাছ শিকার করার সময় গাওয়া ধুয়া বা বারাশে গান আপনাকে মুগ্ধ করবে। বাদ্যযন্ত্র ছাড়াই এসর গান আপনার অনুভুতিকে আলেড়িত করবে। চলন বিল পাড়ের মানুষের সাহিত্য-সংস্কৃতি ললিত কলা সু-প্রাচীনকাল থেকে বিশেষ উৎকর্ষ সাধন করেছে। লোকশিল্প, ধাঁধা, প্রবাদ, ছড়া, লোকগীতি, আখ্যান বর্ণনায় এ অঞ্চলের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে। এখানে ধুয়া, বারাশে, জারি, সারি, তত্ত্বমূলক ইত্যাদি লোকসঙ্গীত প্রচলিত রয়েছে। এ অঞ্চলের লোকসঙ্গীত কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকেও মুগ্ধ করেছিল। চলন বিলের লোক-সংস্কৃতি নিয়ে আমার অগ্রজ প্রতিম গবেষক নাটোর সিটি কলেজের সহকারী অধ্যাপক ড. মীর নূরুল ইসলাম সাহেব এ অঞ্চলের তিনটি জেলার মানুষের সংস্কৃতিক জীবনাচরণের বিভিন্ন দিক ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। অথচ এ বিল পাড়ের মানুষদের জীবনচিত্র নিয়ে আজো কোন চলচিত্র প্রকাশিত হয়নি। ‘মনপুরা’ চলচিত্রের ন্যায় চলন বিল পাড়ের মানুষদের জীবনচিত্র নিয়ে একটি সার্থক চলচিত্র নির্মাণ সম্ভব। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। এখানে এসে আপনি ঘুরে আসতে পারেন চলন বিল যাদুঘর থেকে। চলন বিল যাদুঘর বিলের মধ্যে খুবজীপুর গ্রামে অবস্থিত।
চলন বিল যাদুঘর: ১৯৭৮ সালে চলন বিল যাদুঘরটি প্রতিষ্ঠিত হয়। চলন বিলের ইতিকথা বইয়ের লেখক জনাব সরদার আব্দুল হামিদ সাহেব প্রথমে যাদুঘরটি ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করেন। বিলের মধ্যে খুবজীপুর গ্রামে এ অঞ্চলের মানুষের জীবনাচরণের বিচিত্র দিকগুলো, প্রাচীন নিদর্শনাবলী, পুরাকীর্তি ও দর্শনীয় স্থানসমুহ তুলে ধরার জন্য তিনি যাদুঘরটি প্রতিষ্ঠা করেন। ২০০১ সালে যাদুঘরটি প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে নেওয়া হয়। উপমহাদেশের অনেক দুর্লভ নিদর্শন সংরক্ষিত রয়েছে এ যাদুঘরে। যাদুঘরের প্রবেশ পথেই রয়েছে স্যার যদুনাথ শহরের পোড়া মাটির মুর্তি। দুর্লভ নিদর্শনের মধ্য রয়েছে তুলট কাগজ, গাছের ছালে লেখা প্রাচীন মধ্যযুগের পুঁথির পান্ডুলিপি, বিভিন্ন সময়ের স্বর্ণ ও রৌপ মুদ্রা। সুলতান নাসিরুদ্দিনের নিজ হাতে লেখা কুরআন শরীফ, পোড়া মাটির ভাস্কর্য, বিভিন্ন ধরনের প্রস্তর, রাজাদের তরবারি, যুদ্ধ অস্ত্র, রাণী ভবানীর স্মৃতি, বিভিন্ন দলিল দস্তাবেজ ইত্যাদী।
যাবেন যেভাবে: রাজধানী ঢাকা থেকে চলন বিলের দূরুত্ব প্রায় ১৫০ কিলোমিমিটার। রেলও সড়ক পথে চলন বিলে যাওয়া যায়। ঢাকার গাবতলী বাস টার্মিনাল হতে দিবা-রাত্রি সব সময় এসি-ননএসি বাস রাজশাহীর উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। ঢাকা থেকে তিন-চার ঘন্টার মধ্যে গুরুদাসপুরের কাছিকাটা নামক স্থানে পৌঁছানো যায়। কাছিকাটা থেকে অটোরিক্সায় চাঁচকৈড় বাজার হয়ে চলন বিলের মুল অংশে যাওয়া যায়। রেলপথে পাবনার চাটমোহর রেল ষ্টেশন থেকে চলন বিলে সহজে পৌঁছানো যায়। আপনি বগুড়া থেকে নাটোর যেতে চাইলে চলন বিলের ভিতর দিয়েই আপনাকে যেতে হবে। আবার সিরাজগঞ্জ থেকে নাটোর বনপাড়া হয়ে রাজশাহী যেতে হলে চলন বিলের মধ্য দিয়েই আপনাকে যেতে হবে। গাড়ীতে বসেই আপনি উপভোগ করতে পারবেন এ বিলের রূপ-বৈচিত্র। এ ছাড়াও ঢাকা ফেরার পথে আপনি প্রাচীন নিদর্শন শাহ শরীফ জিন্দানী (র:) এর সমাধি, নবরতœ মন্দির, সিরাজগঞ্জ শহর, যমুনা সেতুসহ আশে-পাশের অনেক দর্শনীয় স্থান পরিদর্শন করে আসতে পারেন। চলন বিলের চাঁচকৈড় বাজারে রাত্রি যাপনের জন্য হোটেল ও বোডিং রয়েছে। পাবনা শহরে রাত্রি যাপনের জন্য বিভিন্ন রকমের রিসোর্ট, হোটেল ও কটেজ রয়েছে। হাতে এক-দুইদিন সময় থাকলে চাটমোহর শাহী মসজিদ, জগন্নাথমন্দির; ফরিদপুরের বনওয়ারী নগর জমিদারবাড়ি; ভাড়ারা-সাদুল্ল¬াহপুর মসজিদ, পাকশী, জোড় বাংলা মন্দির, মানসিক হাসপাতাল, সুচিত্রা সেন, অনুকুল চন্দ্র, রাজা রায় বাহাদুর ও কবি বন্দে আলী মিয়ার স্মৃৃতি বিজরিত বাড়ি ঘুরে আসতে পারেন। এ ছাড়া নাটোরের উত্তরা গণভরন, নাটোরের রাজবাড়ি ঘুরে আসতে পারেন। খেতে পারবেন হাঁস ও পাখীর গোসত। পাবেন চলন বিলের মিঠা পানির মাছ। কিনতে পারবেন পাবনার তাঁতের শাড়ী-লুঙ্গী-গামছা, খাঁটিঁ দুধের নানা-রকমের মিষ্টান্ন এবং আউশ-আমন ধানের চিড়া, মুড়ি ও খই।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সাঁথিয়া মহিলা ডিগ্রি কলেজ, পাবনা।
৬৫
১০০ মন্তব্য