Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৭ আগস্ট, ২০২৬ ০৭:১১ অপরাহ্ণ

বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ১ম উচ্চতর গ্রেড: বিএড স্কেল নয়, ১ম এমপিও থেকে গণনার যৌক্তিকতা

বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ১ম উচ্চতর গ্রেড: বিএড স্কেল নয়, ১ম এমপিও থেকে গণনার যৌক্তিকতা

ভূমিকা

বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের চাকরিজীবনে উচ্চতর গ্রেড একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দীর্ঘদিন চাকরি করার পর একজন শিক্ষক যখন উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন, তখন তাঁর বেতন-ভাতা নির্ধারণে চাকরির মেয়াদ কী তারিখ থেকে গণনা করা হবে—এ প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

বিশেষ করে যেসব শিক্ষক বিএড ডিগ্রি অর্জনের পর বিএড স্কেলে বেতন নির্ধারণ করেছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে একটি বিতর্ক দেখা যায়—উচ্চতর গ্রেডের জন্য চাকরির সময়কাল কি বিএড স্কেলে যাওয়ার তারিখ থেকে গণনা করা হবে, নাকি প্রথম এমপিওভুক্তির তারিখ থেকে?

শিক্ষকদের একটি বড় অংশের দাবি হলো, উচ্চতর গ্রেড নির্ধারণে বিএড স্কেলকে চাকরির নতুন সূচনা হিসেবে গণ্য করা উচিত নয়; বরং প্রথম এমপিওভুক্তির তারিখ থেকেই চাকরির ধারাবাহিকতা গণনা করা উচিত। এই দাবির পেছনে রয়েছে চাকরির ধারাবাহিকতা, পদ ও প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকার বাস্তবতা এবং বেতনস্কেল পরিবর্তনের প্রকৃতি।


উচ্চতর গ্রেড কী?

উচ্চতর গ্রেড হলো নির্দিষ্ট সময় ধরে একই পদে দায়িত্ব পালনকারী যোগ্য কর্মচারী বা শিক্ষকের বেতন কাঠামোর উন্নয়ন। এর উদ্দেশ্য হলো দীর্ঘদিনের চাকরি, অভিজ্ঞতা ও দায়িত্বের স্বীকৃতি প্রদান করা।

একজন শিক্ষক প্রথমে যে পদে নিয়োগ পান, পরবর্তীতে প্রশিক্ষণ বা শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জনের কারণে তাঁর বেতনস্কেল পরিবর্তিত হতে পারে। কিন্তু বেতনস্কেল পরিবর্তন মানেই চাকরির নতুন নিয়োগ বা নতুন চাকরিতে প্রবেশ নয়।

এই পার্থক্যটি উচ্চতর গ্রেড নির্ধারণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


বিএড স্কেল কি নতুন চাকরির সূচনা?

একজন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বিএড ডিগ্রি অর্জনের পর যখন বিএড স্কেলে বেতন নির্ধারণ করেন, তখন মূলত তাঁর বেতন কাঠামোর পরিবর্তন ঘটে। তিনি নতুন করে একই প্রতিষ্ঠানে নিয়োগপ্রাপ্ত হন না এবং সাধারণত তাঁর পূর্ববর্তী চাকরির অভিজ্ঞতাও বাতিল হয়ে যায় না।

অর্থাৎ—

প্রথম এমপিও → চাকরির ধারাবাহিকতা → বিএড অর্জন → বিএড স্কেল

এখানে বিএড স্কেলকে চাকরির নতুন সূচনাবিন্দু হিসেবে বিবেচনা করলে একজন শিক্ষকের পূর্ববর্তী চাকরির মেয়াদ কার্যত উপেক্ষিত হয়ে যায়।

তাই যুক্তিসঙ্গতভাবে বলা যায়, বিএড স্কেল একটি বেতন-উন্নয়ন বা বেতন পুনর্নির্ধারণের বিষয়; এটি চাকরির নতুন নিয়োগের সমতুল্য নয়।


কেন ১ম এমপিও থেকে উচ্চতর গ্রেড গণনা করা যৌক্তিক?

১. চাকরির ধারাবাহিকতা বজায় থাকে

একজন শিক্ষক প্রথম এমপিওভুক্ত হওয়ার পর থেকে নিয়মিতভাবে একই প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করে আসতে পারেন। বিএড অর্জনের কারণে তাঁর বেতনস্কেল পরিবর্তিত হলেও তাঁর চাকরি বিচ্ছিন্ন হয়নি।

তাই চাকরির প্রকৃত ধারাবাহিকতা বিবেচনায় প্রথম এমপিওভুক্তির তারিখ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হওয়া উচিত।

২. বিএড স্কেল নতুন নিয়োগ নয়

বিএড স্কেল পাওয়ার অর্থ শিক্ষক নতুন পদে নতুন করে নিয়োগ পেয়েছেন—এমন নয়। বরং নির্দিষ্ট শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জনের ফলে তাঁর বেতন নির্ধারণে পরিবর্তন এসেছে।

সুতরাং শুধুমাত্র বিএড স্কেলের তারিখ থেকে চাকরির মেয়াদ গণনা করলে বেতনস্কেল পরিবর্তনকে নতুন নিয়োগের সঙ্গে তুলনা করা হয়, যা বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে।

৩. পূর্বের চাকরির অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন প্রয়োজন

একজন শিক্ষক বিএড স্কেলে যাওয়ার আগে যদি বহু বছর ধরে বিদ্যালয়ে দায়িত্ব পালন করে থাকেন, তাহলে সেই অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করা শিক্ষকের দীর্ঘ কর্মজীবনের যথাযথ মূল্যায়ন নয়।

উচ্চতর গ্রেডের মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে চাকরির অভিজ্ঞতার বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই পূর্ববর্তী চাকরিকাল যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

৪. শিক্ষকদের মধ্যে বৈষম্য কমবে

একই সময়ে চাকরিতে যোগ দেওয়া দুইজন শিক্ষক যদি একই পদে দায়িত্ব পালন করেন, কিন্তু একজন আগে বিএড স্কেলে এবং অন্যজন পরে বিএড স্কেলে যান, তাহলে কেবল বিএড স্কেলের তারিখকে ভিত্তি করলে তাঁদের উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সময়ের মধ্যে অযৌক্তিক পার্থক্য তৈরি হতে পারে।

প্রথম এমপিও থেকে চাকরিকাল গণনা করলে এ ধরনের বৈষম্য অনেকাংশে কমানো সম্ভব।


একটি উদাহরণ

ধরা যাক, একজন শিক্ষক ১ জানুয়ারি ২০১২ সালে একটি বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নিয়োগ পেলেন এবং পরবর্তীতে ১ জুলাই ২০১৩ সালে প্রথম এমপিওভুক্ত হলেন। তিনি কয়েক বছর চাকরি করার পর ১ জুলাই ২০১৮ সালে বিএড ডিগ্রি অর্জন করে বিএড স্কেলে বেতন নির্ধারণ করলেন।

এখানে দুটি তারিখকে সামনে আনা যায়—

  • প্রথম এমপিও: ১ জুলাই ২০১৩

  • বিএড স্কেল: ১ জুলাই ২০১৮

যদি উচ্চতর গ্রেডের চাকরিকাল বিএড স্কেলের তারিখ থেকে গণনা করা হয়, তাহলে ২০১৩ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত তাঁর চাকরির সময়কাল কার্যত উচ্চতর গ্রেডের হিসাব থেকে বাদ পড়ে যায়।

অন্যদিকে প্রথম এমপিওভুক্তির তারিখ থেকে চাকরিকাল গণনা করলে তাঁর প্রকৃত এমপিওভুক্ত চাকরির ধারাবাহিকতা বিবেচনায় আসে।

এ কারণেই শিক্ষকদের দাবি—বিএড স্কেল নয়, প্রথম এমপিওভুক্তির তারিখকে ভিত্তি ধরে উচ্চতর গ্রেডের চাকরিকাল গণনা করা উচিত।


প্রথম এমপিও কেন গুরুত্বপূর্ণ?

বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের চাকরির ক্ষেত্রে এমপিওভুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও আর্থিক মাইলফলক। এমপিওভুক্তির মাধ্যমে শিক্ষক সরকারি বেতন-ভাতার কাঠামোর আওতায় আসেন।

তাই উচ্চতর গ্রেডের ক্ষেত্রে যদি এমপিওভুক্ত চাকরির মেয়াদ বিবেচনা করা হয়, তাহলে প্রথম এমপিওভুক্তির তারিখ একটি স্বাভাবিক ও বাস্তবসম্মত ভিত্তি হতে পারে।

তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট রাখা জরুরি—চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অবশ্যই সংশ্লিষ্ট সরকারি বিধিমালা, পরিপত্র, এমপিও নীতিমালা এবং কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।


বিএড শিক্ষকদের ক্ষেত্রে সমস্যাটি কোথায়?

বিএড ডিগ্রি শিক্ষকের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বিএড অর্জনের কারণে যদি উচ্চতর গ্রেডের জন্য পূর্বের এমপিওভুক্ত চাকরিকাল বাদ দেওয়া হয়, তাহলে শিক্ষকের কাছে বিষয়টি বৈষম্যমূলক মনে হতে পারে।

কারণ—

বিএড অর্জন = পেশাগত যোগ্যতার উন্নয়ন

কিন্তু

বিএড স্কেল = বেতন নির্ধারণের পরিবর্তন

এ দুটিকে চাকরির নতুন সূচনা হিসেবে একইভাবে বিবেচনা করা যুক্তিসঙ্গত নয়—এমন মত শিক্ষকদের মধ্যে রয়েছে।


প্রশাসনিক স্বচ্ছতার প্রয়োজন

উচ্চতর গ্রেড নিয়ে বিভিন্ন সময়ে শিক্ষকদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। একই ধরনের চাকরির ক্ষেত্রে কোথা থেকে চাকরিকাল গণনা করা হবে—এ বিষয়ে স্পষ্ট ও একক নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন।

এক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের উচিত—

  1. প্রথম এমপিওভুক্তির তারিখ কীভাবে গণনায় আসবে তা স্পষ্ট করা;

  2. বিএড স্কেলে বেতন নির্ধারণের প্রভাব ব্যাখ্যা করা;

  3. চাকরির ধারাবাহিকতা কীভাবে বিবেচিত হবে তা নির্দিষ্ট করা;

  4. একই ধরনের শিক্ষকদের ক্ষেত্রে একই নীতি প্রয়োগ করা;

  5. পূর্ববর্তী চাকরিকাল গণনার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও প্রমাণের তালিকা প্রকাশ করা।


শিক্ষকদের ন্যায্য প্রত্যাশা

একজন শিক্ষক তাঁর কর্মজীবনের দীর্ঘ সময় শিক্ষার্থীদের পাঠদান, বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং শিক্ষার মানোন্নয়নে ব্যয় করেন। তাঁর বেতনস্কেল পরিবর্তনের কারণে যদি পূর্বের চাকরির অভিজ্ঞতা অগ্রাহ্য হয়, তাহলে দীর্ঘ চাকরিজীবনের স্বীকৃতি প্রশ্নের মুখে পড়ে।

তাই শিক্ষকদের প্রত্যাশা হলো, উচ্চতর গ্রেড নির্ধারণে বাস্তব চাকরির ধারাবাহিকতা ও প্রযোজ্য সরকারি বিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হবে।

বিশেষ করে প্রথম এমপিওভুক্তির পর থেকে যদি শিক্ষক একই পদে ও ধারাবাহিকভাবে চাকরি করে থাকেন, তাহলে সেই চাকরিকাল উচ্চতর গ্রেডের হিসাবের ক্ষেত্রে কীভাবে গণনা হবে—এ বিষয়ে সুস্পষ্ট প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত থাকা অত্যন্ত জরুরি।


উপসংহার

বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উচ্চতর গ্রেড একটি অধিকার ও চাকরিজীবনের গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতির বিষয়। বিএড স্কেলকে চাকরির নতুন সূচনা হিসেবে বিবেচনা করা হবে, নাকি প্রথম এমপিওভুক্তির তারিখ থেকে চাকরিকাল গণনা করা হবে—এটি কেবল বেতন নির্ধারণের বিষয় নয়; এর সঙ্গে শিক্ষকের দীর্ঘ কর্মজীবন ও ন্যায্যতার প্রশ্নও জড়িত।

শিক্ষকদের বক্তব্যের মূল যুক্তি হলো—বিএড স্কেল চাকরির নতুন নিয়োগ নয়; এটি যোগ্যতা অর্জনের ফলে বেতনস্কেলের পরিবর্তন। ফলে উচ্চতর গ্রেডের ক্ষেত্রে প্রথম এমপিওভুক্তির তারিখ থেকে চাকরির ধারাবাহিকতা বিবেচনা করার দাবি বাস্তবতা ও ন্যায্যতার আলোকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

মূল কথা: বিএড স্কেল একটি বেতনস্কেল পরিবর্তন; আর প্রথম এমপিও একজন শিক্ষকের এমপিওভুক্ত চাকরিজীবনের গুরুত্বপূর্ণ সূচনাবিন্দু। উচ্চতর গ্রেড নির্ধারণে এই পার্থক্যটি স্পষ্টভাবে বিবেচনা করাই ন্যায়সংগত ব্যবস্থার ভিত্তি হতে পারে।

মন্তব্য করুন