সহকারী অধ্যাপক
১৭ আগস্ট, ২০২৬ ০৯:২১ অপরাহ্ণ
আল্লাহর বিধান মেনে চলি - মোঃ মুজিবুর রহমান
আল্লাহর বিধান মেনে চলি
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর
ভূমিকা
মানুষ এই পৃথিবীতে স্বাধীনভাবে বসবাস করলেও সে সম্পূর্ণ বিধিবিধানহীন নয়। তার জীবন, জীবিকা, পরিবার, সমাজ, নৈতিকতা ও আখিরাত—সবকিছুর সঙ্গে সৃষ্টিকর্তার নির্দেশনা গভীরভাবে সম্পর্কিত। মহান আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্য দিয়েছেন হালাল-হারামের বিধান, ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য এবং বৈধ-অবৈধের সীমারেখা। তাই একজন মুমিনের প্রকৃত সফলতা কেবল ধন-সম্পদ, ক্ষমতা, খ্যাতি বা পার্থিব ভোগে নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং তাঁর বিধান অনুযায়ী জীবন পরিচালনার মধ্যেই নিহিত।
আল্লাহর বিধান মেনে চলা শুধু মুখে কিছু কথা বলা বা নির্দিষ্ট কিছু ইবাদত পালন করার নাম নয়। এর অর্থ হলো জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর নির্দেশকে প্রাধান্য দেওয়া—ইবাদতে, চরিত্রে, উপার্জনে, পরিবারে, ব্যবসা-বাণিজ্যে, সামাজিক আচরণে, ন্যায়বিচারে এবং মানুষের অধিকার আদায়ে। প্রদত্ত মূল রচনাতেও এই ব্যাপক জীবনদৃষ্টিই তুলে ধরা হয়েছে—আল্লাহর হক ও বান্দার হক উভয়ই যথাযথভাবে আদায়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আল্লাহর বিধান মানুষের কল্যাণের জন্য
মহান আল্লাহ আসমান-জমিন সৃষ্টি করেছেন, মানুষকে জীবন দিয়েছেন এবং তাকে জ্ঞান-বিবেক দিয়ে সত্য ও মিথ্যা, ন্যায় ও অন্যায় এবং বৈধ ও অবৈধের পার্থক্য বোঝার সামর্থ্য দিয়েছেন। মানুষের কল্যাণের জন্যই তিনি বিভিন্ন বিধান দিয়েছেন। এসব বিধান মানুষের জীবনকে শৃঙ্খলিত করে, চরিত্রকে সুন্দর করে এবং সমাজে ন্যায় ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করে।
মানুষ যখন নিজের প্রবৃত্তি, লোভ, অহংকার ও স্বার্থকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে স্থান দেয়, তখন অন্যায়, দুর্নীতি, প্রতারণা, জুলুম ও অধিকারহরণের পথ খুলে যায়। পক্ষান্তরে, যখন সে আল্লাহর বিধানকে জীবনের মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করে, তখন তার ব্যক্তিজীবন যেমন সুন্দর হয়, তেমনি পরিবার ও সমাজেও শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
অতএব, আল্লাহর বিধান মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার জন্য নয়; বরং মানুষকে অন্যায়, পাপ, শোষণ ও আত্মবিনাশ থেকে রক্ষা করে কল্যাণের পথে পরিচালিত করার জন্য।
হালাল-হারামের সীমারেখা
ইসলামী জীবনব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো হালাল ও হারামের পার্থক্য বোঝা। আল্লাহ যেসব বিষয় বৈধ করেছেন, সেগুলো গ্রহণ করা এবং যেসব বিষয় নিষিদ্ধ করেছেন, সেগুলো থেকে বিরত থাকা একজন মুমিনের দায়িত্ব। প্রদত্ত লেখাতেও বলা হয়েছে—হালাল পথে রুজি অর্জন করতে হবে এবং হারাম পথ থেকে দূরে থাকতে হবে।
উপার্জনের ক্ষেত্রে এই নীতি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। অল্প হলেও হালাল উপার্জন মানুষের জীবনে প্রশান্তি ও বরকত আনতে পারে। অন্যদিকে অন্যায়, প্রতারণা, ঘুষ, আত্মসাৎ বা অবৈধ পন্থায় অর্জিত সম্পদ বাহ্যিকভাবে বেশি মনে হলেও তা মানুষের নৈতিক ও আত্মিক জীবনে ক্ষতি করতে পারে।
তাই একজন সচেতন মানুষকে সব সময় নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে—আমি যে অর্থ উপার্জন করছি, তা কি বৈধ পথে? আমি যে ব্যবসা করছি, তাতে কি কারও অধিকার নষ্ট হচ্ছে? আমি কি ওজনে বা মাপে কম দিচ্ছি? আমি কি আমানতের খেয়ানত করছি? এসব প্রশ্নের উত্তর নিজের বিবেকের কাছে এবং সর্বোপরি আল্লাহর কাছে দিতে হবে।
সত্যবাদিতা ও আমানতদারি
সত্যবাদিতা মুমিনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ। সত্য মানুষকে বিশ্বাসযোগ্য করে, আর মিথ্যা মানুষের চরিত্র ও সম্পর্ককে দুর্বল করে। পরিবার, ব্যবসা, শিক্ষা, চাকরি কিংবা সামাজিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সত্যবাদিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কাউকে ঠকানো, প্রতারণা করা, আমানতের খেয়ানত করা, ওজনে কম দেওয়া, মাপে কম দেওয়া বা অন্যের অধিকার আত্মসাৎ করা ইসলামী নৈতিকতার পরিপন্থী। তাই আমাদের কথা ও কাজে সততা থাকতে হবে। প্রদত্ত লেখায় ঘুষ, প্রতারণা, জুলুম, অন্যের হক নষ্ট করা এবং ওজনে-মাপে কম দেওয়ার মতো অন্যায় থেকে দূরে থাকার ওপর বিশেষভাবে জোর দেওয়া হয়েছে।
একজন সত্যবাদী মানুষ হয়তো সব সময় তাৎক্ষণিকভাবে বেশি লাভবান নাও হতে পারেন; কিন্তু তার প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি হয় এবং তার জীবন নৈতিক দৃঢ়তা লাভ করে। সত্য ও আমানতদারি একটি সুন্দর সমাজের অন্যতম ভিত্তি।
অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের দায়িত্ব
আল্লাহ মানুষকে চোখ, কান, জিহ্বা, হাত, পা ও হৃদয় দিয়েছেন। এসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গেরও নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে। চোখ দিয়ে যা দেখা উচিত নয়, তা দেখা থেকে বিরত থাকতে হবে। জিহ্বা দিয়ে মিথ্যা, গীবত, অপবাদ, অশ্লীলতা বা কটু কথা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে। কান দিয়ে সব কথা শোনা উচিত নয়; ভালো ও কল্যাণকর বিষয় গ্রহণ করতে হবে।
হাত যেন অন্যায়ের কাজে ব্যবহৃত না হয়, পা যেন অন্যায়ের পথে না চলে এবং হৃদয় যেন অহংকার, হিংসা, বিদ্বেষ ও পাপের প্রতি আসক্ত না হয়। মানুষের প্রতিটি কাজই আল্লাহর জ্ঞাত। তাই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং আত্মশুদ্ধির চেষ্টা করা একজন মুমিনের অপরিহার্য দায়িত্ব। মূল লেখাতেও চোখ, জিহ্বা, কান, হাত, পা ও হৃদয়ের দায়িত্ব এবং কর্মের হিসাবের বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
ইবাদত ও নৈতিকতার সমন্বয়
আল্লাহর বিধান মেনে চলার অর্থ শুধু নামাজ, রোজা ও অন্যান্য ইবাদত পালন করা নয়; মানুষের অধিকার রক্ষা করাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একজন মানুষ নিয়মিত ইবাদত করেও যদি অন্যের প্রতি অন্যায় করে, প্রতারণা করে, অধিকার নষ্ট করে বা মানুষের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করে, তবে তার নৈতিক জীবনে বড় ধরনের অসংগতি থেকে যায়।
তাই ইবাদতের পাশাপাশি মানুষের সঙ্গে সুন্দর আচরণ, সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতা, দয়া, ক্ষমা, আমানতদারি ও দায়িত্বশীলতা গড়ে তুলতে হবে। মূল লেখায়ও আল্লাহর হক ও বান্দার হক—উভয়কে যথাযথভাবে আদায়ের কথা বলা হয়েছে।
নামাজ মানুষকে আল্লাহর স্মরণে রাখে, কুরআন তাকে সঠিক পথের দিশা দেয়, তাকওয়া তাকে পাপ থেকে দূরে রাখে এবং সবর তাকে বিপদের সময়ে দৃঢ় থাকতে সাহায্য করে। ফলে ইবাদত ও নৈতিকতা পরস্পরের পরিপূরক।
পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ব
আল্লাহর বিধান মেনে চলার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ। তাঁদের সম্মান করা, সেবা করা, প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ানো এবং তাঁদের সঙ্গে কোমল ভাষায় কথা বলা সন্তানের নৈতিক দায়িত্ব।
পিতা-মাতা সন্তানের জন্য যে ত্যাগ স্বীকার করেন, তা সহজে পরিশোধ করা সম্ভব নয়। তাই তাঁদের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধ প্রকাশ করা উচিত। একই সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা এবং আত্মীয়স্বজনের ন্যায্য অধিকার আদায় করাও ইসলামী জীবনব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
পরিবারে আল্লাহর বিধানের প্রয়োগ
একটি শান্তিপূর্ণ পরিবার গড়ে ওঠে পারস্পরিক সম্মান, দায়িত্ববোধ, ভালোবাসা, ক্ষমাশীলতা ও সুন্দর আচরণের মাধ্যমে। স্বামী-স্ত্রী যদি একে অপরকে সম্মান করেন, পরস্পরের অধিকার বুঝতে চেষ্টা করেন এবং রাগ, অপমান ও কটু কথা থেকে বিরত থাকেন, তাহলে পরিবারে শান্তি ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধি পায়।
বিশেষ করে সন্তানের সামনে বাবা-মায়ের আচরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুরা শুধু উপদেশ শুনে শেখে না; তারা বড়দের আচরণ দেখে শেখে। বাবা-মায়ের মধ্যে যদি পারস্পরিক সম্মান, সহমর্মিতা ও দায়িত্বশীলতা থাকে, তাহলে সন্তানও সুন্দর আচরণের শিক্ষা পায়। প্রদত্ত রচনায় ঘরকে সন্তানের নৈতিক শিক্ষার প্রথম ক্ষেত্র হিসেবে দেখানো হয়েছে।
অতএব, পরিবারে আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠার অর্থ হলো ভালোবাসা, ন্যায়, দায়িত্ব ও শালীনতার পরিবেশ তৈরি করা।
সমাজজীবনে আল্লাহর বিধান
মানুষ একা বসবাস করে না। সে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের অংশ। তাই ব্যক্তিগত নৈতিকতার পাশাপাশি সামাজিক দায়িত্বও পালন করতে হয়।
ব্যবসায়ী সত্যবাদী হলে, কৃষক দায়িত্বশীল হলে, শ্রমিক নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করলে, শিক্ষক ন্যায় ও আদর্শ শিক্ষা দিলে, চিকিৎসক সেবার মনোভাব নিয়ে কাজ করলে, বিচারক ন্যায়বিচার করলে এবং দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা নিজেদের কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করলে সমাজে আস্থা ও স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পায়। প্রদত্ত লেখাতেও বিভিন্ন পেশার মানুষের দায়িত্বশীলতা ও সততার মাধ্যমে সমাজের শক্তিশালী হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
অন্যদিকে দুর্নীতি, ঘুষ, প্রতারণা, শোষণ, জুলুম, পক্ষপাতিত্ব ও অধিকারহরণ সমাজকে দুর্বল করে। তাই সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রত্যেককে নিজের দায়িত্ব সৎভাবে পালন করতে হবে।
প্রতিবেশী ও দুর্বল মানুষের অধিকার
ইসলামী জীবনব্যবস্থায় মানুষের প্রতি দয়া ও সহমর্মিতার গুরুত্ব অনেক। প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা করা, বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানো, দুর্বলকে সহযোগিতা করা, ছোটদের স্নেহ করা এবং বড়দের সম্মান করা সুন্দর মানবিক চরিত্রের পরিচয়।
মানুষের মর্যাদা রক্ষা করা ধর্মীয় ও নৈতিক দায়িত্ব। কারও দারিদ্র্য, দুর্বলতা বা অসহায়ত্বকে উপহাস না করে তাকে সহযোগিতা করা উচিত। একটি সমাজ তখনই সত্যিকার অর্থে সুন্দর হয়, যখন সেখানে শক্তিশালী ব্যক্তি দুর্বলকে অবহেলা না করে বরং তার পাশে দাঁড়ায়।
কথাবার্তায় সংযম
মানুষের জিহ্বা ছোট হলেও এর প্রভাব অনেক বড়। একটি সুন্দর কথা মানুষের মন আনন্দে ভরিয়ে দিতে পারে; আবার একটি কটু কথা মানুষের হৃদয়ে দীর্ঘস্থায়ী কষ্ট সৃষ্টি করতে পারে। তাই কথা বলার আগে চিন্তা করা প্রয়োজন।
রাগের সময় নিজেকে সংযত রাখা, কাউকে অপমান না করা, মিথ্যা না বলা, গীবত ও অপবাদ থেকে বিরত থাকা এবং সম্ভব হলে সুন্দর ও কল্যাণকর কথা বলা উচিত। মূল রচনায়ও কথার ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাব তুলে ধরে কথা বলার আগে চিন্তা করার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।
সুন্দর আচরণ মানুষের হৃদয় জয় করে। তাই আমাদের ভাষা হোক ভদ্র, সংযত, সত্য ও কল্যাণমুখী।
বিপদে সবর, সুখে শুকর
মানুষের জীবন সব সময় একরকম থাকে না। কখনো সুখ আসে, কখনো দুঃখ; কখনো সাফল্য আসে, কখনো ব্যর্থতা। একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো—সুখের সময়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা এবং বিপদের সময়ে সবর করা।
বিপদ এলে হতাশ হয়ে পড়া নয়; বরং বৈধ ও বাস্তব উপায় অবলম্বন করে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা উচিত। তাওয়াক্কুল মানে চেষ্টা ছেড়ে দেওয়া নয়; বরং যথাসাধ্য চেষ্টা করার পর ফলাফলের ব্যাপারে আল্লাহর ওপর নির্ভর করা।
মূল লেখায় সুখের দিনে শুকর, দুঃখে সবর এবং বিপদের সময় আল্লাহর ওপর ভরসা রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ভুল হলে তাওবা
মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। কখনো জ্ঞান বা বিবেকের দুর্বলতায় মানুষ ভুল করে বসতে পারে। কিন্তু ভুলের পরও যদি সে নিজের ভুল বুঝতে পারে, অনুতপ্ত হয়, অন্যায় থেকে ফিরে আসে এবং সংশোধনের চেষ্টা করে, তবে তার জন্য কল্যাণের দরজা খোলা থাকে।
তাই পাপ বা ভুল হয়ে গেলে হতাশ না হয়ে আল্লাহর কাছে তাওবা করতে হবে। একই ভুল বারবার না করার জন্য দৃঢ় সংকল্প করতে হবে এবং সম্ভব হলে যার অধিকার নষ্ট হয়েছে, তার অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। প্রদত্ত লেখায়ও ভুলের পর আল্লাহর দিকে ফিরে আসা, তাওবা করা এবং সৎকর্মের মাধ্যমে নিজেকে সংশোধনের আহ্বান জানানো হয়েছে।
দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী
পৃথিবীর জীবন চিরস্থায়ী নয়। মানুষের ধন-সম্পদ, ক্ষমতা, পদমর্যাদা, খ্যাতি ও বাহ্যিক জৌলুশ একদিন শেষ হয়ে যাবে। মৃত্যুর পর মানুষ পৃথিবীর সম্পদ সঙ্গে নিয়ে যেতে পারবে না। তার সঙ্গে থাকবে তার আমল।
এই উপলব্ধি মানুষকে দায়িত্বশীল করে। যখন মানুষ বুঝতে পারে যে একদিন তার কাজের হিসাব দিতে হবে, তখন সে অন্যায় থেকে দূরে থাকার এবং ভালো কাজ করার চেষ্টা করে। মূল রচনায়ও মৃত্যু, কবর, হাশর এবং কর্মের হিসাবের কথা উল্লেখ করে নেক আমলকে মানুষের প্রকৃত পাথেয় হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
তাই জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে মূল্যবান মনে করা উচিত। সময় চলে গেলে আর ফিরে আসে না। আজ যে ভালো কাজ করার সুযোগ আছে, তা কাল পাওয়া যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
আখিরাতের সফলতা
ইসলামী দৃষ্টিতে প্রকৃত সফলতা হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং আখিরাতে নাজাত লাভ করা। দুনিয়ার সাফল্য প্রয়োজনীয় হলেও তা চূড়ান্ত নয়। একজন মানুষ দুনিয়ায় ধনী, ক্ষমতাবান বা বিখ্যাত হতে পারেন; কিন্তু যদি তার জীবন অন্যায় ও অবাধ্যতায় পরিপূর্ণ হয়, তবে সেই বাহ্যিক সাফল্য প্রকৃত সফলতার মানদণ্ড হতে পারে না।
অন্যদিকে একজন সাধারণ মানুষও যদি সত্যবাদী, সৎ, আমানতদার, ন্যায়পরায়ণ ও আল্লাহভীরু হন, তবে তার জীবন মহান মর্যাদা লাভ করতে পারে। তাই দুনিয়ার দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি আখিরাতের জন্যও প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন।
আল্লাহর বিধান মেনে চলার বাস্তব অঙ্গীকার
আল্লাহর বিধান মেনে চলার জন্য আমাদের জীবনে কিছু সুস্পষ্ট অঙ্গীকার থাকা প্রয়োজন। যেমন—
১. আল্লাহর প্রতি ঈমান দৃঢ় করা।
২. নিয়মিত নামাজ ও অন্যান্য ফরজ ইবাদত যথাযথভাবে পালন করা।
৩. কুরআন ও সুন্নাহর শিক্ষা বোঝার চেষ্টা করা।
৪. হালাল উপার্জনের চেষ্টা করা।
৫. হারাম ও সন্দেহজনক বিষয় থেকে যথাসম্ভব দূরে থাকা।
৬. সত্য কথা বলা এবং আমানত রক্ষা করা।
৭. অন্যের অধিকার নষ্ট না করা।
৮. ঘুষ, প্রতারণা, জুলুম ও দুর্নীতি থেকে বিরত থাকা।
৯. পিতা-মাতা, আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীর অধিকার আদায় করা।
১০. স্বামী-স্ত্রী, সন্তান ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সুন্দর আচরণ করা।
১১. ছোটদের স্নেহ ও বড়দের সম্মান করা।
১২. রাগ, অহংকার, হিংসা ও বিদ্বেষ নিয়ন্ত্রণ করা।
১৩. সুখে শুকর এবং দুঃখে সবর করা।
১৪. ভুল হলে দ্রুত তাওবা ও সংশোধনের পথে ফিরে আসা।
১৫. প্রতিটি কাজের আখিরাতের জবাবদিহির কথা স্মরণ রাখা।
উপসংহার
আল্লাহর বিধান মেনে চলা একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন। এটি শুধু মসজিদ বা ইবাদতের স্থানে সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানুষের ব্যক্তিজীবন থেকে পারিবারিক জীবন, শিক্ষা থেকে কর্মক্ষেত্র, ব্যবসা থেকে সামাজিক সম্পর্ক—জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এর প্রভাব রয়েছে।
আল্লাহর বিধান মেনে চললে মানুষ সত্য ও ন্যায়ের পথে দৃঢ় হতে পারে, হারাম থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারে, মানুষের অধিকার আদায় করতে পারে এবং নিজের চরিত্রকে সুন্দর করতে পারে। পরিবারে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে ভালোবাসা ও শান্তি; সমাজে বাড়তে পারে ন্যায় ও পারস্পরিক আস্থা; আর ব্যক্তির অন্তরে জাগতে পারে তাকওয়া, আত্মসংযম ও আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা।
তাই আমাদের জীবনের মূলনীতি হওয়া উচিত—আল্লাহ যা বৈধ করেছেন তা গ্রহণ করা, যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা, সত্য ও ন্যায়ের পথে অটল থাকা এবং মানুষের অধিকার যথাযথভাবে আদায় করা। পৃথিবীর জীবন ক্ষণস্থায়ী; একদিন সবাইকে মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হবে এবং নিজ নিজ কর্মের জবাব দিতে হবে। সুতরাং সময় থাকতে আমাদের জীবনকে নেক আমল, সত্য, ন্যায়, তাকওয়া ও মানবিকতায় পরিপূর্ণ করা প্রয়োজন।
আল্লাহর বিধান মেনে চলাই মুমিনের সম্মান, চরিত্রের সৌন্দর্য, জীবনের কল্যাণ এবং আখিরাতের সফলতার অন্যতম পথ। আমাদের প্রত্যেকের অঙ্গীকার হোক—আমরা হালাল পথে চলব, হারাম থেকে দূরে থাকব, সত্য ও ন্যায়কে ধারণ করব, মানুষের অধিকার রক্ষা করব এবং সর্বাবস্থায় মহান আল্লাহর সন্তুষ্টিকে জীবনের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করব।
হে মহান আল্লাহ! আমাদের সঠিক পথের ওপর অটল রাখুন। হালাল-হারাম বুঝে চলার তাওফিক দিন। সত্য বলার শক্তি দিন, অন্যায় থেকে দূরে রাখুন, পিতা-মাতার সেবা ও মানুষের অধিকার আদায়ের তাওফিক দিন। আমাদের পরিবারে শান্তি, সমাজে ন্যায় এবং জীবনে তাকওয়া দান করুন। ইহকালে শান্তি ও কল্যাণ এবং আখিরাতে নাজাত দান করুন। আমিন।
৪
৫ মন্তব্য