সহকারী অধ্যাপক
১৭ আগস্ট, ২০২৬ ০৯:৩১ অপরাহ্ণ
আল্লাহর স্মরণে, কৃতজ্ঞতায় জীবন -মোঃ মুজিবুর রহমান
আল্লাহর স্মরণে, কৃতজ্ঞতায় জীবন
—( সূরা আল-বাকারা, আয়াত ১৫২-এর আলোকে)
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর
ভূমিকা
মানুষের জীবন মহান আল্লাহর অমূল্য দান। আমরা নিজের ইচ্ছায় পৃথিবীতে আসিনি, নিজের শক্তিতে বেঁচেও নেই। আমাদের অস্তিত্ব, জীবন, জ্ঞান, বিবেক, সুস্থতা, পরিবার, খাদ্য, পানি, আলো-বাতাস—সবই মহান আল্লাহর অসংখ্য নিয়ামতের অন্তর্ভুক্ত। আকাশের বিশালতা, পৃথিবীর সৌন্দর্য, সূর্যের আলো, চাঁদের জ্যোৎস্না, রাতের নীরবতা, সকালের নির্মল বাতাস—সবকিছুর মধ্যেই তাঁর কুদরতের নিদর্শন ছড়িয়ে আছে। অথচ মানুষ অনেক সময় এসব নিয়ামত ভোগ করেও নিয়ামতদাতাকে ভুলে যায়। সুখের সময়ে আল্লাহকে স্মরণ করে না, বিপদে পড়লে কেবল তাঁকে ডাকে; অথচ মুমিনের জীবন হওয়া উচিত সর্বাবস্থায় আল্লাহর স্মরণ, আনুগত্য ও কৃতজ্ঞতায় পরিপূর্ণ।
মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেন—
فَاذْكُرُونِي أَذْكُرْكُمْ وَاشْكُرُوا لِي وَلَا تَكْفُرُونِ
অর্থ: “তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাদের স্মরণ করব। আর তোমরা আমার প্রতি কৃতজ্ঞ হও এবং অকৃতজ্ঞ হয়ো না।”
— সূরা আল-বাকারা, ২:১৫২
এই আয়াতটি মানুষের জীবন পরিচালনার জন্য এক গভীর ও সুন্দর শিক্ষা বহন করে। এখানে আল্লাহর স্মরণ, আল্লাহর কৃতজ্ঞতা এবং অকৃতজ্ঞতা থেকে বেঁচে থাকার নির্দেশ একসঙ্গে দেওয়া হয়েছে। তাই একজন মুমিনের জীবনের অন্যতম প্রধান সৌন্দর্য হলো—মুখে আল্লাহর স্মরণ, অন্তরে তাঁর ভালোবাসা, কাজে তাঁর আনুগত্য এবং জীবনের প্রতিটি নিয়ামতের জন্য তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা।
আল্লাহর স্মরণ কেন প্রয়োজন
আল্লাহর স্মরণ বা যিকর মানুষের আত্মার খাদ্য। যেমন খাদ্য ছাড়া দেহ দুর্বল হয়ে পড়ে, তেমনি আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে থাকলে মানুষের অন্তরও ধীরে ধীরে কঠিন ও অশান্ত হয়ে পড়ে। মানুষ পৃথিবীর অনেক কিছু অর্জন করতে পারে, অর্থ-সম্পদ, সম্মান, জ্ঞান ও সাফল্য লাভ করতে পারে; কিন্তু আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দুর্বল হলে তার অন্তরের প্রকৃত প্রশান্তি নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন—
أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ
অর্থ: “জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।”
— সূরা আর-রাদ, ১৩:২৮
অতএব, প্রকৃত শান্তি কেবল বাহ্যিক সম্পদে নয়; বরং আল্লাহর স্মরণ, তাঁর ওপর ভরসা এবং তাঁর বিধান অনুসরণের মধ্যেই নিহিত।
দুঃখ-কষ্ট, ব্যর্থতা, হতাশা, বিচ্ছেদ, আর্থিক সংকট কিংবা জীবনের নানা পরীক্ষার সময় একজন মুমিন আল্লাহর দিকে ফিরে যায়। সে জানে—মানুষ সীমাবদ্ধ, কিন্তু আল্লাহ অসীম ক্ষমতার অধিকারী; মানুষ সবকিছু জানে না, কিন্তু আল্লাহ সবকিছু জানেন; মানুষ সাহায্য করতে অক্ষম হতে পারে, কিন্তু আল্লাহ সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান।
যিকর শুধু মুখের উচ্চারণ নয়
যিকর বলতে শুধু মুখে কিছু নির্দিষ্ট বাক্য উচ্চারণ করাকেই বোঝায় না। অবশ্যই সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ইত্যাদি মহান আল্লাহর স্মরণের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কুরআন তিলাওয়াত, দোয়া, ইস্তিগফার ও আল্লাহর প্রশংসাও যিকরের অন্তর্ভুক্ত।
কিন্তু যিকরের প্রকৃত সৌন্দর্য তখনই প্রকাশ পায়, যখন আল্লাহর স্মরণ মানুষের চরিত্র ও কর্মে প্রতিফলিত হয়। যে ব্যক্তি মুখে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে, কিন্তু মানুষের অধিকার নষ্ট করে, মিথ্যা বলে, প্রতারণা করে, অন্যায় করে এবং হারাম কাজে লিপ্ত হয়—তার যিকরের শিক্ষা এখনো তার জীবনে পূর্ণভাবে প্রতিফলিত হয়নি।
আল্লাহকে সত্যিকার অর্থে স্মরণ করার অর্থ হলো—তাঁর উপস্থিতি ও জ্ঞানকে মনে রেখে জীবন পরিচালনা করা। একাকী অবস্থায় যেমন আল্লাহকে ভয় করা, তেমনি মানুষের সামনে ন্যায়পরায়ণ থাকা; সুখে যেমন তাঁকে স্মরণ করা, তেমনি দুঃখেও তাঁর ওপর ভরসা রাখা—এটাই ঈমানি জীবনের সৌন্দর্য।
আল্লাহর স্মরণ ও আত্মশুদ্ধি
আল্লাহর স্মরণ মানুষের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে। যিকর মানুষকে অহংকার, হিংসা, বিদ্বেষ, লোভ, ক্রোধ ও অন্যায় থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করে। যখন মানুষ মনে রাখে যে আল্লাহ তার প্রতিটি কথা, কাজ ও নিয়ত সম্পর্কে অবগত, তখন সে গোপনেও অন্যায় করতে ভয় পায়।
একজন সত্যিকার আল্লাহস্মরণকারী মানুষ নিজেকে বড় মনে করে না। সে জানে—তার জ্ঞান সীমিত, শক্তি সীমিত, জীবন সীমিত। আজ সে শক্তিশালী, কাল দুর্বল হতে পারে; আজ সুস্থ, কাল অসুস্থ হতে পারে; আজ সম্পদশালী, কাল সম্পদহীন হতে পারে। তাই সে অহংকারের পরিবর্তে বিনয়কে বেছে নেয়।
আল্লাহর স্মরণ মানুষের বিবেককে জাগ্রত রাখে এবং তাকে নিজের ভুলের জন্য তাওবা করতে শেখায়। গুনাহ হয়ে গেলে সে হতাশ হয়ে পড়ে না; বরং মহান আল্লাহর রহমতের দিকে ফিরে আসে। এভাবেই যিকর মানুষের অন্তরে আশা, আত্মসংযম ও আল্লাহভীতি সৃষ্টি করে।
শোকর বা কৃতজ্ঞতার প্রকৃত অর্থ
সূরা আল-বাকারার ১৫২ নম্বর আয়াতে আল্লাহর স্মরণের সঙ্গে কৃতজ্ঞতার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, যিকর ও শোকর পরস্পর গভীরভাবে সম্পর্কিত।
শোকর হলো কোনো নিয়ামত পাওয়ার পর নিয়ামতদাতাকে স্বীকার করা, তাঁর প্রশংসা করা এবং সেই নিয়ামতকে তাঁর সন্তুষ্টির পথে ব্যবহার করা।
শুধু মুখে “আলহামদুলিল্লাহ” বলা শোকরের একটি অংশ; কিন্তু শোকরের পূর্ণতা হলো নিয়ামতের যথাযথ ব্যবহার।
আল্লাহ চোখ দিয়েছেন—তাই চোখ দিয়ে অন্যায় ও অশ্লীলতা না দেখে কল্যাণকর বিষয় দেখা উচিত।
আল্লাহ কান দিয়েছেন—তাই কুৎসা, গীবত ও অশোভন কথা না শুনে সত্য ও কল্যাণের কথা শোনা উচিত।
আল্লাহ জিহ্বা দিয়েছেন—তাই মিথ্যা, অপবাদ ও কটু কথা না বলে সত্য ও সুন্দর কথা বলা উচিত।
আল্লাহ হাত দিয়েছেন—তাই অন্যায় কাজে নয়, মানুষের সেবা ও কল্যাণে তা ব্যবহার করা উচিত।
আল্লাহ পা দিয়েছেন—তাই অন্যায়ের পথে নয়, কল্যাণ ও সৎকর্মের পথে এগিয়ে চলা উচিত।
আল্লাহ জ্ঞান দিয়েছেন—তাই সেই জ্ঞান দিয়ে নিজে আলোকিত হওয়া এবং অন্যকে আলোকিত করা উচিত।
আল্লাহ সম্পদ দিয়েছেন—তাই তার মধ্যে দরিদ্র, অসহায় ও অভাবীদের অধিকার স্মরণ করা উচিত।
আল্লাহ সময় দিয়েছেন—তাই সময়কে অপচয় না করে ইবাদত, শিক্ষা, কর্ম, পরিবার ও সমাজের কল্যাণে ব্যবহার করা উচিত।
এটাই শোকরের বাস্তব রূপ।
নিয়ামতের সঠিক ব্যবহারই প্রকৃত কৃতজ্ঞতা
মানুষের জীবনে অসংখ্য নিয়ামত রয়েছে। সুস্থতা, নিরাপত্তা, পরিবার, সন্তান, শিক্ষা, কর্মক্ষমতা, সময়, খাদ্য, পানি, বাসস্থান—এসবের প্রতিটি আল্লাহর দান। অনেক সময় মানুষ কোনো একটি বড় নিয়ামত না পাওয়ার কারণে তার কাছে থাকা অসংখ্য নিয়ামতের কথা ভুলে যায়।
একজন কৃতজ্ঞ মানুষ শুধু যা নেই তা নিয়ে দুঃখ করে না; বরং যা আছে তার জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে। তার জীবনে অভাব থাকতে পারে, সমস্যা থাকতে পারে, দুঃখ থাকতে পারে; কিন্তু সে জানে—আল্লাহর দেওয়া নিয়ামত গুনে শেষ করা সম্ভব নয়।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন—
وَإِن تَعُدُّوا نِعْمَتَ اللَّهِ لَا تُحْصُوهَا
অর্থ: “তোমরা আল্লাহর নিয়ামত গণনা করতে চাইলে তা গণনা করে শেষ করতে পারবে না।”
— সূরা ইবরাহিম, ১৪:৩৪
তাই একজন মুমিনের দৃষ্টিভঙ্গি হওয়া উচিত—অল্প পেলেও শোকর, বেশি পেলেও শোকর; সুখে শোকর, পরীক্ষায়ও ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর ভরসা।
শোকর করলে নিয়ামত বৃদ্ধি পায়
মহান আল্লাহ আরও ঘোষণা করেছেন—
لَئِن شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ وَلَئِن كَفَرْتُمْ إِنَّ عَذَابِي لَشَدِيدٌ
অর্থ: “তোমরা কৃতজ্ঞ হলে অবশ্যই আমি তোমাদের আরও বাড়িয়ে দেব; আর তোমরা অকৃতজ্ঞ হলে নিশ্চয়ই আমার শাস্তি কঠিন।”
— সূরা ইবরাহিম, ১৪:৭
এ আয়াত মানুষের জন্য গভীর শিক্ষা বহন করে। কৃতজ্ঞতা শুধু একটি নৈতিক গুণ নয়; এটি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। শোকর মানুষের অন্তরে তৃপ্তি সৃষ্টি করে, অহংকার কমায় এবং প্রাপ্ত নিয়ামতের মূল্য উপলব্ধি করতে শেখায়।
অন্যদিকে অকৃতজ্ঞতা মানুষকে এমন অবস্থায় নিয়ে যায়, যেখানে অনেক কিছু পেয়েও সে নিজেকে দরিদ্র মনে করে। তার চোখ থাকে অভাবের দিকে, কিন্তু নিয়ামতের দিকে থাকে না। ফলে তার মন অশান্ত হয়ে পড়ে।
অকৃতজ্ঞতার ভয়াবহতা
মানুষ যখন নিয়ামত পেয়ে নিয়ামতদাতাকে ভুলে যায়, তখন তার মধ্যে অহংকার জন্ম নিতে পারে। সে মনে করতে শুরু করে—“আমি নিজেই সব করেছি।” অথচ তার প্রতিটি সামর্থ্যের পেছনে আল্লাহর দান রয়েছে।
মানুষের একটি শ্বাসও তার নিজের তৈরি নয়। একটি হৃদস্পন্দনও তার নিজের নিয়ন্ত্রণে নয়। সে কখন জন্মাবে, কোথায় জন্মাবে, কতদিন বাঁচবে—এসবের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তার হাতে নেই।
তাই সামান্য সাফল্য পেয়ে অহংকার করা মুমিনের চরিত্র নয়। বরং সাফল্য এলে বলা উচিত—আলহামদুলিল্লাহ। ব্যর্থতা এলে বলা উচিত—আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে নিজের ভুল সংশোধনের চেষ্টা করব। কারণ মুমিন জানে, আল্লাহর ফয়সালার মধ্যে জ্ঞান ও হিকমত রয়েছে।
বিপদে আল্লাহর স্মরণ
জীবন সবসময় একই রকম থাকে না। কখনো আনন্দ আসে, কখনো দুঃখ; কখনো সাফল্য, কখনো ব্যর্থতা; কখনো প্রাপ্তি, কখনো বঞ্চনা। এই পরিবর্তনশীল জীবনে আল্লাহর স্মরণ মুমিনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়।
বিপদের সময় মানুষ অনেকের কাছে সাহায্য চাইতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার অন্তরের প্রকৃত আশ্রয় মহান আল্লাহ। তিনি বান্দার অশ্রু দেখেন, তার কষ্ট জানেন এবং তার অন্তরের কথা জানেন।
তাই দুঃখের সময় হতাশ না হয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে যেতে হবে। সালাত, দোয়া, কুরআন তিলাওয়াত, যিকর, ইস্তিগফার ও তাওয়াক্কুলের মাধ্যমে নিজের হৃদয়কে শক্ত করতে হবে।
আল্লাহর স্মরণ বিপদকে সবসময় সঙ্গে সঙ্গে দূর করে দেয়—এমন নয়; কিন্তু তা বিপদের মধ্যে মানুষকে ধৈর্য, আশা ও সঠিক পথে থাকার শক্তি দেয়। একজন মুমিন জানে—পরীক্ষা জীবনের অংশ, আর আল্লাহর রহমত তার চেয়েও বিস্তৃত।
সুখের সময়েও আল্লাহকে স্মরণ
শুধু বিপদের সময় আল্লাহকে স্মরণ করা যথেষ্ট নয়। সুখের সময়ও আল্লাহকে স্মরণ করতে হবে। কারণ সুখও পরীক্ষা।
অর্থ-সম্পদ পাওয়া যেমন পরীক্ষা, না পাওয়াও পরীক্ষা। সুস্থতা যেমন পরীক্ষা, অসুস্থতাও পরীক্ষা। ক্ষমতা যেমন পরীক্ষা, দুর্বলতাও পরীক্ষা। সন্তান যেমন নিয়ামত, সন্তানের দায়িত্বও তেমনি আমানত।
তাই সুখের দিনে আল্লাহকে ভুলে যাওয়া উচিত নয়। বরং সুখ যত বাড়বে, শোকরও তত বাড়াতে হবে।
পরিবারে যিকর ও শোকরের চর্চা
একটি সুন্দর পরিবার গড়ে ওঠে শুধু অর্থ-সম্পদ দিয়ে নয়; বরং পারস্পরিক সম্মান, ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ, ক্ষমাশীলতা ও আল্লাহভীতির মাধ্যমে।
পরিবারে যদি আল্লাহর স্মরণ থাকে, তাহলে সন্তানরা ছোটবেলা থেকেই সত্যবাদিতা, শিষ্টাচার, দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতার শিক্ষা পায়। বাবা-মা যদি নিজেদের আচরণে ইসলামী আদর্শের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন, তাহলে সন্তানদের ওপর তার গভীর প্রভাব পড়ে।
স্বামী-স্ত্রীর উচিত পরস্পরকে সম্মান করা, কটু কথা এড়িয়ে চলা, ভুল হলে ক্ষমা করা এবং সংসারের সমস্যা ধৈর্য ও পরামর্শের মাধ্যমে সমাধান করা। কারণ সন্তান শুধু উপদেশ শুনে শেখে না; সে ঘরের পরিবেশ দেখে শেখে।
তাই একটি পরিবারে যদি মুখে যিকর, কাজে ন্যায়, কথায় সৌন্দর্য এবং আচরণে মমতা থাকে, তাহলে সেই পরিবার শান্তির নীড় হয়ে উঠতে পারে।
কর্মজীবনে আল্লাহর স্মরণ
আল্লাহর স্মরণ শুধু মসজিদ বা ইবাদতের স্থানেই সীমাবদ্ধ নয়। একজন মুসলিমের কর্মজীবনেও আল্লাহর স্মরণ ও তাকওয়ার প্রভাব থাকা উচিত।
ব্যবসায়ী সঠিক মাপ দেবে, শিক্ষক দায়িত্বশীলতার সঙ্গে শিক্ষা দেবেন, কর্মকর্তা ন্যায়বিচার করবেন, কর্মচারী আমানত রক্ষা করবেন, শ্রমিক নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করবেন—এগুলোও আল্লাহর বিধান পালনের অংশ।
লেনদেনে প্রতারণা না করা, ঘুষ থেকে দূরে থাকা, অন্যের অধিকার নষ্ট না করা, দায়িত্বে অবহেলা না করা এবং মানুষের সঙ্গে সুন্দর আচরণ করা—এসবই আল্লাহসচেতন জীবনের পরিচয়।
যে ব্যক্তি কর্মস্থলে আল্লাহকে স্মরণ করে, সে জানে—মানুষ না দেখলেও আল্লাহ দেখছেন। এই বিশ্বাস মানুষকে গোপন ও প্রকাশ্য উভয় অবস্থায় সৎ থাকতে সাহায্য করে।
জ্ঞান ও সময়ের শোকর
জ্ঞান একটি বিরাট নিয়ামত। জ্ঞান অর্জন করার সুযোগ পাওয়া আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ। তাই জ্ঞানকে অহংকারের কারণ না বানিয়ে কল্যাণের মাধ্যম বানাতে হবে।
একজন জ্ঞানী মানুষ যদি জ্ঞানকে মানুষের উপকারে ব্যবহার করেন, তবে সেটি শোকরের একটি সুন্দর প্রকাশ। শিক্ষক যদি নিষ্ঠার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দেন, শিক্ষার্থী যদি অর্জিত জ্ঞান সৎ কাজে ব্যবহার করে—তাহলে জ্ঞানের নিয়ামতের মর্যাদা রক্ষা হয়।
একইভাবে সময়ও অমূল্য নিয়ামত। অর্থ হারালে তা কোনোভাবে ফিরে পাওয়া যেতে পারে; কিন্তু চলে যাওয়া সময় আর ফিরে আসে না। তাই সময়কে অলসতা, অর্থহীন বিনোদন ও অনর্থক কাজে নষ্ট না করে ইবাদত, শিক্ষা, পরিবার, কর্ম ও সমাজের কল্যাণে ব্যয় করা উচিত।
আল্লাহর স্মরণ ও সুন্দর চরিত্র
আল্লাহর স্মরণের অন্যতম ফল হলো সুন্দর চরিত্র। সত্যিকার যিকর মানুষের আচরণকে সুন্দর করে।
যে আল্লাহকে স্মরণ করে, সে মিথ্যা বলতে লজ্জা পায়; অন্যের অধিকার নষ্ট করতে ভয় পায়; গীবত, অপবাদ, হিংসা ও অহংকার থেকে নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করে।
ইসলাম শুধু কিছু ইবাদতের নাম নয়; ইসলাম মানুষের চরিত্র, আচরণ, লেনদেন ও সামাজিক দায়িত্বকেও গুরুত্ব দেয়। তাই আল্লাহর স্মরণ যদি মানুষের চরিত্রে সৌন্দর্য সৃষ্টি না করে, তাহলে তাকে নিজের আত্মশুদ্ধির দিকে আরও মনোযোগ দিতে হবে।
যিকরহীন হৃদয়ের বিপরীতে জাগ্রত হৃদয়
আল্লাহর স্মরণহীন হৃদয় ধীরে ধীরে অসচেতন হয়ে যেতে পারে। কিন্তু যিকর মানুষের অন্তরকে জাগ্রত রাখে। একজন মুমিন প্রতিদিন নিজেকে প্রশ্ন করতে পারে—আমি কী করছি? কেন করছি? আমার কাজ কি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করবে? আমার কথায় কি কারও কষ্ট হচ্ছে? আমি কি কারও অধিকার নষ্ট করছি?
এই আত্মজিজ্ঞাসা মানুষকে সংশোধনের পথে নিয়ে যায়।
আল্লাহর স্মরণ মানে শুধু একটি শব্দ বারবার উচ্চারণ করা নয়; বরং জীবনকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে দেওয়া। চিন্তায় আল্লাহ, কথায় সত্য, কাজে ন্যায়, ব্যবহারে সৌন্দর্য এবং অন্তরে তাকওয়া—এটাই আল্লাহস্মরণী জীবনের পরিপূর্ণ রূপ।
যিকর, শোকর ও সবর—মুমিনের জীবনের তিন আলো
মুমিনের জীবনে তিনটি গুণ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—যিকর, শোকর ও সবর।
সুখে প্রয়োজন শোকর—যাতে মানুষ অহংকারী না হয়।
বিপদে প্রয়োজন সবর—যাতে মানুষ হতাশ না হয়।
প্রতিটি অবস্থায় প্রয়োজন যিকর—যাতে মানুষ আল্লাহকে ভুলে না যায়।
এই তিনটি গুণ মানুষের জীবনকে ভারসাম্যপূর্ণ করে। সুখ তাকে বেপরোয়া করে না, দুঃখ তাকে ভেঙে দেয় না এবং ব্যস্ততা তাকে আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে দেয় না।
দৈনন্দিন জীবনে যিকর ও শোকরের চর্চা
প্রতিদিনের জীবনে কিছু সহজ অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে। ঘুম থেকে উঠে আল্লাহকে স্মরণ করা, সালাত যথাযথভাবে আদায় করা, কুরআন তিলাওয়াত করা, সকাল-সন্ধ্যার মাসনূন যিকর ও দোয়া পড়া, ইস্তিগফার করা এবং নিজের কাজের হিসাব নেওয়া—এসব একজন মানুষের ঈমানি জীবনকে শক্তিশালী করে।
খাবার আগে ও পরে আল্লাহকে স্মরণ করা, কোনো নিয়ামত পেলে আলহামদুলিল্লাহ বলা, বিপদে ধৈর্য ধরা, ভুল হলে তাওবা করা এবং মানুষের সঙ্গে সুন্দর আচরণ করা—এসবও আল্লাহস্মরণী জীবনের অংশ।
তবে ইবাদতের পাশাপাশি দায়িত্ব পালনও জরুরি। পরিবার, শিক্ষা, কর্ম, সমাজ ও মানুষের অধিকারের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়াও ইসলামী জীবনের অপরিহার্য অংশ।
শোকর মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়
কৃতজ্ঞ মানুষ সবসময় সমস্যামুক্ত থাকে না; কিন্তু সে সমস্যার মধ্যেও আল্লাহর নিয়ামত দেখতে শেখে।
সে ভাবে—আমার হয়তো সবকিছু নেই, কিন্তু আল্লাহ আমাকে জীবন দিয়েছেন। হয়তো আমার সম্পদ সীমিত, কিন্তু আল্লাহ আমাকে ঈমান দিয়েছেন। হয়তো আমার পথ কঠিন, কিন্তু আল্লাহ আমাকে চেষ্টা করার শক্তি দিয়েছেন। হয়তো আমার কিছু স্বপ্ন পূরণ হয়নি, কিন্তু আল্লাহ আমাকে আরও অনেক নিয়ামত দিয়েছেন।
এই দৃষ্টিভঙ্গি মানুষের অন্তরে তৃপ্তি সৃষ্টি করে। তখন মানুষ অন্যের সঙ্গে নিজের তুলনা করে অশান্ত না হয়ে নিজের প্রাপ্তির জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে।
কৃতজ্ঞতার সঙ্গে দায়িত্ববোধ
শোকর মানে নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে থাকা নয়। আল্লাহর ওপর ভরসা করার অর্থ দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া নয়। বরং একজন মুমিন আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করবে এবং নিজের সাধ্য অনুযায়ী সঠিক চেষ্টা করবে।
রোগ হলে চিকিৎসা নেওয়া, অভাব হলে হালাল উপার্জনের চেষ্টা করা, শিক্ষার সুযোগ পেলে মনোযোগ দিয়ে পড়া, কর্মের দায়িত্ব পেলে নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করা—এসবই আল্লাহর দেওয়া সামর্থ্যের সঠিক ব্যবহার।
অর্থাৎ তাওয়াক্কুলের সঙ্গে চেষ্টা, শোকরের সঙ্গে দায়িত্ব এবং যিকরের সঙ্গে কর্ম—এগুলোই ভারসাম্যপূর্ণ ইসলামী জীবনের বৈশিষ্ট্য।
উপসংহার
সূরা আল-বাকারার ১৫২ নম্বর আয়াত আমাদের জীবনের জন্য এক অনন্য পথনির্দেশনা। মহান আল্লাহ আমাদের আহ্বান করেছেন—তাঁকে স্মরণ করতে, তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ হতে এবং অকৃতজ্ঞ না হতে। এই নির্দেশ কেবল মুখের কিছু বাক্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি সম্পূর্ণ জীবনব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত।
তাই আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর স্মরণকে স্থান দিতে হবে। মুখে তাঁর নাম, অন্তরে তাঁর ভালোবাসা, কাজে তাঁর আনুগত্য, আচরণে সৌন্দর্য, উপার্জনে সততা, পরিবারে মমতা, সমাজে ন্যায় এবং প্রতিটি নিয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞতা—এসবের সমন্বয়েই গড়ে উঠবে সুন্দর মুমিনের জীবন।
আমরা যেন সুখে আল্লাহকে ভুলে না যাই, দুঃখে তাঁর রহমত থেকে নিরাশ না হই; নিয়ামত পেয়ে অহংকার না করি, সামান্য বঞ্চনায় হতাশ না হই। চোখ, কান, জিহ্বা, হাত, পা, জ্ঞান, সময়, সম্পদ ও সামর্থ্য—প্রতিটি নিয়ামত যেন আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে ব্যবহার করতে পারি।
জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আমাদের হৃদয় যেন আল্লাহর স্মরণে জাগ্রত থাকে, জিহ্বা যেন সত্য ও কল্যাণের কথা বলে, হাত যেন মানুষের উপকারে ব্যবহৃত হয় এবং জীবন যেন নেক আমলে পূর্ণ হয়।
আল্লাহর স্মরণে হৃদয় হোক জাগ্রত, কৃতজ্ঞতায় জীবন হোক সমৃদ্ধ; তাঁর আনুগত্যে চরিত্র হোক সুন্দর, তাঁর সন্তুষ্টিতে জীবন হোক সফল।
হে মহান আল্লাহ, আমাদেরকে তোমাকে বেশি বেশি স্মরণ করার তাওফিক দাও। তোমার দেওয়া নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা আদায় করার শক্তি দাও। আমাদের অন্তরকে অহংকার, হিংসা, লোভ ও অকৃতজ্ঞতা থেকে পবিত্র করো। বিপদে আমাদের সবর দাও, সুখে শোকর দাও, ভুল হলে তাওবার তাওফিক দাও এবং সর্বাবস্থায় তোমার ওপর ভরসা করার শক্তি দাও।
“তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাদের স্মরণ করব; আর তোমরা আমার প্রতি কৃতজ্ঞ হও এবং অকৃতজ্ঞ হয়ো না”—এই মহান কুরআনি নির্দেশই হোক আমাদের জীবনের পথনির্দেশ, আত্মশুদ্ধির অঙ্গীকার এবং সুন্দর জীবনের স্থায়ী পাথেয়।
১৩
১৮ মন্তব্য