সহকারী অধ্যাপক
১৭ আগস্ট, ২০২৬ ০৯:৩৬ অপরাহ্ণ
ভালোবাসায় গড়া সংসার -মোঃ মুজিবুর রহমান
ভালোবাসায় গড়া সংসার
(স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্মান, পারিবারিক সৌহার্দ্য ও সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ)
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর
সংসার মানুষের জীবনের সবচেয়ে আপন আশ্রয়। এটি কেবল ইট-পাথর, আসবাবপত্র ও অর্থসম্পদের সমষ্টি নয়; বরং ভালোবাসা, মায়া-মমতা, দায়িত্ববোধ, পারস্পরিক সম্মান, বিশ্বাস, সহমর্মিতা ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা একটি ছোট্ট পৃথিবী। একটি সুন্দর সংসার মানুষের মনে শান্তি আনে, ক্লান্ত হৃদয়ে স্বস্তি দেয় এবং সন্তানদের জন্য নিরাপদ ও সুন্দর পরিবেশ তৈরি করে। আর একটি অশান্ত সংসার মানুষের জীবনকে বিষণ্ন করে তোলে এবং তার প্রভাব পরিবারের প্রতিটি সদস্যের ওপর পড়ে। বিশেষ করে সন্তানরা বাবা-মায়ের আচরণ খুব কাছ থেকে দেখে, শোনে এবং নিজেদের অজান্তেই তা থেকে সম্পর্ক, ভালোবাসা, সম্মান ও আচরণের শিক্ষা গ্রহণ করে। তাই একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ অনেকাংশেই নির্ভর করে স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করেন তার ওপর।
দাম্পত্যজীবন আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ আমানত। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে শান্তি, ভালোবাসা ও দয়ার সম্পর্ক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ বলেন, তিনি মানুষের জন্য তাদের মধ্য থেকেই জীবনসঙ্গী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তারা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করে এবং তাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া স্থাপন করেছেন। (সূরা আর-রূম, ৩০:২১)। এই আয়াত দাম্পত্যজীবনের মূল সৌন্দর্যকে অত্যন্ত গভীরভাবে তুলে ধরে। অর্থাৎ স্বামী-স্ত্রী একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; তারা পরস্পরের সহযাত্রী, সহযোগী ও জীবনপথের সঙ্গী।
একটি সংসারে মতের অমিল হতেই পারে। দুজন মানুষ যখন একসঙ্গে জীবনযাপন করেন, তখন তাঁদের চিন্তা, পছন্দ, অভ্যাস ও সিদ্ধান্তে পার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু মতভেদ যেন কখনো মনভেদে পরিণত না হয়। মতের পার্থক্য নিয়ে আলোচনা হতে পারে, যুক্তি হতে পারে, সাময়িক অভিমানও হতে পারে; কিন্তু অপমান, তুচ্ছতাচ্ছিল্য, কটু কথা, উপহাস কিংবা একে অপরকে হেয় করা কোনোভাবেই সুস্থ দাম্পত্যজীবনের লক্ষণ নয়।
স্বামী যদি স্ত্রীর প্রতি অসম্মানজনক আচরণ করেন অথবা স্ত্রী যদি স্বামীকে ছোট করেন, তাহলে শুধু দুজন মানুষের সম্পর্কই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না; এর প্রভাব সন্তানদের মনেও পড়ে। একটি শিশু যখন নিয়মিত দেখে যে তার বাবা-মা একে অপরকে সম্মান করেন, সুন্দরভাবে কথা বলেন এবং মতের অমিল হলেও শান্তভাবে সমাধান করেন, তখন সে শেখে—মানুষের সঙ্গে সম্মানের সঙ্গে কথা বলতে হয়, মতের অমিল হলেও সম্পর্ক নষ্ট করা যায় না এবং রাগের সময় নিজেকে সংযত রাখতে হয়।
অন্যদিকে, ঘরে যদি প্রতিনিয়ত ঝগড়া, অপমান, চিৎকার, তুচ্ছতাচ্ছিল্য ও পরস্পরকে দোষারোপ করার পরিবেশ থাকে, তাহলে সন্তানের মনে নিরাপত্তাহীনতা ও অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। সে বুঝতে পারে না, কখন কোন কথা নিয়ে আবার অশান্তি শুরু হবে। ফলে পরিবারের প্রতি তার স্বাভাবিক আস্থা ও স্বস্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই সন্তানকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে চাইলে শুধু তাকে উপদেশ দিলেই হবে না; বাবা-মাকেও নিজেদের আচরণের মাধ্যমে আদর্শ স্থাপন করতে হবে।
সন্তানের প্রথম বিদ্যালয় হলো তার পরিবার এবং বাবা-মা তার প্রথম শিক্ষক। বিদ্যালয়ে যাওয়ার আগেই শিশু কথা বলা, আচরণ করা, মানুষের সঙ্গে ব্যবহার করা, ভালো-মন্দের পার্থক্য বোঝা এবং আবেগ প্রকাশের অনেক কিছু পরিবার থেকেই শিখে নেয়। বাবা মায়ের সঙ্গে কীভাবে কথা বলেন, মা বাবার প্রতি কীভাবে সম্মান দেখান, দুজন কীভাবে মতের অমিল মেটান, ভুল হলে কীভাবে ক্ষমা চান—এসব দৃশ্য শিশুর মনে গভীর ছাপ ফেলে।
তাই সন্তানকে যদি শেখাতে চাই—‘বড়দের সম্মান করবে’, তাহলে আগে তাকে দেখাতে হবে বাবা-মা নিজেরাও একে অপরকে সম্মান করেন। যদি শেখাতে চাই—‘কটু কথা বলবে না’, তাহলে ঘরের ভাষা হতে হবে ভদ্র ও সংযত। যদি শেখাতে চাই—‘ভুল করলে ক্ষমা চাইবে’, তাহলে বাবা-মাকেও প্রয়োজন হলে পরস্পরের কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাইতে হবে। শিশুর কাছে উপদেশের চেয়ে বাস্তব আচরণের শিক্ষা অনেক বেশি শক্তিশালী।
স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্মান শুধু ভালোবাসার প্রকাশ নয়; এটি চরিত্রেরও পরিচয়। জীবনসঙ্গীর দুর্বলতা নিয়ে হাসাহাসি করা, অন্যের সামনে তাকে অপমান করা, পুরোনো ভুল বারবার তুলে ধরা কিংবা ব্যক্তিগত বিষয় প্রকাশ করে তাকে হেয় করা কোনো সুস্থ সম্পর্কের অংশ হতে পারে না। যে মানুষটি জীবনের সুখ-দুঃখে পাশে থাকে, তার মর্যাদা রক্ষা করা দায়িত্বও, ভালোবাসাও।
পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন, “তোমরা তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।” (সূরা আন-নিসা, ৪:১৯)। এই নির্দেশ দাম্পত্যজীবনের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। জীবনসঙ্গীর প্রতি সদাচরণ শুধু হাসিমুখে কথা বলার নাম নয়; বরং তার অধিকার রক্ষা করা, কষ্ট বুঝতে চেষ্টা করা, প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ানো, তার মর্যাদা রক্ষা করা এবং ন্যায়সংগত আচরণ করা—সবই এর অন্তর্ভুক্ত।
একই আয়াতে মহান আল্লাহ স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, কোনো কিছু অপছন্দ হলেও তার মধ্যে অনেক কল্যাণ থাকতে পারে। তাই সাময়িক বিরক্তি, মতের অমিল কিংবা কোনো একটি অপছন্দের বিষয়কে কেন্দ্র করে পুরো সম্পর্ককে মূল্যহীন মনে করা উচিত নয়। মানুষের যেমন গুণ আছে, তেমনি সীমাবদ্ধতাও আছে। স্বামী-স্ত্রী উভয়েই অসম্পূর্ণ মানুষ; তাই পরস্পরের ভুল সংশোধনের পাশাপাশি গুণগুলোও দেখতে হবে।
সংসারে রাগ আসবে। কিন্তু রাগ আসা আর রাগের বশবর্তী হয়ে অন্যায় কথা বলা এক বিষয় নয়। রাগের মুহূর্তে কিছু সময় নীরব থাকা, স্থান পরিবর্তন করা, ওজু করা, নামাজ আদায় করা কিংবা পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার পর কথা বলা অনেক সময় বড় ভুল থেকে রক্ষা করতে পারে। একটি উত্তপ্ত মুহূর্তে বলা কঠিন কথা অনেক বছর পরেও হৃদয়ে দাগ রেখে যেতে পারে। তাই কথার আগে ভাবা এবং রাগের সময় নিজেকে সংযত রাখা অত্যন্ত জরুরি।
ভুল হলে ‘আমি কেন ক্ষমা চাইব?’—এই অহংকার সম্পর্ককে দুর্বল করে। বরং আন্তরিকভাবে ‘আমি ভুল করেছি, আমাকে ক্ষমা করো’ বলতে পারা মহত্ত্বের পরিচয়। ক্ষমা চাওয়া ছোট হওয়া নয়; বরং সম্পর্ককে বড় করে তোলার সাহস। আবার ক্ষমা করাও দুর্বলতা নয়; বরং অনেক সময় তা হৃদয়ের উদারতার প্রকাশ। তবে ক্ষমার অর্থ অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া নয়। গুরুতর অন্যায়, নির্যাতন বা নিরাপত্তার সমস্যা থাকলে তা যথাযথভাবে মোকাবিলা করা প্রয়োজন। ভালোবাসার সংসার মানে অন্যায় সহ্য করে নীরব থাকা নয়; বরং ন্যায়, নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষা করে সম্পর্ককে সুন্দর করার চেষ্টা করা।
স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের পোশাক বা আবরণস্বরূপ—পবিত্র কুরআনের এই উপমা দাম্পত্যসম্পর্কের গভীরতা বোঝায়। (সূরা আল-বাকারা, ২:১৮৭)। পোশাক যেমন মানুষের দেহকে আচ্ছাদিত করে, সুরক্ষা দেয় এবং সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে, তেমনি স্বামী-স্ত্রীও একে অপরের সম্মান, দুর্বলতা ও ব্যক্তিগত বিষয় রক্ষা করবেন। তাই জীবনসঙ্গীর ব্যক্তিগত দুর্বলতা মানুষের সামনে প্রকাশ করে তাকে অপমান করা এই সম্পর্কের মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সংসারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কৃতজ্ঞতা। আমরা অনেক সময় মানুষের বড় বড় ত্যাগ দেখতে পাই না, কিন্তু ছোটখাটো ভুল সহজেই চোখে পড়ে। অথচ একটি সুন্দর সংসারে শুধু ভুল খুঁজলে শান্তি থাকে না; গুণের প্রশংসা করতে হয়, দায়িত্ব পালনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হয় এবং প্রিয় মানুষটির উপস্থিতির মূল্য উপলব্ধি করতে হয়। একটি আন্তরিক ‘ধন্যবাদ’, একটি সুন্দর ‘আলহামদুলিল্লাহ’, কিংবা ‘তুমি পাশে আছো—এটাই আমার জন্য অনেক’—এ ধরনের কথাও সম্পর্ককে গভীর করতে পারে।
অর্থনৈতিক সংকট সংসারের জীবনে আসতে পারে। রিজিক কখনো বেশি, কখনো কম হতে পারে। অসুস্থতা, চাকরির সমস্যা, ব্যবসায়িক ক্ষতি কিংবা অন্য কোনো বিপদ পরিবারকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি করতে পারে। তখন একে অপরকে দোষারোপ না করে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন। অভাবের সময়ে স্বামী-স্ত্রী যদি পরস্পরের হাত শক্ত করে ধরেন, তাহলে কঠিন সময়ও অনেকটা সহজ হয়ে যায়। মুমিনের জীবনে চেষ্টা, সবর ও আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল গুরুত্বপূর্ণ পাথেয়।
একটি সুন্দর সংসারে শুধু সুখের দিনে পাশে থাকাই যথেষ্ট নয়। অসুস্থতার সময় সেবা করা, ক্লান্তির সময় সহযোগিতা করা, দুঃখের সময় সান্ত্বনা দেওয়া এবং বিপদের সময় সাহস জোগানোই প্রকৃত ভালোবাসার পরিচয়। ভালোবাসা শুধু মুখের মিষ্টি কথায় নয়; বরং দায়িত্বশীল কাজ, ত্যাগ ও যত্নের মধ্যেই তার সত্যিকারের প্রকাশ ঘটে।
সন্তানের সামনে বাবা-মায়ের আচরণ তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সন্তান যদি দেখে বাবা মাকে সম্মান করছেন, মায়ের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছেন এবং পরিবারের কাজে সহযোগিতা করছেন, তাহলে তার মনে নারীর মর্যাদা সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। একইভাবে মা যদি বাবার সম্মান রক্ষা করেন, তার সঙ্গে সুন্দরভাবে কথা বলেন এবং মতভেদ হলেও শালীনতা বজায় রাখেন, তাহলে সন্তান পুরুষের প্রতি সম্মান ও পারিবারিক দায়িত্ববোধের শিক্ষা পায়।
তবে সম্মান মানে অন্ধ আনুগত্য নয়; সম্মান মানে মানবিক মর্যাদা রক্ষা করা। স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই অধিকার আছে, উভয়েরই দায়িত্ব আছে এবং উভয়েরই অনুভূতি আছে। একটি সুস্থ পরিবারে সিদ্ধান্ত গ্রহণে পারস্পরিক পরামর্শ, মতামতের মূল্যায়ন এবং দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার মানসিকতা থাকা উচিত। একতরফা কর্তৃত্ব, অবজ্ঞা কিংবা ভয় দেখিয়ে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা যায়; কিন্তু তাতে প্রকৃত শান্তি ও ভালোবাসা জন্ম নেয় না।
সন্তানের সামনে দাম্পত্যের সব সমস্যা আলোচনা করাও সমীচীন নয়। প্রাপ্তবয়স্কদের কিছু ব্যক্তিগত বিষয় প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেই শান্তভাবে সমাধান করা ভালো। সন্তানকে বাবা-মায়ের ব্যক্তিগত বিরোধের বিচারক বানানো উচিত নয়। কোনো সমস্যা হলে বিশ্বস্ত ও বিচক্ষণ পরিবারের সদস্য, অভিজ্ঞ ব্যক্তি বা প্রয়োজন হলে উপযুক্ত পেশাদার সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। লক্ষ্য হবে সম্পর্ককে আরও নিরাপদ, সম্মানজনক ও ভারসাম্যপূর্ণ করা।
ইসলাম পরিবারকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, “তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবারকে আগুন থেকে রক্ষা করো।” (সূরা আত-তাহরীম, ৬৬:৬)। এই নির্দেশ শুধু খাদ্য, পোশাক ও বস্তুগত চাহিদা পূরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; পরিবারকে ঈমান, ইবাদত, নৈতিকতা, সত্যবাদিতা, শালীনতা ও উত্তম চরিত্রের পথে গড়ে তোলাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তাই ঘরকে শুধু থাকার জায়গা না বানিয়ে চরিত্র গঠনের বিদ্যালয়ে পরিণত করতে হবে। ঘরে নামাজের পরিবেশ থাকবে, কুরআন তিলাওয়াতের পরিবেশ থাকবে, সত্য কথা বলার অভ্যাস থাকবে, ছোটদের প্রতি স্নেহ এবং বড়দের প্রতি সম্মান থাকবে। বাবা-মা নিজেরা যদি আমল ও উত্তম চরিত্রের উদাহরণ হন, তাহলে সন্তানও সেই পরিবেশ থেকে অনেক কিছু শিখবে।
সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ মানে শুধু ভালো ফলাফল, বড় চাকরি কিংবা আর্থিক সাফল্য নয়। প্রকৃত সুন্দর ভবিষ্যৎ হলো—সে যেন ঈমানদার, সৎ, দায়িত্বশীল, বিনয়ী, মানবিক, ন্যায়পরায়ণ ও চরিত্রবান মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে। সে যেন মানুষের অধিকার বোঝে, অন্যকে সম্মান করে, দুর্বলকে সাহায্য করে, সত্যকে ভালোবাসে এবং অন্যায় থেকে দূরে থাকে। এই গুণগুলোর ভিত্তি তৈরি হয় পরিবারেই।
সন্তান একদিন বড় হবে। তারও নিজের পরিবার হবে। আজ সে বাবা-মায়ের কাছ থেকে যে সম্পর্কের শিক্ষা গ্রহণ করছে, ভবিষ্যতে তার নিজের জীবনেও তার প্রভাব পড়তে পারে। তাই আজকের বাবা-মায়ের আচরণ শুধু আজকের সংসারকে প্রভাবিত করে না; তা আগামী প্রজন্মের পারিবারিক সংস্কৃতিতেও ছাপ ফেলে। একটি সুন্দর পরিবার থেকে সুন্দর মানুষ তৈরি হয়, আর সুন্দর মানুষই সুন্দর সমাজ গড়ে।
অতএব, স্বামী-স্ত্রীর উচিত প্রতিদিন নিজেদের কাছে কিছু প্রশ্ন করা—আমি কি আমার জীবনসঙ্গীকে যথেষ্ট সম্মান করছি? আমার কথায় কি অকারণে তার হৃদয় কষ্ট পাচ্ছে? সন্তান আমার আচরণ দেখে কী শিখছে? মতের অমিল হলে আমি কি সমাধানের পথ খুঁজছি, নাকি জয়ের চেষ্টা করছি? আমি কি তার গুণের প্রশংসা করি? তার কষ্ট বোঝার চেষ্টা করি? এই আত্মসমালোচনা সংসারকে আরও সুন্দর করার পথ খুলে দিতে পারে।
মনে রাখতে হবে, দাম্পত্যজীবনে ‘কে জিতল’—এ প্রশ্নের চেয়ে ‘সম্পর্কটি বাঁচল কি না’—এই প্রশ্ন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। স্বামী যদি নিজের কথা প্রমাণ করতে গিয়ে স্ত্রীকে অপমান করেন, কিংবা স্ত্রী যদি নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে স্বামীকে হেয় করেন, তাহলে সাময়িকভাবে কেউ হয়তো নিজের মত প্রতিষ্ঠা করতে পারেন; কিন্তু সম্পর্কের যে ক্ষতি হয়, তার মূল্য অনেক বেশি। তাই বিতর্কে জয়ের চেয়ে সম্পর্কের মর্যাদা রক্ষা করা উত্তম।
ভালোবাসার সংসারে প্রতিদিন ছোট ছোট ভালো কাজের প্রয়োজন। একে অপরের কথা মন দিয়ে শোনা, প্রয়োজনের সময় সাহায্য করা, ক্লান্তির খবর নেওয়া, সন্তানদের সামনে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা, ভুল হলে ক্ষমা চাওয়া, ভালো কাজের প্রশংসা করা এবং একসঙ্গে আল্লাহর কাছে দোয়া করা—এসব ছোট কাজই ধীরে ধীরে বড় শান্তির ভিত্তি তৈরি করে।
সংসারে অর্থ প্রয়োজন, সুন্দর বাসস্থান প্রয়োজন, শিক্ষা প্রয়োজন; কিন্তু এসবের কোনো কিছুই পারস্পরিক সম্মান ও ভালোবাসার বিকল্প নয়। বড় বাড়িতে থেকেও মানুষ অশান্ত হতে পারে, আবার সামান্য সামর্থ্যের সংসারেও ভালোবাসা থাকলে মানুষ শান্তিতে থাকতে পারে। সুখের জন্য অঢেল সম্পদের চেয়ে প্রয়োজন আন্তরিকতা, বিশ্বাস, দায়িত্ববোধ এবং আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা।
আমাদের প্রত্যেকের উচিত এমন পরিবার গড়ে তোলার চেষ্টা করা, যেখানে স্বামী স্ত্রীর সম্মান রক্ষা করবেন, স্ত্রী স্বামীর মর্যাদা রক্ষা করবেন, সন্তান বাবা-মায়ের কাছ থেকে ভালোবাসা ও নৈতিকতার শিক্ষা পাবে এবং ঘরের প্রতিটি সদস্য নিজেকে নিরাপদ ও মূল্যবান মনে করবে। সেখানে মতভেদ থাকবে, কিন্তু বিদ্বেষ থাকবে না; অভিমান থাকবে, কিন্তু অপমান থাকবে না; শাসন থাকবে, কিন্তু নিষ্ঠুরতা থাকবে না; সংশোধন থাকবে, কিন্তু তুচ্ছতাচ্ছিল্য থাকবে না।
শেষ পর্যন্ত একটি সুন্দর সংসার গড়ে ওঠে একদিনে নয়। প্রতিদিনের ছোট ছোট ভালো আচরণ, সংযত কথা, ক্ষমা, কৃতজ্ঞতা, দায়িত্ব, দয়া ও ভালোবাসার সমন্বয়ে একটি পরিবার ধীরে ধীরে শান্তির নীড়ে পরিণত হয়। স্বামী-স্ত্রী যদি আল্লাহর সন্তুষ্টিকে সামনে রেখে পরস্পরের অধিকার আদায় করেন, একে অপরের মর্যাদা রক্ষা করেন এবং সন্তানদের সামনে উত্তম চরিত্রের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন, তাহলে সেই পরিবার শুধু একটি সুখী পরিবারই হবে না; বরং একটি সুন্দর সমাজ গঠনের ভিত্তিও হয়ে উঠবে।
মহান আল্লাহ আমাদের প্রত্যেকের পরিবারে শান্তি, ভালোবাসা, পারস্পরিক সম্মান ও ঈমান দান করুন। আমাদের জীবনসঙ্গীদের জন্য কল্যাণকর সঙ্গী বানান, আমাদের সন্তানদের নেক, সৎ, জ্ঞানী ও চরিত্রবান হিসেবে গড়ে তোলার তাওফিক দিন। আমাদের ঘরকে ঝগড়া, অহংকার, অপমান ও বিদ্বেষ থেকে রক্ষা করুন এবং সেখানে কুরআনের আলো, সালাতের সৌন্দর্য, দয়া, ক্ষমা ও মমতা প্রতিষ্ঠা করুন।
কুরআনের একটি হৃদয়স্পর্শী দোয়া আমাদের পারিবারিক জীবনের সুন্দর আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে:
رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا
অর্থ: “হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের আমাদের চোখের শীতলতা দান করুন এবং আমাদের মুত্তাকিদের জন্য আদর্শ করুন।” (সূরা আল-ফুরকান, ২৫:৭৪)
এই দোয়া হোক প্রতিটি পরিবারের অন্তরের আকাঙ্ক্ষা। আমাদের ঘর হোক শান্তির নীড়, ভালোবাসার বাগান, নৈতিকতার বিদ্যালয় ও ঈমানের আলোয় আলোকিত এক পবিত্র আশ্রয়। স্বামী-স্ত্রী পরস্পরকে হেয় না করে সম্মান করুন, কষ্ট না দিয়ে সান্ত্বনা দিন, দূরে না ঠেলে কাছে টানুন, রাগের পরিবর্তে সংযম এবং অহংকারের পরিবর্তে বিনয়কে বেছে নিন। কারণ আজকের পরিবারের সুন্দর আচরণই আগামী দিনের সুন্দর প্রজন্মের ভিত্তি।
ভালোবাসায় গড়া সংসার শুধু একটি সুখী ঘর নয়—এটি একটি সুন্দর প্রজন্ম গড়ার কারখানা, একটি নৈতিক সমাজের ভিত্তি এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি মহৎ ক্ষেত্র।
১৩
১৮ মন্তব্য