Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৭ আগস্ট, ২০২৬ ১০:৫৮ অপরাহ্ণ

ব্ল্যাক হোলের ভেতরে আসলে কী আছে?

ব্ল্যাক হোলের ভেতরে আসলে কী আছে?

ব্ল্যাক হোল মহাবিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় মহাজাগতিক বস্তুগুলোর একটি। এর মহাকর্ষ এতটাই শক্তিশালী যে একটি নির্দিষ্ট সীমার ভেতরে প্রবেশ করার পর কোনো কিছুই আর বাইরে বের হতে পারে না, এমনকি আলোও নয়। এই সীমাকে বলা হয় ইভেন্ট হরাইজন (Event Horizon)। বাইরে থেকে আমরা ব্ল্যাক হোলের চারপাশের গ্যাস, ধূলিকণা ও আলো পর্যবেক্ষণ করতে পারি, কিন্তু ইভেন্ট হরাইজনের ভেতরের কোনো তথ্য সরাসরি আমাদের কাছে পৌঁছাতে পারে না। তাই ব্ল্যাক হোলের অভ্যন্তরে আসলে কী আছে, সেটি এখনো পুরোপুরি নিশ্চিতভাবে জানা সম্ভব হয়নি।


আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব অনুযায়ী, ব্ল্যাক হোলের কেন্দ্রে সিঙ্গুলারিটি (Singularity) নামে একটি অতি রহস্যময় অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। এখানে বিপুল পরিমাণ পদার্থ অত্যন্ত ক্ষুদ্র অঞ্চলে সংকুচিত হয়ে যায় এবং স্থান-কালের বক্রতা অসীমের দিকে চলে যায় বলে গাণিতিক হিসাব নির্দেশ করে। তবে বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই ‘অসীম’ ফলাফল হয়তো প্রকৃতির চূড়ান্ত বাস্তবতা নয়; বরং এটি ইঙ্গিত করতে পারে যে ব্ল্যাক হোলের কেন্দ্রের মতো চরম পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করার জন্য আমাদের বর্তমান পদার্থবিজ্ঞানের তত্ত্ব যথেষ্ট নয়।


কোনো বস্তু ব্ল্যাক হোলে পতিত হলে ইভেন্ট হরাইজন অতিক্রম করার পর সেটি আর বাইরে ফিরে আসতে পারে না। ব্ল্যাক হোলের আকার ও ভরের ওপর নির্ভর করে সেখানে মহাকর্ষীয় জোয়ার-ভাটার শক্তি অত্যন্ত তীব্র হতে পারে। বিশেষ করে ছোট ব্ল্যাক হোলের কাছে কোনো বস্তু প্রবল মহাকর্ষীয় পার্থক্যের কারণে লম্বা হয়ে টানটান হয়ে যেতে পারে—এই ঘটনাকে জনপ্রিয়ভাবে “স্প্যাগেটিফিকেশন” বলা হয়। তবে অত্যন্ত বড় সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোলের ক্ষেত্রে ইভেন্ট হরাইজন অতিক্রমের মুহূর্তে জোয়ারীয় শক্তি তুলনামূলকভাবে কমও হতে পারে।


ব্ল্যাক হোলকে ঘিরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অ্যাক্রিশন ডিস্ক (Accretion Disk)। আশপাশের গ্যাস ও ধূলিকণা ব্ল্যাক হোলের দিকে পতিত হওয়ার সময় প্রচণ্ড গতিতে ঘুরতে থাকে এবং ঘর্ষণ ও সংকোচনের কারণে অত্যন্ত উত্তপ্ত হয়ে প্রচুর বিকিরণ সৃষ্টি করতে পারে। এই উজ্জ্বল পদার্থের অঞ্চলই অনেক সময় ব্ল্যাক হোলকে সরাসরি দেখার পরিবর্তে তার উপস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে কাজ করে। ২০১৯ সালে বিজ্ঞানীরা প্রথমবার একটি ব্ল্যাক হোলের চারপাশের উজ্জ্বল গ্যাসীয় অঞ্চলসহ এর ‘ছায়া’র ছবি প্রকাশ করেন।


তবে ব্ল্যাক হোলের কেন্দ্রে সত্যিই সিঙ্গুলারিটি আছে কি না, নাকি সেখানে এমন কোনো নতুন পদার্থবৈজ্ঞানিক অবস্থা রয়েছে যা আমাদের বর্তমান তত্ত্বে এখনো অজানা—তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। কারণ ব্ল্যাক হোলের অভ্যন্তর ব্যাখ্যা করতে সাধারণ আপেক্ষিকতা এবং কোয়ান্টাম বলবিদ্যা—দুই তত্ত্বকেই একসঙ্গে প্রয়োজন হতে পারে। এই দুই তত্ত্বকে সম্পূর্ণভাবে একীভূত করার মতো একটি প্রতিষ্ঠিত কোয়ান্টাম মহাকর্ষ তত্ত্ব এখনো বিজ্ঞানীদের হাতে নেই।


ব্ল্যাক হোলের ভেতরে অন্য কোনো মহাবিশ্ব, ওয়ার্মহোল কিংবা অন্য জগতের প্রবেশপথ রয়েছে—এমন নানা তাত্ত্বিক ধারণা ও কল্পনা প্রচলিত আছে। কিন্তু এগুলোর পক্ষে এখনো নির্ভরযোগ্য পর্যবেক্ষণগত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই বর্তমানে সবচেয়ে বৈজ্ঞানিক ও সতর্ক উত্তর হলো—ব্ল্যাক হোলের ইভেন্ট হরাইজনের ভেতরে কী ঘটে এবং কেন্দ্রে প্রকৃতপক্ষে কী রয়েছে, তা এখনো মানবজাতির অন্যতম বড় মহাজাগতিক রহস্য।

মন্তব্য করুন