সহকারী শিক্ষক
১৭ আগস্ট, ২০২৬ ১১:৪৯ অপরাহ্ণ
কোথাও বদলি শেষ, কোথাও কমিটিই হয়নি, সাথে ৫-পদের ফাঁদ! প্রাথমিকে অফলাইন বদলির চরম বৈষম্যে দিকবিদিকশূন্য হাজারো শিক্ষক!
কোথাও বদলি শেষ, কোথাও কমিটিই হয়নি, সাথে ৫-পদের ফাঁদ! প্রাথমিকে অফলাইন বদলির চরম বৈষম্যে দিকবিদিকশূন্য হাজারো শিক্ষক!
স্মার্ট বাংলাদেশের যুগে অনলাইনের বদলে অফলাইন: প্রাথমিক শিক্ষক বদলিতে চরম 'হ-য-ব-র-ল' ও প্রশাসনিক নৈরাজ্য
ব্লগ বিভাগ: শিক্ষা ও প্রশাসন / মতামত ও বিশ্লেষণ
ডিজিটাল বাংলাদেশের ধারাবাহিকতায় যখন দেশের মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও মাদ্রাসা শিক্ষার এমপিওভুক্ত শিক্ষক বদলি সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় অনলাইন সিস্টেমে রূপান্তর হচ্ছে, ঠিক তখনই প্রাথমিক শিক্ষক বদলিতে দেখা যাচ্ছে এক অবিশ্বাস্য পশ্চাদপসরণ! অনলাইন প্রক্রিয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রাথমিক শিক্ষকদের আবার ঠেলে দেওয়া হয়েছে অ্যানালগ যুগের 'অফলাইন' ও ‘যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যম’ নামক লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে।
সম্প্রতি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (DPE) থেকে একের পর এক প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র জারি করে আগামী ৩০ আগস্টের মধ্যে বদলি কার্যক্রম শেষ করে সেপ্টেম্বরে ১৪,৫০০ জন নবনিযুক্ত শিক্ষকের পদায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—কাগজে-কলমে জারি করা এই নির্দেশনার সাথে মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতার মিল কতটুকু? অধিদপ্তর কি আদৌ খবর রাখে ৪৫০টিরও বেশি উপজেলায় আজ কী চরম প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা ও সমন্বয়হীনতা চলছে?
১. অনলাইন থেকে অফলাইনে পিছু হটাও: লাল ফিতার দৌরাত্ম্য
স্মার্ট সার্ভিস প্রদানের অঙ্গীকার থাকলেও হঠাৎ করে অফলাইনে আবেদন গ্রহণের সিদ্ধান্তটি ছিল চরম আত্মঘাতী। উপরন্তু, অধিদপ্তর থেকে পরিপত্র জারি করে কড়া হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে—‘যথাযথ কর্তৃপক্ষ’ ব্যতিরেকে সরাসরি আবেদন করা যাবে না। ফলে একজন শিক্ষকের বদলির আবেদন এখন প্রধান শিক্ষক, সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার, উপজেলা শিক্ষা অফিসার, জেলা শিক্ষা অফিসার হয়ে বিভাগীয় কমিশনার পর্যন্ত ঘুরপাক খাচ্ছে। এই এনালগ প্রক্রিয়ায় যেমন দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির সুযোগ বেড়েছে, তেমনি প্রতিটি টেবিলে ফাইল আটকে থেকে সময়ক্ষেপণ হচ্ছে।
২. ৪৫০+ উপজেলায় এক এক রাজ্যের এক এক নিয়ম!
মাঠ পর্যায়ে গিয়ে খোঁজ নিলে দেখা যাবে, দেশের ৪৫০টিরও বেশি উপজেলা এখন যেন একেকটি 'স্বাধীন রাজ্য'। কোথাও কোনো একমুখী নির্দেশনা বা কেন্দ্রীয় সমন্বয় নেই:
- দায় ঠেলাঠেলি: কোনো উপজেলা বদলির আবেদন নিচ্ছে, আবার পাশের উপজেলা বলছে—"জেলা থেকে লিখিত নির্দেশনা আসেনি।" জেলা অফিস বলছে—"বিভাগ থেকে চাওয়া হয়নি।" একমাত্র রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয় থেকে হয়তো তৎপরতা দেখা গেছে, কিন্তু অন্য বিভাগের চিত্র সম্পূর্ণ স্থবির বা ধীরগতির।
- শূন্য পদের গোপনীয়তা: বদলিপ্রত্যাশী শিক্ষকের প্রথম অধিকার হলো শূন্য পদের তালিকা জানা। অথচ কোনো উপজেলা প্রকাশ্যে শূন্য পদের তালিকা ঝুলিয়ে দিচ্ছে, আবার কোনো উপজেলা তা গোপন রেখে স্বজনপ্রীতির পথ উন্মুক্ত রাখছে।
৩. অন্ত-জেলা ও অন্ত-বিভাগ বদলিপ্রত্যাশীদের সাথে প্রহসন
সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হচ্ছেন অন্ত-জেলা এবং অন্ত-বিভাগ বদলিপ্রত্যাশী শিক্ষকরা (বিশেষ করে যারা বিবাহ বা বিচ্ছেদজনিত কারণে স্বামীর এলাকায় বদলি হতে চান)।
- সময়সূচির অমিল: একটি উপজেলার বদলি কার্যক্রম শেষ হয়ে যাচ্ছে, অথচ আবেদনকারীর নিজস্ব উপজেলা এখনো আবেদন গ্রহণই শুরু করেনি!
- পছন্দক্রমের ফাঁদ: এক জেলা/উপজেলার বদলি চক্র চালু হয়ে বন্ধ হয়ে যাবে, আর অন্য জেলার চক্র শুরুই হবে না—এমন প্রেক্ষাপটে একজন শিক্ষক কীভাবে তাঁর কাঙ্ক্ষিত শূন্য পদ বেছে নেবেন? যখন তিনি আবেদন করার সুযোগ পাবেন, ততদিনে হয়তো তাঁর কাঙ্ক্ষিত উপজেলার শূন্য পদগুলো স্থানীয় পদায়নে পূর্ণ হয়ে যাবে! এটি শিক্ষকদের সমসুযোগ পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকারের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
৪. '৫-পদের বিদ্যালয়' নামক অভিশাপ
নীতিমালায় বলা হয়েছে, যেসব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মোট পদ সংখ্যা ৫টি, সেখান থেকে সহজে শিক্ষক বদলি করা যাবে না (যতক্ষণ না ৬ষ্ঠ পদ সৃষ্টি হয়)। বাস্তবতা হলো—দেশের অধিকাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ই ৫-পদ বিশিষ্ট। বিদ্যালয়গুলোতে রাতারাতি ৬ষ্ঠ পদ সৃষ্টির কোনো সুযোগ নেই। ফলে এই নিয়মের কারণে হাজার হাজার শিক্ষক বছরের পর বছর ধরে মানবিক কারণেও (যেমন: বিবাহবিচ্ছেদ, দীর্ঘ অসুস্থতা, পারিবারিক সংকট) বদলি হতে পারছেন না। নিয়ম যেখানে মানুষের কল্যাণের জন্য, সেখানে এই ধরনের অনমনীয় নীতি শিক্ষকদের জন্য এক 'অনির্দিষ্টকালের কারাদণ্ড' হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৫. ৩০ আগস্টের 'দায়সারা' ডেডলাইন ও জবাবদিহিতার অভাব
অধিদপ্তর থেকে সেপ্টেম্বর মাসে ১৪,৫০০ জন নবনিযুক্ত শিক্ষকের পদায়নের সুবিধার্থে আগামী ৩০ আগস্টের মধ্যে সব বদলি প্রক্রিয়া শেষ করার ডেডলাইন বেঁধে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এটি যে কেবলই একটি 'দায়সারা' ও 'টেবিলকেন্দ্রিক' সিদ্ধান্ত, তা মাঠের খবর নিলেই স্পষ্ট হয়। কোন উপজেলায় আবেদন জমা হচ্ছে, কোন জেলায় ফাইল আটকে আছে, কেন সর্বত্র একসাথে সার্কুলার দেওয়া হলো না—এসব প্রশ্নের কোনো তদারকি বা জবাবদিহিতা হেডকোয়ার্টার্স থেকে করা হচ্ছে না। দপ্তর শুধু চিঠি পাঠিয়ে খালাস, আর মাশুল গুনছেন সাধারণ শিক্ষকরা।
উত্তরণের উপায় ও আমাদের দাবি:
১. অনলাইন বদলি ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা: সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে অবিলম্বে সেন্ট্রাল অনলাইন ট্রান্সফার সিস্টেম (স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার) পুনরায় চালু করতে হবে।
২. একক ও অভিন্ন সময়সূচি (Unified Schedule): সারা দেশের সকল উপজেলা ও জেলায় একই দিনে আবেদন শুরু এবং একই দিনে শেষ করার কঠোর নির্দেশ নিশ্চিত করতে হবে।
৩. শূন্য পদের তালিকা উন্মুক্তকরণ: বিভাগ, জেলা ও উপজেলাভিত্তিক সকল শূন্য পদের তালিকা অনলাইনে প্রকাশ্যে রূপান্তর করতে হবে।
৪. ৫-পদের শর্ত শিথিলকরণ: মানবিক, পারিবারিক ও দূরবর্তী স্থানে কর্মরত শিক্ষকদের ক্ষেত্রে ৫-পদের বিদ্যালয়ের অনমনীয় শর্ত অবিলম্বে শিথিল করতে হবে।
৫. সমান ক্ষেত্র তৈরি করা: কোনো উপজেলায় আবেদন গ্রহণ বাকি থাকলে, অন্য উপজেলার বদলি আদেশ চূড়ান্ত করা স্থগিত রাখতে হবে, যাতে সকল শিক্ষক সমান সুযোগ পান।
শেষ কথা:
প্রাথমিক শিক্ষকরাই শিক্ষা ব্যবস্থার মেরুদণ্ড। তাঁদেরকে এভাবে প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং অব্যবস্থাপনার শিকার বানিয়ে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা আশা করা যায় না। অনতিবিলম্বে নীতি নির্ধারকদের মাঠ পর্যায়ের এই চরম নৈরাজ্য ও হ-য-ব-র-ল পরিস্থিতির দিকে নজর দিয়ে একটি স্বচ্ছ, সুনির্দিষ্ট ও বৈষম্যহীন বদলি ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করার আহ্বান জানাচ্ছি।
১৩
১৮ মন্তব্য