সহকারী অধ্যাপক
১৮ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:৪৯ পূর্বাহ্ণ
অসহায় পিতা - মোঃ মুজিবুর রহমান
অসহায় পিতা
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর।
ভূমিকা
মানুষের জীবনে কিছু সম্পর্ক আছে, যেগুলোর মূল্য কোনো অর্থ দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। পিতা-মাতার সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক তেমনই এক অমূল্য বন্ধন। জন্মের পর একটি শিশু যখন পৃথিবীর কিছুই বোঝে না, তখন পিতা তার হাত ধরে পথ দেখান, বিপদ থেকে রক্ষা করেন, প্রয়োজন পূরণ করেন এবং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী তার ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। সন্তানের মুখের হাসিই হয়ে ওঠে পিতার আনন্দ, সন্তানের সাফল্যই হয়ে ওঠে তাঁর গর্ব।
কিন্তু সময় কখনো থেমে থাকে না। যে পিতা একদিন শক্ত হাতে সংসারের হাল ধরেছিলেন, সন্তানদের লেখাপড়া ও জীবনের প্রয়োজন মেটাতে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিলেন, সেই পিতাই একদিন বয়সের ভারে দুর্বল হয়ে পড়েন। কর্মক্ষমতা কমে যায়, আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে যায়, শরীরের শক্তি ক্ষীণ হয়, দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণশক্তি দুর্বল হয়ে আসে। তখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় আপনজনের ভালোবাসা, সম্মান, সঙ্গ ও নিরাপত্তার।
দুঃখজনকভাবে, কখনো কখনো সেই সময়েই একজন পিতা নিজের ঘরেই নিজেকে অপ্রয়োজনীয় বা অসহায় মনে করতে শুরু করেন। এই অসহায়ত্ব শুধু শারীরিক নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানসিক কষ্ট, নিঃসঙ্গতা, অবহেলা ও ভালোবাসার অভাব। তাই ‘অসহায় পিতা’ কেবল একটি আবেগের বিষয় নয়; এটি পরিবার, নৈতিকতা, মানবিকতা এবং ইসলামী দায়িত্ববোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
পিতার ত্যাগের ইতিহাস
একজন পিতা সন্তানের জন্মের পর থেকেই তার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে শুরু করেন। সন্তান কীভাবে বড় হবে, কোথায় পড়বে, কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে—এসব চিন্তা পিতার হৃদয়ে নীরবে চলতে থাকে। নিজের প্রয়োজন অনেক সময় পিছিয়ে দিয়ে তিনি সন্তানের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেন।
রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, নানা প্রতিকূলতা সহ্য করে পিতা জীবিকার সন্ধানে ছুটে চলেন। নিজের শরীরের ক্লান্তিকে গুরুত্ব না দিয়ে সন্তানদের জন্য খাদ্য, পোশাক, শিক্ষা ও নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করার চেষ্টা করেন। কখনো নিজের পছন্দের জিনিস না কিনে সন্তানের প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে দেন। কখনো নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে সন্তানের স্বপ্নকে সামনে এগিয়ে দেন।
সন্তানের প্রথম হাঁটা, প্রথম কথা বলা, প্রথম বিদ্যালয়ে যাওয়া—প্রতিটি স্মৃতি পিতার হৃদয়ে গভীরভাবে গেঁথে থাকে। সন্তান পড়ে গেলে তিনি তাকে তুলে নেন, ভয় পেলে সাহস দেন, ব্যর্থ হলে উৎসাহ দেন এবং ভুল করলে শাসনের মাধ্যমে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন। মূল রচনাতেও পিতার এই দীর্ঘ ত্যাগ, শ্রম ও সন্তানের প্রতি ভালোবাসার চিত্র অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শীভাবে ফুটে উঠেছে।
পিতার শাসন কখনো সন্তানের কাছে কঠোর মনে হতে পারে; কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তার অন্তরে থাকে সন্তানের কল্যাণের আকাঙ্ক্ষা। তাই পিতার কোনো আচরণকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে তাঁর সামগ্রিক ত্যাগ ও দায়িত্ববোধের আলোকে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
সময়ের পরিবর্তন ও পিতার বার্ধক্য
সময়ের স্রোত কারও জন্য থেমে থাকে না। শিশুরা বড় হয়, তরুণ হয়, কর্মজীবনে প্রবেশ করে, নিজেদের পরিবার গড়ে তোলে। অন্যদিকে তাদের পিতা ধীরে ধীরে বার্ধক্যের দিকে এগিয়ে যান।
যে হাত একদিন সন্তানকে কোলে তুলে নিয়েছিল, সেই হাত একদিন কাঁপতে শুরু করে। যে পা দিয়ে পিতা কর্মক্ষেত্রে ছুটে বেড়িয়েছেন, সেই পায়ে একসময় চলার শক্তি কমে যায়। যে কণ্ঠস্বর ছিল দৃঢ় ও আত্মবিশ্বাসী, তা ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে আসে। যে মানুষটি একসময় পরিবারের সবার ভরসা ছিলেন, তিনিই একসময় অন্যের সাহায্যের প্রয়োজন অনুভব করেন।
এটাই জীবনের স্বাভাবিক নিয়ম। আজ যে সন্তান শক্তিশালী, কাল সে-ও বার্ধক্যের মুখোমুখি হবে। আজ যে পিতা অন্যের হাত ধরে হাঁটছেন, একদিন হয়তো সন্তানেরও কারও হাতের প্রয়োজন হবে। তাই পিতার বার্ধক্যকে কখনোই বোঝা হিসেবে দেখা উচিত নয়।
অসহায়ত্বের প্রকৃত বেদনা
একজন বৃদ্ধ পিতার সবচেয়ে বড় কষ্ট সবসময় অর্থের অভাব নয়। অনেক সময় তাঁর সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হয় একটু সময়, কিছু মমতাময় কথা এবং আপনজনের সঙ্গ।
সন্তান নিজের কর্মজীবন, সংসার ও সামাজিক ব্যস্ততায় এতটাই নিমগ্ন হয়ে যেতে পারে যে পিতার পাশে বসে কয়েক মিনিট কথা বলার সময়ও বের করতে পারে না। তখন পিতা হয়তো মুখে অভিযোগ করেন না। কিন্তু তাঁর নীরবতার মধ্যেও অনেক কথা লুকিয়ে থাকে।
যে পিতা একদিন সন্তানের চোখের জল মুছে দিয়েছেন, বার্ধক্যে তাঁর নিজের চোখের জল মুছে দেওয়ার মানুষ না থাকলে সেই বেদনা অত্যন্ত গভীর হয়। সংযুক্ত রচনায় এই নীরব নিঃসঙ্গতার বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
একজন পিতা হয়তো দামি উপহার চান না। তিনি চান সন্তান তাঁকে সম্মান করুক, তাঁর কথা শুনুক, তাঁর প্রয়োজন বুঝুক এবং মাঝে মাঝে পাশে বসুক। সন্তানের একটি আন্তরিক প্রশ্ন—‘বাবা, কেমন আছ?’—অনেক সময় একজন বৃদ্ধ পিতার মনে গভীর আনন্দ এনে দিতে পারে।
ইসলামে পিতা-মাতার মর্যাদা
ইসলাম পিতা-মাতার মর্যাদাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। মহান আল্লাহ তাঁর ইবাদতের নির্দেশের সঙ্গে পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশও দিয়েছেন। তাঁদের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করা, তাঁদের প্রতি নম্র হওয়া এবং তাঁদের কষ্ট না দেওয়া সন্তানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
কুরআনে এমনকি পিতা-মাতার সামনে বিরক্তি প্রকাশের সামান্যতম শব্দ উচ্চারণ করতেও নিষেধ করা হয়েছে। তাঁদের সঙ্গে সম্মান ও কোমলতার সঙ্গে কথা বলতে বলা হয়েছে। তাঁদের জন্য দোয়া করতে শেখানো হয়েছে—
‘হে আমার রব! তাঁরা যেমন শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন, তেমনি আপনিও তাঁদের প্রতি দয়া করুন।’
এই শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে পিতা-মাতার প্রতি সম্মান কেবল সামাজিক ভদ্রতা নয়; এটি ঈমান, নৈতিকতা ও আল্লাহর আনুগত্যের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। সংযুক্ত রচনাতেও এই ইসলামী শিক্ষাকে কেন্দ্রীয়ভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
পিতার সেবা কেন জরুরি
বৃদ্ধ পিতার সেবা করার অর্থ শুধু তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থা করা নয়। সেবা একটি বিস্তৃত দায়িত্ব। এর মধ্যে রয়েছে—
- তাঁর সঙ্গে সম্মানজনকভাবে কথা বলা;
- তাঁর প্রয়োজনের কথা জানতে চাওয়া;
- প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও ওষুধের ব্যবস্থা করা;
- সময়মতো খাবারের ব্যবস্থা করা;
- চলাফেরায় সহযোগিতা করা;
- তাঁর কথা ধৈর্যসহকারে শোনা;
- ভুলে গেলে বা একই কথা বারবার বললে বিরক্ত না হওয়া;
- তাঁর সিদ্ধান্ত ও মতামতকে যথাসম্ভব সম্মান করা;
- একাকিত্ব দূর করতে তাঁর সঙ্গে সময় কাটানো;
- তাঁকে পরিবারের একজন সম্মানিত সদস্য হিসেবে অনুভব করানো।
বৃদ্ধ বয়সে অনেকের স্মৃতিশক্তি দুর্বল হতে পারে, চলাফেরা ধীর হতে পারে কিংবা একই কথা বারবার বলার প্রবণতা দেখা দিতে পারে। এসব কারণে বিরক্ত না হয়ে ধৈর্য ও মমতার সঙ্গে আচরণ করা সন্তানের মানবিক দায়িত্ব।
মূল রচনায়ও পিতার ধীর চলা, ভুলে যাওয়া, ওষুধ ও খাবারের প্রয়োজন এবং মানসিক সঙ্গের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বৃদ্ধ পিতা বোঝা নন
একজন বৃদ্ধ পিতাকে কখনোই পরিবারের বোঝা হিসেবে দেখা উচিত নয়। তিনি পরিবারের ইতিহাসের ধারক, অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার এবং দীর্ঘ জীবনের সাক্ষী। তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে সন্তান ও নাতি-নাতনিরা অনেক কিছু শিখতে পারে।
যে মানুষটি জীবনের সেরা সময়গুলো পরিবারের জন্য ব্যয় করেছেন, তাঁর শেষ বয়সে পরিবারের কাছেই নিরাপদ আশ্রয় পাওয়ার অধিকার রয়েছে। তিনি হয়তো আগের মতো অর্থ উপার্জন করতে পারেন না; কিন্তু তাঁর ভালোবাসা, দোয়া, অভিজ্ঞতা ও পারিবারিক অবদান অর্থের চেয়ে অনেক মূল্যবান।
তাই একজন পিতার কর্মক্ষমতা কমে গেলে তাঁর মর্যাদা কমে যায় না। মানুষের মূল্য কেবল তার উপার্জনক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না।
পিতার ভুল ও সন্তানের আচরণ
পিতা মানুষ; তাই তাঁরও ভুল হতে পারে। জীবনের দীর্ঘ পথে তাঁর সিদ্ধান্তের কোনোটি সঠিক হতে পারে, কোনোটি ভুলও হতে পারে। কিন্তু তাঁর ভুলের কারণে তাঁর দীর্ঘ ত্যাগ ও ভালোবাসাকে অস্বীকার করা উচিত নয়।
সংযুক্ত রচনায় যথার্থই বলা হয়েছে যে পিতার ভুল থাকতে পারে, কারণ তিনিও একজন মানুষ; কিন্তু সেই ভুলের আড়ালেও তাঁর অসংখ্য ত্যাগের ইতিহাস রয়েছে।
অবশ্যই অন্যায়কে অন্যায় বলা প্রয়োজন। কিন্তু মতভেদ বা ভুলের কারণে পিতার সঙ্গে অসম্মানজনক আচরণ করা কোনোভাবেই কাম্য নয়। যুক্তি, নম্রতা, ধৈর্য ও ভালোবাসার মাধ্যমে পারিবারিক সমস্যার সমাধান করা উচিত।
অর্থ নয়, ভালোবাসাই বড়
অনেক সন্তান মনে করেন, বাবার জন্য বড় কোনো উপহার কিনে দিলেই দায়িত্ব শেষ। বাস্তবে ভালোবাসার মূল্য অনেক বেশি।
একজন বৃদ্ধ পিতার প্রয়োজন হতে পারে—
‘বাবা, আপনার কিছু লাগবে?’
‘বাবা, আজ কেমন আছেন?’
‘চলুন, একটু বসি।’
‘আপনার ওষুধ খেয়েছেন তো?’
এই সামান্য কথাগুলোই তাঁর মনে গভীর প্রশান্তি সৃষ্টি করতে পারে।
দামি পোশাক, মূল্যবান উপহার কিংবা বিলাসী সামগ্রী সবসময় একজন বৃদ্ধ পিতার হৃদয়ের শূন্যতা পূরণ করতে পারে না। তাঁর প্রয়োজন আন্তরিকতা, সম্মান, সঙ্গ ও ভালোবাসা। সংযুক্ত রচনাতেও এই সত্যটি স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
বৃদ্ধাশ্রম নয়, ভালোবাসার আশ্রয়
সমাজে বিভিন্ন কারণে বৃদ্ধাশ্রমের প্রয়োজন হতে পারে এবং প্রত্যেক পরিবারের বাস্তবতা এক নয়। তাই কোনো পরিবারকে কেবল বাহ্যিক পরিস্থিতি দেখে বিচার করা উচিত নয়। তবে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যদি কোনো সন্তান শুধু দায়িত্ব এড়ানোর জন্য বৃদ্ধ পিতাকে পরিত্যাগ করে, তা অত্যন্ত বেদনাদায়ক।
একজন পিতা যদি সন্তানের জন্য জীবনের দীর্ঘ সময় ব্যয় করে থাকেন, তাহলে তাঁর শেষ বয়সে সন্তানদের উচিত তাঁকে যথাসম্ভব ভালোবাসা, সম্মান ও নিরাপত্তা দেওয়া।
আদর্শ পরিবার এমন একটি পরিবেশ তৈরি করবে, যেখানে বৃদ্ধ পিতা নিজেকে পরিত্যক্ত নয়, বরং প্রয়োজনীয় ও সম্মানিত মনে করবেন।
পিতার অধিকার ও সন্তানের দায়িত্ব
পিতার প্রতি সন্তানের দায়িত্বকে কয়েকটি স্তরে দেখা যায়।
প্রথমত—সম্মান।
পিতার সঙ্গে কটু ভাষায় কথা বলা যাবে না। তাঁর মর্যাদা রক্ষা করতে হবে।
দ্বিতীয়ত—সেবা।
অসুস্থতা, দুর্বলতা বা বার্ধক্যে তাঁর প্রয়োজন পূরণে এগিয়ে আসতে হবে।
তৃতীয়ত—সঙ্গ।
শুধু অর্থ দেওয়া যথেষ্ট নয়; তাঁকে সময়ও দিতে হবে।
চতুর্থত—নিরাপত্তা।
তাঁর বাসস্থান, চিকিৎসা, খাদ্য ও দৈনন্দিন প্রয়োজনের দিকে নজর রাখতে হবে।
পঞ্চমত—মানসিক শান্তি।
অপ্রয়োজনীয় বিরোধ, অপমান ও অবহেলা থেকে তাঁকে দূরে রাখতে হবে।
ষষ্ঠত—দোয়া।
জীবিত পিতার জন্য কল্যাণের দোয়া করতে হবে এবং মৃত্যুবরণ করলে তাঁর জন্য মাগফিরাত কামনা করতে হবে।
সংযুক্ত রচনার শেষাংশেও জীবিত পিতার সেবা এবং মৃত পিতার জন্য দোয়ার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মৃত পিতার প্রতিও দায়িত্ব
পিতা পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেই তাঁর প্রতি সন্তানের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। তাঁর জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও রহমত প্রার্থনা করা, তাঁর জন্য সাদাকাহ বা অন্যান্য বৈধ কল্যাণমূলক কাজ করা এবং তাঁর রেখে যাওয়া বৈধ দায়িত্ব ও সম্পর্কের প্রতি যত্নশীল হওয়া সন্তানের জন্য নেক কাজের অংশ হতে পারে।
একজন সন্তান যখন মৃত পিতার জন্য আন্তরিকভাবে দোয়া করে, তখন সে শুধু একজন মৃত মানুষের কথা স্মরণ করে না; সে নিজের শিকড়, নিজের পরিচয় এবং নিজের জীবনের পেছনে থাকা একজন মহান ত্যাগী মানুষের স্মৃতিকে সম্মান করে।
সমাজেরও দায়িত্ব আছে
অসহায় পিতার দায়িত্ব শুধু সন্তানের নয়; সমাজেরও দায়িত্ব রয়েছে। কোনো বৃদ্ধ মানুষ যদি সত্যিই অসহায় হয়ে পড়েন এবং তাঁর দেখাশোনার মতো কেউ না থাকে, তাহলে আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, সামাজিক সংগঠন ও সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের এগিয়ে আসা উচিত।
মানবিক সমাজ সেই সমাজ, যেখানে দুর্বল মানুষকে একা ফেলে রাখা হয় না। অসুস্থ, দরিদ্র, বৃদ্ধ ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো মানবতার পরিচয়।
তাই আমাদের পরিবারে যেমন পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ববোধ তৈরি করতে হবে, তেমনি সমাজেও পারস্পরিক সহমর্মিতা ও সহযোগিতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
আজকের পিতা, আগামীর আমি
জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সত্যগুলোর একটি হলো—সময় কাউকে ছাড়ে না।
আজ আমি তরুণ; কাল আমি বৃদ্ধ হব। আজ আমার হাতে শক্তি আছে; কাল সেই শক্তি কমে যেতে পারে। আজ আমি অন্যকে সাহায্য করছি; কাল হয়তো আমারই সাহায্যের প্রয়োজন হবে।
তাই পিতার বার্ধক্য দেখে বিরক্ত হওয়ার আগে নিজের ভবিষ্যৎকে স্মরণ করা উচিত। যে আচরণ আমরা আজ আমাদের পিতার সঙ্গে করছি, ভবিষ্যতে আমাদের সন্তানরা আমাদের সঙ্গে একই আচরণ করতে পারে—এটি জীবনের একটি গভীর নৈতিক শিক্ষা।
পিতার অসহায়ত্ব তাই আমাদের জন্য সতর্কবার্তা। এটি আমাদের শেখায়—ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, যৌবন চিরস্থায়ী নয়, অর্থ চিরস্থায়ী নয়; কিন্তু মানুষের ভালো কাজ ও সুন্দর আচরণের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী।
সন্তানদের প্রতি হৃদয়স্পর্শী আহ্বান
হে সন্তান, তোমার বাবা যখন শক্তিশালী ছিলেন, তখন তিনি তোমার হাত ধরেছিলেন। তুমি যখন হাঁটতে জানতে না, তিনি তোমাকে পথ দেখিয়েছেন। তুমি যখন ভয় পেয়েছ, তিনি তোমাকে সাহস দিয়েছেন। তুমি যখন অসুস্থ হয়েছ, তিনি উদ্বিগ্ন হয়েছেন। তুমি যখন ব্যর্থ হয়েছ, তিনি আবার চেষ্টা করতে বলেছেন।
আজ যদি তাঁর পা কাঁপে, তাঁর হাত ধরো।
আজ যদি তাঁর চোখ দুর্বল হয়, তাঁর পথ আলোকিত করো।
আজ যদি তাঁর আয় না থাকে, সামর্থ্য অনুযায়ী তাঁর ভরসা হও।
আজ যদি তাঁর মন ভেঙে যায়, ভালোবাসার কথা বলো।
আজ যদি তিনি একা হয়ে পড়েন, তাঁর পাশে বসো।
কারণ সময় চলে গেলে অনেক কিছু ফিরে পাওয়া যায় না। কিন্তু সময় থাকতে একটি মমতাময় আচরণ একজন পিতার হৃদয়ে আজীবন আনন্দের স্মৃতি হয়ে থাকতে পারে।
পিতা-মাতার সেবায় বরকত
ইসলামী জীবনব্যবস্থায় পিতা-মাতার সেবা একটি মহান নেক কাজ। তাঁদের সম্মান করা, তাঁদের প্রয়োজন পূরণ করা এবং তাঁদের জন্য দোয়া করা সন্তানের চরিত্রকে সুন্দর করে।
তবে পিতা-মাতার সেবা যেন শুধু কোনো প্রতিদানের আশায় না হয়। এটি হওয়া উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি, কৃতজ্ঞতা, মানবিকতা ও নৈতিক দায়িত্ববোধ থেকে।
যে সন্তান পিতার মুখে হাসি ফোটাতে চেষ্টা করে, সে আসলে নিজের হৃদয়কেও পরিশুদ্ধ করে। যে সন্তান বৃদ্ধ পিতার হাত ধরে, সে শুধু একজন বৃদ্ধ মানুষকে সহায়তা করে না; সে নিজের শৈশবের স্মৃতিকে সম্মান করে।
আমাদের অঙ্গীকার
আমরা অঙ্গীকার করতে পারি—
পিতা-মাতাকে অবহেলা করব না।
তাঁদের সঙ্গে সম্মানজনক ভাষায় কথা বলব।
তাঁদের প্রয়োজন জানতে চেষ্টা করব।
বার্ধক্যে তাঁদের একাকী হতে দেব না।
তাঁদের চিকিৎসা ও দৈনন্দিন প্রয়োজনের প্রতি যত্নশীল থাকব।
তাঁদের ভুল হলে ধৈর্য ধরব।
তাঁদের সঙ্গে সময় কাটাব।
তাঁদের জন্য দোয়া করব।
আর যেসব পিতা-মাতা ইতিমধ্যে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন, তাঁদের জন্য আল্লাহর কাছে মাগফিরাত ও রহমত কামনা করব।
উপসংহার
পিতা শুধু একটি পরিচয়ের নাম নয়; পিতা একটি দীর্ঘ ত্যাগের ইতিহাস। পিতা সন্তানের জীবনের প্রথম আশ্রয়গুলোর অন্যতম। তাঁর শ্রমে সন্তান বেড়ে ওঠে, তাঁর ত্যাগে সন্তানের স্বপ্নের ভিত্তি তৈরি হয় এবং তাঁর ভালোবাসায় সন্তান জীবনের কঠিন পথ পাড়ি দেওয়ার সাহস পায়।
কিন্তু সময়ের অমোঘ নিয়মে সেই শক্তিমান পিতাই একদিন অসহায় হয়ে পড়েন। তখন তাঁর প্রয়োজন হয় সন্তানের ভালোবাসা, সম্মান, সেবা ও নিরাপদ আশ্রয়। তাই বৃদ্ধ পিতাকে বোঝা মনে করা নয়; বরং তাঁর শেষ জীবনকে শান্তিময় করা সন্তানের নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব।
মনে রাখতে হবে—আজকের শক্তিশালী পিতা একদিন দুর্বল হবেন, আর আজকের সন্তানও একদিন বার্ধক্যের দ্বারে পৌঁছাবে।
তাই পিতার হাতটি শক্ত করে ধরতে হবে, তাঁর কথা মন দিয়ে শুনতে হবে, তাঁর চোখের জল মুছে দিতে হবে এবং তাঁর মুখে হাসি ফোটাতে হবে।
পিতার জন্য সবচেয়ে বড় উপহার সবসময় অর্থ নয়; অনেক সময় সন্তানের একটু সময়, একটি মধুর কথা, সামান্য সম্মান এবং আন্তরিক ভালোবাসাই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
আসুন, আমরা এমন পরিবার গড়ে তুলি যেখানে কোনো পিতা শেষ বয়সে নিজেকে অসহায় মনে করবেন না; এমন সমাজ গড়ে তুলি যেখানে বৃদ্ধ মানুষ অবহেলার নয়, সম্মানের প্রতীক হবেন; এবং এমন জীবন গড়ে তুলি, যেখানে পিতা-মাতার সেবা হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম সুন্দর মাধ্যম।
পিতা যেন কখনো সন্তানের ঘরে বোঝা না হন—
পিতা হোন সন্তানের হৃদয়ের সম্মানিত আশ্রয়।
হে আল্লাহ! আমাদের পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ করার তাওফিক দিন, তাঁদের জীবিত অবস্থায় সেবা করার সুযোগ দিন, তাঁদের কষ্ট দেওয়া থেকে আমাদের রক্ষা করুন এবং যাঁরা ইন্তেকাল করেছেন তাঁদের মাগফিরাত ও রহমত দান করুন। আমিন।
৭
৬ মন্তব্য