সহকারী অধ্যাপক
১৯ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:০৭ পূর্বাহ্ণ
মুসাফিরের মতো জীবন - মোঃ মুজিবুর রহমান
মুসাফিরের মতো জীবন
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর
দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী। মানুষ এখানে চিরদিন থাকার জন্য আসেনি; বরং নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তাকে এই পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছে। জন্মের মাধ্যমে যার যাত্রা শুরু, মৃত্যুর মাধ্যমে একদিন তার দুনিয়ার সফর শেষ হবে। এরপর শুরু হবে আখিরাতের অনন্ত জীবন। তাই একজন সচেতন মুমিনের কাছে দুনিয়া চূড়ান্ত গন্তব্য নয়; এটি আখিরাতের পথে একটি অস্থায়ী যাত্রাবিরতি মাত্র। এই গভীর সত্যটি বোঝানোর জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) মুমিনের দুনিয়াবি অবস্থানকে পথিক বা মুসাফিরের অবস্থানের সঙ্গে তুলনা করেছেন। সংক্ষেপে বলা যায়—দুনিয়ায় এমনভাবে জীবনযাপন করতে হবে, যেন আমরা একজন পথিক; যার সামনে দীর্ঘ পথ, আর যার প্রকৃত গন্তব্য দুনিয়ার বাইরে।
আমাদের আলোচ্য রচনার মূল বক্তব্যও এটাই—দুনিয়ার মোহে নিজেকে হারিয়ে না ফেলে, প্রয়োজনীয় বৈধ উপকরণ গ্রহণ করে, সরলতা, সংযম, তাকওয়া, সৎকর্ম ও আল্লাহর স্মরণকে জীবনের ভিত্তি করে আখিরাতের প্রস্তুতি নেওয়া। মূল রচনায় দুনিয়াকে ক্ষণিকের ছায়া, জীবনকে নদীর স্রোত এবং মানুষকে পথিক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
দুনিয়া একটি ক্ষণস্থায়ী সফর
মানুষের জীবনের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, সময় কখনো থেমে থাকে না। শৈশব পেরিয়ে কৈশোর, কৈশোর পেরিয়ে যৌবন, যৌবন পেরিয়ে বার্ধক্য—এভাবেই জীবন অজান্তেই শেষের দিকে এগিয়ে যায়। যে সকালটি একবার চলে যায়, তা আর ফিরে আসে না। গতকাল আমাদের হাতে নেই, আগামীকাল আমাদের নিশ্চিত নয়; আমাদের হাতে রয়েছে কেবল বর্তমান মুহূর্ত। তাই সময়ের প্রতিটি মুহূর্ত অত্যন্ত মূল্যবান।
দুনিয়ার সুখ-সৌন্দর্যও স্থায়ী নয়। আজ যে ঘরে আনন্দের কোলাহল, কাল সেখানে নেমে আসতে পারে নীরবতা। আজ যে মানুষ শক্তিশালী ও সম্মানিত, কাল সে হতে পারে দুর্বল ও অসহায়। আজ যার অঢেল সম্পদ, মৃত্যুর পরে সেই সম্পদ তার সঙ্গে যাবে না। মূল রচনাতেও বলা হয়েছে—প্রাসাদ, ধনভাণ্ডার, সোনা-রূপা, ক্ষমতা ও মান-সম্মান কিছুই মানুষের সঙ্গে যাবে না; সঙ্গে থাকবে তার কর্মের ফল।
অতএব, দুনিয়াকে ভালোবাসা নয়—দুনিয়ার প্রতি আসক্তিই মানুষের জন্য বিপদের কারণ হতে পারে। দুনিয়া মানুষের প্রয়োজন পূরণের ক্ষেত্র; কিন্তু দুনিয়াকে জীবনের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য বানানো উচিত নয়।
মুসাফিরের উপমার গভীর শিক্ষা
একজন মুসাফির যখন দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়, তখন সে পথের ধারে সাময়িকভাবে পাওয়া কোনো জিনিসকে নিজের স্থায়ী সম্পদ মনে করে না। সে জানে, তাকে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। সে প্রয়োজনীয় সামগ্রী সঙ্গে রাখে, কিন্তু অপ্রয়োজনীয় বোঝা বহন করে না। তার চোখ থাকে গন্তব্যের দিকে।
মুমিনের জীবনও এমন হওয়া উচিত। দুনিয়ায় সে কাজ করবে, উপার্জন করবে, পরিবার পরিচালনা করবে, সন্তানদের লালন-পালন করবে, জ্ঞান অর্জন করবে এবং সমাজের কল্যাণে ভূমিকা রাখবে; কিন্তু এসবের কোনোটিকেই আল্লাহর স্মরণ ও আখিরাতের দায়িত্বের বিকল্প বানাবে না। মূল রচনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—সম্পদ হাতে থাকবে, কিন্তু হৃদয়ের আসন থাকবে আল্লাহর জন্য; ঘর-পরিবার ও হালাল রুজির প্রয়োজন থাকবে, কিন্তু হৃদয় যেন দুনিয়ার দাসে পরিণত না হয়।
এটাই মুসাফিরের মতো জীবনযাপনের প্রকৃত শিক্ষা।
সরল জীবন মানে দারিদ্র্য নয়
ইসলামে সরল জীবনযাপন বলতে সম্পদ অর্জনকে নিষিদ্ধ করা বোঝায় না। একজন মানুষ হালাল পথে উপার্জন করতে পারে, ব্যবসা করতে পারে, সুন্দর বাড়ি করতে পারে, পরিবারকে ভালো রাখতে পারে এবং বৈধ উপায়ে স্বচ্ছল জীবনযাপন করতে পারে। তবে সম্পদ যেন তার হৃদয় দখল করে না নেয় এবং তাকে আল্লাহর স্মরণ, ইবাদত ও মানুষের অধিকার থেকে দূরে সরিয়ে না দেয়।
সরলতার অর্থ হলো—অপ্রয়োজনীয় ভোগবিলাস, অহংকার, অপচয় ও অতিরিক্ত লোভ থেকে নিজেকে সংযত রাখা। প্রয়োজনের চেয়ে বেশি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা যখন মানুষের অন্তরে অশান্তি সৃষ্টি করে, তখন সম্পদ আশীর্বাদের পরিবর্তে বোঝায় পরিণত হয়। বিপরীতে হালাল উপার্জন, অল্পে তুষ্টি এবং সামর্থ্য অনুযায়ী দান মানুষের জীবনকে কল্যাণময় করে।
মূল রচনাতেও সরলতাকে দারিদ্র্যের সঙ্গে এক করে দেখা হয়নি; বরং অল্পে তুষ্ট থাকা, বেশি দান করা এবং অন্তরকে পবিত্র রাখাকেই সরলতার সৌন্দর্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
সম্পদ থাকবে হাতে, হৃদয়ে নয়
সম্পদ মানুষের জীবনে প্রয়োজনীয়। অর্থ ছাড়া পরিবার চালানো, সন্তানদের শিক্ষা দেওয়া, অসহায়দের সাহায্য করা কিংবা সমাজের বিভিন্ন কল্যাণমূলক কাজে অংশ নেওয়া কঠিন। তাই সম্পদ নিজে খারাপ নয়; বরং সম্পদ অর্জনের পদ্ধতি, ব্যবহারের ধরন এবং অন্তরের অবস্থাই মূল বিষয়।
হালাল উপায়ে অর্জিত সম্পদ যদি মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়, তাহলে তা মহৎ নিয়ামত হতে পারে। ক্ষুধার্তকে খাদ্য দেওয়া, অসুস্থকে সাহায্য করা, দরিদ্রের পাশে দাঁড়ানো, শিক্ষার সুযোগ করে দেওয়া, আত্মীয়ের প্রয়োজন পূরণ করা—এসব কাজে সম্পদ ব্যয় করা কল্যাণের মাধ্যম হতে পারে। অন্যদিকে অহংকার, প্রতারণা, জুলুম, সুদ, ঘুষ, আত্মসাৎ কিংবা অন্যের অধিকার নষ্ট করে সম্পদ অর্জন করলে তা মানুষের জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তাই মুমিনের নীতি হওয়া উচিত—সম্পদ আমার হাতে থাকবে, কিন্তু আমার হৃদয়ের মালিক হবে না। হৃদয়ের সর্বোচ্চ আসন থাকবে আল্লাহর জন্য।
অহংকারের পরিবর্তে বিনয়
দুনিয়ার সম্পদ, ক্ষমতা, জ্ঞান, সৌন্দর্য, পদমর্যাদা কিংবা সামাজিক অবস্থান মানুষকে অহংকারী করে তুলতে পারে। কিন্তু মানুষকে মনে রাখতে হবে—এসবই সাময়িক। আজ যে ব্যক্তি শক্তিশালী, কাল সে অসুস্থ হতে পারে; আজ যে সম্মানিত, কাল তার অবস্থার পরিবর্তন হতে পারে; আজ যে ধনী, কাল সে কবরের বাসিন্দা হতে পারে।
অহংকার মানুষের অন্তরকে কঠিন করে এবং অন্য মানুষকে তুচ্ছ করার প্রবণতা সৃষ্টি করে। ইসলামী জীবনব্যবস্থা এর বিপরীতে বিনয়, নম্রতা, দয়া ও মানবিকতার শিক্ষা দেয়। তাই কাউকে ছোট করা উচিত নয়। দুর্বল, দরিদ্র কিংবা অসহায় মানুষকেও সম্মানের চোখে দেখতে হবে। কারণ মানুষের প্রকৃত মর্যাদা বাহ্যিক সম্পদে নয়; বরং ঈমান, তাকওয়া, চরিত্র ও সৎকর্মে।
মূল রচনায় অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, ক্ষুধার্তের মুখে হাসি ফোটানো এবং অন্যের অশ্রু মুছে দেওয়াকে মানবিক ও কল্যাণকর জীবনের অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
মানুষের প্রতি দয়া ও দায়িত্ববোধ
মুসাফিরের মতো জীবন মানে শুধু নিজের আখিরাতের চিন্তা করা নয়; বরং মানুষের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়াও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একজন প্রকৃত মুমিন নিজের সুখের পাশাপাশি অন্যের দুঃখের কথাও ভাববে। সে ক্ষুধার্তকে দেখে চোখ ফিরিয়ে নেবে না, অসহায়কে অবহেলা করবে না এবং বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবে।
একটি ভালো কথা, এক গ্লাস পানি, সামান্য খাদ্য, প্রয়োজনের সময় একটি সহানুভূতির হাত—এসব ছোট কাজও মানুষের জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। মানুষের প্রতি দয়া, ক্ষমা, সহযোগিতা ও ভালোবাসা সমাজে পারস্পরিক বন্ধন দৃঢ় করে।
তাই মুসাফিরের মতো জীবন মানে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা নয়; বরং দুনিয়ার পথে চলতে চলতে মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত রাখা।
সময়ের মূল্য
জীবন সীমিত, কিন্তু মানুষের চাহিদা অসীম। মানুষ অনেক সময় এমনভাবে দুনিয়াবি কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে যে জীবনের আসল উদ্দেশ্য ভুলে যায়। অথচ সময় একবার চলে গেলে তা আর ফিরে আসে না। তাই একজন মুমিনের উচিত সময়কে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো।
জ্ঞান অর্জন, ইবাদত, পরিবারকে সময় দেওয়া, জীবিকা অর্জন, মানুষের উপকার করা, আত্মশুদ্ধি এবং সমাজের কল্যাণে কাজ করা—এসবই সময়ের সুন্দর ব্যবহার। অলসতা, অর্থহীন বিনোদন, পরনিন্দা, অযথা বিরোধ, অহংকার ও অনর্থক কাজে জীবনের মূল্যবান সময় নষ্ট করা উচিত নয়।
মূল রচনায় সময়ের মূল্য বোঝানো হয়েছে এভাবে যে আজকের সুযোগ আগামীকাল নাও থাকতে পারে; তাই জ্ঞান, সৎকর্ম ও ইবাদতের মাধ্যমে জীবনকে গড়ে তুলতে হবে।
মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী
মৃত্যু এমন এক সত্য, যা কোনো মানুষ অস্বীকার করতে পারে না। ধনী-গরিব, রাজা-প্রজা, তরুণ-বৃদ্ধ—সবার জীবনেই মৃত্যুর আগমন ঘটবে। মৃত্যুর জন্য বয়স কোনো নির্দিষ্ট শর্ত নয়। কেউ দীর্ঘ জীবন পায়, কেউ অল্প বয়সেই পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়।
তাই মৃত্যুর কথা মনে রাখা হতাশার বিষয় নয়; বরং এটি মানুষকে দায়িত্বশীল ও সচেতন করে। মৃত্যু স্মরণ করলে মানুষ অহংকার থেকে দূরে থাকে, অন্যের অধিকার নষ্ট করতে ভয় পায়, পাপ থেকে ফিরে আসার চেষ্টা করে এবং ভালো কাজের প্রতি আগ্রহী হয়।
কবর হলো দুনিয়ার জীবনের পরবর্তী পর্যায়ের সূচনা। সেখানে মানুষের বাহ্যিক পরিচয়, ধন-সম্পদ ও সামাজিক মর্যাদার পরিবর্তে তার কর্মের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। মূল রচনায়ও বলা হয়েছে, মৃত্যুর পর মানুষের সঙ্গে থাকবে তার কর্মের হিসাব ও আমলনামা; দুনিয়ার বাহ্যিক চাকচিক্য ও সম্পদের স্তূপ সেখানে কোনো কাজে আসবে না।
তাওবা ও আত্মসংশোধন
মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। জীবনে ভুল হতে পারে, পাপ হতে পারে, অন্যায় হয়ে যেতে পারে। কিন্তু ভুলের পর ভুল আঁকড়ে থাকা মুমিনের বৈশিষ্ট্য নয়। বরং ভুল বুঝতে পারলে আল্লাহর কাছে ফিরে আসা, অনুতপ্ত হওয়া এবং নিজেকে সংশোধন করা জরুরি।
তাওবা শুধু মুখে ক্ষমা চাওয়ার নাম নয়; বরং পাপ থেকে ফিরে এসে জীবনকে সংশোধনের চেষ্টা করা। কেউ যদি অন্যের অধিকার নষ্ট করে থাকে, তবে সম্ভব হলে সেই অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। কারও মনে কষ্ট দিয়ে থাকলে ক্ষমা চাইতে হবে এবং ভবিষ্যতে সেই ভুল পুনরায় না করার চেষ্টা করতে হবে।
মূল রচনাতেও সময় থাকতে তাওবা করা, হারাম ছেড়ে হালাল গ্রহণ করা, সত্য ও ন্যায়ের পথে ফিরে আসা এবং অন্যের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সুখে শোকর, দুঃখে সবর
জীবনে সুখ ও দুঃখ পাশাপাশি আসে। সব সময় আনন্দ থাকবে না, আবার সব সময় দুঃখও থাকবে না। কখনো মানুষ সম্পদ, স্বাস্থ্য, সম্মান ও স্বাচ্ছন্দ্য পায়; আবার কখনো তাকে অভাব, অসুস্থতা, ব্যর্থতা বা বিপদের মুখোমুখি হতে হয়।
একজন মুমিন সুখের সময় আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করবে এবং নিয়ামতকে সৎ কাজে ব্যবহার করবে। দুঃখের সময় ধৈর্য ধারণ করবে এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখবে। বিপদ তাকে আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে দেবে না; বরং আরও বেশি তাঁর দিকে ফিরিয়ে নেবে।
এই ভারসাম্যপূর্ণ মানসিকতা মানুষকে স্থির, সংযত ও আশাবাদী করে। মূল রচনায়ও সুখে শোকর, দুঃখে সবর এবং সব অবস্থায় আল্লাহর ওপর ভরসা রাখার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।
দুনিয়া কর্মভূমি, আখিরাত ফলভূমি
দুনিয়াকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা ইসলামের শিক্ষা নয়। বরং দুনিয়াকে সঠিকভাবে ব্যবহার করে আখিরাতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়াই মুমিনের দায়িত্ব। মানুষ এখানে যে কাজ করবে, তারই ফল তাকে পরবর্তী জীবনে ভোগ করতে হবে।
তাই দুনিয়াকে একটি কর্মক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা যায়। এখানে আমরা ঈমান, ইবাদত, ন্যায়, সততা, দয়া, মানবসেবা ও সৎকর্মের বীজ বপন করব। আর আখিরাতে সেই কর্মের ফল লাভ করব। মূল রচনায় এই বিষয়টি বীজ ও ফলের উপমার মাধ্যমে অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে—সৎকর্মের বীজ কল্যাণের ফল দেয়, আর পাপের বীজ অনুতাপের ফল বয়ে আনে।
পরিবার ও সমাজের প্রতি দায়িত্ব
মুসাফিরের মতো জীবনযাপন মানে সংসার ছেড়ে পাহাড়-জঙ্গলে চলে যাওয়া নয়। মানুষ পরিবারে থাকবে, সন্তানদের লালন-পালন করবে, তাদের শিক্ষা ও নৈতিক বিকাশের ব্যবস্থা করবে এবং হালাল জীবিকা অর্জনের চেষ্টা করবে। তবে এসব দায়িত্ব পালনের মধ্যেও আল্লাহর বিধান ও আখিরাতের কথা মনে রাখতে হবে।
একজন পিতা-মাতা সন্তানের জন্য শুধু অর্থ-সম্পদ রেখে গেলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; বরং তাকে সৎ, ন্যায়পরায়ণ, দায়িত্বশীল ও আল্লাহভীরু মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাও বড় দায়িত্ব। পরিবারে ভালোবাসা, পারস্পরিক সম্মান, সত্যবাদিতা ও নৈতিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
মূল রচনায়ও ঘর সাজানো, পরিবার দেখাশোনা এবং সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার পাশাপাশি হালাল পথে জীবন পরিচালনা ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের কথা বলা হয়েছে।
হালাল রুজি ও পবিত্র উপার্জন
মুমিনের জীবনে উপার্জনের পবিত্রতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অল্প হলেও হালাল উপার্জন সম্মানজনক; আর অন্যায় ও হারাম পথে অর্জিত বিপুল সম্পদ মানুষের জন্য কল্যাণ বয়ে আনে না। কারণ সম্পদের পরিমাণের চেয়ে তার উৎস ও ব্যবহার অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যবসা, চাকরি, কৃষি, কারিগরি কাজ কিংবা যে কোনো বৈধ পেশার মাধ্যমে উপার্জন করা যায়। কিন্তু প্রতারণা, ঘুষ, আত্মসাৎ, জুলুম, মিথ্যা, অন্যের অধিকার হরণ কিংবা অবৈধ পন্থায় সম্পদ অর্জন থেকে বিরত থাকতে হবে।
হালাল উপার্জন মানুষের জীবনে প্রশান্তি আনে এবং অন্যের অধিকার রক্ষার পথ খুলে দেয়। তাই মুসাফিরের মতো জীবনযাপনকারী মানুষ অল্পে তুষ্ট হলেও নিষ্কর্মা হবে না; বরং পরিশ্রম করবে, হালাল উপার্জন করবে এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ কল্যাণের কাজে ব্যয় করবে।
অন্তরের আসন আল্লাহর জন্য
মানুষের ঘরে অনেক কিছু থাকতে পারে—সম্পদ, আসবাব, পোশাক, যানবাহন, জমি, ব্যবসা ও নানা ধরনের সুবিধা। কিন্তু হৃদয়ের কেন্দ্রস্থলে কী আছে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যদি মানুষের হৃদয় দুনিয়ার সম্পদ, পদমর্যাদা ও মানুষের প্রশংসার প্রতি অতিরিক্ত আসক্ত হয়ে যায়, তাহলে সে ধীরে ধীরে আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে যেতে পারে।
অন্যদিকে, যার হৃদয়ে আল্লাহর স্মরণ রয়েছে, সে দুনিয়ার নিয়ামত ভোগ করেও তার প্রতি অতিরিক্ত আসক্ত হয় না। সম্পদ তার হাতে থাকে, কিন্তু তাকে নিয়ন্ত্রণ করে না; সম্মান আসে, কিন্তু সে অহংকারী হয় না; বিপদ আসে, কিন্তু সে হতাশ হয়ে পড়ে না।
এই অন্তরের স্বাধীনতাই মুসাফিরের জীবনের অন্যতম সৌন্দর্য।
আখিরাতের প্রস্তুতি
দুনিয়ার সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গন্তব্যের জন্য প্রস্তুতি। একজন মুসাফির যেমন দীর্ঘ পথের জন্য প্রয়োজনীয় পাথেয় সঙ্গে নেয়, তেমনি একজন মুমিনেরও আখিরাতের জন্য পাথেয় সংগ্রহ করতে হবে।
এই পাথেয় হলো ঈমান, সালাত, কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক, সৎকর্ম, সত্যবাদিতা, আমানতদারি, মানুষের অধিকার আদায়, দান-সদকা, দয়া, ক্ষমা, ন্যায়পরায়ণতা, আত্মসংযম ও আল্লাহর স্মরণ। অন্যদিকে পাপ, অহংকার, জুলুম, মিথ্যা, প্রতারণা, হিংসা, বিদ্বেষ ও অন্যের অধিকার হরণ—এসব থেকে নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা করতে হবে।
হাশরের ময়দানে মানুষের গোপন ও প্রকাশ্য কর্মের হিসাব সামনে আসবে—এই বিশ্বাস মানুষকে আত্মশুদ্ধির পথে পরিচালিত করে। মূল রচনায় হাশরের মাঠ, আমলনামা এবং মানুষের কর্মের প্রকাশের বিষয়টি আখিরাতের জবাবদিহির অনুভূতি জাগানোর জন্য তুলে ধরা হয়েছে।
কেমন হবে মুসাফিরের মতো জীবন?
মুসাফিরের মতো জীবন মানে—
অল্পে তুষ্ট থাকা, কিন্তু অলস না হওয়া;
সম্পদ অর্জন করা, কিন্তু সম্পদের দাস না হওয়া;
পরিবারকে ভালোবাসা, কিন্তু আল্লাহকে ভুলে না যাওয়া;
দুনিয়ায় কাজ করা, কিন্তু আখিরাতকে ভুলে না যাওয়া;
হালাল উপার্জন করা, কিন্তু হারাম থেকে দূরে থাকা;
সুখে শোকর করা, দুঃখে সবর করা;
অহংকার ত্যাগ করে বিনয়ী হওয়া;
অন্যের অধিকার আদায় করা;
অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো;
মিথ্যা ও জুলুম পরিহার করে সত্য ও ন্যায়কে আঁকড়ে ধরা;
সময়কে মূল্য দেওয়া;
ভুল হলে তাওবা করা;
এবং প্রতিটি মুহূর্তে মনে রাখা—একদিন এই দুনিয়ার সফর শেষ হবে।
উপসংহার
দুনিয়া একটি ক্ষণস্থায়ী সফর, আর মানুষ তার পথিক। আমরা যতই দুনিয়ার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হই, যতই সম্পদ সঞ্চয় করি, যতই ক্ষমতা বা সম্মান অর্জন করি—একদিন সবকিছু ছেড়ে চলে যেতে হবে। তাই দুনিয়াকে অস্বীকার নয়, বরং সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হবে। দুনিয়ার প্রয়োজনীয় উপকরণ গ্রহণ করতে হবে, কিন্তু দুনিয়াকে হৃদয়ের একমাত্র লক্ষ্য বানানো যাবে না।
মুসাফির যেমন জানে—পথের ধারে পাওয়া সাময়িক আশ্রয় তার চূড়ান্ত ঠিকানা নয়, তেমনি মুমিনও জানবে—এই পৃথিবী তার স্থায়ী আবাস নয়। তার প্রকৃত প্রত্যাবর্তন আল্লাহর কাছেই। তাই জীবনের প্রতিটি দিনকে আখিরাতের প্রস্তুতির সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
আমাদের জীবন হোক সরল, পবিত্র ও পরিশ্রমী; উপার্জন হোক হালাল; চরিত্র হোক সুন্দর; অন্তর হোক বিনয়ী; আচরণ হোক মানবিক; মুখে থাকুক সত্য; হাতে থাকুক সৎকর্ম; হৃদয়ে থাকুক আল্লাহর স্মরণ। দুনিয়ার পথে চলব আমরা দায়িত্বশীল মানুষের মতো, আর আখিরাতের পথে প্রস্তুত হব সচেতন মুমিনের মতো।
শেষ পর্যন্ত আমাদের সবার প্রত্যাবর্তন সেই মহান রবের কাছেই। তাই আজ থেকেই সংকল্প হোক—দুনিয়ার মোহে হারিয়ে যাব না, দুনিয়াকে ব্যবহার করব আখিরাতের কল্যাণের জন্য; মুসাফিরের মতো চলব, সৎকর্মের পাথেয় গড়ব এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিকে জীবনের সর্বোচ্চ লক্ষ্য বানাব।
আল্লাহ আমাদের এমন জীবন দান করুন, যে জীবনে থাকবে ঈমানের আলো, আমলের সৌন্দর্য, হালাল উপার্জনের পবিত্রতা, মানুষের প্রতি দয়া, অন্তরের বিনয় এবং আখিরাতের সফলতার আকাঙ্ক্ষা। তিনি আমাদের দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী মোহ থেকে রক্ষা করুন, সৎপথে অবিচল রাখুন এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমিন।
১৩
১৮ মন্তব্য