সহকারী শিক্ষক
১৯ আগস্ট, ২০২৬ ০৮:০৭ পূর্বাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
আমরা মানুষ হিসেবে কথা বলার জন্য শব্দ ও ভাষা ব্যবহার করি। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, আমাদের চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা নীরব গাছপালাগুলো কি একে অপরের সাথে যোগাযোগ করে? আপাতদৃষ্টিতে নিথর ও নিঃশব্দ মনে হলেও, বিজ্ঞান বলছে—গাছপালা মোটেও একাকী বা বিচ্ছিন্ন নয়। তারা নিজেদের মধ্যে প্রতিনিয়ত তথ্য আদান-প্রদান করে, একে অপরকে বিপদের সতর্কতা পাঠায় এবং এমনকি খাবার বা পুষ্টিও ভাগাভাগি করে নেয়!
গাছ আমাদের মতো মুখ ফুটে কথা বলে না বা শব্দ তৈরি করে না। তবে তাদের যোগাযোগের ধরণটি বহুলাংশে রাসায়নিক ও জৈবিক। জঙ্গলের কোনো একটি গাছে যদি পোকা আক্রমণ করে বা কোনো রোগ দেখা দেয়, তবে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আশেপাশের অন্যান্য গাছগুলো সেই বিপদ সম্পর্কে জেনে যায় এবং আগাম প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের মতে, একটি বনের সমস্ত গাছপালা আসলে একটি বিশাল সামাজিক নেটওয়ার্কের মতো কাজ করে।
গাছপালার যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো বাতাসে উদ্বায়ী জৈব যৌগ বা VOCs (Volatile Organic Compounds) ছড়িয়ে দেওয়া।
সতর্কবার্তা পাঠানো: যখন কোনো জিরাফ বা ক্ষতিকর পোকা গাছের পাতা খেতে শুরু করে, তখন আক্রান্ত গাছটি বাতাসে বিশেষ ধরনের রাসায়নিক গ্যাস (যেমন: ইথিলিন) নিঃসৃত করে।
প্রতিরোধ গড়ে তোলা: বাতাসের মাধ্যমে এই কেমিক্যাল মেসেজ আশেপাশে থাকা অন্য গাছের পাতায় পৌঁছায়। সংকেত পাওয়া মাত্রই অন্য গাছগুলো দ্রুত নিজেদের পাতায় 'ট্যানিন' (Tannin) বা বিষাক্ত ও তিক্ত স্বাদের কেমিক্যাল তৈরি শুরু করে, যাতে পোকা বা প্রাণী সেই পাতা না খায়।
বন্ধু পোকাকে আহ্বান: কিছু গাছ পোকার আক্রমণে এমন রাসায়নিক ছড়ায় যা শত্রুপোকার প্রাকৃতিক শিকারী (যেমন: বিশেষ মাছি বা বোলতা)-কে আকর্ষণ করে গাছটিকে রক্ষা করতে ডেকে আনে!
বাতাসের চেয়েও উদ্ভিদের সবচেয়ে বিস্ময়কর যোগাযোগব্যবস্থাটি গড়ে ওঠে মাটির নিচে। একে বিজ্ঞানীরা রসিকতা করে বলেন "উড ওয়াইড ওয়েব" (Wood Wide Web)।
মাইকোরাইজাল নেটওয়ার্ক (Mycorrhizal Network): মাটির নিচে বিশেষ ধরনের ছত্রাক (Fungi) বা ফাঙ্গাসের সূক্ষ্ম সূতোর মতো জাল ছড়িয়ে থাকে। এই ছত্রাকগুলো বিভিন্ন গাছের শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিশাল এক ভূগর্ভস্থ নেটওয়ার্ক তৈরি করে।
পুষ্টি ও তথ্যের আদান-প্রদান: এই ছত্রাক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বড় ও প্রবীণ গাছগুলো (যাদের 'মাদার ট্রি' বলা হয়) ছোট বা দুর্বল চারাগাছকে শর্করা ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাঠায়।
বিপদের অ্যালার্ম: মাটির নিচের এই হাইওয়ের মাধ্যমে একটি গাছ অন্য গাছকে রোগ বা কীটপতঙ্গের আক্রমণের তথ্য বা সংকেত পাঠাতে পারে।
গাছের শিকড় শুধু মাটি থেকে পানি ও খনিজ উপাদানই শোষণ করে না, বরং মাটির পরিবেশ পর্যবেক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
শিকড়ের বিশেষ ক্ষমতা: শিকড়গুলো মাটির ভেতরের রাসায়নিক নিঃসরণের (Root Exudates) মাধ্যমে আশপাশের অন্যান্য গাছের শিকড় চিনতে পারে। নিজ প্রজাতির গাছের শিকড় হলে তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করে পাশাপাশি বাড়ে, কিন্তু ভিন্ন ক্ষতিকারক প্রজাতির উদ্ভিদের ক্ষেত্রে তারা রাসায়নিক ছড়িয়ে নিজেদের সীমানা রক্ষা করে।
এছাড়া সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, খরা বা পানির সংকট দেখা দিলে শিকড় থেকে বিশেষ হরমোন সংকেত পাঠিয়ে গাছ নিজের পাতাগুলোকে বাষ্পীভবন কমাতে প্রস্তুত করে।
কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত পরিবেশবিজ্ঞানী ড. সুজান সিমার্ড (Dr. Suzanne Simard) উদ্ভিদের এই যোগাযোগের ওপর দীর্ঘকাল গবেষণা করেছেন। তাঁর গবেষণায় যেসব চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে:
মাদার ট্রির ভূমিকা: বনে বড় ও বয়স্ক গাছগুলো পুরো নেটওয়ার্কের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করে। এগুলো ছোট চারাগাছদের বাঁচিয়ে রাখতে নিজস্ব শক্তির উল্লেখযোগ্য অংশ পাঠায়।
ইলেকট্রিক্যাল সিগন্যাল: প্রাণীদের স্নায়ুতন্ত্রের মতো উদ্ভিদের মধ্যেও আঘাত পেলে খুব সূক্ষ্ম বৈদ্যুতিক সংকেত (Action Potentials) প্রবাহিত হয়।
উদার প্রকৃতি: গবেষণায় দেখা গেছে, শীতকালে পাতাঝরা গাছ পাইন বা দেবদারু জাতীয় সবুজ গাছ থেকে পুষ্টি নেয়, আবার গ্রীষ্মকালে উল্টোটা ঘটে। অর্থাৎ তারা বিপদে একে অপরকে সাহায্য করে।
গাছের যোগাযোগ নিয়ে রূপকথা বা গল্পগাথায় নানা কাল্পনিক ধারণা থাকলেও বিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি বেশ স্পষ্ট:
| বিষয় | প্রচলিত কাল্পনিক ধারণা | বৈজ্ঞানিক প্রমাণ |
| যোগাযোগের ধরণ | গাছ মানুষের মতো চিন্তা করে বা আবেগ দিয়ে কথা বলে। | এটি সম্পূর্ণ জৈব-রাসায়নিক (Bio-chemical) ও প্রাকৃতিক বিবর্তনের ফল। |
| শব্দ তৈরি | গাছ শব্দ করে গল্প করে। | অত্যন্ত সূক্ষ্ম আল্ট্রাসনিক কম্পন বা আল্ট্রাসাউন্ড তৈরি হলেও তা কথার মতো কোনো ভাষা নয়। |
| উদ্দেশ্য | কেবল সহানুভূতির জন্য সাহায্য করে। | এটি প্রজাতির টিকে থাকা ও ইকোসিস্টেমের ভারসাম্য রক্ষার একটি প্রাকৃতিক মেকানিজম। |
গাছ হয়তো আমাদের ভাষায় কথা বলে না, কিন্তু তাদের নিজস্ব এই গোপন ও জটিল যোগাযোগ ব্যবস্থা রূপকথার চেয়ে কোনো অংশে কম রোমাঞ্চকর নয়। একটি বনে যখন একটি বড় গাছ কেটে ফেলা হয়, তখন শুধু একটি গাছই মরে না—বরং মাটির নিচের আস্ত একটি যোগাযোগ নেটওয়ার্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই প্রকৃতির এই অদৃশ্য বাঁধন ও ভারসাম্য রক্ষা করতে আমাদের বন ও গাছপালাকে বাঁচিয়ে রাখা অত্যন্ত জরুরি।
১৩
১৮ মন্তব্য