সহকারী শিক্ষক
১৯ আগস্ট, ২০২৬ ১২:১৬ অপরাহ্ণ
সন্তানকে মাদক, ইন্টারনেট ও অনলাইন গেম এর আসক্তি থেকে মুক্তি দিতে অভিভাবকের ভূমিকা
সন্তানকে মাদক, ইন্টারনেট ও অনলাইন গেম এর আসক্তি থেকে মুক্তি দিতে অভিভাবকের ভূমিকা
মনিরুল হক,
ঢাকার একজন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে লেখা নিবন্ধে জানিয়েছেন, তাঁর কাছে সম্প্রতি এক বাবা-মা এসেছিলেন সন্তানের জন্য নিরাময় কেন্দ্র খুঁজতে। সমস্যাটা মাদক ছিল না, ছিল স্মার্টফোন। পরীক্ষার হলে দুই-তিন ঘণ্টা ডিভাইস ছাড়া বসে থাকার কথা ভাবলেই সন্তানটি ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে, রীতিমতো আতঙ্কিত হয়। তিনি লিখেছেন, বাংলাদেশে এখন এমন বহু অভিভাবক মাদক নিরাময় কেন্দ্রে আসছেন, অথচ তাঁদের সন্তানের মূল সমস্যা মোবাইল ফোন, অনলাইন গেম বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের প্রতি অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত নির্ভরতা। ডিভাইস কেড়ে নিলে এই শিশুরা অস্থির হয়ে ওঠে, আক্রমণাত্মক আচরণ করে, পরিবারের সঙ্গে তীব্র সংঘাতে জড়ায়।
এই একটি ঘটনাই বলে দেয়, বাংলাদেশে শিশু-কিশোরদের আসক্তির চেহারা কতটা বদলে গেছে। আগে অভিভাবকদের দুশ্চিন্তার কেন্দ্রে থাকত মাদক এখন তার পাশাপাশি জায়গা করে নিয়েছে ইন্টারনেট আর অনলাইন গেম। তিনটি সমস্যা দেখতে আলাদা মনে হলেও এদের শিকড় প্রায় একই জায়গায় তত্ত্বাবধানহীন অবসর সময়, দুর্বল হয়ে পড়া পারিবারিক বন্ধন, আর সন্তানের মানসিক জগতের সঙ্গে অভিভাবকের ক্রমশ কমে আসা সংযোগ। আর ঠিক এই জায়গাতেই অভিভাবকের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আইন, পুলিশি অভিযান কিংবা স্কুলের নিয়মকানুন কোনোটাই পরিবারের ভূমিকার বিকল্প হতে পারে না। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর ইউএনওডিসি নিজেও বলছে, পরিবারই শিশু-কিশোরদের জীবনে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরক্ষামূলক শক্তি হয়ে উঠতে পারে।
এই লেখায় বাংলাদেশের বাস্তব পরিসংখ্যান, দেশি-বিদেশি গবেষণা এবং সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত কিছু প্রকৃত ঘটনার আলোকে দেখার চেষ্টা করা হয়েছে, অভিভাবকেরা ঠিক কী করতে পারেন—আর কী এড়িয়ে চলা উচিত।
বাংলাদেশে আসক্তির বাস্তব চিত্রঃ
ক) মাদকাসক্তির পরিসংখ্যানঃ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশে মাদকাসক্ত পুরুষের সংখ্যা প্রায় ৭৭ লাখ ৬০ হাজার, নারী প্রায় ২ লাখ ৮৫ হাজার এবং শিশু-কিশোর প্রায় ২ লাখ ৫৫ হাজার। একই ব্যক্তি একাধিক মাদকে আসক্ত হওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সামগ্রিক হিসাব করলে মোট আসক্তের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৮৩ লাখে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মানুষ আসক্ত গাঁজায়—প্রায় ৬১ লাখ, এরপর ইয়াবায় প্রায় ২৩ লাখ এবং মদ্যপানে প্রায় ২০ লাখ ২৪ হাজার। অধিদপ্তরের হিসাব বলছে, ২০২৪ সালে বিচার হওয়া প্রায় সাড়ে তিন হাজার মাদক মামলার ৫৫ শতাংশেই সব আসামি খালাস পেয়েছেন। অর্থাৎ শুধু আইনি প্রয়োগের ওপর ভরসা করে এই সংকট মোকাবিলা করা কঠিন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের একজন অপরাধ বিশেষজ্ঞ সংবাদমাধ্যমে মন্তব্য করেছেন, তরুণদের মাদকাসক্ত হওয়ার পেছনে যত কারণই থাকুক, মাদকের সহজলভ্যতাই এর প্রধান কারণ। তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, হতাশা, একাকীত্ব, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া কিংবা বন্ধু বা সঙ্গীর প্ররোচনায় অনেকে মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ে।
বাস্তব উদাহরণঃ একজন সাবেক সরকারি কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, তাঁর একমাত্র ছেলে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ায় পড়াশোনা শেষ করতে পারেনি। দুইবার নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি করানোর পরও সে এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি, আর পরিবারটি সামাজিকভাবেও হেয় হয়েছে বলে তিনি আক্ষেপ করেন। ঢাকার একটি মানসিক স্বাস্থ্য ও মাদকাসক্তি চিকিৎসা কেন্দ্রের একজন কাউন্সেলরের পর্যবেক্ষণ, বেশিরভাগ পরিবার বিষয়টি গোপন রাখে, চিকিৎসার প্রয়োজন মনে করে না আর এভাবেই আসক্তদের সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে।
খ) ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন আসক্তিঃ
প্রযুক্তির নাগাল এখন শিশুদের হাতেও পৌঁছে গেছে অনেক আগেভাগেই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের মধ্যে প্রায় ৫৬ শতাংশ মুঠোফোন ব্যবহার করে, আর তাদের মধ্যে প্রায় ৩১ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহার করে। ব্যুরোর ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের জরিপ অনুযায়ী, দেশের ৭০ শতাংশের বেশি পরিবারে অন্তত একটি স্মার্টফোন আছে এবং পরিবার পর্যায়ে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার এখন প্রায় ৫০ শতাংশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের জন্য স্বাভাবিক স্ক্রিন টাইম দৈনিক দুই ঘণ্টার মধ্যে থাকা উচিত। অথচ ২০২৩ সালের একটি আন্তর্জাতিক জরিপে দেখা গেছে, ৮ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের দৈনিক স্ক্রিন টাইম গড়ে ছয় থেকে নয় ঘণ্টা, আর সেই জরিপে অংশ নেওয়া ৪৭ শতাংশ অভিভাবকই মনে করেন তাঁদের সন্তান স্মার্টফোনে আসক্ত।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (পূর্বনাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) ২০২২ সালের একটি গবেষণায় উঠে এসেছে, স্মার্টফোন ব্যবহারকারী প্রায় ৫৯ শতাংশ শিশু-কিশোর অনলাইনে সাইবার বুলিং, যৌন বা শাব্দিক হেনস্তার শিকার হয়, যা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলে। বিশ্ববিদ্যালয়টির একজন সহযোগী অধ্যাপক সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, স্মার্টফোন আসক্তি মূলত একটি আচরণগত সমস্যা হিসেবে শুরু হলেও তা কারও স্বাভাবিক জীবনযাপন বা মানসিক স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত করলে সেটি মানসিক রোগের পর্যায়ে চলে যায়। পরিবার ছোট হয়ে আসা, বাবা-মা দুজনকেই কর্মস্থলে যেতে হওয়া এবং খেলার মাঠ বা ঘোরাফেরার জায়গার অভাবের মতো সামাজিক বাস্তবতাও এই আসক্তি বাড়িয়ে তুলছে বলে তিনি মনে করেন।
বাস্তব উদাহরণঃ প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদনে ধানমন্ডির এক প্রি-স্কুল শিক্ষার্থীর কথা উঠে এসেছে, যার বয়স সাড়ে চার বছর। দেড় বছর বয়স থেকেই তাকে ব্যস্ত রাখতে স্মার্টফোন দিয়ে রাখা হতো, আর এখন ফোন সরিয়ে নিতে গেলে সে চিৎকার করে কাঁদে। একই প্রতিবেদনে রাজধানীর রায়েরবাজার এলাকার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক জানিয়েছেন, কিছু শিক্ষার্থীর ফোন-আসক্তি এতটাই গুরুতর যে তাদের জন্য আলাদা ‘ছায়া শিক্ষক’ নিয়োগ করতে হয়েছে। তবে তাঁর ভাষায়, অভিভাবক নিজে সন্তানের ফোন দেখার অভ্যাস কমাতে না পারলে এই সমস্যার প্রকৃত সমাধান আসে না।
গ) অনলাইন গেম আসক্তিঃ
ফ্রি ফায়ার আর পাবজির মতো গেম বাংলাদেশে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এতটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল যে ২০২১ সালে শিক্ষা ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের কাছে গেম দুটি বন্ধের সুপারিশ পাঠিয়েছিল, বিশেষত করোনাকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার সময় এই আসক্তি বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছানোর কথা উল্লেখ করে। বাংলাদেশের স্কুলপড়ুয়া কিশোর-কিশোরীদের নিয়ে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, গেম আসক্তির সঙ্গে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ফলাফলের একটি নেতিবাচক সম্পর্ক আছে, যদিও গবেষকেরা সতর্ক করেছেন যে এই সম্পর্ক জটিল এবং তাতে একাধিক মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক উপাদান জড়িত—শুধু গেম খেলাকেই একমাত্র কারণ বলা যায় না। বাংলাদেশি গবেষকদের সাম্প্রতিক আরেকটি গবেষণায় গেমিং ডিজঅর্ডার ও ইন্টারনেট গেমিং ডিজঅর্ডারকে ক্রমবর্ধমান জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় বাংলাদেশে পরিচালিত একটি গুণগত গবেষণা এখানে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক, কারণ এটি সরাসরি অভিভাবকত্ব ও সন্তানের ডিজিটাল গেম আসক্তির সম্পর্ক নিয়ে কাজ করেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, সন্তানের সঙ্গে অভিভাবকের অস্বস্তিকর সম্পর্ক, পড়াশোনায় প্রতিযোগিতামূলক হয়ে ওঠার জন্য মাত্রাতিরিক্ত চাপ, অভিভাবকের অবহেলা, সন্তানের একাকীত্ব ও উদ্বেগ, এবং অতিরিক্ত ছাড় দেওয়া ধরনের অভিভাবকত্ব—এই বিষয়গুলো শিশুর গেম আসক্তির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। অর্থাৎ গেম আসক্তি নিছক প্রযুক্তির সমস্যা নয়, এর পেছনে পারিবারিক পরিবেশের একটা বড় ভূমিকা আছে।
কেন শিশু-কিশোররা আসক্ত হয়ে পড়েঃ
তিনটি আসক্তির কারণ আলাদা মনে হলেও গভীরে গেলে অনেকগুলো মিল পাওয়া যায়। শহরাঞ্চলে খেলার মাঠ কমে যাওয়া, যৌথ পরিবারের ভাঙন, বাবা-মা দুজনেরই কর্মস্থলে ব্যস্ত থাকা—এসব কারণে শিশু-কিশোররা আগের চেয়ে অনেক বেশি সময় একা কাটাচ্ছে। সেই একাকীত্ব পূরণ করতে গিয়ে কেউ ঝুঁকছে স্মার্টফোন বা অনলাইন গেমে, কেউবা বন্ধুদের প্ররোচনায় মাদকের দিকে। বয়ঃসন্ধিকালে মস্তিষ্কের যে অংশ ঝুঁকি বিচার করে, সেটি তখনো পুরোপুরি পরিণত হয় না—ফলে কৌতূহল বা সহপাঠীদের চাপে তারা এমন সব আচরণে সহজেই জড়িয়ে পড়ে, যার পরিণতি সম্পর্কে তারা পুরোপুরি সচেতন নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় পরীক্ষায় ভালো ফলের জন্য মাত্রাতিরিক্ত চাপ, সামাজিক মাধ্যমে সহপাঠীদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার তাগিদ, এবং পরিবারে খোলামেলা কথা বলার সংস্কৃতির অভাব।
একটি কাল্পনিক অথচ পরিচিত দৃশ্যঃ ধরা যাক গ্রামীণ বাংলাদেশের কোনো মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর কথা, যার বাবা প্রবাসে থাকেন আর মা একা সংসার সামলান। রাতে হোমওয়ার্কের কথা বলে ফোন নিয়ে ঘরে ঢোকে সে, কিন্তু আসলে কয়েক ঘণ্টা কাটিয়ে দেয় অনলাইন গেম খেলে বা ভিডিও দেখে। সারাদিনের কাজে ক্লান্ত মা হয়তো তা খেয়ালই করেন না। এই দৃশ্য বাস্তব কোনো প্রতিবেদনের অংশ নয়, তবে প্রবাসী পরিবার প্রধান এমন অসংখ্য বাংলাদেশি পরিবারে এর সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে না, যেখানে একজন অভিভাবককে একাই সংসার আর সন্তান দুটোই সামলাতে হয়।
গবেষণায় বারবার উঠে এসেছে যে, অভিভাবকের অবহেলা এবং অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ—দুটোই আসক্তির ঝুঁকি বাড়ায়। প্রয়োজন হলো এই দুইয়ের মাঝামাঝি একটি ভারসাম্য, যা নিয়ে পরের অংশে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
গবেষণা যা বলেঃ অভিভাবকের ভূমিকা কতটা নির্ধারকঃ
আন্তর্জাতিক গবেষণাগুলো একটি বিষয়ে প্রায় একমত—পরিবারের পরিবেশ ও অভিভাবকত্বের ধরন সন্তানের আসক্তিপ্রবণতা নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে। স্পেনে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব অভিভাবক সন্তানের সঙ্গে জড়িত থাকেন, তার কথা শোনেন এবং যুক্তিসহ বিষয় বোঝান—গবেষকদের ভাষায় এই ধরনের অভিভাবকত্বকে বলা হয় ‘অথরিটেটিভ’তাঁদের সন্তানদের মধ্যে ইন্টারনেট বা অনলাইন জুয়া আসক্তির ঝুঁকি তুলনামূলক কম থাকে। বিপরীতে, কঠোর নিয়ম চাপিয়ে দেওয়া বা অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণধর্মী অভিভাবকত্বের সঙ্গে সাইবার বুলিংয়ের শিকার হওয়ার মতো অন্যান্য ঝুঁকিও বেশি দেখা গেছে।
চীনে পরিচালিত একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় দেখা গেছে, অভিভাবক সন্তানের কার্যকলাপের প্রতি যতটা সচেতন নজর রাখেন, পরবর্তী সময়ে সন্তানের গেম আসক্তির মাত্রা ততটাই কম থাকে। আবার সন্তান আসক্ত হয়ে পড়লে অভিভাবকের সেই নজরদারিও ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে সম্পর্কটি অর্থাৎ দ্বিমুখী। একই গবেষণায় বাবার সঙ্গে সন্তানের সম্পর্কের মানকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ইতালিতে পরিচালিত আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, মা-বাবার যত্নশীল আচরণ সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতির মাধ্যমে পরোক্ষভাবে ইন্টারনেট আসক্তির ঝুঁকি কমায়।
জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর ইউএনওডিসি দীর্ঘদিন ধরে ‘ফ্যামিলি স্কিলস ট্রেনিং’ নামে একটি কর্মসূচি পরিচালনা করছে, যার মূল বার্তা হলো—শুধু মাদকের ক্ষতি সম্পর্কে তথ্য দেওয়ার চেয়ে অভিভাবকদের বাস্তব দক্ষতা শেখানো অনেক বেশি কার্যকর। সংস্থাটির নির্দেশিকা অনুযায়ী, নিরাপদ ও উষ্ণ পিতামাতা-সন্তান সম্পর্ক, সচেতন পর্যবেক্ষণ, ধারাবাহিক ও যুক্তিসংগত শৃঙ্খলা এবং সুসংগঠিত পারিবারিক পরিবেশ শিশু-কিশোরদের মাদক ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। বিপরীতে, উদাসীন পারিবারিক সম্পর্ক ও বিশৃঙ্খল গৃহপরিবেশ আসক্তির ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
এই গবেষণাগুলো থেকে একটি সহজ সিদ্ধান্তে আসা যায় আসক্তি ঠেকানোর জন্য সবচেয়ে কার্যকর প্রতিষেধক কোনো আইন বা প্রযুক্তিগত নিষেধাজ্ঞা নয়, বরং সন্তানের সঙ্গে অভিভাবকের সম্পর্কের মান।
অভিভাবকের করণীয়ঃ
ক) সময় দিন, প্রকৃত অর্থে কথা বলুনঃ
সন্তানের সঙ্গে দৈনিক অন্তত কিছুটা সময় এমনভাবে কাটান, যেখানে ফোন বা টিভি বন্ধ থাকে। স্কুল থেকে ফিরে শুধু ‘আজ কেমন গেল দিন’ জিজ্ঞেস করার চেয়ে বরং তার কোনো নির্দিষ্ট ঘটনা নিয়ে জিজ্ঞেস করুন কোন বন্ধুর সঙ্গে কথা হলো, কোন বিষয়ে ভালো লাগল বা খারাপ লাগল। রাগ বা বিচারের সুরে নয়, মনোযোগ দিয়ে শুনুন। গবেষণায় বারবার দেখা গেছে, যেসব সন্তান মনে করে তাদের বাবা-মা তাদের কথা গুরুত্ব দিয়ে শোনেন, তারা নিজেদের সমস্যা লুকিয়ে না রেখে ভাগ করে নেওয়ার সাহস পায়—আর এটাই আসক্তি প্রতিরোধের প্রথম ধাপ।
খ) স্ক্রিন টাইম নিয়ে স্পষ্ট অথচ নমনীয় নিয়ম করুনঃ
হঠাৎ করে ফোন কেড়ে নেওয়া বা ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়ার মতো কড়া পদক্ষেপ সাময়িকভাবে কাজ করলেও দীর্ঘমেয়াদে সন্তানকে বিদ্রোহী করে তোলে। বরং শুরুতেই সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে একটি নিয়ম ঠিক করুন—পড়াশোনার সময়, খাবার টেবিলে, ঘুমানোর আগে ফোন থাকবে না, এমন কিছু সময়সীমা বেঁধে দিন। বয়স অনুযায়ী স্ক্রিন টাইমের একটি সীমা রাখুন এবং তা একবারে বন্ধ না করে ধীরে ধীরে কমিয়ে আনুন। ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে খাওয়ানোর সময় বা শান্ত রাখার জন্য ফোন দেওয়ার অভ্যাস যত দ্রুত সম্ভব বাদ দিন, কারণ বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী আসক্তির শুরুটা প্রায়ই এখান থেকেই হয়।
গ) নিয়ন্ত্রণ নয়, বিশ্বাসের সম্পর্ক গড়ে তুলুনঃ
সন্তানের ফোন গোপনে ঘাঁটাঘাঁটি করা বা প্রতিটি কার্যকলাপে সন্দেহের চোখে তাকানো সম্পর্ককে দুর্বল করে দেয়। এর বদলে সন্তানকে বোঝান কেন কিছু নিয়ম দরকার—শুধু ‘না করো’ বলে না দিয়ে তার পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করুন। সাইবার বুলিং বা অনলাইনে অপরিচিত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের ঝুঁকি নিয়ে খোলাখুলি কথা বলুন। গবেষণা বলছে, অতিরিক্ত কড়াকড়ি করা অভিভাবকত্বে সন্তান যেমন নানা ঝুঁকিতে পড়তে পারে, তেমনি অতিরিক্ত ছাড় দেওয়া অভিভাবকত্বেও পড়তে পারে। সংযুক্ত থাকা, তবে শ্বাসরুদ্ধকর নিয়ন্ত্রণ না করা—এই মাঝামাঝি পথটিই সবচেয়ে নিরাপদ বলে গবেষণায় বারবার উঠে এসেছে।
ঘ) বিকল্প শখ ও কর্মকাণ্ডের সুযোগ তৈরি করুনঃ
স্মার্টফোন বা গেম থেকে সন্তানকে দূরে রাখতে চাইলে শুধু ‘না’ বললেই চলবে না, বিকল্প কিছু দিতে হবে। খেলাধুলা, ছবি আঁকা, গান বা বাদ্যযন্ত্র শেখা, বই পড়া, বাগান করা, স্কাউট বা সামাজিক সংগঠনের কার্যক্রমে যুক্ত করা—এসব সন্তানের মধ্যে একটি শখের জায়গা তৈরি করে, যা তাকে যেকোনো আসক্তি থেকে দূরে রাখতে সাহায্য করে। গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকায় খেলার মাঠের প্রাচুর্য এখনো তুলনামূলক বেশি; এই সুবিধা কাজে লাগানো শহরের চেয়ে সহজ, শুধু উদ্যোগটা অভিভাবকের কাছ থেকে আসা দরকার।
ঙ) নিজে উদাহরণ হয়ে উঠুনঃ
শিশুরা যা শোনে তার চেয়ে বেশি শেখে যা দেখে। বাবা-মা নিজেরাই সারাক্ষণ ফোনে ডুবে থাকলে সন্তানকে ফোন কম ব্যবহার করতে বলাটা কার্যকর হয় না। ২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বাবা-মায়ের মধ্যে কারও স্মার্টফোন আসক্তি থাকলে সন্তানও একই আচরণ অনুকরণ করার প্রবণতা দেখায়। প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদনে ছয় বছর বয়সী এক শিশুকন্যার বাবা জানিয়েছিলেন, মেয়ের সামনে তাঁরা স্বামী-স্ত্রী ফোন ব্যবহার করেন না—তবু ওয়াইফাই লাইনে সমস্যা হলে মেয়ে অস্থির হয়ে যায়, ফোনের জন্য বায়না করে। এই ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, শুধু নিজে উদাহরণ হয়ে ওঠাই যথেষ্ট নয়; তার সঙ্গে ধৈর্য ধরে ধারাবাহিকভাবে সময় ও মনোযোগ দিতে হয়।
চ) প্রাথমিক লক্ষণ চিনুন, দেরি না করে পদক্ষেপ নিনঃ
আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন, পড়াশোনা বা স্কুলে অনীহা, ঘুমের ধরন পাল্টে যাওয়া, বন্ধুবান্ধব বদলে যাওয়া, টাকাপয়সা নিয়ে অস্বাভাবিক আচরণ, ফোন বা ডিভাইস থেকে দূরে থাকলে অস্থিরতা বা রাগ—এসব লক্ষণ দেখা দিলে অবহেলা না করে মনোযোগ দিন। আগেই উল্লিখিত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কাউন্সেলরের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বেশিরভাগ বাংলাদেশি পরিবার সন্তানের আসক্তির বিষয়টি সামাজিক লজ্জার ভয়ে গোপন রাখে, চিকিৎসার প্রয়োজন মনে করে না, আর এই দেরিই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। সন্দেহ হলে স্কুলের শিক্ষক, কাউন্সেলর বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলুন। লজ্জা বা সামাজিক ভাবমূর্তির কথা ভেবে বিষয়টি চেপে রাখলে সমস্যা কেবল গভীর হয়।
প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা এবং পরিবারের গুরুত্বঃ
বাংলাদেশে মাদকাসক্তদের চিকিৎসার অবকাঠামোও যথেষ্ট নয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকাসহ চার বিভাগীয় শহরের সরকারি কেন্দ্রগুলোতে একসঙ্গে মাত্র ১৯৯ জন রোগীর চিকিৎসার সক্ষমতা আছে, যদিও বেসরকারি পর্যায়ে প্রায় ৩৮৭টি নিরাময় কেন্দ্র সক্রিয়। আরও উদ্বেগের বিষয়, স্মার্টফোন বা গেম আসক্তির মতো আচরণগত সমস্যার জন্য আলাদা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এখনো তৈরি হয়নি। বর্তমান নিরাময় কেন্দ্রগুলো মূলত রাসায়নিক মাদকাসক্তি চিকিৎসার জন্যই অনুমোদিত, ফলে ডিজিটাল আসক্তিতে আক্রান্ত সন্তানকে নিয়ে অনেক অভিভাবকই কোথায় যাবেন বুঝে উঠতে পারেন না। দক্ষিণ কোরিয়ার মতো কিছু দেশ এই সমস্যাকে জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে ডিজিটাল ডিটক্স ক্যাম্প ও আচরণগত পুনর্বাসন কেন্দ্র চালু করেছে বলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একজন উপপরিচালক সম্প্রতি এক নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন।
এই প্রাতিষ্ঠানিক ফাঁক যতদিন না পূরণ হচ্ছে, ততদিন পরিবারই থাকছে প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। স্কুল সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালাতে পারে, রাষ্ট্র আইন করতে পারে, কিন্তু সন্তানের দৈনন্দিন জীবনের সবচেয়ে কাছের পর্যবেক্ষক এখনো অভিভাবকই।
মাদক, ইন্টারনেট বা অনলাইন গেম—কোনোটিকেই একেবারে নিষিদ্ধ করে দেওয়া বাস্তবসম্মত সমাধান নয়। প্রযুক্তি আজকের শিক্ষার্থীর শেখা, যোগাযোগ ও বিনোদনের অবিচ্ছেদ্য অংশ; সমস্যাটা প্রযুক্তি নয়, তার ব্যবহারের ভারসাম্যহীনতা। অভিভাবকের কাজ তাই শত্রুর মতো প্রযুক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা নয়, বরং সন্তানকে এমন একটি পরিবেশ দেওয়া যেখানে সে নিরাপদ বোধ করে, কথা বলতে পারে, এবং প্রয়োজনে ভুল স্বীকার করতেও ভয় পায় না। গবেষণা আর বাস্তব অভিজ্ঞতা—দুটোই একই সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। যে পরিবারে সময়, মনোযোগ আর বিশ্বাস আছে, সেই পরিবারের সন্তানের আসক্তিতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি সবচেয়ে কম।
কলমে,
মোঃ মনিরুল হক
সহকারী শিক্ষক
আমলাবাড়ী মাধ্যমিক বিদ্যালয়
০১৭২২ ২৭৩২৭২
১৩
১৮ মন্তব্য