Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৯ আগস্ট, ২০২৬ ১০:১১ অপরাহ্ণ

নিকোটিনের ছোবলে বিবেকের অবক্ষয়

                নিকোটিনের ছোবলে বিবেকের অবক্ষয়

                               ফয়সল আহমদ বাবুল

 

একটি সিগারেটের আগুন নিভে যেতে সময় লাগে মাত্র কয়েক মিনিট। কিন্তু সেই ধোঁয়া অনেক সময় মানুষের বিবেক, সহমর্মিতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রদীপটিই নিভিয়ে দেয়। বাসস্ট্যান্ড, হাসপাতালের প্রবেশপথ, গণপরিবহন কিংবা ভিড়ভাট্টার জনসমাগমে নির্দ্বিধায় ধূমপান করতে দেখা যায় অনেককে। আশপাশে গর্ভবতী নারী, শিশু, প্রবীণ বা শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত রোগী আছেন কি না, সে বিষয়ে তাদের সামান্যতম ভ্রুক্ষেপও চোখে পড়ে না। এমন দৃশ্য আমাদের মনে প্রশ্ন জাগায়, একজন মানুষ কীভাবে অন্যের কষ্টকে এত সহজে উপেক্ষা করতে পারেন?

 

প্রথম দৃষ্টিতে এটি শিষ্টাচারের অভাব বা দায়িত্বহীন আচরণ বলে মনে হলেও, আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞান ভিন্ন একটি বাস্তবতার কথা বলে। ধূমপান কেবল একটি অভ্যাস নয়, এটি নিকোটিননির্ভর একটি জটিল মাদকাসক্তি। এই আসক্তি মানুষের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে ধীরে ধীরে বদলে দেয় এবং তার সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক সংবেদনশীলতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।

 

মানুষের মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স অঞ্চলটি নৈতিক বিচার, দূরদর্শী চিন্তা, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক আচরণ নিয়ন্ত্রণের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আমেরিকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অন ড্রাগ অ্যাবিউজ (এনআইডিএ)-এর গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘদিন নিকোটিন গ্রহণের ফলে মস্তিষ্কের ডোপামিন ব্যবস্থা পরিবর্তিত হয়ে যায়। ধূমপানের পর নিকোটিন কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই মস্তিষ্কে পৌঁছে কৃত্রিম আনন্দ ও স্বস্তির অনুভূতি সৃষ্টি করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্ক এই কৃত্রিম উদ্দীপনার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ফলে নিকোটিনের মাত্রা কমে গেলেই মস্তিষ্ক সেটিকে জরুরি সংকট হিসেবে বিবেচনা করে এবং ব্যক্তি তীব্রভাবে ধূমপানের আকাঙ্ক্ষা অনুভব করেন। সেই মুহূর্তে অন্যের অসুবিধা বা সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়টি তার কাছে গৌণ হয়ে যায়।

 

মনোবিজ্ঞানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো কগনিটিভ ডিসোনেন্স বা জ্ঞানীয় অসঙ্গতি। সামাজিক মনোবিজ্ঞানী লিওন ফেস্টিঙ্গারের এই তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষ যখন নিজের বিশ্বাস ও আচরণের মধ্যে অসঙ্গতি অনুভব করে, তখন সেই অস্বস্তি কমানোর জন্য নানা ধরনের আত্মপ্রতারণার আশ্রয় নেয়। অধিকাংশ ধূমপায়ী জানেন ধূমপান ক্ষতিকর। তারা এটাও জানেন যে, তাদের ধোঁয়ায় অন্য মানুষেরও ক্ষতি হচ্ছে। কিন্তু আসক্তির কারণে সেই অভ্যাস ছাড়তে না পেরে তারা নিজেরাই নিজেদের বোঝাতে থাকেন, "সামান্য ধোঁয়ায় কিছু হয় না", "খোলা জায়গায় ক্ষতি নেই" কিংবা "সবাই তো ধূমপান করে।" এই আত্মপ্রবঞ্চনা ধীরে ধীরে বিবেকের স্বাভাবিক সতর্কতাকে নিস্তেজ করে দেয়।

 

পরোক্ষ ধূমপানের ভয়াবহতা আজ আর কোনো অনুমান নয়, এটি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত সত্য। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ১২ লক্ষ অ-ধূমপায়ী মানুষ পরোক্ষ ধূমপানের কারণে অকালে মৃত্যুবরণ করেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ শিশু, নারী এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত মানুষ। তামাকের ধোঁয়ায় সাত হাজারেরও বেশি রাসায়নিক উপাদান রয়েছে, যার শতাধিক বিষাক্ত এবং অন্তত সত্তরের বেশি ক্যানসার সৃষ্টিকারী। ফলে জনসমাগমে ধূমপান কেবল ব্যক্তিগত স্বাধীনতার বিষয় নয়, এটি অন্যের জীবন ও স্বাস্থ্যের মৌলিক অধিকারের ওপর সরাসরি আঘাত।

 

সাহিত্যিক দৃষ্টিতে ধূমপানের ধোঁয়া শুধু বাতাসকে দূষিত করে না, এটি মানুষের মানবিক বোধকেও আচ্ছন্ন করে। নীল ধোঁয়ার কুণ্ডলী যেন ধীরে ধীরে ঢেকে দেয় সহমর্মিতার জানালা। একজন ধূমপায়ী যখন হাসপাতালের সামনে কিংবা গণপরিবহনে ধোঁয়া ছাড়েন, তখন তিনি শুধু তামাক পোড়ান না, তিনি অজান্তেই অন্যের নিরাপদ শ্বাস নেওয়ার অধিকারকে ক্ষুণ্ন করেন। এই নীরব আগ্রাসন সমাজে অসহিষ্ণুতা ও দায়িত্বহীনতার সংস্কৃতিকেও শক্তিশালী করে।

 

তবে ধূমপায়ীদের কেবল নিন্দা করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। নিকোটিন আসক্তি একটি চিকিৎসাযোগ্য স্বাস্থ্যসমস্যা। ধূমপান ত্যাগে কাউন্সেলিং, নিকোটিন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি, প্রয়োজনীয় ওষুধ, পারিবারিক সহায়তা এবং সামাজিক উৎসাহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে জনপরিসরে ধূমপান নিষিদ্ধকরণ আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, গণসচেতনতা বৃদ্ধি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তামাকবিরোধী শিক্ষা জোরদার করাও সময়ের দাবি।

 

সভ্য সমাজের পরিচয় শুধু উন্নত অবকাঠামো বা প্রযুক্তিতে নয়, মানুষের পারস্পরিক দায়িত্ববোধ ও সহমর্মিতায়। ধোঁয়ার কুয়াশা যত ঘনই হোক, সচেতনতা, বিজ্ঞান ও মানবিকতার আলো তার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। যেদিন নিকোটিনের রাসায়নিক দাসত্বের পরিবর্তে মানুষের অন্তরে মানবিক চেতনার নবোদয় ঘটবে, সেদিনই ধোঁয়ার কুয়াশা সরে গিয়ে উদ্ভাসিত হবে এক সুস্থ, সহানুভূতিশীল ও দায়িত্বশীল সমাজ। একটি ধোঁয়ামুক্ত জনপরিসর কেবল সুস্থ পরিবেশই নিশ্চিত করবে না, আরও মানবিক, সহনশীল ও দায়িত্বশীল সমাজ গঠনের পথও সুগম করবে।

 

লেখকঃ 

সিনিয়র শিক্ষক, সিরাজুল ইসলাম আলিম মাদ্রাসা, সদর, সিলেট

মোবাইলঃ ০১৭১৭৬৭৪১০২

মন্তব্য করুন