সহকারী অধ্যাপক
২০ আগস্ট, ২০২৬ ০৩:০২ পূর্বাহ্ণ
জ্ঞানচর্চার গুরুত্ব ও ইসলামে ইলমের মর্যাদা -মোঃ মুজিবুর রহমান
জ্ঞানচর্চার গুরুত্ব ও ইসলামে ইলমের মর্যাদা
-মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা,কালিয়াকৈর, গাজীপুর।
ভূমিকা
মানুষকে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো জ্ঞান। জ্ঞান মানুষকে সত্য ও মিথ্যা, ন্যায় ও অন্যায়, কল্যাণ ও অকল্যাণের পার্থক্য বুঝতে শেখায়। জ্ঞানের আলোয় মানুষ নিজের পরিচয় জানতে পারে, সৃষ্টিজগতের নিদর্শন নিয়ে চিন্তা করতে পারে এবং স্রষ্টার প্রতি তার দায়িত্ব উপলব্ধি করতে পারে। অজ্ঞতা যেখানে মানুষকে বিভ্রান্তি, কুসংস্কার ও অন্যায়ের দিকে ঠেলে দেয়, জ্ঞান সেখানে তাকে সত্য, ন্যায়, শৃঙ্খলা ও কল্যাণের পথে পরিচালিত করে।
ইসলাম জ্ঞানকে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে। ইসলামী জীবনব্যবস্থায় ইলম কেবল কিছু তথ্য মুখস্থ করার নাম নয়; বরং সঠিক জ্ঞান অর্জন করে তা বুঝতে পারা, জীবনে প্রয়োগ করা এবং মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানোই জ্ঞানের প্রকৃত সার্থকতা। তাই একজন প্রকৃত জ্ঞানী ব্যক্তি শুধু নিজের উন্নতির কথা ভাবেন না; তিনি তাঁর জ্ঞানের আলো অন্য মানুষের কাছেও পৌঁছে দিতে চান।
প্রদত্ত বাণীগুলোতেও জ্ঞানচর্চার এই মহৎ দিকটি বিশেষভাবে ফুটে উঠেছে। সেখানে রাতের কিছু সময় জ্ঞানচর্চার গুরুত্ব, জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার মর্যাদা এবং অর্জিত জ্ঞান অন্যের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার মহত্ত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
জ্ঞান কী এবং কেন তা প্রয়োজন
জ্ঞান হলো কোনো বিষয় সম্পর্কে যথার্থভাবে জানা, বোঝা ও উপলব্ধি করার ক্ষমতা। তবে ইসলামী দৃষ্টিতে জ্ঞান শুধু পার্থিব সাফল্য অর্জনের উপকরণ নয়। জ্ঞান মানুষের বিবেককে জাগ্রত করে, চরিত্রকে সুন্দর করে এবং জীবনকে সঠিক পথে পরিচালিত করে।
মানুষ যদি জানে না কোন কাজ ভালো এবং কোন কাজ মন্দ, কোনটি ন্যায় এবং কোনটি অন্যায়, কোনটি বৈধ এবং কোনটি অবৈধ, তাহলে সে সহজেই ভুল পথে চলে যেতে পারে। তাই সঠিক জীবনযাপনের জন্য সঠিক জ্ঞান অপরিহার্য।
একজন মানুষ যত বেশি জ্ঞান অর্জন করে, তার দায়িত্বও তত বাড়ে। কারণ জ্ঞান মানুষকে সত্য চিনতে সাহায্য করে এবং সত্য জানার পর সে সত্যের অনুসরণ করার দায়িত্বও অনুভব করে। সুতরাং জ্ঞান ও দায়িত্ব পরস্পর সম্পর্কযুক্ত।
ইসলামে ইলমের মর্যাদা
ইসলামে ইলমের মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ। কুরআন-সুন্নাহর শিক্ষা মানুষকে জ্ঞান অর্জন, চিন্তা, পর্যবেক্ষণ, অনুধাবন ও শিক্ষা গ্রহণের দিকে উৎসাহিত করে। জ্ঞান মানুষকে অন্ধ অনুসরণ থেকে মুক্ত করে এবং সত্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।
প্রদত্ত উপাদানে বলা হয়েছে, জ্ঞান অর্জনের জন্য যে ব্যক্তি বের হয়, তার এই পথকে আল্লাহর পথে চলার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে জ্ঞান অন্বেষণের মর্যাদা ও গুরুত্ব বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ জ্ঞান অর্জন কোনো তুচ্ছ কাজ নয়; এটি মানুষের জীবন গঠন ও কল্যাণের একটি মহৎ সাধনা।
জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সত্যকে জানা, নিজের জীবনকে সংশোধন করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। যে জ্ঞান মানুষকে বিনয়ী, সৎ, ন্যায়পরায়ণ ও মানবিক করে তোলে, সেই জ্ঞানই প্রকৃত অর্থে কল্যাণকর জ্ঞান।
রাতের সময় জ্ঞানচর্চার শিক্ষা
দিনের ব্যস্ততার কারণে অনেক সময় মানুষ নিজের জন্য চিন্তা ও অধ্যয়নের সুযোগ পায় না। রাতের নীরবতা তাই জ্ঞানচর্চার জন্য বিশেষ উপযোগী হতে পারে। প্রদত্ত বাণীতে রাতের এক ঘণ্টা জ্ঞানচর্চার বিশেষ মর্যাদার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এর মূল শিক্ষাটি হলো—সময়কে মূল্যবান মনে করতে হবে। অবসর সময়কে শুধু বিনোদন, অলসতা বা অর্থহীন কাজে ব্যয় না করে জ্ঞান অর্জনে ব্যবহার করা উচিত। প্রতিদিন অল্প অল্প করে পড়াশোনা করলেও দীর্ঘদিনে তা বড় জ্ঞানভাণ্ডারে পরিণত হয়।
একজন শিক্ষার্থী যদি প্রতিদিন নিয়মিত বই পড়ে, পাঠ পুনরাবৃত্তি করে, নতুন বিষয় শেখে এবং শেখা বিষয় নিয়ে চিন্তা করে, তাহলে তার জ্ঞান ধীরে ধীরে গভীর ও সুসংহত হয়। জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতাই বড় শক্তি।
তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রত্যেকের জন্য রাত জেগে পড়াশোনা করাই আদর্শ। বরং নিজের শারীরিক সামর্থ্য, প্রয়োজনীয় বিশ্রাম ও ইবাদতের ভারসাম্য বজায় রেখে সময়কে সুশৃঙ্খলভাবে ব্যবহার করাই উত্তম।
জ্ঞান ও আমলের সম্পর্ক
শুধু জ্ঞান অর্জন করলেই মানুষের জীবন পূর্ণতা লাভ করে না। জ্ঞানের সঙ্গে আমল বা বাস্তব প্রয়োগের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। একজন মানুষ সত্য জানে, কিন্তু সত্যের পথে চলে না—তাহলে তার জ্ঞান তার চরিত্রে যথাযথ প্রভাব ফেলতে পারেনি।
ইসলামী শিক্ষায় জ্ঞান মানুষের আচরণ পরিবর্তনের মাধ্যম। আমরা যদি জানি সত্য বলা উত্তম, তবে সত্য বলতে হবে। যদি জানি মিথ্যা বলা অন্যায়, তবে মিথ্যা থেকে বিরত থাকতে হবে। যদি জানি পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ কর্তব্য, তবে তাঁদের সঙ্গে ভালো আচরণ করতে হবে। যদি জানি প্রতিবেশীর অধিকার রয়েছে, তবে প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্বশীল হতে হবে।
সুতরাং জ্ঞানের প্রকৃত সৌন্দর্য প্রকাশ পায় চরিত্রে, আচরণে ও কর্মে। জ্ঞান মানুষের অন্তরে আল্লাহভীতি, সততা, দায়িত্ববোধ, মানবিকতা ও নৈতিকতা সৃষ্টি করলে তবেই সেই জ্ঞান জীবন্ত হয়ে ওঠে।
জ্ঞান ও বিনয়
প্রকৃত জ্ঞান মানুষের মধ্যে অহংকার সৃষ্টি করে না; বরং তাকে বিনয়ী করে। মানুষ যত বেশি জ্ঞান অর্জন করে, তত বেশি উপলব্ধি করে যে জ্ঞানের জগৎ অসীম এবং তার নিজের জানা অত্যন্ত সীমিত।
অজ্ঞ মানুষ অনেক সময় সামান্য জ্ঞান নিয়ে নিজেকে সর্বজ্ঞ মনে করতে পারে। কিন্তু প্রকৃত জ্ঞানী ব্যক্তি নিজের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করেন। তিনি অন্যের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন, ভুল হলে তা স্বীকার করেন এবং নতুন কিছু শেখার জন্য সবসময় প্রস্তুত থাকেন।
তাই শিক্ষার্থীর অন্যতম গুণ হওয়া উচিত বিনয়। শিক্ষক, অভিভাবক, আলেম, জ্ঞানী ব্যক্তি এবং অভিজ্ঞ মানুষের কাছ থেকে শ্রদ্ধার সঙ্গে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। অহংকার জ্ঞানের দরজা সংকুচিত করে, আর বিনয় জ্ঞানের দরজা উন্মুক্ত করে।
শিক্ষক ও জ্ঞানচর্চা
জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন শিক্ষক শুধু বইয়ের তথ্য শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছে দেন না; তিনি একজন মানুষের চিন্তা, চরিত্র ও ভবিষ্যৎ গঠনে ভূমিকা রাখেন।
একজন আদর্শ শিক্ষক শিক্ষার্থীর মধ্যে জ্ঞানপিপাসা সৃষ্টি করেন, সত্য অনুসন্ধানের সাহস দেন এবং নৈতিক মূল্যবোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করেন। তিনি শিক্ষার্থীদের শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য নয়, বরং ভালো মানুষ হওয়ার জন্য প্রস্তুত করেন।
অন্যদিকে শিক্ষার্থীরও কর্তব্য হলো শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া, মনোযোগ দিয়ে পাঠ গ্রহণ করা, প্রশ্ন করা এবং শেখা বিষয় বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করা। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর এই সুন্দর সম্পর্ক একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের অন্যতম ভিত্তি।
জ্ঞান বিতরণের মহত্ত্ব
জ্ঞান এমন এক সম্পদ, যা অন্যকে দিলে কমে না; বরং আরও বৃদ্ধি পায়। অর্থ-সম্পদ কাউকে দিলে নিজের সম্পদ কমে যেতে পারে, কিন্তু জ্ঞান কাউকে দিলে জ্ঞানদাতার জ্ঞান নিঃশেষ হয় না। বরং একজনের জ্ঞান অন্যজনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এবং সেখান থেকে আরও বহু মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।
প্রদত্ত বাণীতে অর্জিত জ্ঞান অন্য মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার মহত্ত্বকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
একজন শিক্ষক একজন শিক্ষার্থীকে শেখান। সেই শিক্ষার্থী ভবিষ্যতে আরও বহু মানুষকে শিক্ষা দিতে পারে। এভাবেই একটি ছোট জ্ঞানের আলো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে। একটি ভালো শিক্ষা একটি মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে; আর একজন পরিবর্তিত মানুষ একটি পরিবার, একটি প্রতিষ্ঠান কিংবা একটি সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।
তাই জ্ঞান গোপন করে রাখা নয়, বরং যথাযথভাবে, সঠিক উদ্দেশ্যে এবং সঠিক পদ্ধতিতে মানুষের কল্যাণে ছড়িয়ে দেওয়া জ্ঞানীর দায়িত্ব।
জ্ঞান ও মানবকল্যাণ
জ্ঞানের উদ্দেশ্য মানুষের কল্যাণ সাধন। এমন জ্ঞান, যা মানুষকে অন্যায়, প্রতারণা, হিংসা ও বিভেদের দিকে নিয়ে যায়, তা মানবতার জন্য কল্যাণকর নয়। প্রকৃত উপকারী জ্ঞান মানুষের জীবনকে সুন্দর করে, সমাজকে সুশৃঙ্খল করে এবং মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান ও সহমর্মিতা বৃদ্ধি করে।
জ্ঞান মানুষকে শেখায় দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়াতে, অসহায়কে সাহায্য করতে, পিতা-মাতার সেবা করতে, প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা করতে, আমানত সংরক্ষণ করতে এবং প্রতিশ্রুতি পালন করতে।
জ্ঞান মানুষকে আরও শেখায়—কারও অধিকার নষ্ট করা যাবে না, অন্যায়ভাবে কারও সম্পদ গ্রহণ করা যাবে না, মিথ্যা বলা যাবে না এবং মানুষের মনে অকারণে কষ্ট দেওয়া যাবে না।
এই কারণে জ্ঞান কেবল মস্তিষ্ককে আলোকিত করবে না; হৃদয়কেও আলোকিত করতে হবে।
ধর্মীয় ও পার্থিব জ্ঞানের সমন্বয়
মানুষের পূর্ণাঙ্গ জীবন গঠনের জন্য দ্বীনি জ্ঞানের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পার্থিব জ্ঞানও অর্জন করা দরকার। ধর্মীয় জ্ঞান মানুষকে সঠিক বিশ্বাস, ইবাদত, নৈতিকতা ও আখিরাতের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করে। আর বিজ্ঞান, চিকিৎসা, কৃষি, প্রযুক্তি, অর্থনীতি, সাহিত্য, ইতিহাসসহ বিভিন্ন জ্ঞান মানুষের পার্থিব জীবনকে উন্নত করতে সাহায্য করে।
তবে সব জ্ঞানের ব্যবহার হতে হবে নৈতিকতার ভিত্তিতে। জ্ঞান-বিজ্ঞান যতই উন্নত হোক, যদি নৈতিকতা না থাকে, তবে সেই জ্ঞান মানুষের জন্য বিপদের কারণও হতে পারে। তাই জ্ঞানের সঙ্গে নৈতিকতা, মানবিকতা ও আল্লাহভীতি থাকা অপরিহার্য।
একটি জ্ঞানী ও নৈতিক প্রজন্মই একটি সুন্দর সমাজ গড়ে তুলতে পারে।
শিক্ষার্থীদের জন্য জ্ঞানচর্চার গুরুত্ব
শিক্ষার্থীদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হলো শেখার সময়। এই সময়কে অবহেলা করলে পরবর্তী জীবনে তার মূল্য দিতে হয়। তাই শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পড়াশোনা, পাঠ পুনরাবৃত্তি, বই পড়া, শিক্ষককে প্রশ্ন করা এবং শেখা বিষয় নিয়ে চিন্তা করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
অলসতা জ্ঞানের শত্রু। সময়ের অপচয়ও শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অপ্রয়োজনীয় বিনোদন কিংবা অর্থহীন কাজে অতিরিক্ত সময় ব্যয় না করে শিক্ষার্থীদের সময়ের একটি অংশ জ্ঞানচর্চার জন্য নির্ধারণ করা উচিত।
প্রতিদিন একটি নতুন বিষয় শেখার চেষ্টা করলে এক বছরে একজন শিক্ষার্থী কত কিছু শিখতে পারে—তা কল্পনাও করা যায় না। ছোট ছোট অধ্যয়নই একদিন বড় জ্ঞানের ভিত্তি তৈরি করে।
জ্ঞানচর্চায় প্রযুক্তির ভূমিকা
বর্তমান যুগ তথ্য ও প্রযুক্তির যুগ। ইন্টারনেট, ডিজিটাল বই, অনলাইন পাঠ, শিক্ষামূলক ভিডিও ও বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর উপকরণের মাধ্যমে এখন আগের তুলনায় অনেক সহজে জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব।
তবে প্রযুক্তির ব্যবহারেও সতর্কতা জরুরি। ইন্টারনেটে সঠিক তথ্যের পাশাপাশি ভুল, বিভ্রান্তিকর ও ক্ষতিকর তথ্যও রয়েছে। তাই কোনো তথ্য গ্রহণের আগে তার উৎস, সত্যতা ও প্রাসঙ্গিকতা যাচাই করা দরকার।
প্রযুক্তিকে বিনোদনের প্রধান মাধ্যম না বানিয়ে জ্ঞান অর্জন, গবেষণা, শিক্ষা ও সৃজনশীলতার কাজে ব্যবহার করলে তা মানুষের জন্য অত্যন্ত উপকারী হতে পারে।
জ্ঞানচর্চা ও সমাজ উন্নয়ন
একটি সমাজের উন্নতির মূল ভিত্তিগুলোর একটি হলো জ্ঞানী ও নৈতিক মানুষ। যে সমাজে শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার পরিবেশ থাকে, সেখানে মানুষ সাধারণত সচেতন হয়, নিজের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে জানে এবং উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে পারে।
জ্ঞান মানুষকে কুসংস্কার থেকে মুক্ত করে, সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে সচেতন করে এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মানসিকতা তৈরি করে। একটি শিক্ষিত ও নৈতিক সমাজে আইন, শৃঙ্খলা, মানবিকতা ও পারস্পরিক সম্মানের মূল্য বৃদ্ধি পায়।
তাই পরিবার, বিদ্যালয়, মাদ্রাসা, মসজিদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠন—সব ক্ষেত্রেই জ্ঞানচর্চার পরিবেশ সৃষ্টি করা প্রয়োজন।
জ্ঞানীর দায়িত্ব
জ্ঞান অর্জনের সঙ্গে দায়িত্বও আসে। একজন জ্ঞানী মানুষের উচিত তাঁর জ্ঞানকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করা। তিনি যেন জ্ঞানকে অহংকারের কারণ না বানান, অন্যকে অপমান করার অস্ত্র না বানান এবং অপ্রয়োজনীয় বিতর্কে ব্যবহার না করেন।
জ্ঞানী ব্যক্তি সত্যকে ভালোবাসবেন, ভুলকে সংশোধন করবেন, অজ্ঞকে অবজ্ঞা করবেন না এবং মানুষকে সুন্দরভাবে শিক্ষা দেবেন। তাঁর আচরণে জ্ঞানের সৌন্দর্য প্রকাশ পাবে।
নিজে জানা এবং অন্যকে জানানো—এই দুইয়ের সমন্বয়েই জ্ঞান পূর্ণতা লাভ করে। প্রদত্ত উপাদানেও জ্ঞান অর্জন করে তা ছড়িয়ে দেওয়ার মহত্ত্ব বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি
জ্ঞান মানুষের আত্মশুদ্ধির অন্যতম মাধ্যম। মানুষ যখন নিজের ভুল সম্পর্কে জানতে পারে, তখন সে নিজেকে সংশোধন করতে পারে। যখন সে জীবনের উদ্দেশ্য বুঝতে পারে, তখন তার কর্মও অর্থবহ হয়।
জ্ঞান মানুষকে শেখায়—জীবন ক্ষণস্থায়ী, সময় অমূল্য, মানুষের অধিকার গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রতিটি কাজের দায়িত্ব রয়েছে। এই উপলব্ধি মানুষকে আরও সতর্ক ও সংযমী করে।
ইসলামী জ্ঞান মানুষের অন্তরে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও ভয়, সৎকর্মের আগ্রহ এবং অন্যায় থেকে বেঁচে থাকার মানসিকতা সৃষ্টি করে। ফলে জ্ঞান শুধু মস্তিষ্ককে সমৃদ্ধ করে না; মানুষের আত্মাকেও পরিশুদ্ধ করে।
আমাদের করণীয়
জ্ঞানচর্চাকে জীবনের নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত করা আমাদের সবার কর্তব্য। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় বই পড়া, কুরআন ও হাদিস অধ্যয়ন করা, প্রয়োজনীয় বিষয় শেখা, শিক্ষকের কাছ থেকে জ্ঞান গ্রহণ করা এবং শেখা বিষয় নিয়ে চিন্তা করা উচিত।
শুধু পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য নয়, জীবনকে সুন্দর করার জন্য জ্ঞান অর্জন করতে হবে। জ্ঞান অনুযায়ী আমল করতে হবে এবং নিজের অর্জিত উপকারী জ্ঞান অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নিতে হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে—একজন মানুষের হাতে যদি একটি প্রদীপ থাকে এবং সে তা অন্যের প্রদীপে জ্বালিয়ে দেয়, তাহলে তার নিজের প্রদীপ নিভে যায় না; বরং চারপাশ আরও আলোকিত হয়। জ্ঞানও তেমন। জ্ঞান ভাগ করলে তা কমে না; বরং মানুষের মধ্যে তার আলো বহুগুণে ছড়িয়ে পড়ে।
উপসংহার
জ্ঞান মানুষের জীবনের আলো, উন্নতির পথ এবং সত্য অনুসন্ধানের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। ইসলামী ভাবধারায় ইলমের মর্যাদা অত্যন্ত গভীর। প্রদত্ত বাণীগুলো আমাদের শেখায় যে জ্ঞানচর্চা একটি মহৎ সাধনা, জ্ঞান অর্জনের পথ মর্যাদাপূর্ণ এবং অর্জিত জ্ঞান মানুষের কল্যাণে ছড়িয়ে দেওয়া অত্যন্ত মহৎ কাজ।
তবে জ্ঞানের প্রকৃত সৌন্দর্য তখনই প্রকাশ পায়, যখন তা আমলে পরিণত হয়, চরিত্রকে সুন্দর করে এবং মানুষের উপকারে আসে। যে জ্ঞান মানুষকে অহংকারী করে, অন্যকে হেয় করতে শেখায় কিংবা অন্যায়ের পথে পরিচালিত করে, তা জ্ঞানের প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণ করে না। প্রকৃত জ্ঞান মানুষকে বিনয়ী, সৎ, ন্যায়পরায়ণ, দয়ালু ও দায়িত্বশীল করে।
তাই আমাদের জীবনের অঙ্গীকার হোক—শিখব, বুঝব, আমল করব এবং অন্যকে শেখাব। জ্ঞানের আলোয় নিজের জীবন আলোকিত করব, পরিবার ও সমাজকে আলোকিত করব এবং মানবকল্যাণে জ্ঞানকে কাজে লাগাব।
রাতের নীরব সময় হোক জ্ঞানচর্চার সময়, দিনের কর্ম হোক নেক আমলের মাধ্যমে আলোকিত। জ্ঞান হোক আমাদের পথের দিশারি, নৈতিকতা হোক তার সৌন্দর্য, আমল হোক তার বাস্তব রূপ এবং মানবসেবা হোক তার ফল।
জ্ঞান অর্জন হোক আমাদের ব্রত,
জ্ঞান অনুযায়ী আমল হোক আমাদের চরিত্র,
জ্ঞান বিতরণ হোক আমাদের দায়িত্ব,
আর উপকারী জ্ঞান হোক আমাদের জীবনের অমূল্য সম্পদ।
১৩
১৮ মন্তব্য