Loading..

ব্লগ

রিসেট

২০ আগস্ট, ২০২৬ ০৬:১২ পূর্বাহ্ণ

ইসলামের দৃষ্টিতে ইদ্দত: নারী ও পুরুষ—একটি পর্যালোচনা ​রচয়িতা: মোস্তফিজুর রহমান

ইসলামের দৃষ্টিতে ইদ্দত: নারী ও পুরুষ—একটি পর্যালোচনা

রচয়িতা: মোস্তফিজুর রহমান

​১. ভূমিকা

​ইসলামী শরীআতে ইদ্দত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সুনির্দিষ্ট বিধান। বিবাহবিচ্ছেদ বা স্বামীর মৃত্যুর পর নারীর জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করার নামই ইদ্দত। মানবজীবনের পবিত্রতা রক্ষা, বংশের বিশুদ্ধতা বজায় রাখা এবং সামাজিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় ইদ্দতের বিধান এক গভীর প্রজ্ঞার পরিচায়ক। তবে ইদ্দতের এই বিধান কি নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য সমান, নাকি এতে ভিন্নতা রয়েছে? এই প্রবন্ধে শরীআতের আলোকে নারী ও পুরুষের ক্ষেত্রে ইদ্দত পালনের বিধান এবং এর পেছনের যৌক্তিকতা পর্যালোচনা করা হয়েছে।

​২. ইদ্দতের সংজ্ঞা ও শরয়ী তাৎপর্য

​ভাষাগতভাবে 'ইদ্দত' (عدة) অর্থ গণনা করা বা হিসাব রাখা। ইসলামী পরিভাষায়, স্বামী কর্তৃক তালাকপ্রাপ্তা কিংবা স্বামীর মৃত্যুর কারণে নারীর বিবাহ বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়ার পর পরবর্তী বিবাহে আবদ্ধ হওয়ার ওপর যে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত শরীআত কর্তৃক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে, তাকে ইদ্দত বলা হয়। ইদ্দত পালনের মূল উদ্দেশ্য হলো জরায়ু পবিত্র কি না তা নিশ্চিত করা, অহেতুক বংশের সংমিশ্রণ রোধ করা এবং দাম্পত্য জীবনের ভাঙনের পর মানসিক ও আত্মিক সামঞ্জস্য বিধান করা।

​৩. নারীর ক্ষেত্রে ইদ্দতের বিধান

​পবিত্র কুরআনে নারীদের ইদ্দত পালনের সুনির্দিষ্ট বিধান ও সময়সীমা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। পরিস্থিতির ভিন্নতা অনুযায়ী নারীদের ইদ্দত বিভিন্ন হয়ে থাকে:

  • স্বামীর মৃত্যুর ক্ষেত্রে: স্বামী মারা গেলে গর্ভবর্তী না হলে স্ত্রীকে চার মাস দশ দিন ইদ্দত পালন করতে হয় (সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২৩৪)। আর গর্ভবতী হলে তার ইদ্দত সন্তান প্রসব পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হয় (সূরা আত-তালাক, আয়াত ৪)।

  • তালাকপ্রাপ্তার ক্ষেত্রে: ঋতুস্রাব হয় এমন নারীর ইদ্দত হলো তিন হায়েজ বা তিন পবিত্রতা কাল (সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২২৮)। আর ঋতু বন্ধ হয়ে গেছে বা বয়স হয়েছে এমন নারী এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের ইদ্দত হলো তিন মাস।

​৪. পুরুষের ক্ষেত্রে ইদ্দতের বিধান: একটি পর্যালোচনা

​ইসলামী শরীআতের সার্বজনীন ও চিরন্তন বিধান অনুযায়ী, স্ত্রীর মৃত্যুতে কিংবা বৈবাহিক সম্পর্কচ্ছেদের পর পুরুষের জন্য ইদ্দত পালনের কোনো বিধান বা বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি। এ বিষয়ে উম্মাহর সকল ফকীহ ও মুতাজাহিদগণের সুদৃঢ় ইজমা বা ঐকমত্য রয়েছে।

  • ​পুরুষ স্ত্রী মারা যাওয়ার সাথে সাথেই কিংবা তালাক দেওয়ার পর শরয়ী নিয়মে চাইলে অন্যত্র বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারেন।

  • ​কুরআনে বা হাদিসে পুরুষদের জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময় অপেক্ষা করার নির্দেশ আসেনি। ফলে এ ক্ষেত্রে পুরুষ পূর্ণাঙ্গভাবে স্বাধীন।

​৫. বিধানগত পার্থক্যের মূল কারণ ও প্রজ্ঞা

​নারী ও পুরুষের ইদ্দত পালনের এই তারতম্যের পেছনে রয়েছে ইসলামের সুগভীর জ্ঞান ও সূক্ষ্ম বিচারবুদ্ধি:

  • জরায়ুর পবিত্রতা ও বংশের সংরক্ষণ: ইদ্দতের অন্যতম প্রধান হিকমত হলো পূর্বের স্বামীর ঔরসে গর্ভে কোনো সন্তান রয়েছে কি না তা নিশ্চিত করা। পুরুষ গর্ভধারণ করে না, তাই তার ক্ষেত্রে বংশের সংমিশ্রণ বা পিতৃপরিচয় সংকটের কোনো আশঙ্কা থাকে না।

  • শারীরিক ও মানসিক কাঠামোর ভিন্নতা: ইসলামে নারী ও পুরুষের দায়িত্ব, অধিকার এবং শারীরিক গঠনের ভিন্নতাকে সামনে রেখেই বিধিবিধান প্রনয়ন করা হয়েছে। পারিবারিক কাঠামোতে সুরক্ষার অংশ হিসেবে নারীর জন্য ইদ্দত ফরজ করা হলেও পুরুষের ক্ষেত্রে এর প্রয়োজনীয়তা নেই।

​৬. শোক পালনের বিধান (ইহদাদ) ও পুরুষ

​ইদ্দত পালন করতে না হলেও স্ত্রীর মৃত্যুতে স্বামীর শোক প্রকাশের বিষয়টি মানবিক ও স্বাভাবিক। রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রথমা স্ত্রী হযরত খাদিজা (রা.)-এর ইন্তেকালের পর গভীর শোক প্রকাশ করেছিলেন। তবে নারীর ক্ষেত্রে স্বামীর মৃত্যুতে যেমন সুনির্দিষ্ট চার মাস দশ দিন সাজসজ্জা বর্জন করা এবং নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে থাকা বাধ্যতামূলক (যাকে 'ইহদাদ' বা শোক পালন বলে), পুরুষদের জন্য স্ত্রীর মৃত্যুতে সেরকম কোনো আনুষ্ঠানিক বা বাধ্যতামূলক সময়সীমা নির্ধারিত নেই। স্বামী স্বাভাবিক নিয়মে তার শোক কাটিয়ে উঠতে পারেন।

​৭. উপসংহার

​পরিশেষে বলা যায়, ইসলামের বিধানসমূহ অত্যন্ত সুষম ও বাস্তবসম্মত। নারী ও পুরুষের জৈবিক ও সামাজিক পার্থক্যের কথা বিবেচনা করেই শরীআত পুরুষদের জন্য ইদ্দত ফরজ করেনি, পক্ষান্তরে নারীদের মর্যাদা, বংশের পবিত্রতা এবং পারিবারিক শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে তাদের জন্য ইদ্দতকে বাধ্যতামূলক করেছে। এই ব্যবস্থার মধ্যে কোনো অবিচার নেই, বরং রয়েছে মহান আল্লাহর নিখুঁত হিকমত ও মানবকল্যাণমুখী দৃষ্টিভঙ্গি।

​আশা করি এই প্রবন্ধটি আপনার প্রয়োজনাদি এবং প্রত্যাশা অনুযায়ী সুন্দরভাবে সাজানো হয়েছে। এ বিষয়ে আপনার আর কোনো সংশোধনী বা সংযোজন প্রয়োজন হলে নির্দ্বিধায় জানাতে পারেন।

#Mostafezur_Rahman_


মন্তব্য করুন