Loading..

ব্লগ

রিসেট

২১ আগস্ট, ২০২৬ ১০:৩২ পূর্বাহ্ণ

শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ: মানসম্মত শিক্ষার মূল চাবিকাঠি

শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ: মানসম্মত শিক্ষার মূল চাবিকাঠি


একটি জাতির মেরুদণ্ড হলো শিক্ষা, আর সেই শিক্ষাব্যবস্থার প্রাণশক্তি হলেন শিক্ষক। একজন দক্ষ, প্রশিক্ষিত ও সময়োপযোগী শিক্ষক শুধু একটি বিষয় পড়ান না; তিনি শিক্ষার্থীর চিন্তাশক্তি, সৃজনশীলতা, মূল্যবোধ, আত্মবিশ্বাস ও ভবিষ্যৎ কর্মদক্ষতা গড়ে তোলেন। ফলে শিক্ষার মানোন্নয়নের যে কোনো পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির বিষয়টি থাকা অপরিহার্য।
বর্তমান পৃথিবী দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার, পরিবর্তিত কর্মবাজার, নতুন শিক্ষাদান পদ্ধতি এবং শিক্ষার্থীদের পরিবর্তনশীল মানসিকতার কারণে একজন শিক্ষককে তাঁর প্রাথমিক শিক্ষাগত যোগ্যতার ওপর নির্ভর করে সারাজীবন একই পদ্ধতিতে পাঠদান করা সম্ভব নয়। একজন শিক্ষক চাকরিতে প্রবেশের সময় যে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করেন, সময়ের পরিবর্তনে তা পুরোনো হয়ে যেতে পারে। তাই শিক্ষকতাকে একটি চলমান পেশাগত শেখার প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
আমাদের দেশেও শিক্ষাক্রম ও মূল্যায়ন ব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে এবং বিভিন্ন স্তরে পরিমার্জিত শিক্ষাক্রম, শিক্ষক সহায়িকা ও মূল্যায়ন নির্দেশনা প্রকাশিত হচ্ছে। এনসিটিবির বর্তমান কার্যক্রমেও শিক্ষাক্রম উন্নয়ন, শিক্ষক সহায়িকা এবং শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণের গুরুত্ব স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
এ কারণে শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ কোনো অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা নয়; বরং মানসম্মত, আধুনিক ও শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক শিক্ষা নিশ্চিত করার অন্যতম মৌলিক শর্ত।


১.যুগের পরিবর্তন এবং আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতি:
একসময় শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক কথা বলবেন এবং শিক্ষার্থীরা নীরবে শুনবে—এটাই ছিল প্রচলিত শিক্ষাদানের প্রধান কাঠামো। চক-ডাস্টার, পাঠ্যবই এবং মুখস্থনির্ভর শিক্ষাই ছিল শিক্ষার প্রধান উপকরণ। কিন্তু বর্তমান সময়ে শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু তথ্য মনে রাখা নয়; বরং তথ্য বিশ্লেষণ করা, সমস্যা সমাধান করা, যুক্তি দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া, দলগতভাবে কাজ করা এবং বাস্তব জীবনে অর্জিত জ্ঞান প্রয়োগ করা।
এই পরিবর্তনের কারণে শিক্ষকের ভূমিকাতেও পরিবর্তন এসেছে। আধুনিক শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক শুধু তথ্যের উৎস নন; তিনি একজন Facilitator বা শেখার সহায়ক। শিক্ষার্থীকে প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করা, দলগত কাজের সুযোগ তৈরি করা, বাস্তব সমস্যা বিশ্লেষণ করানো এবং শিক্ষার্থীর নিজস্ব চিন্তাকে মূল্য দেওয়া—এসবই আধুনিক শিক্ষাদানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কিন্তু একজন শিক্ষককে এই দক্ষতাগুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে অর্জন করতে হবে—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। নিয়মিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষককে দেখাতে হবে কীভাবে একটি প্রচলিত বক্তৃতাভিত্তিক ক্লাসকে অংশগ্রহণমূলক ক্লাসে রূপান্তর করা যায়।
যেমন, একজন ব্যবসায় শিক্ষা শিক্ষক যদি ‘বাজারজাতকরণ’ পড়ান, তাহলে শুধু বিপণনের সংজ্ঞা মুখস্থ করানোর পরিবর্তে স্থানীয় একটি পণ্যের বাজারজাতকরণ নিয়ে শিক্ষার্থীদের দলগত কাজ করাতে পারেন। কোন পণ্যটি কোথায় বিক্রি হয়, ক্রেতারা কেন সেটি কিনছে, কীভাবে বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে—এসব বিশ্লেষণ করালে শিক্ষার্থীরা বইয়ের ধারণাকে বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত করতে পারবে।
এই ধরনের কার্যকর শিক্ষাদান পদ্ধতি শেখানোর জন্য নিয়মিত বিষয়ভিত্তিক ও পেডাগজিক্যাল প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।


২. নতুন শিক্ষাক্রম ও মূল্যায়ন পদ্ধতির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা:
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি হলো শিক্ষাক্রম ও মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তন। নতুন শিক্ষাক্রমের লক্ষ্য ছিল শিক্ষার্থীদের শুধু পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য প্রস্তুত করা নয়; বরং তাদের জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, যোগাযোগ দক্ষতা ও বাস্তব জীবনের সক্ষমতা বিকাশ করা।
পরবর্তীতে শিক্ষাক্রম ও মূল্যায়ন ব্যবস্থায় বিভিন্ন পর্যায়ে পরিমার্জনও এসেছে। বর্তমানে এনসিটিবি(National Curriculum and Textbook Board) প্রাথমিক স্তরের জন্য পরিমার্জিত ২০২৫ শিক্ষাক্রম এবং ২০২৬ সালের শিক্ষক সহায়িকা ও মূল্যায়ন নির্দেশনা প্রকাশ করেছে। মাধ্যমিক স্তরেও ২০২৬ সালের জন্য পরিমার্জিত বিষয়-কাঠামো ও মূল্যায়ন নির্দেশনা প্রকাশ করা হয়েছে।
এখানে মূল চ্যালেঞ্জ হলো—শিক্ষাক্রমের পরিবর্তন কেবল বই পরিবর্তনের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা যায় না। শিক্ষকের পাঠপরিকল্পনা, শ্রেণিকক্ষ পরিচালনা, প্রশ্ন করার ধরন, শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং মূল্যায়নের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনতে হয়।
ধরা যাক, আগে কোনো শিক্ষক একটি অধ্যায় পড়িয়ে শেষে কয়েকটি সংক্ষিপ্ত প্রশ্নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর জ্ঞান যাচাই করতেন। নতুন বা পরিমার্জিত শিক্ষাক্রমের উদ্দেশ্য অনুযায়ী তাঁকে হয়তো একই বিষয় নিয়ে শিক্ষার্থীদের একটি বাস্তব সমস্যা দিতে হবে, দলগত আলোচনা করাতে হবে, তাদের যুক্তি উপস্থাপন করতে দিতে হবে এবং সেই কাজের ওপর ভিত্তি করে শিক্ষার্থীর অগ্রগতি মূল্যায়ন করতে হবে।
এ ধরনের পরিবর্তন একজন শিক্ষককে শুধু একটি নির্দেশিকা পড়ে বোঝানো কঠিন। প্রশিক্ষণে হাতে-কলমে দেখাতে হবে—একটি শিখনফল কীভাবে নির্ধারণ করতে হয়, সেই শিখনফলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কীভাবে কার্যক্রম তৈরি করতে হয় এবং কার্যক্রমের ফল কীভাবে মূল্যায়ন করতে হয়।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় আরেকটি সমস্যা হলো একই শ্রেণিতে শিক্ষার্থীদের সক্ষমতার ব্যাপক পার্থক্য। শহরের কোনো প্রতিষ্ঠানে যেখানে ডিজিটাল ডিভাইস ও ইন্টারনেটের সুবিধা আছে, গ্রাম বা প্রত্যন্ত অঞ্চলের কোনো প্রতিষ্ঠানে সেখানে একই ধরনের সুবিধা নাও থাকতে পারে। তাই প্রশিক্ষণ হতে হবে বাস্তবতাভিত্তিক। শুধু আদর্শ শ্রেণিকক্ষের উদাহরণ না দিয়ে সীমিত উপকরণে কীভাবে একই শিক্ষণফল অর্জন করা যায়, প্রশিক্ষণে সেটিও দেখাতে হবে।
উদাহরণস্বরূপ, বিজ্ঞান বিষয়ের কোনো কার্যক্রমের জন্য ল্যাবরেটরি না থাকলেও শিক্ষক স্থানীয় ও সহজলভ্য উপকরণ ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা ও ফলাফল বিশ্লেষণের সুযোগ দিতে পারেন। প্রশিক্ষণে এমন বাস্তবসম্মত বিকল্প পদ্ধতি শেখানো জরুরি।
অর্থাৎ, নতুন শিক্ষাক্রম সফল করার মূল দায়িত্ব কেবল নীতিনির্ধারকের নয়; শ্রেণিকক্ষে সেটিকে বাস্তব রূপ দেওয়ার প্রধান দায়িত্ব শিক্ষকের। আর সেই দায়িত্ব পালনের জন্য ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ অপরিহার্য।


৩. ডিজিটাল ক্লাসরুম ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তির ব্যবহার:
বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তির সঙ্গে বেড়ে উঠছে। মোবাইল ফোন, ভিডিও, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। ফলে শিক্ষাক্ষেত্রেও প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার এখন সময়ের দাবি।
তবে ডিজিটাল ক্লাসরুম মানেই শ্রেণিকক্ষে একটি প্রজেক্টর বা স্মার্ট বোর্ড স্থাপন করা নয়। প্রযুক্তিকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে হলে শিক্ষককে জানতে হবে—কোন পাঠে ভিডিও ব্যবহার করা প্রয়োজন, কোথায় ছবি বা অ্যানিমেশন কার্যকর, কখন অনলাইন কুইজ নেওয়া যায় এবং কখন প্রযুক্তির পরিবর্তে সরাসরি আলোচনা বা হাতে-কলমে কাজ করাই বেশি কার্যকর।
বাংলাদেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর, কম্পিউটার, ইন্টারনেট বা স্মার্ট ক্লাসরুমের সরঞ্জাম থাকলেও এগুলোর কার্যকর ব্যবহার সব জায়গায় সমান নয়। অনেক সময় প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্দেশ্য না বুঝে শুধু PowerPoint-এর কয়েকটি স্লাইড দেখিয়েই ক্লাস শেষ করা হয়। এতে প্রচলিত বক্তৃতাভিত্তিক শিক্ষাদানের খুব বেশি পরিবর্তন হয় না।
তাই প্রশিক্ষণে ‘ডিজিটাল ডিভাইস কীভাবে চালাতে হয়’ শেখানোর পাশাপাশি ‘ডিজিটাল প্রযুক্তি দিয়ে কীভাবে শেখানো যায়’—এই বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে।
ধরা যাক, একজন শিক্ষক ‘জলবায়ু পরিবর্তন’ বিষয়ে পাঠদান করছেন। তিনি প্রথমে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য ভিডিও দেখাতে পারেন। এরপর শিক্ষার্থীদের ছোট দলে ভাগ করে প্রশ্ন করতে পারেন—‘সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশের উপকূলীয় মানুষের জীবনে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে?’ শিক্ষার্থীরা তথ্য সংগ্রহ করে উপস্থাপন করতে পারে। এভাবে প্রযুক্তি শুধু প্রদর্শনের মাধ্যম না হয়ে শিক্ষার্থীর চিন্তা, আলোচনা ও সমস্যা সমাধানের মাধ্যম হয়ে উঠবে।
একইভাবে Google Forms, Pentimeter বা অন্য কোনো ডিজিটাল কুইজ প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে শিক্ষক ক্লাসের শেষে দ্রুত বুঝতে পারেন কতজন শিক্ষার্থী বিষয়টি বুঝেছে এবং কোন অংশে তাদের সমস্যা হচ্ছে। তবে যেসব প্রতিষ্ঠানে ইন্টারনেট বা ডিভাইসের সুবিধা সীমিত, সেখানে একই কার্যক্রমের অফলাইন বিকল্পও শিক্ষককে জানতে হবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রেও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ জরুরি। AI দিয়ে পাঠপরিকল্পনার খসড়া তৈরি, প্রশ্নের বিভিন্ন স্তর তৈরি, শিক্ষার্থীদের অনুশীলনী প্রস্তুত বা তথ্য সংগঠিত করা সম্ভব। কিন্তু AI-এর তথ্য যাচাই, কপিরাইট, শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা এবং অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকি সম্পর্কেও শিক্ষককে সচেতন করতে হবে।
বাংলাদেশে অনলাইন শিক্ষক প্রশিক্ষণের ভিত্তিও ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখা ২০২১ বিষয়ে শিক্ষকদের অনলাইন প্রশিক্ষণের জন্য মুক্তপাঠ ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল; শিক্ষক বাতায়নেও অনলাইন ও সরাসরি প্রশিক্ষণের বিভিন্ন রেকর্ড দেখা যায়।
অতএব, ভবিষ্যতের প্রশিক্ষণে ‘ডিজিটাল ক্লাসরুম ব্যবস্থাপনা’ একটি স্বতন্ত্র ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।


৪. মনস্তাত্ত্বিক জ্ঞান ও শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনা:
একটি শ্রেণিকক্ষে সব শিক্ষার্থী একই রকম নয়। কারও শেখার গতি দ্রুত, কারও ধীর; কেউ সহজেই প্রশ্ন করে, আবার কেউ লজ্জা বা ভয়ের কারণে নিজের মতামত প্রকাশ করে না। কেউ পারিবারিক সমস্যার কারণে মনোযোগ হারাতে পারে, আবার কেউ বিশেষ সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে।
একজন শিক্ষক যদি শিক্ষার্থীর এই বৈচিত্র্য সম্পর্কে সচেতন না হন, তাহলে একই পদ্ধতিতে সবাইকে শেখানোর চেষ্টা ব্যর্থ হতে পারে। তাই নিয়মিত প্রশিক্ষণে শিশুমনস্তত্ত্ব, কিশোর মনস্তত্ত্ব, inclusive education, gender sensitivity এবং শিক্ষার্থীর আচরণগত বৈচিত্র্য সম্পর্কে বাস্তবভিত্তিক ধারণা দেওয়া প্রয়োজন।
শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনাও শুধু শৃঙ্খলা বজায় রাখার বিষয় নয়। একটি কার্যকর শ্রেণিকক্ষ এমন হওয়া উচিত যেখানে শিক্ষার্থী ভুল করতে ভয় পাবে না, প্রশ্ন করতে সংকোচ বোধ করবে না এবং শিক্ষককে নিজের শেখার সহায়ক হিসেবে বিবেচনা করবে।
উদাহরণস্বরূপ, কোনো শিক্ষার্থী বারবার ক্লাসে কথা বললে তাকে শুধু শাস্তি না দিয়ে শিক্ষককে বুঝতে হবে—তার আচরণের পেছনে কোনো কারণ আছে কি না। প্রশিক্ষিত শিক্ষক আচরণকে শুধু ‘সমস্যা’ হিসেবে না দেখে সমস্যার কারণ অনুসন্ধান করে সমাধানের চেষ্টা করতে পারেন।
এ ধরনের দক্ষতা বই পড়ে অর্জন করা কঠিন; প্রশিক্ষণে বাস্তব পরিস্থিতি, কেস স্টাডি, ভূমিকাভিনয় ও দলীয় আলোচনার মাধ্যমে এগুলো শেখানো অধিক কার্যকর।


৫. শিক্ষকদের আত্মবিশ্বাস ও পেশাগত মর্যাদা বৃদ্ধি:
নিয়মিত প্রশিক্ষণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফল হলো শিক্ষকের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি। একজন শিক্ষক যখন নতুন কোনো শিক্ষাদান পদ্ধতি, মূল্যায়ন কৌশল বা প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ হয়ে ওঠেন, তখন তাঁর শ্রেণিকক্ষ পরিচালনার সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
প্রশিক্ষণ শুধু নতুন জ্ঞান দেয় না; শিক্ষককে নিজের কাজ মূল্যায়নের সুযোগও দেয়। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তিনি বুঝতে পারেন—কোন পদ্ধতিটি তাঁর শ্রেণিতে কার্যকর হচ্ছে, কোথায় পরিবর্তন প্রয়োজন এবং কীভাবে নিজের পেশাগত দক্ষতা আরও উন্নত করা যায়।
একই সঙ্গে প্রশিক্ষণকে শুধু পদোন্নতি বা আর্থিক সুবিধা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখাও ঠিক নয়। এর মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত শিক্ষকের পেশাগত উৎকর্ষ সাধন। তবে প্রশিক্ষণ, দক্ষতা ও কর্মদক্ষতার মধ্যে একটি সুসংগঠিত সম্পর্ক থাকলে তা শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা ও কর্মপ্রেরণা বৃদ্ধিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।


৬. প্রশিক্ষণকে এককালীন নয়, ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখতে হবে:
বাংলাদেশে শিক্ষক প্রশিক্ষণের বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা রয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর,  মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ বিভাগ শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ এবং PTI, TTC, HSTTI সহ সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের সঙ্গে কাজ করে। কিন্তু সব পর্যায়ের বিপুলসংখ্যক বিদ্যমান ও অনাগত শিক্ষকের পুনঃ পুনঃ প্রশিক্ষণের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার জন্য ৫৪টি পিটিআই এবং ১৪টি সরকারি ও ৭১টি বেসরকারি টিটি কলেজ যথেষ্ট নয়।
তবে শুধু একটি প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করলেই একজন শিক্ষক দীর্ঘদিনের জন্য প্রশিক্ষিত হয়ে যান—এমন ধারণা পরিবর্তন করা প্রয়োজন। শিক্ষাক্রম পরিবর্তিত হলে নতুন প্রশিক্ষণ দরকার, প্রযুক্তি পরিবর্তিত হলে নতুন দক্ষতা দরকার এবং শিক্ষার্থীদের আচরণ ও চাহিদা পরিবর্তিত হলে নতুন পদ্ধতি দরকার।
তাই প্রশিক্ষণ হওয়া উচিত ধারাবাহিক। বছরে একটি বড় প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ছোট ছোট বিষয়ভিত্তিক রিফ্রেশার্স কোর্স, অনলাইন মডিউল, সহকর্মীভিত্তিক শেখা, Lesson Study, Peer Observation এবং প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পেশাগত উন্নয়ন কার্যক্রম চালু করা যেতে পারে।


৭. প্রশিক্ষণের পর বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করা:
প্রশিক্ষণের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা দেখা দেয় তখন, যখন প্রশিক্ষণে শেখা বিষয় শ্রেণিকক্ষে প্রয়োগ করা হয় না। একটি প্রশিক্ষণে শিক্ষক নতুন কোনো শিক্ষাদান পদ্ধতি শিখলেন, কিন্তু প্রতিষ্ঠানে ফিরে পুরোনো পদ্ধতিতেই পাঠদান করলেন—তাহলে প্রশিক্ষণের কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না।
তাই প্রশিক্ষণের পর Follow-up বা অনুসরণমূলক কার্যক্রম থাকা প্রয়োজন। যেমন—প্রশিক্ষণের এক মাস পর শিক্ষককে তাঁর প্রয়োগ করা নতুন পদ্ধতি নিয়ে সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন দিতে বলা যেতে পারে। সহকর্মীরা তাঁর একটি ক্লাস পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। প্রতিষ্ঠান প্রধান বা বিষয়ভিত্তিক সমন্বয়ক ইতিবাচক পরামর্শ দিতে পারেন।
এখানে তদারকির উদ্দেশ্য যেন শাস্তি দেওয়া না হয়; বরং শিক্ষককে সহযোগিতা করা হয়। প্রশিক্ষণ-পরবর্তী সহযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করতে পারলে শিক্ষক নতুন পদ্ধতি প্রয়োগে বেশি আগ্রহী হবেন।


৮. বাংলাদেশের বাস্তবতায় কী ধরনের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন:
বাংলাদেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো, শিক্ষকসংখ্যা, শিক্ষার্থীর আর্থসামাজিক অবস্থা এবং প্রযুক্তিগত সুবিধা এক নয়। তাই সবার জন্য একই ধরনের প্রশিক্ষণ কার্যকর নাও হতে পারে।
প্রশিক্ষণকে কয়েকটি স্তরে ভাগ করা যেতে পারে—
প্রথমত, বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ: শিক্ষক যে বিষয় পড়ান, সেই বিষয়ের নতুন ধারণা, বাস্তব প্রয়োগ ও শিক্ষণ কৌশল।
দ্বিতীয়ত, পেডাগজিক্যাল প্রশিক্ষণ: শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক পাঠদান, প্রশ্ন করার কৌশল, দলগত কাজ, সমস্যা সমাধান ও শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনা।
তৃতীয়ত, মূল্যায়ন প্রশিক্ষণ: শিখনফল নির্ধারণ, গঠনমূলক মূল্যায়ন, কার্যক্রমভিত্তিক মূল্যায়ন, প্রশ্ন প্রণয়ন এবং শিক্ষার্থীর অগ্রগতি নির্ণয়।
চতুর্থত, ডিজিটাল দক্ষতা: স্মার্ট ক্লাসরুম, ডিজিটাল কনটেন্ট, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ডিজিটাল মূল্যায়ন ও AI-এর দায়িত্বশীল ব্যবহার।
পঞ্চমত, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা: বিভিন্ন সক্ষমতা ও সামাজিক-পারিবারিক পটভূমির শিক্ষার্থীদের নিয়ে কার্যকর শ্রেণিকক্ষ পরিচালনা।


৯. করণীয়:
শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণকে কার্যকর করতে কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে।
ক. নিয়মিত রিফ্রেশার্স প্রশিক্ষণ: প্রতি বছর প্রত্যেক শিক্ষকের জন্য অন্তত একটি স্বল্পমেয়াদি পেশাগত উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
খ. ব্লেন্ডেড লার্নিং: সরাসরি প্রশিক্ষণের পাশাপাশি অনলাইন প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ করা। মুক্তপাঠের মতো প্ল্যাটফর্মকে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
গ. প্রতিষ্ঠানভিত্তিক প্রশিক্ষণ: একই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা নিজেদের সমস্যা নিয়ে মাসিক বা ত্রৈমাসিক পেশাগত আলোচনা করতে পারেন।
ঘ. বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ: বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা, মানবিকসহ প্রতিটি বিষয়ের জন্য আলাদা প্রশিক্ষণ মডিউল তৈরি করা।
ঙ. ডিজিটাল দক্ষতার প্রশিক্ষণ: শুধু কম্পিউটার চালানো নয়; ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি, অনলাইন মূল্যায়ন, নিরাপদ প্রযুক্তি ব্যবহার এবং AI-এর দায়িত্বশীল ব্যবহার শেখানো।
চ. প্রশিক্ষণ-পরবর্তী মূল্যায়ন: প্রশিক্ষণ শেষে শুধু পরীক্ষা নিয়ে সার্টিফিকেট প্রদান না করে শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে কতটা প্রয়োগ করছেন, সেটিও মূল্যায়ন করা।
ছ. প্রণোদনা ও স্বীকৃতি: প্রশিক্ষণে অর্জিত দক্ষতা সফলভাবে প্রয়োগকারী শিক্ষককে প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে স্বীকৃতি দেওয়া।


একজন শিক্ষক যত বেশি শিখবেন, তাঁর শিক্ষার্থীরা তত বেশি শেখার সুযোগ পাবে। তাই শিক্ষকের পেশাগত উন্নয়নকে শিক্ষা ব্যবস্থার অতিরিক্ত কোনো কার্যক্রম হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি শিক্ষার মানোন্নয়নের কেন্দ্রীয় উপাদান।
একটি নতুন শিক্ষাক্রম প্রণয়ন করা, নতুন বই প্রকাশ করা বা শ্রেণিকক্ষে প্রযুক্তি স্থাপন করাই যথেষ্ট নয়। এসব পরিবর্তনকে সফলভাবে বাস্তবায়ন করার জন্য প্রয়োজন দক্ষ, আত্মবিশ্বাসী ও সময়োপযোগী শিক্ষক। আর সেই শিক্ষক তৈরি করার অন্যতম কার্যকর উপায় হলো নিয়মিত ও মানসম্মত পেশাগত প্রশিক্ষণ।
আমাদের মনে রাখতে হবে—একটি বিদ্যালয় বা কলেজের ভবন আধুনিক হতে পারে, শ্রেণিকক্ষে স্মার্ট বোর্ড থাকতে পারে, পাঠ্যবই হতে পারে আধুনিক; কিন্তু শিক্ষক যদি সময়ের সঙ্গে নিজেকে উন্নত না করেন, তাহলে শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব নয়।
অতএব, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণকে এককালীন আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে নয়, বরং আজীবন পেশাগত শেখার অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। শিক্ষককে প্রশিক্ষিত করা মানে শুধু একজন কর্মীকে দক্ষ করা নয়; বরং একই সঙ্গে শত শত শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎকে আরও সম্ভাবনাময় করে তোলা।
শিক্ষকের ওপর বিনিয়োগ মানেই শিক্ষার্থীর ওপর বিনিয়োগ; আর শিক্ষার্থীর ওপর বিনিয়োগ মানেই বাংলাদেশের ভবিষ্যতের ওপর বিনিয়োগ। তাই মানসম্মত, দক্ষ ও আধুনিক বাংলাদেশ গড়তে শিক্ষকদের জন্য নিয়মিত, যুগোপযোগী ও বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই।


মুন্সী রুহুল আমিন
প্রভাষক, উৎপাদন ব্যবস্থাপনা ও বিপণন
রাজানগর রাণীরহাট ডিগ্রি কলেজ, রাঙ্গুনিয়া, চট্টগ্রাম। 

মন্তব্য করুন