Loading..

ব্লগ

রিসেট

২২ আগস্ট, ২০২৬ ১২:২৬ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশে সহ-শিক্ষাক্রম: বাস্তব প্রয়োগ ও প্রয়োজনীয়তা

1.    বাংলাদেশে সহ-শিক্ষাক্রম: বাস্তব প্রয়োগ প্রয়োজনীয়তা

ভূমিকা

শিক্ষা কেবল পাঠ্যপুস্তকের মুখস্থ জ্ঞান আয়ত্ত করা নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ মানুষ গড়ে তোলার প্রক্রিয়া। এই পূর্ণাঙ্গতার একটি অপরিহার্য অংশ হলো সহ-শিক্ষাক্রম কার্যক্রম (Co-curricular Activities) বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরেই একাডেমিক ফলাফলকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যার ফলে সহ-শিক্ষাক্রম কার্যক্রম অনেকটাই উপেক্ষিত থেকেছে। তবে সাম্প্রতিক শিক্ষাক্রম সংস্কারের ধারাবাহিকতায় এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে।

সহ-শিক্ষাক্রম কী?

সহ-শিক্ষাক্রম বলতে সেইসব কার্যক্রম বোঝায় যা নিয়মিত পাঠ্যক্রমের বাইরে থেকে শিক্ষার্থীর সামগ্রিক বিকাশে ভূমিকা রাখে। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত

  • খেলাধুলা শারীরিক শিক্ষা

  • সংগীত, নৃত্য, চারুকলা অভিনয়

  • বিতর্ক, বক্তৃতা কুইজ প্রতিযোগিতা

  • স্কাউট, গার্লস গাইড রেড ক্রিসেন্ট কার্যক্রম

  • বিজ্ঞান ক্লাব, সাহিত্য ক্লাব ইনভেনশন ফেয়ার

  • সামাজিক সেবামূলক কার্যক্রম স্বেচ্ছাসেবা

  • নেতৃত্ব বিকাশমূলক কর্মশালা

বাংলাদেশে বর্তমান বাস্তব চিত্র

শহর গ্রামের বৈষম্য

ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বড় শহরের নামকরা স্কুল-কলেজগুলোতে সহ-শিক্ষাক্রম কার্যক্রমের জন্য নির্দিষ্ট বাজেট, প্রশিক্ষক অবকাঠামো থাকলেও গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে এসবের চরম ঘাটতি রয়েছে। খেলার মাঠ, সংগীত কক্ষ বা প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাবে গ্রামের শিক্ষার্থীরা এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

একাডেমিক চাপের প্রাধান্য

জিপিএ- কেন্দ্রিক প্রতিযোগিতা এবং কোচিং সংস্কৃতি এত প্রবল যে অভিভাবকরাও প্রায়ই সন্তানদের সহ-শিক্ষাক্রম কার্যক্রমে অংশগ্রহণকে "সময় নষ্ট" মনে করেন। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান কাগজে-কলমে এসব কার্যক্রমের তালিকা রাখলেও বাস্তবে তার চর্চা সীমিত।

নতুন শিক্ষাক্রমের উদ্যোগ

২০২৩ সালে প্রবর্তিত জাতীয় শিক্ষাক্রমে অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখন, দলগত কাজ ব্যবহারিক মূল্যায়নের উপর জোর দেওয়া হয়েছে, যা সহ-শিক্ষাক্রম কার্যক্রমকে মূলধারার শিক্ষার সাথে সংযুক্ত করার একটি প্রচেষ্টা। যদিও বাস্তবায়নে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।

সহ-শিক্ষাক্রমের প্রয়োজনীয়তা

. সামগ্রিক ব্যক্তিত্ব বিকাশ

শুধু পরীক্ষার নম্বর একজন শিক্ষার্থীর প্রকৃত সক্ষমতার প্রতিফলন নয়। সহ-শিক্ষাক্রম কার্যক্রম আত্মবিশ্বাস, যোগাযোগ দক্ষতা, নেতৃত্বগুণ সৃজনশীলতা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

. মানসিক স্বাস্থ্য চাপ মোকাবিলা

পড়াশোনার একঘেয়েমি পরীক্ষার চাপ কমাতে খেলাধুলা, সংগীত বা শিল্পকর্মের মতো কার্যক্রম কার্যকর মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। এটি শিক্ষার্থীদের মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে সহায়তা করে।

. দলগত কাজ সামাজিক দক্ষতা

দলগত খেলা, নাটক বা প্রকল্পভিত্তিক কাজ শিক্ষার্থীদের একসাথে কাজ করা, দ্বন্দ্ব নিরসন সহমর্মিতার মতো গুরুত্বপূর্ণ জীবনদক্ষতা শেখায়, যা কর্মক্ষেত্রেও অপরিহার্য।

. কর্মসংস্থান ভবিষ্যৎ প্রস্তুতি

বর্তমান কর্মবাজারে কেবল একাডেমিক সনদ যথেষ্ট নয়; নিয়োগকর্তারা যোগাযোগ দক্ষতা, নেতৃত্বগুণ সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা খোঁজেনযেসব গুণ সহ-শিক্ষাক্রম কার্যক্রমের মাধ্যমে গড়ে ওঠে।

. প্রতিভা অন্বেষণ

অনেক শিক্ষার্থীর সুপ্ত প্রতিভাখেলাধুলা, সংগীত বা শিল্পকলায়শ্রেণিকক্ষের বাইরের কার্যক্রমের মাধ্যমেই প্রথম প্রকাশ পায়। সহ-শিক্ষাক্রম না থাকলে এই প্রতিভাগুলো অনাবিষ্কৃতই থেকে যায়।

বাস্তবায়নের প্রধান বাধাসমূহ

  • পর্যাপ্ত বাজেট অবকাঠামোর অভাব

  • প্রশিক্ষিত শিক্ষক প্রশিক্ষকের সংকট

  • একাডেমিক ফলাফল-কেন্দ্রিক মূল্যায়ন পদ্ধতি

  • অভিভাবকদের মানসিকতা সচেতনতার ঘাটতি

  • শহর-গ্রাম বৈষম্য

  • সময়সূচিতে পর্যাপ্ত স্থান না রাখা

করণীয়

. নীতিগত অগ্রাধিকার: শিক্ষানীতিতে সহ-শিক্ষাক্রম কার্যক্রমকে বাধ্যতামূলক মূল্যায়নযোগ্য অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা।

. অবকাঠামো বিনিয়োগ: প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে ন্যূনতম খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কক্ষ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিশ্চিত করা।

. শিক্ষক প্রশিক্ষণ: বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকদের পাশাপাশি সহ-শিক্ষাক্রম পরিচালনার জন্য দক্ষ প্রশিক্ষক তৈরি করা।

. অভিভাবক সচেতনতা: সহ-শিক্ষাক্রম কার্যক্রমের গুরুত্ব সম্পর্কে অভিভাবকদের সচেতন করার জন্য প্রচারণা চালানো।

. স্থানীয় সম্পদ ব্যবহার: শহর গ্রামের বৈষম্য কমাতে স্থানীয় ক্লাব, খেলার মাঠ সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে সমন্বয় করা।

. মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তন: একাডেমিক নম্বরের পাশাপাশি সহ-শিক্ষাক্রম কার্যক্রমে অংশগ্রহণকে শিক্ষার্থীর সামগ্রিক মূল্যায়নে অন্তর্ভুক্ত করা।

উপসংহার

বাংলাদেশে একটি প্রতিযোগিতামূলক দক্ষতা-নির্ভর প্রজন্ম গড়ে তুলতে হলে সহ-শিক্ষাক্রম কার্যক্রমকে আর ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি এখন শিক্ষার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। সরকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক অভিভাবকসকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব, যা শিক্ষার্থীদের কেবল ভালো ফলাফল অর্জনকারী নয়, বরং আত্মবিশ্বাসী, সৃজনশীল দক্ষ ভবিষ্যৎ নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলবে।

মন্তব্য করুন