সহকারী অধ্যাপক
২২ আগস্ট, ২০২৬ ০৩:২২ পূর্বাহ্ণ
রমযান: সাওম ও কুরআনের আলোকে আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য - মোঃ মুজিবুর রহমান
|
|
রমযান: সাওম ও কুরআনের আলোকে আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর
রমযান মাস মুসলমানের জীবনে এক অনন্য রহমত, বরকত ও আত্মশুদ্ধির মাস। এটি শুধু পানাহার থেকে বিরত থাকার মাস নয়; বরং তাকওয়া অর্জন, আত্মসংযম, চরিত্র পরিশুদ্ধি, কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করা এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক সুবর্ণ সুযোগ। মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য এই মাসকে বিশেষ মর্যাদায় ভূষিত করেছেন। রমযানের প্রতিটি দিন যেন রহমতের আহ্বান, প্রতিটি রাত যেন ক্ষমার প্রত্যাশা এবং প্রতিটি মুহূর্ত যেন নেক আমল বৃদ্ধির সুযোগ নিয়ে আসে।
রাসুলুল্লাহ ﷺ রমযানের আগমন সম্পর্কে সাহাবিদের সুসংবাদ দিয়ে বলেছেন, “তোমাদের মাঝে বরকতময় রমযান মাস এসেছে। আল্লাহ তোমাদের ওপর এ মাসের সিয়াম সাধনা ফরজ করে দিয়েছেন।”—এই মর্মে হাদিসে রমযানের মর্যাদা বর্ণিত হয়েছে। তাই রমযান কোনো সাধারণ মাস নয়; এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার জন্য বিশেষ অনুগ্রহ ও প্রশিক্ষণের সময়।
পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন, “হে মুমিনগণ! তোমাদের ওপর সিয়াম ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।” (সূরা আল-বাকারা, ২:১৮৩)। এই আয়াত থেকে স্পষ্ট হয় যে রোজার মূল উদ্দেশ্য শুধু ক্ষুধা-তৃষ্ণা সহ্য করা নয়; বরং মানুষের অন্তরে আল্লাহভীতি, আত্মসংযম ও তাকওয়া সৃষ্টি করা। একজন প্রকৃত রোজাদার দিনের বেলায় যেমন খাদ্য-পানীয় থেকে নিজেকে বিরত রাখেন, তেমনি মিথ্যা, গিবত, অশ্লীলতা, প্রতারণা, অহংকার, হিংসা, ক্রোধ ও অন্যায় থেকেও নিজেকে দূরে রাখেন।
রমযান শুরু হলে রহমতের দরজা খুলে দেওয়া হয়—এ মর্মে সহিহ হাদিসে সুসংবাদ এসেছে। এটি মুমিনের জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক বিষয়। সারা বছর মানুষ নানা ভুল-ত্রুটি ও গুনাহে জড়িয়ে পড়ে। কিন্তু রমযান তাকে ফিরে আসার, নিজেকে সংশোধন করার এবং আল্লাহর ক্ষমা লাভের সুযোগ দেয়। তাই রমযান এলে একজন সচেতন মুসলমানের হৃদয়ে নতুন প্রত্যাশা জাগে—এবার সে নিজের জীবনকে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে আরও সুন্দরভাবে গড়ে তুলবে।
রমযানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বৈশিষ্ট্য হলো—এ মাসের সঙ্গে পবিত্র কুরআনের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, “রমযান মাস—যাতে কুরআন নাজিল করা হয়েছে, যা মানুষের জন্য হিদায়াত এবং সুস্পষ্ট পথনির্দেশ ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী।” (সূরা আল-বাকারা, ২:১৮৫)। অতএব রমযান হলো কুরআনের মাস। এ মাসে কুরআন তিলাওয়াত, অর্থ বোঝা, চিন্তা করা এবং জীবনে কুরআনের শিক্ষা বাস্তবায়নের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
কুরআন শুধু তিলাওয়াতের জন্য নাজিল হয়নি; বরং এটি মানুষের জীবন পরিচালনার পূর্ণাঙ্গ পথনির্দেশ। তাই রমযানে আমরা যদি কুরআন পড়ি কিন্তু তার শিক্ষা জীবনে বাস্তবায়ন না করি, তাহলে কুরআনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক পূর্ণতা পায় না। কুরআন আমাদের সত্যবাদী হতে শেখায়, ন্যায়বিচার করতে শেখায়, পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ করতে শেখায়, আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা করতে শেখায়, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে শেখায় এবং অন্যায়-অশ্লীলতা থেকে দূরে থাকতে শিক্ষা দেয়।
সাওম ও কুরআন—দুটিই মানুষের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে। সাওম মানুষকে নিজের প্রবৃত্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে শেখায়, আর কুরআন তাকে সঠিক পথের দিশা দেয়। একটি মানুষকে সংযমী করে, অন্যটি তাকে পথনির্দেশ দেয়। তাই রমযানে সাওম ও কুরআনের সমন্বয় একজন মুমিনের আত্মিক উন্নতির শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে ওঠে।
হাদিসে এসেছে, কিয়ামতের দিন সাওম ও কুরআন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। সাওম বলবে—হে আমার প্রতিপালক! আমি তাকে দিনের বেলায় পানাহার ও প্রবৃত্তির চাহিদা থেকে বিরত রেখেছিলাম; তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। আর কুরআন বলবে—আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখে তিলাওয়াতে নিয়োজিত রেখেছিলাম; তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। অতএব তাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হবে—এ মর্মে বর্ণনা রয়েছে। এই হাদিস মুমিনের সামনে এক মহামূল্যবান আশার দ্বার খুলে দেয়।
তবে এই সুপারিশের প্রত্যাশা যেন আমাদের অলস না করে; বরং আরও বেশি সাওম পালন, কুরআন তিলাওয়াত এবং নেক আমলে উৎসাহিত করে। রোজা শুধু ক্ষুধার নাম নয়। রাসুলুল্লাহ ﷺ সতর্ক করেছেন—যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও মন্দ কাজ পরিত্যাগ করে না, তার শুধু পানাহার ত্যাগ করার মধ্যে প্রকৃত সাওমের উদ্দেশ্য পূর্ণ হয় না। তাই রোজার প্রকৃত শিক্ষা হলো—জিহ্বাকে সংযত করা, চোখকে হারাম থেকে হেফাজত করা, কানকে অশ্লীলতা থেকে রক্ষা করা, হাত-পাকে অন্যায় থেকে বিরত রাখা এবং অন্তরকে পাপের চিন্তা থেকে পরিশুদ্ধ করা।
রমযান আমাদের সময়ের মূল্য বুঝতে শেখায়। সাধারণ সময়ে যে মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনর্থক কাজে ব্যয় করে, রমযানে সে নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, দোয়া, ইস্তিগফার ও দান-সদকার মাধ্যমে সময়কে অর্থবহ করে তুলতে পারে। বিশেষ করে রাতের ইবাদত, তারাবিহ, তাহাজ্জুদ ও কুরআন তিলাওয়াত মুমিনের হৃদয়ে ঈমানের আলো বাড়িয়ে দেয়।
রমযান দরিদ্র ও অসহায় মানুষের কষ্ট উপলব্ধি করারও শিক্ষা দেয়। সারাদিন ক্ষুধা ও তৃষ্ণা অনুভব করার মাধ্যমে মানুষ বুঝতে পারে—যারা প্রতিদিন অভাবের মধ্যে জীবন কাটায়, তাদের কষ্ট কত গভীর। তাই রমযান আমাদের শুধু নিজের ইবাদতে ব্যস্ত থাকতে শেখায় না; বরং অভাবী, এতিম, অসহায়, প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা দেয়। যাকাত, সদকা, ফিতরা ও ইফতার করানোসহ বিভিন্ন কল্যাণমূলক কাজের মাধ্যমে সামাজিক সহমর্মিতা বৃদ্ধি পায়।
রমযান আত্মসংযমের বিদ্যালয়। এখানে ক্ষুধা আমাদের ধৈর্য শেখায়, তৃষ্ণা আমাদের সংযম শেখায়, কুরআন আমাদের হিদায়াত দেয়, নামাজ আমাদের আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করে এবং দান আমাদের হৃদয়কে উদার করে। ফলে রমযান শেষে একজন মুমিনের চরিত্রে পরিবর্তন আসাই হওয়া উচিত। সে যেন আরও বিনয়ী, সত্যবাদী, ধৈর্যশীল, ক্ষমাশীল, দায়িত্বশীল ও পরোপকারী হয়ে ওঠে।
রমযানের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো তাকওয়া। তাকওয়া অর্থ আল্লাহকে ভয় করে তাঁর অসন্তুষ্টি থেকে বেঁচে থাকা এবং তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা। মানুষ যখন একাকী অবস্থায়ও রোজা ভঙ্গ করে না, তখন সে মূলত আল্লাহর প্রতি তার বিশ্বাসের প্রমাণ দেয়। কারণ সে জানে—মানুষ তাকে না দেখলেও আল্লাহ তাকে দেখছেন। এই আত্মসচেতনতা যদি রমযানের পরও জীবনে স্থায়ী হয়, তাহলেই রোজার প্রকৃত সাফল্য অর্জিত হবে।
কুরআনের সঙ্গে সম্পর্কও শুধু রমযানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। রমযানে আমরা যদি নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করি, তবে রমযানের পরও প্রতিদিন কুরআনের জন্য নির্দিষ্ট সময় রাখা প্রয়োজন। শুধু দ্রুত খতম করার পরিবর্তে অর্থ বোঝা, আয়াতের শিক্ষা নিয়ে চিন্তা করা এবং সেই শিক্ষা নিজের চরিত্রে প্রয়োগ করা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। কুরআনের আলোয় পরিবার, সমাজ ও ব্যক্তিজীবন গড়ে উঠলে মানুষের জীবন সুন্দর, শান্তিময় ও কল্যাণময় হয়ে ওঠে।
রমযান আমাদের গুনাহ থেকে ফিরে আসার আহ্বান জানায়। একজন মানুষ যত বড় ভুলই করে থাকুক, আল্লাহর রহমত থেকে তার নিরাশ হওয়া উচিত নয়। আন্তরিক তাওবা, পাপ পরিত্যাগ, নেক আমল এবং আল্লাহর প্রতি প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে মানুষ নতুন জীবন শুরু করতে পারে। রমযান সেই প্রত্যাবর্তনের জন্য সর্বোত্তম সুযোগগুলোর একটি।
এই মাসে আমাদের উচিত নামাজ সময়মতো আদায় করা, কুরআন তিলাওয়াত করা, বেশি বেশি দোয়া ও ইস্তিগফার করা, মিথ্যা ও গিবত থেকে বিরত থাকা, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা, অসহায় মানুষের সাহায্য করা এবং হালাল-হারামের সীমারেখা মেনে চলা। রোজার সময় যেমন খাবার-দাবারের প্রতি সংযম প্রয়োজন, তেমনি ইফতারের পর অতিভোজন, অপচয় ও বিলাসিতা থেকেও বিরত থাকা প্রয়োজন। কারণ রমযান সংযমের মাস; অপচয়ের মাস নয়।
আমাদের মনে রাখতে হবে, রমযানের প্রকৃত সাফল্য ঈদের দিন নতুন পোশাক পরা বা আনন্দ-উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত সাফল্য হলো—রমযানের পরও একজন মানুষ যদি নামাজি থাকে, কুরআনের সঙ্গে যুক্ত থাকে, গুনাহ থেকে দূরে থাকে, মানুষের অধিকার রক্ষা করে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিকে জীবনের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করে। রমযান যদি আমাদের চরিত্র বদলে দেয়, তবে সেটিই রমযানের সবচেয়ে বড় অর্জন।
সুতরাং রমযান আমাদের জন্য আল্লাহর বিশেষ রহমতের সময়। এ মাসে সাওম আমাদের আত্মাকে সংযত করবে, কুরআন আমাদের পথ দেখাবে, নামাজ আমাদের আল্লাহর কাছে নিয়ে যাবে, দোয়া আমাদের হৃদয়কে বিনয়ী করবে এবং দান-সদকা আমাদের সমাজের মানুষের সঙ্গে ভালোবাসার বন্ধন দৃঢ় করবে। কিয়ামতের কঠিন দিনে সাওম ও কুরআনের সুপারিশ লাভের প্রত্যাশা আমাদের আরও বেশি আমল করতে অনুপ্রাণিত করবে।
পরিশেষে বলা যায়, রমযান হলো আত্মশুদ্ধির মাস, সাওম হলো তাকওয়ার প্রশিক্ষণ এবং কুরআন হলো হিদায়াতের আলো। যে ব্যক্তি রমযানের মর্যাদা উপলব্ধি করে আন্তরিকতার সঙ্গে সাওম পালন করে, কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে, নিজের চরিত্র সংশোধন করে এবং আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী জীবন পরিচালনার চেষ্টা করে, তার জন্য রমযান হতে পারে জীবনের এক মহৎ পরিবর্তনের সূচনা। তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত—রমযানকে শুধু ক্যালেন্ডারের একটি মাস হিসেবে নয়, বরং আল্লাহর নৈকট্য লাভ, গুনাহ থেকে মুক্তি, আত্মশুদ্ধি এবং আখিরাতের সফলতার এক অনন্য সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সঠিকভাবে সাওম পালন করার, কুরআন বুঝে পড়ার, কুরআনের শিক্ষা জীবনে বাস্তবায়ন করার এবং কিয়ামতের দিন সাওম ও কুরআনের সুপারিশ লাভের তাওফিক দান করুন। আমিন।
৪
৪ মন্তব্য