Loading..

ব্লগ

রিসেট

২২ আগস্ট, ২০২৬ ০৬:২৬ পূর্বাহ্ণ

শিক্ষার্থীর নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ বিকাশে 'আখলাকে হামিদা': প্রাত্যহিক অনুশীলনের গুরুত্ব মোস্তাফিজুর রহমান কবি ও শিক্ষক

শিক্ষার্থীর নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ বিকাশে 'আখলাকে হামিদা': প্রাত্যহিক অনুশীলনের গুরুত্ব

মোস্তাফিজুর রহমান কবি ও শিক্ষক

মানবজীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ অলংকার ও অমূল্য সম্পদ হলো উন্নত চরিত্র। ইসলামি পরিভাষায় যাকে বলা হয় 'আখলাকে হামিদা' বা প্রশংসনীয় চরিত্র। একটি সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও মানবিক সমাজ বিনির্মাণের পূর্বশর্ত হলো প্রতিটি ব্যক্তির নৈতিক উৎকর্ষ সাধন। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের কোমলমতি বয়সে যদি তাদের মননে নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের বীজ বপন করা যায়, তবে ভবিষ্যৎ পৃথিবী হবে আরও বেশি সহনশীল, শান্তিময় ও বাসযোগ্য। পুঁথিগত বিদ্যা অর্জনের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সুকুমার বৃত্তির বিকাশ ও আত্মশুদ্ধির জন্য 'আখলাকে হামিদা'র অনুশীলন আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

বর্তমান সময়ে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রভূত প্রসার ঘটলেও শিক্ষার্থীদের মাঝে নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের এক অনাকাঙ্ক্ষিত শূন্যতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য কেবল পরীক্ষায় ভালো ফলাফল অর্জন নয়, বরং একজন পরিপূর্ণ, দায়িত্বশীল ও মানবিক মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলা। আর এই মহৎ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে আমাদের শ্রেণিকক্ষগুলো। শ্রেণিকক্ষ কেবল পাঠদানের স্থান নয়, এটি হলো মানুষ গড়ার প্রকৃত কর্মশালা।

আখলাকে হামিদা বা প্রশংসনীয় চরিত্রের শত উপমা মূলত একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন। এই বিশাল গুণাবলির ভাণ্ডার দেখে শিক্ষার্থীরা প্রথমে হয়তো কিছুটা অভিভূত হতে পারে। তাই তাদের মাঝে ইতিবাচক রূপান্তর আনতে হলে একটি সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবসম্মত কৌশল গ্রহণ করা প্রয়োজন। আর তা হলো— "প্রতিদিন কমপক্ষে তিনটি গুণের অনুশীলন"। একবারে শত গুণের ভার চাপিয়ে না দিয়ে, প্রতিদিন ছোট ছোট প্রত্যয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মননে ইতিবাচক অভ্যাস গড়ে তোলা সম্ভব।

উদাহরণস্বরূপ, সপ্তাহের প্রথম দিন শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীরা প্রত্যয় গ্রহণ করতে পারে যে, আজ তারা তিনটি সুনির্দিষ্ট গুণ অনুশীলন করবে। যেমন: ১. "সর্বাবস্থায় সত্যবাদিতা ও সততা বজায় রাখা।" ২. "সহপাঠী ও বন্ধুদের সাথে আন্তরিকতাপূর্ণ ও সুদৃঢ় সম্পর্ক বজায় রাখা।" ৩. "শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সকল নিয়মশৃঙ্খলা, পবিত্রতা ও শিষ্টাচার মেনে চলা।"

পরের দিন তারা নতুন আরও তিনটি গুণের অনুশীলন করবে। যেমন: ১. "পড়াশোনায় তুলনামূলক দুর্বল সহপাঠীদের আন্তরিকভাবে সহায়তা করা।" ২. "চলাচলের পথ থেকে সব ধরনের কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করা।" ৩. "শিক্ষাগুরুদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভক্তি প্রদর্শন করা।"

এভাবে প্রতিদিন মাত্র তিনটি করে বিষয় সচেতনভাবে অনুশীলনের ফলে এক মাসের মধ্যেই একজন শিক্ষার্থী প্রায় নব্বইটি ইতিবাচক গুণের সাথে পরিচিত ও অভ্যস্ত হয়ে উঠবে। বিন্দু বিন্দু জলে যেমন মহাসিন্ধু গড়ে ওঠে, তেমনি প্রতিদিনের এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনুশীলন শিক্ষার্থীদের অবচেতন মনে স্থায়ী ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।

প্রতিদিন সকালে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পূর্বে মাত্র পাঁচ মিনিট সময় বরাদ্দ করে শিক্ষক এই তিনটি গুণের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে পারেন। দিনশেষে শিক্ষার্থীরা নিজেরাই নিজেদের আত্মপর্যালোচনা (মুহাসাবা) করবে যে তারা কতটুকু সফল হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীদের মাঝে পারস্পরিক সহমর্মিতা, শৃঙ্খলাবোধ, বিনয় এবং পরমতসহিষ্ণুতা বৃদ্ধি পাবে। তারা শিখবে কীভাবে অপরের সুখ ও সফলতায় আনন্দ প্রকাশ করতে হয়, কীভাবে ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হয় এবং কীভাবে নিঃস্বার্থভাবে অপরের কল্যাণে আত্মনিয়োগ করতে হয়।

একজন শিক্ষক হিসেবে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, শিক্ষার প্রকৃত সার্থকতা নিহিত রয়েছে শিক্ষার্থীর চারিত্রিক দৃঢ়তার মাঝে। 'আখলাকে হামিদা'র এই প্রাত্যহিক অনুশীলন শিক্ষার্থীদের কেবল ভালো ছাত্রই বানাবে না, বরং তাদের হৃদয়কে করবে মানবিক আলোয় আলোকিত। যে শিক্ষার্থী প্রতিদিন অপরের সম্মান রক্ষা করতে শেখে, দুর্বলকে সহায়তা করতে শেখে এবং প্রকৃতির প্রতি সদয় হতে শেখে— সে কখনোই সমাজ বা রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে না।

আসুন, আমরা আমাদের শ্রেণিকক্ষগুলোকে কেবল প্রতিযোগিতার ময়দান না বানিয়ে মানবিকতার আতুঁড়ঘরে পরিণত করি। প্রতিদিন অন্তত তিনটি প্রশংসনীয় চরিত্রের অনুশীলনের মধ্য দিয়ে আমাদের শিক্ষার্থীরা গড়ে উঠুক আগামীর আলোকিত মানুষ হিসেবে। কারণ, একটি সুন্দর চরিত্রই পারে একটি সুন্দর পৃথিবীর নিশ্চয়তা দিতে।

মন্তব্য করুন