সিনিয়র শিক্ষক
২২ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:৪৬ অপরাহ্ণ
মহানবী (সা.)-কে দমাতে শত্রুদের ১০ কূটচাল
নবুয়ত লাভের আগে রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন মক্কার সবচেয়ে সমাদৃত মানুষ। সবাই তাঁর বুদ্ধি, বিচক্ষণতা, সাহসিকতা ও সততার প্রশংসা করত। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন নবুয়ত পেলেন এবং আল্লাহর হুকুমে দ্বিনের দাওয়াত দিতে শুরু করলেন, তখন মক্কার পৌত্তলিক সমাজ তাঁর শত্রুতে পরিণত হলো। তারা বুঝতে পেরেছিল, মুহাম্মদ (সা.) যে সত্যের আহবান জানাচ্ছে তা মেনে নিলে আমরা জুলুম অত্যাচারের মাধ্যমে স্বার্থ হাসিলের সুযোগ হারাব এবং মিথ্যা আভিজাত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত আমাদের নেতৃত্বও ভেঙে পড়বে মুহূর্তে। তাই নবুয়তের সূচনাকাল থেকে তারা মহানবী (সা.)-এর বিরুদ্ধে নানামুখী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে চূড়ান্ত পরাজয়ের আগ পর্যন্ত তারা এই ষড়যন্ত্র অব্যাহত রাখে।
মহানবী (সা.) মদিনায় হিজরত করার পর
স্থানীয় ইহুদি সম্প্রদায়ও তাঁর বিরুদ্ধে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র করেছিল;
কিন্তু আল্লাহ তাঁর নবীকে সব ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করেছিলেন। রাসুলুল্লাহ
(সা.)-এর প্রতি আল্লাহর অঙ্গীকার ছিল—‘আল্লাহ আপনাকে মানুষের অনিষ্ট থেকে
রক্ষা করবেন।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৬৭)
নবীজি (সা.)-এর বিরুদ্ধে ১০ ষড়যন্ত্র
মক্কা ও মদিনায় রাসুলুল্লাহ (সা.) বিরুদ্ধে হওয়া উল্লেখযোগ্য ১০টি ষড়যন্ত্রের বিবরণ দেওয়া হলো—
১. নারী, সম্পদ ও নেতৃত্বের প্রলোভন : মক্কার মুশরিকরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে থামাতে না পেরে তারা প্রলোভন নিয়ে হাজির হয়। তারা তাঁকে বলে, তুমি যদি নেতৃত্ব, সুন্দরী নারী বা সম্পদ লাভের জন্য এসব করে থাকো তবে আমরা অঙ্গীকার করছি তোমাকে আমরা তাই দেব। নবীজি (সা.) বললেন, আমার এক হাতে চাঁদ অন্য হাতে সূর্য এনে দিলেও আমি সত্য প্রচার থেকে বিরত থাকব না।
২. পরিবারকে অবরুদ্ধ করা : রাসুলুল্লাহ (সা.) দ্বিনের দাওয়াত থেকে বিরত রাখতে মক্কার মুশরিকরা শিআবে আবি তালিবে নবী (সা.)-এর পরিবার ও বংশের লোকদের তিন বছর পর্যন্ত অবরুদ্ধ করে রেখেছিল। অতঃপর মক্কার কিছু বিবেকবান মানুষের উদ্যোগে সেই অবরোধ ভেঙে ফেলা হয়। এই অবরোধের সময় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পরিবার, বংশের লোকেরা এবং সাহাবিরা অমানসিক কষ্ট সহ্য করেছিলেন।
৩. পাগল আখ্যা দেওয়া : হজের মৌসুমে মক্কার বাইরের মানুষগুলো যেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কথা না শোনে এ জন্য তারা মক্কার প্রবেশপথগুলোতে লোক নিযুক্ত করেছিল। তারা হজযাত্রীদের বলত, তোমরা মুহাম্মদের কথা শুনো না, সে পাগল ও জাদুগ্রস্ত। কিন্তু তাদের এই ষড়যন্ত্রের ফল উল্টো হলো, মানুষের মনে মুহাম্মদ (সা.) ও তাঁর দ্বিনের ব্যাপারে কৌতূহল তৈরি হলো এবং এভাবে বেশ কয়েকজন মুসলমানও হলো।
৪. রাতের আঁধারে হত্যার ষড়যন্ত্র : আল্লাহর ইচ্ছায় মদিনায় ইসলামের সুবাতাস বইতে শুরু করল এবং গোপনে সাহাবিরা সেখানে হিজরত করতে লাগল। মক্কার মুশরিকরা বুঝতে পারল যেকোনো সময় মুহাম্মদ (সা.) মদিনায় হিজরত করবেন। তখন তারা তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র করল (নাউজুবিল্লাহ)। হত্যার উদ্দেশ্যে মক্কার নির্বাচিত যোদ্ধারা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বাড়ি ঘেরাও করল। কিন্তু তাঁকে মুশরিকদের ষড়যন্ত্রের কথা জানিয়ে দেওয়া হলো। তিনি আলী (আ.)-কে নিজের বিছানায় শুইয়ে দিয়ে পাহারায় থাকা যুবকদের চোখের সামনে দিয়ে বের হয়ে গেলেন। তারা সেটা বুঝতেও পারল না।
৫. ধরতে পারলে ১০০ উট : যখন মক্কার মুশরিকরা টের পেল নবীজি (সা.) নিরাপদে ঘর থেকে বের হয়ে গেছেন, তখন তারা নতুন ষড়যন্ত্র করল। তারা ঘোষণা করল—মুহাম্মদকে জীবিত বা মৃত ধরে আনতে পারলে ১০০ উট পুরস্কার দেওয়া হবে। কিন্তু আল্লাহর রহমত ও মহানবী (সা.)-এর বিচক্ষণতায় কেউ শেষ পর্যন্ত ধরতে পারল না। সুরাকা বিন মালিক (রা.) (তখন ঈমান আনেননি) রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে দেখে ফেললেও আল্লাহর কুদরতে তাঁর কাছে আসতে পারল না।
৬. চিঠি পাঠিয়ে হুমকি : যখন কোনোভাবেই নবী করিম (সা.) ও সাহাবিদের হিজরত রোধ করতে পারল না, তখন মক্কার মুশরিকরা মুনাফিক সরদার আবদুল্লাহ বিন উবাইকে চিঠি লিখে হুমকি দেয়। তারা তাতে লেখে ‘তোমরা আমাদের লোকদের তোমাদের এলাকায় জায়গা দিয়েছ। আমরা আল্লাহর শপথ করে বলছি, তোমরা যদি তাদেরকে বের করে না দাও, তা হলে আমরা তোমাদের ওপর আক্রমণ করব, তোমাদেরকে হত্যা করব এবং তোমাদের স্ত্রীদের দাসী বানাব।’ মুনাফিক সরদার এই চিঠিকে অজুহাত বানিয়ে নবীজি (সা.) ও মুহাজির সাহাবিদের বের করে দেওয়ার পাঁয়তারা করতে থাকে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি তেজোদ্দীপ্ত ভাষণ তার সব ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দেয়।
৭. পাথর ফেলে হত্যার চেষ্টা : রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় হিজরত করার পর একটি হত্যার দিয়তের ব্যাপারে ফয়সালা করতে ইহুদি গোত্র বনু নাজিরে গমন করেন। তিনি সেখানে গিয়ে একটি দেয়ালের পাশে বসে ছিলেন। ইহুদিরা পূর্ব ষড়যন্ত্র অনুযায়ী ওপর থেকে বড় একটি পাথর ফেলে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে হত্যা করার চেষ্টা করেছিল। পাথর নিক্ষেপের পূর্ব মুহূর্তে আল্লাহ ওহির মাধ্যমে নবীজি (সা.)-কে বিষয়টি জানিয়ে দেন। তিনি দ্রুত সরে যান এবং পাথর তাঁর কাছেই এসে পড়ে।
৮. খাদ্যে বিষ প্রয়োগ : মহানবী (সা.)-কে হত্যা করতে মদিনার ইহুদি নারী জয়নব বিনতে হারিস খাসির গোশতে বিষ মিশিয়ে তা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে পেশ করে। তিনি বিষযুক্ত খাবার মুখে নিতেই খাবার বলে দিল তাতে বিষ আছে। তিনি সঙ্গে সঙ্গে তা ফেলে দিলেন। তবে বিষযুক্ত খাবার খেয়ে সাহাবি বিশর বিন বারা (রা.) শহীদ হয়ে যান। এই হত্যার দায়ে জয়নবকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
৯. গুপ্ত ঘাতক প্রেরণ : বদর যুদ্ধে পরাজয়ের পর প্রতিশোধের জন্য কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান (তিনি পরবর্তী সময়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন) রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে হত্যার জন্য মদিনায় গুপ্ত ঘাতক পাঠিয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ সেই ষড়যন্ত্র ফাঁস করে দেন এবং পরে আবু সুফিয়ান নিজেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।
১০. মাথা চেয়ে ফরমান জারি : রাসুলুল্লাহ (সা.) অন্যান্য রাজা-বাদশাহের সঙ্গে পারস্যের সম্রাট কিসরার কাছে ইসলামের আহবান জানিয়ে চিঠি লেখেন। এই চিঠি পড়ে সে ক্ষুব্ধ হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চিঠি ছিঁড়ে ফেলে। সে ইয়েমেনে নিযুক্ত তার প্রশাসক বাজানের কাছে ফরমান পাঠায়, সে যেন নবী (সা.)-কে হত্যা করে তাঁর মাথা সম্রাটের কাছে পাঠিয়ে দেয়। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছায় কিছুদিনের মধ্যে সম্রাটের মৃত্যু হয় এবং বাজান নবীজি (সা.)-এর আহ্বানে ইসলাম গ্রহণ করেন।
আলুকা ডটকম অবলম্বনে
১৩
১৮ মন্তব্য