Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৩ আগস্ট, ২০২৬ ১০:৫৮ পূর্বাহ্ণ

বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা গ্রীষ্মে নয়, শীতকালেই হোক


বাংলাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ‘বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা’ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আমাদের শৈশব স্মৃতির এক অনন্য অংশ। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, বর্তমানে দেশের অধিকাংশ সরকারি ও বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্ষপঞ্জির জটিলতা বা প্রশাসনিক বিলম্বের কারণে এই আয়োজন সম্পন্ন করতে করতে চৈত্র বা বৈশাখের তীব্র দাবদাহ চলে আসে। কড়া রোদে তপ্ত মাঠে কোমলমতি শিশুদের দৌড়ঝাঁপ, কুচকাওয়াজ কিংবা শারীরিক কসরত করানো শুধু কষ্টদায়কই নয়, তাদের স্বাস্থ্যের জন্যও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। স্বাস্থ্যগত ও মনস্তাত্ত্বিক—উভয় দিক বিবেচনায় এই ঐতিহ্যবাহী আয়োজনটি চৈত্র-বৈশাখের তীব্র গরমে না করে শীতকালে সম্পন্ন করা এখন সময়ের দাবি

১. গরমে শারীরিক ঝুঁকি তীব্র রোদে শারীরিক পরিশ্রম কোমলমতি শিশুদের স্বাস্থ্যের ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। গ্রীষ্মের প্রখর রোদে খোলা মাঠে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেই শিশুরা ডিহাইড্রেশন (পানিশূন্যতা), হিট স্ট্রোক, তীব্র ক্লান্তি এবং হিট র‍্যাশের শিকার হতে পারে। রোদে দৌড়াতে গিয়ে মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ার মতো দুর্ঘটনাও অস্বাভাবিক নয়। এছাড়া প্রতিযোগিতার আগের কয়েকদিনের নিয়মিত অনুশীলনও শিশুদের শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্রমাগত ক্লান্ত করে তোলে

২. শীতকাল—আদর্শ ঋতু আবহাওয়ার বিচারে শীতকালই ক্রীড়া ও বহিরাঙ্গন (আউটডোর) কার্যকলাপের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে আবহাওয়া থাকে মনোরম, ঠান্ডা ও শুষ্ক। এ সময় মাঠে খেলাধুলা করা শিশুদের জন্য আরামদায়ক; মিষ্টি রোদে তারা স্বাভাবিক স্ফূর্তি নিয়ে খেলায় অংশ নিতে পারে। ঘাম কম হওয়ায় ক্লান্তি আসে দেরিতে, ফলে শিশুরা নিজেদের সেরাটা উপহার দিতে পারে

৩. আনন্দময় শিখন বনাম শারীরিক শাস্তি প্রাথমিক শিক্ষার অন্যতম মূল লক্ষ্য শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ। তীব্র গরমে প্রতিযোগিতা আয়োজন করলে তা আনন্দের বদলে এক ধরনের ‘শারীরিক শাস্তিতে’ পরিণত হয়। শিশুরা স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের আগ্রহ হারিয়ে ফেলে, আর অভিভাবকরাও তীব্র গরমে সন্তানদের মাঠে পাঠাতে দ্বিধাবোধ করেন। শীতকালে আয়োজন করা হলে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবক—সবাই এক উৎসবমুখর পরিবেশে দিনটি উপভোগ করতে পারেন

৪. প্রাতিষ্ঠানিক পঞ্জিকার সাথে সামঞ্জস্য নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতে (জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি) বা বার্ষিক পরীক্ষার পরপরই এই প্রতিযোগিতার সূচি নির্ধারণ করা গেলে সারা বছরের পাঠদানের স্বাভাবিক ছন্দ বিঘ্নিত হয় না। বরং শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই একটি প্রাণবন্ত আয়োজন শিক্ষার্থীদের নতুন উদ্যমে শ্রেণিকক্ষে ফিরতে সহায়তা করে

৫. নীতিগত সুপারিশ শিক্ষা প্রশাসন ও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের উচিত বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার কেন্দ্রীয় ক্যালেন্ডারে পরিবর্তন আনা এবং ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যেই দেশের সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা সম্পন্ন করার একটি সুস্পষ্ট বাধ্যবাধকতা তৈরি করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়ে বিদ্যালয়গুলোকে এই সূচি মেনে চলতে বাধ্য করা যেতে পারে

শিশুরাই ভবিষ্যতের কান্ডারি। তাদের হাসিখুশি ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগ দেওয়া আমাদের দায়িত্ব। গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহে মাঠে নামিয়ে তাদের অসুস্থ করে তোলার চেয়ে, শীতের মনোরম আমেজে আনন্দময় পরিবেশে এই বার্ষিক উৎসব আয়োজন করাই হোক আমাদের নতুন অঙ্গীকার

 

মন্তব্য করুন