Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৩ আগস্ট, ২০২৬ ১২:১০ অপরাহ্ণ

হলুদ সাংবাদিক কাকে বলে,,,

সাংবাদিকতার সাথে জড়িত নয় এমন সব লোকও জোসেফ পুলিৎজারকে এক নামে চেনে। তাকে বলা হয় সাংবাদিকতার দাদা। কারণ আর তেমন কিছু নয়, সাংবাদিকতার বড় এক স্বীকৃতি ও সম্মানজনক পুরস্কার পুলিৎজার। হাঙ্গেরীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকান সাংবাদিক পুলিৎজার আঠারো শতকের শেষ থেকে উনিশ শতকের গোড়া অব্দি সোল্লাসে বিচরণ করেছেন সাহিত্য আর সংবাদের উঠোনে। লেখনীর জনপ্রিয়তা ও সংবাদপত্র দিয়ে কম সময়ে বেশ বিপুল অঙ্কের টাকা জমে তার। ১৯১১ সালে মৃত্যুর আগে কলম্বিয়া স্কুল অব জার্নালিজমে তার টাকার বিরাট একটি অংশ দান করে যান। মৃত্যুর পর থেকে চালু হয় পুলিৎজার পুরস্কার দেওয়া।প্রতি বছর সাংবাদিকতা, শিল্পকলা, পত্র ও কল্পকাহিনী বিভাগে এই পুরস্কার দেওয়া হয়। সাধারণত আমেরিকার পত্রপত্রিকার সাংবাদিকরা এই পুরস্কারের জন্য মনোনীত হওয়ার যোগ্যতা রাখেন। এখন অনলাইন সাংবাদিকতায়ও এই পুরস্কার দেওয়া হয়। প্রতি বছরের এপ্রিল মাসে বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়। এখানে মোট ২১টি ক্ষেত্রে পুরস্কারের সুযোগ থাকে।

হলুদ রঙের সাংবাদিকতার কথা বলতে এসে জোসেফ পুলিৎজারের পরিচয় দিয়ে শুরু করাটা ধান ভানতে শিবের গীতের মতো শোনায় বটে। তবে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ সাংবাদিকতার এই দাদা, যিনি কি না ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি এনে বৈচিত্র্য দিয়েছিলেন সাংবাদিকতায়, তিনিই প্রথম এই পেশাকে নোংরা প্রতিযোগিতার মাঝে ঠেলে নিয়ে যান।

হলুদ সাংবাদিকতা বলতে সাধারণত বোঝানো হয় অতিরঞ্জিত সাংবাদিকতাকে। এখানে সত্যকে বাড়িয়ে বলা হয়, অথবা অতি সাধারণ সংবাদের এমন এক গুরুতর শিরোনাম দেওয়া হয় যে পাঠক পড়তে আকৃষ্ট হবেই। কেলেঙ্কারি ধরনের খবর এই সংবাদের প্রধান লক্ষ্য থাকে। সাধারণ সংবাদকে প্রথম পাতায় নিয়ে এসে পাতা জুড়ে বড় অক্ষরে রংচঙে শিরোনাম করাও হলুদ সাংবাদিকতার মাঝে পড়ে।১৯৪১ সালে ফ্রাংক মট হলুদ সাংবাদিকতার পাঁচটি লক্ষণের কথা বলেছিলেন। এর মাঝে আছে বিশাল অক্ষরে ছাপা শিরোনাম, যা মানুষকে ভয় পাইয়ে দেয়, নিশ্চয় সাংঘাতিক কিছু ঘটেছে, অথচ তেমন কিছুই না। যেসব সংবাদে অনাবশ্যকভাবে বেশি বেশি ছবি ব্যবহার করা হয়, যেখানে মিথ্যা সাক্ষাৎকার দেয়া হয়, কুসংস্কারকে বিজ্ঞান বলে দাবী করা, ভুল তথ্য দিয়ে ‘গবেষণায় পাওয়া যায়’ বা ‘বিশেষজ্ঞরা মনে করেন’ বলে দেওয়া, অপ্রয়োজনীয় রঙের ব্যবহার।

কিন্তু পৃথিবীতে এত রঙের বাহার থাকতে হলুদ রঙটা কী এমন দোষ করলো যে অসৎ সাংবাদিকতার সাথে তার নাম জুড়ে যাবে?
পুলিৎজারের কথা দিয়ে শুরু করা হয়েছিল, ফিরে যাওয়া যাক আবার তার কাছেই।

১৮৯০ সাল নাগাদ প্রযুক্তির এগিয়ে যাওয়া সংবাদপত্রগুলোকে দিন দিন সস্তা করে তুলছিল। নিউ ইয়র্কের পত্রিকা মালিকেরা নিজেদের মাঝে লড়াইয়ে নামলেন, যে যত দাম কমিয়ে ক্রেতা বাড়াতে পারেন। কিন্তু এর মাঝে জোসেফ পুলিৎজার আর উইলিয়াম র‍্যাডলফ হার্স্টের লড়াই চিরদিন মনে রাখার মতো। দুটো পত্রিকাকেই খদ্দের ধরতে খবরে রঙ চড়ানোর দায়ে অভিযুক্ত করা হতো, যদিও তারা ভালো রিপোর্টিং কম করেনি একেবারে।

১৮৮৩ সালে পুলিৎজার নিউ ইয়র্ক ওয়ার্ল্ড পত্রিকাটি কিনে নেন। তিনি প্রথমে চেষ্টা করেন যেন তার পত্রিকাটি আর দশটা গৎবাঁধা পত্রিকার মতো না হয়। পাঠকের জন্য সহজপাঠ্য করে তোলার এই চেষ্টায় পত্রিকার বিশাল একটা অংশ ভরে গেলো সস্তা ভাঁড়ামিতে। পাঠকসংখ্যা বাড়াতে পাতায় পাতায় বিভিন্ন প্রতিযোগিতা, মজার খেলা ও ছবি দেওয়া হলো। যতটুকু জায়গায় সংবাদ হতো, সেটুকু চাঞ্চল্যকর অপরাধবিষয়ক সংবাদে ভরা থাকতো। গুরুত্বপূর্ণ খবর বাদ দিয়ে, ‘সত্যিই কি আত্মহত্যা?’ বা ‘করুণার জন্য চিৎকার’ নামের শিরোনামগুলো বড় হরফে লিখে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হত।

পুলিৎজার নিউ ইয়র্ক ওয়ার্ল্ডের দাম ঠিক করেন দুই সেন্ট। দুই সেন্টে তিনি পাঠকদের আট থেকে বারো পাতার সংবাদপত্র দিতেন। অন্যদিকে নিউ ইয়র্কে সে সময় চলা দুই সেন্টের পত্রিকাগুলো চার পাতার বেশি ছিল না। পুলিৎজার নিউ ইয়র্ক ওয়ার্ল্ড কেনার পর দুই বছরে সেটা নিউ ইয়র্কের সবচেয়ে পাঠকপ্রিয় আর সর্বাধিক বিক্রিত পত্রিকায় পরিণত হয়েছিল।

মন্তব্য করুন