সহকারী শিক্ষক
২৩ আগস্ট, ২০২৬ ০২:২৪ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
আজ একটি প্রশ্ন লিখে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে এআইয়ের কাছ থেকে উত্তর পাওয়া আমাদের কাছে খুব স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছে। ই-মেল লেখা, ছবি তৈরি, তথ্য খোঁজা, কোডিং, ভ্রমণের পরিকল্পনা কিংবা দীর্ঘ নথির সারাংশ—সবকিছুতেই বাড়ছে এআইয়ের ব্যবহার। কিন্তু পর্দায় ভেসে ওঠা সেই কয়েক লাইনের উত্তরের পিছনে আসলে কী কাজ করে, তা আমরা খুব কমই ভাবি।
একটি এআই প্রম্পটের যাত্রা পৌঁছে যায় বিশাল ডেটা সেন্টারে, যেখানে শক্তিশালী সার্ভার ও বিশেষ চিপ বিপুল পরিমাণ হিসাব সম্পন্ন করে। সেই যন্ত্র চালাতে প্রয়োজন বিদ্যুৎ, অতিরিক্ত তাপ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন শীতলীকরণ ব্যবস্থা, আর এই পুরো প্রযুক্তি কাঠামো গড়ে তুলতে লাগে নানা গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ। একটি প্রম্পট হয়তো সামান্য, কিন্তু প্রতিদিন যখন কোটি কোটি মানুষ একই কাজ করছে, তখন সেই অদৃশ্য খরচের পরিমাণ আর মোটেও সামান্য থাকে না।
প্রতিদিন বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাছে নানা প্রশ্ন করছে। কেউ ই-মেল লিখছে, কেউ ছবি তৈরি করছে, কেউ দীর্ঘ নথির সারাংশ চাইছে, কেউ ভ্রমণের পরিকল্পনা করছে, আবার কেউ জটিল কোডিং সমস্যার সমাধান খুঁজছে। কয়েক বছর আগেও যে কাজগুলির জন্য আলাদা সফটওয়্যার, বিশেষজ্ঞ অথবা দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হতো, এখন তার অনেকটাই কয়েকটি শব্দ লিখে করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে এআই দ্রুত ব্যক্তিগত এবং পেশাগত জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে।
এই বিস্তারের পরিমাণও নজরকাড়া। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে ওপেনএআইয়ের চ্যাটজিপিটি সাপ্তাহিক সক্রিয় ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৯০ কোটি ছাড়িয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আফ্রিকা ও এশিয়ায় এর ব্যবহার বৃদ্ধির গতি বিশেষভাবে দ্রুত। একই সময়ের মধ্যে গুগলের জেমিনি মাসিক সক্রিয় ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৭৫ কোটির বেশি বলে জানিয়েছে। পরে বাজারে এলেও চীনের ডিপসিক কয়েক মাসের মধ্যেই কয়েক কোটি ব্যবহারকারী আকর্ষণ করেছে। অর্থাৎ এআই আর কেবল প্রযুক্তি সংস্থার পরীক্ষাগারের বিষয় নয়, এটি ক্রমশ সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ডিজিটাল অভ্যাসে পরিণত হচ্ছে।
এই পরিবর্তনের সঙ্গে মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের বিস্তারও সরাসরি যুক্ত। বিশ্বের ১০ বছরের বেশি বয়সি মানুষের প্রায় ৮২ শতাংশের হাতে এখন মোবাইল ফোন রয়েছে। উচ্চ আয়ের এবং নিম্ন আয়ের দেশগুলির মধ্যে ডিজিটাল ব্যবহারে এখনও বড় ফারাক থাকলেও মোবাইল ফোনের নাগাল এবং ইন্টারনেট সংযোগের ব্যবধান ধীরে ধীরে কমছে। প্রতিটি নতুন স্মার্টফোন ব্যবহারকারী, নতুন ইন্টারনেট গ্রাহক এবং ক্লাউডের সঙ্গে যুক্ত প্রতিটি নতুন যন্ত্র ভবিষ্যতে এআই পরিষেবার সম্ভাব্য ব্যবহারকারী হয়ে উঠতে পারে।
ভারতের বাজারেও সেই পরিবর্তন স্পষ্ট। ফ্লিপকার্ট এবং কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের যৌথ সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, স্মার্টফোন কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় ৮৯ শতাংশ ক্রেতা এআই-সক্ষম সুবিধাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেছেন। অর্থাৎ ক্যামেরা, ব্যাটারি, প্রসেসরের মতোই এআই এখন স্মার্টফোন বিক্রির অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠছে। কিন্তু একটি প্রশ্ন সাধারণত আড়ালেই থেকে যায়। তুমি যখন এআইকে একটি প্রম্পট দিচ্ছ, তার উত্তর তৈরি করতে আসলে কতটা বাস্তব অবকাঠামো কাজ করছে?
এআইয়ের উত্তর কোনও অদৃশ্য জাদুর ফল নয়। তোমার লেখা কয়েকটি শব্দ ডেটা সেন্টারে পৌঁছয়, সেখানে শক্তিশালী সার্ভার এবং বিশেষায়িত প্রসেসর সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে। বৃহৎ ভাষা মডেলের ক্ষেত্রে বিপুল সংখ্যক গাণিতিক হিসাব কয়েক মুহূর্তের মধ্যে সম্পন্ন করতে হয়। এই কাজের জন্য ব্যবহৃত গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিট বা জিপিইউ এবং অন্যান্য উচ্চক্ষমতার চিপ প্রচুর বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। তারপর সেই যন্ত্রপাতি ঠান্ডা রাখার জন্য প্রয়োজন হয় আরও একটি বিশাল ব্যবস্থা।
বর্তমানে বিশ্বের মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রায় ১.৫ শতাংশ ডেটা সেন্টারগুলির সঙ্গে যুক্ত। সংখ্যাটি প্রথম দেখায় খুব বড় মনে না হলেও, এআইয়ের দ্রুত বিস্তারের কারণে এই চাহিদা ভবিষ্যতে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। একটি সাধারণ ইন্টারনেট অনুসন্ধানের তুলনায় জটিল এআই অনুসন্ধান বা দীর্ঘ উত্তর তৈরিতে অনেক বেশি কম্পিউটিং শক্তি প্রয়োজন হতে পারে। বিশেষ করে ছবি, ভিডিও অথবা বড় আকারের এআই মডেল তৈরির কাজের ক্ষেত্রে শক্তির ব্যবহার আরও বেড়ে যায়।
তবে শুধু বিদ্যুৎই বিষয় নয়। ডেটা সেন্টারের সার্ভারগুলি প্রচণ্ড গরম হয়ে ওঠে। সেই তাপ নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন ধরনের শীতলীকরণ ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়, যার মধ্যে জলনির্ভর ব্যবস্থাও রয়েছে। ফলে এআইয়ের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছু অঞ্চলে বিদ্যুৎ এবং জলের উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। বিশেষত যেখানে আগে থেকেই গরম আবহাওয়া, জলাভাব অথবা বিদ্যুৎ সরবরাহের সমস্যা রয়েছে, সেখানে নতুন বৃহৎ ডেটা সেন্টার গড়ে তোলা একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত প্রশ্ন হয়ে উঠতে পারে।
এআইয়ের আর একটি অদৃশ্য স্তর রয়েছে। সার্ভার, চিপ এবং ব্যাটারি তৈরির জন্য প্রয়োজন সিলিকন, লিথিয়াম, কোবাল্টসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও উপাদান। তাই এআইয়ের ব্যবহার শুধু ডিজিটাল জগতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে খনি, উৎপাদন শিল্প, চিপ কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, ফাইবার-অপটিক নেটওয়ার্ক এবং বিশাল ডেটা সেন্টারের বাস্তব পৃথিবী।
ভারতের মতো দেশে এই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। দেশ একদিকে এআই এবং ডেটা সেন্টার অবকাঠামোয় দ্রুত বিনিয়োগ আকর্ষণ করছে, অন্যদিকে গ্রীষ্মকালে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা নতুন রেকর্ড তৈরি করছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জীবাশ্ম জ্বালানির ভূমিকা এখনও বড়। ফলে কোটি কোটি নতুন এআই ব্যবহারকারী এবং ক্রমবর্ধমান ডেটা সেন্টারের জন্য প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত বিদ্যুৎ কোথা থেকে আসবে, সেটি প্রযুক্তির বাইরেও অর্থনীতি, পরিবেশ এবং অবকাঠামোর প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
একটি মাত্র প্রম্পট হয়তো খুব সামান্য সম্পদ ব্যবহার করে। কিন্তু যখন একই ধরনের প্রম্পট প্রতিদিন কোটি কোটি বা শত কোটি বার পাঠানো হয়, তখন সেই সামান্য ব্যবহারই বিশাল পরিমাণ বিদ্যুৎ, কম্পিউটিং ক্ষমতা, শীতলীকরণ ব্যবস্থা এবং প্রাকৃতিক সম্পদের চাহিদায় পরিণত হয়। এআইয়ের প্রতিটি উত্তর তাই পর্দায় কয়েক সেকেন্ডে ভেসে উঠলেও, তার পিছনে কাজ করে এক বিশাল এবং ক্রমশ সম্প্রসারিত বাস্তব অবকাঠামো।
৬
৬ মন্তব্য