সহকারী অধ্যাপক
২৪ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:৩৮ পূর্বাহ্ণ
উত্তম কথা, মধুর হাসি ও কৃতজ্ঞতার আলো - মোঃ মুজিবুর রহমান
উত্তম কথা, মধুর হাসি ও কৃতজ্ঞতার আলো
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর
ভূমিকা
মানুষের ব্যক্তিত্ব, চরিত্র ও মানবিকতার অন্যতম প্রধান প্রকাশ ঘটে তার কথা, আচরণ ও ব্যবহারের মাধ্যমে। একজন মানুষ কীভাবে কথা বলে, কীভাবে অন্যের সঙ্গে আচরণ করে, উপকার পেলে কীভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতের প্রতি কীভাবে শুকরিয়া আদায় করে—এসবের মধ্য দিয়েই তার অন্তরের সৌন্দর্য ও চরিত্রের পরিচয় ফুটে ওঠে।
ইসলাম মানুষের বাহ্যিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি অন্তরের সৌন্দর্য ও উত্তম চরিত্রকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। ঈমান শুধু মুখে উচ্চারিত কিছু বিশ্বাসের নাম নয়; বরং ঈমান মানুষের কথা, কাজ, আচরণ, ব্যবহার, চিন্তা ও সামাজিক সম্পর্কের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। তাই একজন মুমিনের মুখে অশ্লীলতা, মিথ্যা, গালি, অপবাদ, পরনিন্দা ও কটু কথা শোভা পায় না। তার কথা হবে সত্য, সুন্দর, কল্যাণকর ও হৃদয়গ্রাহী। মানুষের সঙ্গে তার আচরণ হবে বিনয়ী, আন্তরিক ও ভালোবাসাপূর্ণ।
একটি সুন্দর কথা মানুষের ভেঙে যাওয়া মনকে সান্ত্বনা দিতে পারে। একটি আন্তরিক হাসি অপরিচিত মানুষকেও আপন করে নিতে পারে। আবার একটি কটু কথা দীর্ঘদিনের সম্পর্ক নষ্ট করে দিতে পারে। তাই কথা ও আচরণের ক্ষেত্রে সচেতনতা একজন মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ গুণ।
আমাদের আলোচ্য মূল শিক্ষায় তিনটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে—উত্তম কথা, মধুর হাসি এবং কৃতজ্ঞ হৃদয়। এই তিনটি গুণ ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে শান্তি, সৌহার্দ্য, ভালোবাসা ও পারস্পরিক সহযোগিতা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
উত্তম কথা বলার গুরুত্ব
মানুষের মুখের ভাষা তার চরিত্রের আয়না। কথার মাধ্যমে মানুষ তার জ্ঞান, বিবেক, মূল্যবোধ ও মানসিকতার পরিচয় দেয়। সুন্দর কথা মানুষের হৃদয় জয় করে; আর কটু কথা মানুষের হৃদয়ে আঘাত সৃষ্টি করে।
একজন মুমিনের উচিত কথা বলার আগে চিন্তা করা—আমি যা বলতে যাচ্ছি, তা কি সত্য? এতে কি কোনো কল্যাণ আছে? এতে কি অন্যের উপকার হবে? নাকি আমার কথায় কারও মনে কষ্ট সৃষ্টি হবে?
যে কথায় কল্যাণ নেই, সে কথা না বলাই উত্তম। কারণ মানুষের জিহ্বা ছোট হলেও তার প্রভাব অনেক বড়। একটি কথা বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে পারে, আবার একটি কথাই সম্পর্কের মধ্যে গভীর ফাটল সৃষ্টি করতে পারে। মূল রচনাতেও কথাকে সম্পর্ক গড়ার ও ভাঙার শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
তাই সত্য কথা বলতে হবে, তবে তা বলতে হবে সুন্দর ও কোমল ভাষায়। সত্য কখনো কঠিন হতে পারে, কিন্তু সত্য প্রকাশের পদ্ধতি যেন মানুষের হৃদয়ে অযথা আঘাত না করে। উপদেশ দিতে হলে প্রজ্ঞা ও নম্রতার সঙ্গে দিতে হবে। কাউকে সংশোধন করার উদ্দেশ্যে বলা কথা যদি অপমানের ভাষায় বলা হয়, তাহলে অনেক সময় সংশোধনের পরিবর্তে বিরোধ সৃষ্টি হয়।
মিথ্যা, গালি ও পরনিন্দা বর্জন
ইসলামী চরিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জিহ্বার হেফাজত। মিথ্যা, গালি, অপবাদ, বিদ্রূপ, পরনিন্দা ও অকারণে কাউকে অপমান করা মানুষের চরিত্রকে কলুষিত করে। এগুলো শুধু ব্যক্তির সম্মান নষ্ট করে না; পরিবার, বন্ধুত্ব ও সামাজিক সম্পর্কেও অশান্তি সৃষ্টি করে।
বিশেষ করে রাগের সময় মানুষ অনেক সময় এমন কথা বলে ফেলে, যা পরে সে নিজেই অনুতপ্ত হয়। কিন্তু উচ্চারিত কথা সহজে ফিরিয়ে নেওয়া যায় না। তাই রাগের মুহূর্তে নীরব থাকা, নিজেকে সংযত করা এবং পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার পর কথা বলা বুদ্ধিমানের কাজ। মূল উপাদানেও রাগের সময় থেমে যাওয়া, আত্মসংযম এবং জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণ করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অতএব, কোনো ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে তার দোষ আলোচনা করা, মিথ্যা অভিযোগ করা, অপমানজনক কথা বলা বা রাগের বশে আঘাতকারী ভাষা ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। একজন মুমিনের জিহ্বা হবে শান্তির বাহন, বিবাদের কারণ নয়।
কথার আগে চিন্তা করার শিক্ষা
কথা বলার আগে কিছু প্রশ্ন নিজেকে করা উচিত—
আমি কি সত্য কথা বলছি?
আমার কথায় কি কোনো কল্যাণ আছে?
আমার কথা কি অন্যের উপকার করবে?
আমার কথায় কি কারও হৃদয়ে অকারণে আঘাত লাগতে পারে?
এই কথা না বললেও কি চলে?
যদি কোনো কথায় কল্যাণ না থাকে, তাহলে নীরব থাকা উত্তম। কারণ নীরবতা কখনো দুর্বলতা নয়; বরং অনেক সময় নীরবতা প্রজ্ঞা, আত্মসংযম ও পরিণত ব্যক্তিত্বের পরিচয়।
মানুষের জীবনে অনেক বিবাদ শুরু হয় সামান্য একটি বাক্য থেকে। আবার অনেক সম্পর্কও একটি আন্তরিক বাক্যের মাধ্যমে পুনরায় সুন্দর হয়ে ওঠে। তাই কথা বলার ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতা অত্যন্ত জরুরি।
মধুর হাসির মাহাত্ম্য
মানুষের সঙ্গে সুন্দর সম্পর্ক গড়ে তোলার সবচেয়ে সহজ মাধ্যমগুলোর একটি হলো আন্তরিক হাসি। একটি হাসির জন্য অর্থ ব্যয় করতে হয় না, অথচ তা অন্যের মনে আনন্দ সৃষ্টি করতে পারে। ক্লান্ত মানুষকে সাহস দিতে পারে, বিষণ্ন মানুষকে স্বস্তি দিতে পারে এবং অপরিচিত মানুষের সঙ্গে আন্তরিকতার সূচনা করতে পারে।
হাসিমুখে সালাম দেওয়া, সৌজন্যপূর্ণভাবে কথা বলা এবং আন্তরিকতার সঙ্গে অন্যের খোঁজ নেওয়া মানুষের মধ্যে ভালোবাসা ও সৌহার্দ্য সৃষ্টি করে। মূল রচনায়ও হাসিমুখে তাকানোকে সদকার একটি দান হিসেবে উল্লেখ করে এর সামাজিক ও মানবিক গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
তবে হাসি যেন কখনো বিদ্রূপের হাসি না হয়। কারও দুর্বলতা, দারিদ্র্য, শারীরিক বৈশিষ্ট্য, ভুল বা অসহায়ত্ব নিয়ে হাসাহাসি করা মানবিকতার পরিপন্থী। মুমিনের হাসি হবে ভালোবাসার, আন্তরিকতার ও সৌহার্দ্যের প্রকাশ।
একজন বিষণ্ন মানুষকে আন্তরিকভাবে জিজ্ঞেস করা—“কেমন আছেন?”—তার কাছে হয়তো খুব সাধারণ একটি কথা; কিন্তু তার নিঃসঙ্গ হৃদয়ে এটি আশার আলো জ্বালাতে পারে।
মানুষের পাশে দাঁড়ানো
ইসলামী জীবনব্যবস্থায় মানবসেবা একটি মহৎ গুণ। মানুষ কেবল নিজের জন্য বাঁচবে না; বরং অন্যের সুখ-দুঃখের প্রতিও তার দায়িত্ব রয়েছে।
কেউ দুঃখে থাকলে তাকে সান্ত্বনা দেওয়া, কেউ বিপদে পড়লে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া, কেউ পথ হারালে সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো উত্তম চরিত্রের পরিচয়।
শিশুর প্রতি স্নেহ, বয়োজ্যেষ্ঠের প্রতি সম্মান, অতিথির প্রতি আতিথেয়তা এবং প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্বশীলতা একটি সুন্দর সমাজের ভিত্তি তৈরি করে।
মানুষের কষ্টকে নিজের কষ্টের মতো অনুভব করা মানবিকতার উচ্চতর প্রকাশ। সমাজে প্রত্যেকে যদি কেবল নিজের স্বার্থের কথা না ভেবে অন্যের কল্যাণেও চিন্তা করে, তাহলে পারস্পরিক সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও ভালোবাসা বৃদ্ধি পাবে।
কৃতজ্ঞতার শিক্ষা
কৃতজ্ঞতা মানুষের অন্যতম মহৎ গুণ। কেউ আমাদের উপকার করলে তার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া মানবিক ও ইসলামী চরিত্রের অংশ। উপকার ছোট হোক বা বড়—উপকারীর অবদানকে স্বীকার করা উচিত।
জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে আমরা অসংখ্য মানুষের কাছ থেকে সাহায্য ও সহযোগিতা পাই। মা আমাদের লালন-পালন করেন, বাবা আমাদের জন্য ত্যাগ স্বীকার করেন, শিক্ষক আমাদের জ্ঞান দেন, বন্ধু বিপদের সময় পাশে দাঁড়ায় এবং অনেক মানুষ বিভিন্নভাবে আমাদের জীবনে সহযোগিতা করে। তাদের অবদান স্মরণ করা এবং যথাসাধ্য সম্মান ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা আমাদের দায়িত্ব।
কৃতজ্ঞতা মানুষকে বিনয়ী করে। সে তখন নিজের সাফল্যকে কেবল নিজের যোগ্যতার ফল মনে করে অহংকারে ডুবে যায় না; বরং উপলব্ধি করে যে জীবনে অন্য মানুষের অবদানও রয়েছে।
মূল রচনায় উপকারীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশকে ইসলামী শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে এবং মা-বাবা, শিক্ষক, বন্ধু ও বিপদের সময় সাহায্যকারী মানুষের অবদান স্মরণ করার কথা বলা হয়েছে।
আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া
মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতার পাশাপাশি আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া আদায় করাও মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। মানুষের জীবন অসংখ্য নেয়ামতে পরিপূর্ণ। জীবন, সুস্থতা, জ্ঞান, সময়, পরিবার, খাদ্য, পানি, বাতাস, আলো, নিরাপদ পরিবেশ—এসবই আল্লাহর মহান অনুগ্রহ।
মানুষ সাধারণত কোনো নেয়ামত হারানোর পর তার মূল্য উপলব্ধি করে। অথচ একজন সচেতন মুমিন প্রাপ্ত নেয়ামতের জন্য আগেই কৃতজ্ঞ হয়। সে সুখের সময় আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে এবং দুঃখের সময় ধৈর্য ধারণ করে।
শুকরিয়া শুধু মুখে “আলহামদুলিল্লাহ” বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আল্লাহর দেওয়া নেয়ামত সঠিকভাবে ব্যবহার করাও শুকরিয়ার অংশ। জ্ঞান পেলে তা কল্যাণে ব্যবহার করা, সম্পদ পেলে অসহায়কে সাহায্য করা, শক্তি পেলে দুর্বলকে সহযোগিতা করা এবং সময় পেলে ভালো কাজে ব্যয় করা হলো নেয়ামতের যথার্থ মর্যাদা দেওয়া।
কৃতজ্ঞতা ও বিনয়ের সম্পর্ক
কৃতজ্ঞ মানুষ সাধারণত অহংকারী হয় না। কারণ সে জানে, তার জীবনের সাফল্যের পেছনে অনেক মানুষের অবদান রয়েছে এবং সব নেয়ামতের মূল উৎস আল্লাহ তাআলা।
অন্যদিকে অকৃতজ্ঞতা মানুষের হৃদয়কে কঠিন করে দেয়। সে যা পেয়েছে তার দিকে না তাকিয়ে কেবল যা পায়নি তার জন্য অভিযোগ করতে থাকে। ফলে তার মনে অসন্তোষ ও অশান্তি বাড়তে থাকে।
কৃতজ্ঞ মানুষ অল্পের মধ্যেও আনন্দ খুঁজে পায়। সে অন্যের সামান্য উপকারকেও মূল্য দেয় এবং নিজের জীবনের ছোট-বড় প্রতিটি অনুগ্রহকে আল্লাহর দান হিসেবে উপলব্ধি করে।
পরিবারে উত্তম কথা ও কৃতজ্ঞতার প্রয়োজন
পরিবার মানুষের প্রথম শিক্ষালয়। সন্তান বাবা-মায়ের কাছ থেকে কথা বলা, আচরণ করা, সম্মান দেখানো ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের শিক্ষা লাভ করে। তাই পরিবারের পরিবেশ সুন্দর হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্বামী-স্ত্রী যদি পরস্পরের সঙ্গে কোমল ভাষায় কথা বলেন, একে অন্যের অবদান স্বীকার করেন, ভুল হলে ক্ষমা করেন এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন, তাহলে পরিবারে ভালোবাসা ও শান্তি বৃদ্ধি পায়।
অন্যদিকে কটু কথা, অপমান, অহংকার, রাগ ও অকৃতজ্ঞতা পরিবারে অশান্তি সৃষ্টি করে। একটি পরিবারের সদস্যরা যদি একে অপরের ছোট ছোট ভালো কাজেরও প্রশংসা করেন, তাহলে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আন্তরিকতা বৃদ্ধি পায়।
সন্তানের ক্ষেত্রেও একই শিক্ষা প্রযোজ্য। সন্তানকে শুধু শাসন নয়, তার ভালো কাজের প্রশংসা ও উৎসাহ দেওয়া প্রয়োজন। এতে তার আত্মবিশ্বাস ও সুন্দর চরিত্র বিকশিত হয়।
শিক্ষার্থীজীবনে এই শিক্ষার প্রয়োগ
শিক্ষার্থীর চরিত্র গঠনে উত্তম কথা, মধুর হাসি ও কৃতজ্ঞতার বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। একজন শিক্ষার্থীকে শিক্ষক, বাবা-মা, সহপাঠী ও বিদ্যালয়ের কর্মীদের সঙ্গে ভদ্র ও সম্মানজনক আচরণ করতে হবে।
শিক্ষকের কোনো উপদেশ ভালো না লাগলে অসম্মানজনক ভাষা ব্যবহার না করে বিনয়ের সঙ্গে নিজের বক্তব্য প্রকাশ করা উচিত। সহপাঠী ভুল করলে তাকে উপহাস না করে সহযোগিতা করতে হবে। কেউ পড়াশোনায় দুর্বল হলে তাকে সাহায্য করা উচিত।
বন্ধু কোনো উপকার করলে ধন্যবাদ দেওয়া, শিক্ষক জ্ঞান দিলে কৃতজ্ঞ থাকা এবং বাবা-মায়ের ত্যাগকে মূল্য দেওয়া শিক্ষার্থীর চরিত্রকে সুন্দর করে।
এভাবে শিক্ষা কেবল পরীক্ষার ফলাফলে সীমাবদ্ধ না থেকে চরিত্র, আচরণ ও মানবিকতার উন্নয়নে ভূমিকা রাখে।
রাগ নিয়ন্ত্রণ ও আত্মসংযম
রাগ মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতি। কিন্তু রাগের সময় নিজের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা বড় দুর্বলতা। রাগের বশে বলা একটি বাক্য অনেক সময় বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা সম্পর্ক নষ্ট করে দিতে পারে।
তাই রাগের সময় নিজেকে থামাতে হবে। প্রয়োজন হলে কিছু সময় নীরব থাকতে হবে, স্থান পরিবর্তন করতে হবে এবং পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার পর কথা বলতে হবে।
আত্মসংযমের অর্থ নিজের অনুভূতিকে অস্বীকার করা নয়; বরং অনুভূতির ওপর বিবেক ও নৈতিকতার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। মূল শিক্ষায়ও রাগের সময় নিজেকে সংযত করা এবং নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখাকে মুমিনের গুণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
বিনয় ও অহংকার থেকে মুক্তি
উত্তম চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো বিনয়। বিনয়ী মানুষ অন্যকে ছোট করে নিজেকে বড় প্রমাণ করতে চায় না। সে নিজের জ্ঞান, সম্পদ, সৌন্দর্য, ক্ষমতা বা সামাজিক অবস্থান নিয়ে অহংকার করে না।
অহংকার মানুষের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করে, আর বিনয় মানুষের হৃদয় জয় করে। তাই মানুষের সঙ্গে কথা বলার সময় বয়স, পেশা, অর্থনৈতিক অবস্থা বা সামাজিক মর্যাদার ভিত্তিতে কাউকে অবজ্ঞা করা উচিত নয়।
ছোটকে স্নেহ এবং বড়কে সম্মান করা, দরিদ্রকে অবহেলা না করা, অসহায়কে সাহায্য করা এবং সবার সঙ্গে সৌজন্যপূর্ণ আচরণ করা সুন্দর চরিত্রের পরিচয়।
প্রতিবেশী ও সমাজের প্রতি দায়িত্ব
মানুষ একা বসবাস করে না। সে পরিবার, প্রতিবেশী ও সমাজের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। তাই একজন মানুষের চরিত্রের পরীক্ষা শুধু ব্যক্তিগত জীবনে নয়, সামাজিক আচরণেও হয়।
প্রতিবেশী অসুস্থ হলে তার খোঁজ নেওয়া, বিপদে সাহায্য করা, প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ানো এবং তার অধিকার রক্ষা করা সামাজিক দায়িত্বের অংশ।
একইভাবে সমাজের অসহায়, দরিদ্র, বৃদ্ধ, শিশু ও বিপদগ্রস্ত মানুষের প্রতি সহমর্মী হওয়া উচিত। মানবসেবার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে ওঠে।
সুন্দর কথা ও সুন্দর সমাজ
একটি সুন্দর সমাজ কেবল বড় বড় ভবন, উন্নত প্রযুক্তি বা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মাধ্যমে গড়ে ওঠে না। সুন্দর সমাজের জন্য প্রয়োজন সুন্দর মানুষ এবং সুন্দর চরিত্র।
মানুষ যদি সত্য কথা বলে, অন্যকে সম্মান করে, উপকারীর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকে, রাগ নিয়ন্ত্রণ করে, পরনিন্দা ও মিথ্যা থেকে দূরে থাকে এবং বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ায়, তাহলে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়।
অন্যদিকে মিথ্যা, গালি, অপমান, বিদ্বেষ, অহংকার ও পরনিন্দা সামাজিক সম্পর্ক দুর্বল করে। তাই সামাজিক শান্তির অন্যতম পূর্বশর্ত হলো মানুষের কথাবার্তা ও আচরণে নৈতিকতা প্রতিষ্ঠা করা।
মূল রচনার সার্বিক শিক্ষাও হলো—উত্তম কথা, হাসিমুখ, কৃতজ্ঞতা ও মানবসেবার সমন্বয়ে ব্যক্তি ও সমাজজীবনকে সুন্দর করা।
কৃতজ্ঞতা কীভাবে প্রকাশ করা যায়
কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য বড় কোনো আয়োজনের প্রয়োজন নেই। একটি আন্তরিক “ধন্যবাদ”, একটি দোয়া, একটি সম্মানজনক কথা কিংবা প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ানোও কৃতজ্ঞতার প্রকাশ হতে পারে।
কেউ সাহায্য করলে তার প্রতি ভালো আচরণ করা, তার জন্য দোয়া করা এবং সুযোগ পেলে তার উপকারে এগিয়ে আসা উচিত।
তবে কৃতজ্ঞতার প্রকৃত সৌন্দর্য হলো—উপকারীর প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়ার পাশাপাশি আল্লাহর প্রতিও শুকরিয়া আদায় করা। কারণ সব কল্যাণের চূড়ান্ত উৎস আল্লাহ তাআলা।
তিনটি গুণের সমন্বিত শিক্ষা
উত্তম কথা, মধুর হাসি ও কৃতজ্ঞতা—এই তিনটি গুণ পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
উত্তম কথা মানুষের হৃদয়ে শান্তি সৃষ্টি করে।
মধুর হাসি মানুষের মধ্যে ভালোবাসা ও আন্তরিকতা সৃষ্টি করে।
কৃতজ্ঞতা মানুষের হৃদয়ে বিনয় ও মানবিকতা সৃষ্টি করে।
এই তিনটি গুণ যখন একজন মানুষের চরিত্রে একত্রিত হয়, তখন তার ব্যক্তিত্ব সুন্দর ও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। সে নিজের জন্য যেমন কল্যাণকর হয়, তেমনি পরিবার, সমাজ ও মানুষের জন্যও উপকারী হয়ে ওঠে।
মূল রচনাতেও এই তিনটি গুণকে মুমিন জীবনের সৌন্দর্যের আলো হিসেবে একত্রে উপস্থাপন করা হয়েছে।
আমাদের করণীয়
উত্তম কথা, মধুর হাসি ও কৃতজ্ঞতার আলোকে জীবন গড়তে আমাদের কিছু অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে—
১. কথা বলার আগে চিন্তা করতে হবে।
২. সত্য কথা বলতে হবে, তবে কোমল ও সুন্দর ভাষায়।
৩. মিথ্যা, গালি, অপবাদ ও পরনিন্দা থেকে দূরে থাকতে হবে।
৪. রাগের সময় নিজেকে সংযত করতে হবে।
৫. মানুষের সঙ্গে হাসিমুখে ও আন্তরিকভাবে কথা বলতে হবে।
৬. শিশুদের স্নেহ করতে এবং বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান করতে হবে।
৭. অতিথি ও প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্বশীল হতে হবে।
৮. বিপদগ্রস্ত ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে।
৯. কেউ উপকার করলে আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হবে।
১০. মা-বাবা, শিক্ষক, বন্ধু ও উপকারীদের অবদান স্মরণ করতে হবে।
১১. আল্লাহর প্রতিটি নেয়ামতের জন্য শুকরিয়া আদায় করতে হবে।
১২. অহংকারের পরিবর্তে বিনয় এবং বিদ্বেষের পরিবর্তে ভালোবাসা গ্রহণ করতে হবে।
১৩. যে কথা মানুষের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে তোলে, সে কথা বলতে হবে।
১৪. যে কথা অকারণে মানুষের হৃদয় ভেঙে দেয়, তা পরিহার করতে হবে।
১৫. মানুষের কল্যাণকে নিজের জীবনের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
উপসংহার
মানুষের জীবনের প্রকৃত সৌন্দর্য শুধু তার পোশাক, চেহারা, সম্পদ বা সামাজিক মর্যাদায় নয়; বরং তার কথা, চরিত্র, ব্যবহার, কৃতজ্ঞতা ও মানবিকতায়। যে মানুষ সুন্দরভাবে কথা বলে, আন্তরিকভাবে হাসে, অন্যের উপকার স্বীকার করে, আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করে এবং মানুষের দুঃখে পাশে দাঁড়ায়—সে সমাজের জন্য সম্পদ।
আমাদের জিহ্বা যেন কারও হৃদয়ে আঘাত না করে; বরং শান্তির বাণী বহন করে। আমাদের হাসি যেন কাউকে বিদ্রূপ না করে; বরং দুঃখী মানুষের মনে আনন্দ জাগায়। আমাদের হৃদয় যেন অকৃতজ্ঞতায় কঠিন না হয়; বরং মানুষের উপকার স্বীকার করে এবং আল্লাহর অনুগ্রহের জন্য সর্বদা শুকরিয়া আদায় করে।
তাই জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আমরা উত্তম কথা বলব, মধুর হাসি দিয়ে মানুষের সঙ্গে মিলিত হব, উপকারীর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকব এবং আল্লাহর প্রতিটি নেয়ামতের জন্য শুকরিয়া আদায় করব। মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করব এবং সুন্দর চরিত্রের মাধ্যমে ইসলামের সৌন্দর্য প্রকাশ করব।
আমাদের জীবনের মূলনীতি হোক—
কথায় থাকবে সত্য ও মাধুর্য,
মুখে থাকবে আন্তরিক হাসি,
হৃদয়ে থাকবে কৃতজ্ঞতা,
আচরণে থাকবে বিনয়,
কর্মে থাকবে মানবসেবা,
আর জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে থাকবে আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রত্যাশা।
এভাবেই উত্তম কথা, মধুর হাসি ও কৃতজ্ঞতার আলোয় আলোকিত হতে পারে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও মানবজীবন। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সুন্দর কথা বলার, সুন্দর আচরণ করার, মানুষের উপকার করার এবং তাঁর অসংখ্য নেয়ামতের জন্য যথাযথ শুকরিয়া আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
৬
৬ মন্তব্য